Wednesday, January 3, 2024


##সীতাহার তৃতীয় পর্ব##
,©ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী✍️
**খুকুদির বিয়ে বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি**
সীতাহার না পরে মা অন্য হার পরে সেদিন বিয়ে বাড়িতে গেলেন কিন্তু মায়ের মনটা সমানে খচ খচ করেই চলেছে! কোথায় গেল হারটা? হারটাকি বাড়িথেকে চুরি গেল! না অন্য কোথাউ ভুলে রেখে দিয়েছেন! মা বলেন ওঁর শাশুড়ির দেওয়া হার। সেই স্মৃতিটা কি মুছে যাবে! বাবাও খুব দুঃখ পেয়েছেন কিন্তু প্রকাশ করছেন না। খুব মন খারাপ হয়েগেলো মায়ের।
এইসময় আমি বলি ও মা আমাদের বাড়িতে তোমার ঘরের এ. সি খারাপ হয়েছিলো। এ.সি সারাতে যে মেকানিক এসেছিলো মনে আছে কবে এসেছিলো সে?
- মা পরক্ষনে বলেন ঠিক বলেছিসতো। আমার মনেই ছিলোনা। দাঁড়া তোর বাবাকে বলি।
বাবা সেই সময় আমাদের মাসতুতো দাদা তন্ময় মুখার্জীর সঙ্গে কি এক বিষয় খুব মনোযোগ সহকারে কথা বলছিলেন। তন্ময়দা নর্থ কলকাতার শ্যামপুকুর থানার ও. সি. মাসির বাড়ি সাউথ সিঁথি তে। বিরাট বনেদি বাড়ি। অনেক বছরের পুরোনো। ওরা খুব বড় লোক তাই ওদের ব্যাপার স্যাপার আলাদা। বেশ জমিদারী ভাব আছে।
মা ক্রমে বাবার কাছে এসে বলেন শুনছো।
- হ্যাঁ শুনছি। আবার কি হল?
- আবার কিছু হয়নি। যেটা হয়েছে তার একটা সূত্র তোমার ছেলে মনে করিয়ে দিয়েছে। আমার মনে ছিলোনা।
- কি সেটা।
- আমার শোবার ঘরের এ. সি. টা খারাপ হয়েছিলো। সেটা সারাতে যে মেকানিক এসেছিলো সেদিন আমি সেই সময় ঠাকুর ঘরের পাশে ঠাকুর ঝির রান্না কিরছিলাম। ঘরে তো কেউ ছিলোনা।
- খুব ভালো করেছ। সেতো এক মাস প্রায় হবে। ঠাকুর ঘর থেকে ফিরে তুমি দেখোনি।
- না লক্ষ্মী ছিল কাছে। আমি লক্ষ্মীকে বলি, আমি যাইরে তোর পিসির রান্না করতে সে মানুষটা পুজোর পর না খেয়ে বসে থাকবে। তুই চোখ রাখিস। ফিরে দেখি এ. সি. চলছে। ঘরে কেউ নেই।
- লক্ষ্মী কোথায় ছিলো?
- জগা ননার কাছে রান্নাঘরে জোগাড় দিচ্ছিলো।
- তন্ময়দা সব শুনছিলেন। বললেন আপনাদের বাড়িতো আমার এলাকায় পড়ে না। তবে কি আমি সিঁথি র ও. সি. কে বলবো তদন্ত করতে? ও ঠিক খুঁজে বার করে দেবে কে নিয়েছে।
- বাবা বললেন না না পুলিশ ঘরে ঢোকাসনা বাবা। আমার মেয়েটাকে ( লক্ষ্মীকে ) হেনস্তা করবে। তারচেয়ে তুই কিছু কর বাবা। দ্যাখ যদি পাওয়া যায়।
- এ. সি. মেকানিকের নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার দাও তাহলে।
- হ্যাঁ তা পাওয়া যাবে। তবে ঠিকানাতো জানিনা। দেখি বলে বাবা ফোনটার কল লিস্ট সার্চ করেন
****খুকুদির বিবাহ লগ্ন এবং বিবাহ ভোজ ****
এরমধ্যে বর এসেগেল। উলু ধ্বনি আর শঙ্খ বেজে উঠলো। সব্বাই ঐ বরের গাড়ির দিকে ছুটলো। মা বরণ ডালা নিয়ে গেলেন বরকে বরণ করতে। বাবা, তন্ময়দা গেলেন বরের গাড়ির কাছে বরকে ঘরে নিয়ে আসতে। দ্বারে প্রবেশ করার সময় ওপর থেকে পুষ্প বৃষ্টি হল। চারিদিকে রজনীগন্ধার সুগন্ধ। প্রবেশ দ্বার থেকে সারা ঘর নানা ফুল দিয়ে সাজানো। সত্যি খুব যাঁক যমকে খুকুদির বিয়ে হচ্ছে। হবে নাইবা কেন ! ওরা প্রচুর টাকার মালিক। মনটাও ওদের বিশাল। সমস্ত আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রণ করেছে তা ছাড়া পাড়া প্রতিবেশী সকলে। তন্ময়দার অফিসের বন্ধু। ডি. সি. পি নর্থ। তিনিও এসেছেন তন্ময়দার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। খাওয়া দাওয়া এলাহী কাণ্ড।
***খুকুদির বিয়ের ভোজ***
স্টার্টার :-
অতিথিদের স্টার্টার দিয়ে স্বাগত জানানো হল । স্টার্টারে খুব বেশি বৈচিত্র্য রাখা হয়নি । তাই এই ঠান্ডায় বিয়েতে, গরম ডাম্পলিং, টিক্কা, ফিশ ফ্রাই, মিনি সামোসা, কাবাব, কাটলেট, চিলি পটেটো, স্প্রিং রোল, ডরাই মাঞ্চুরিয়ান আছে।এ ছাড়া ফুচকা, চাট কর্নার, দই-ভল্লা তো আছেই। কি নেই!
শীত কালে বিয়ের মরসুমের স্যুপ :-
বিয়ের মেনুতে গরম স্যুপ রাখতেই হয় । মটর-পুদিনা স্যুপ, টমেটো স্যুপ, ভেজ স্যুপ, কর্ন স্যুপ, ইতালিয়ান স্যুপ, চিকেন স্যুপ, পনির স্যুপ এছাড়াও, হট চকলেট, জাফরানি চা এবং কফির বিকল্প তো আছেই। কাশ্মীরি কাবা।
ভেজ আইটেম-
ভেজের জন্য অনেক অপশন রাখতে হয়েছে কারণ খুকুদির অনেক মারোয়াড়ি অতিথি কাস্টমার আছেন। তাদের জন্য আলু ভাজি, জিরা আলু, মেথি আলু, মাশরুম, মেথি মালাই, বাঁধাকপি মুসাল্লাম এবং মিক্সড ভেজ রাখা আছে। । অন্যদিকে তরকারিতে পনির মেথি মালাই, শাহি পনির, পনির কোরমা, পনির আচারি, কড়াই পনির, পনির লাবদার, মালাই কোফতা, ছোলে এবং ছানা রাওয়াল পিন্ডি। চলে বটুরে। ঢোকলা গুজুদের জন্য।
ননভেজ আইটেম- নন-ভেজ আইটেম যেমন বাটার চিকেন, চিকেন রেজালা, বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দের। এছাড়াও, তাওয়া চিকেন, মটন দো পেঁয়াজ ফিশ কারি, মটন বিরিয়ানি এবং চিকেন বিরিয়ানি তো আছেই। ভেটকির বাটার ফ্রাই, চিংডির মালাইকারি,ইলিশ মাছের পাতুরি, সর্ষে ইলিশ, তোপসে ফ্রাই, পাবদা মাছের ঝাল। কি নেই?
মিষ্টি :- গোলাপ জামুন, রসগোল্লা, শক্তিগড়ের ল্যাংচা, মনোহরা, শাঁখ সন্দেশ, দরবেশ, মিহিদানা, সীতাভোগ,মিষ্টি দই,
চাটনি পাঁপড়,
পান :- বেনারসী পান, মিষ্টি পান, জর্দা পান।
চিত্র ঋন :- ইন্টারনেট।
All reactions:
Madhabi Chakraborty and Narmada Choudhury
2
Like
Comment
Send

দ্বিতীয় পর্ব
©ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী✍️
**খুকুদির বিয়ে**
খুকুদি, আমাদের মাসতুতো দিদি। খুকুদির কিন্তু নিজের চাটার্ড ফার্ম আছে। চাটার্ড একাউন্টেন্সি পাস করে কোন চাকরি না করে শহরের বিখ্যাত চাটার্ড ফার্ম "মুখার্জী এন্ড ফিনান্সশিয়াল কনসাল্টেন্সি" তে কয়েক বছর কাজ করেন তারপর নিজেই চাটার্ড ফার্ম খুলে বসেন। খুকুদির অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী ক্লায়েন্ট আছেন। খুব কমদিনে খুকুদি নাম করে ফেলেন। কিন্তু বিয়ের বয়েস ক্রমশ গড়িয়ে যায়। মিনু মাসি খুকুদির বিয়ের জন্য ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে খুকুদির প্রোফাইল খোলেন। আনন্দবাজার পাত্র পাত্রী কলমে বিজ্ঞাপণ দেন। এইসব দেখে কিন্তু খুকুদি খুব বিরক্ত হন। শেষে খুকুদি নিজেই তার মা কে খুকুদির বিজনেস পার্টনার এবং ক্লাসমেট অরিন্দম চৌধুরী কে যোগাযোগ করতে বলেন।
মিনু মাসি খুকুদির কাছথেকে ফোন নাম্বার পেয়ে অরিন্দমদের বাড়িতে ল্যান্ড লাইনে ফোন করে। ল্যান্ড লাইনে ওপাশ থেকে এক মহিলার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
-হ্যালো...কে বলছেন? ওপার থেকে মহিলা প্রশ্ন করেন।
- হ্যালো .. এটাকি অরিন্দম ব্যানার্জী র বাড়ি?
- হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?
- আমি মিনতি মুখার্জী। আমার মেয়ে তনিমা মুখার্জী আপনার ছেলে অরিন্দম চৌধুরীর সঙ্গে চাটার্ড একাউন্টেন্সি পড়তো এবং ওরা একসঙ্গে সি. এ. পাসকরেছে । ওরা বিজনেস পার্টনার। আবার খুব ভালো বন্ধু। একসঙ্গে চাটার্ড ফার্ম চালায়। এই বন্ধুত্ব সুদৃঢ করতে ওদের দুজনকে....
- কেন বলুনতো?বন্ধু ঠিক আছে কিন্তু... আমি আমার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করি তারপর আসবেন।
- আমার মেয়ে....
- হ্যাঁ জানি আপনার মেয়ে আমার ছেলের বন্ধু, বিজনেস পার্টনার কিন্তু আমার ছেলের সঙ্গে এবং ওর বাবার সঙ্গে কথা না বলে আমি কিছুই বলতে পারবোনা। ক্ষমা করবেন। রাখি।
- মিনু মাসি খুব অপমানিত বোধ করলেন। ব্যাপারটা খুকু জানলে রক্ষে নেই। আমার বলার ধরণটা বোধহয় ভুল হল। শুরুতেই বিবাহ প্রস্তাব এক অজানা মহিলাকে....!! না ঠিক হোলোনা!!!
পরের দিন অরিন্দম ফোনকরে খুকুকে বলে তোমার মা বাবাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে এস।
- খুকু বলে কেন?
- আহা এসইনা। এলে সব জানবে। তোমার কি আমাদের বাড়িতে আসতে আপত্তি আছে?
- না তা নেই তবে কারণটা কি শুনি!
- এলেই শুনবে অতো উতলা হচ্ছ কেন? তুমি আমার বিজনেস পার্টনার, ক্লাস মেট, বন্ধু...
- আর! আর কি?
- ওটা এলে শুনবে।
- মা বাবা যাবেন আমি যাবোনা।
- কেন?
- সে উত্তর কেন দেব?
-ঠিক আছে। জো আজ্ঞা ম্যাডাম।
- তথাস্তু বৎস।
- খুকুমাসি ফিক করে হেঁসে ফেলে ফোন ছেড়ে।
- কিরে হাঁসছিস কেন? মা বলেন ঘরে ঢুকতে ঢুকতে।
- কি কাণ্ড করেছ তুমি?
- কেন আবার কি হল?
- অরিন্দমদের বাড়ি ফোন করেছিলে?
- হ্যাঁ তুইতো ফোন নাম্বার দিয়েছিলিস। মনে নেই। তবে এখন কান্ডর কি হল?
- ঠিকআছে আমি ড্রাইভারকে ওদের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দেব। ও তোমাদের রবিবার নিয়েযাবে।
- ওকে আমার লক্ষ্মী মেয়ে। দেখি কি হয়!
**অরিন্দমদের বাড়ি খুকু মাসির বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে**
রবিবারদিন মিনতি মুখার্জী, মনোজ মুখার্জী ওনাদের গাড়ি নিয়ে সল্ট লেকের এফ. ডি ব্লকে অরিন্দমদের বাড়ি যান। আগেথেকে ফোনে যোগাযোগ করে তারপর ওনারা যান। অরিন্দম ভালোভাবেই জানেন খুকুদিকে তাই সে বিষয়ে কোন বিশেষ কথা হোলোনা। অরিন্দমের মা বাবা বলেন আমাদের ছেলের যখন আপনাদের মেয়েকে পছন্দ তখন আমাদের কিছু বলার নেই। এখন দিন ক্ষণ স্থির করুন।
মেসো বলেন,আগামী ১২ই মাঘ, শুক্রবার:- সন্ধ্যা ০৬:৩৩ থেকে রাত্তির ১০.৫০ পর্যন্ত কর্কট লগ্নে সুতোহিবুক যোগে শুভ বিবাহর লগ্ন আছে। সেই দিনটাই স্থির হোক।
- তবে তাই হোক।
সেই খুকুদির বিবাহর শুভ লগ্ন আজ। আমাদের বাড়ির সকলে ঐ বিয়েবাড়িতে এসেছি। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে আমার মা সেই সীতাহার পরে আজ বিয়ে বাড়িতে যাওয়ার কথা। কিন্তু আলমারির লকারে সীতাহার না পেয়ে মা আশ্চর্য হয়ে বাবাকে বলেন। বাবা বলেন আগেই তোমায় বলেছি ঐ হার ব্যাঙ্কের লকারে রাখতে। তুমি শুনলেনা। এখন বোঝ ঠ্যালা।
মা বলেন আলমারিথেকে কি হারের ডানা গজালো? কি আশ্চর্য কোথায় গেল হার?
-তুমি আলমারির চাবি কোথায় রেখেছিলে?
- কেন যেখানে থাকার সেখানেই ছিল।
- যেখানে মানে ?
- বালিশের নিচে।
- ঐ দেখ। সব মহিলার ঐ এক দোষ। বালিশের নিচে!! আরে বাবা ঐ জায়গাতো সকলে জানে।
- তবে কোথায় রাখবো?
- কেন আঁচলে রাখবে। ওটাতো সবচেয়ে সেফ যায়গা। তোমার সঙ্গেই থাকে।
- অতো বড় চাবির গোছা নিয়ে সব সময় বাড়িময় ঘুরতে কি ভালো লাগে?
- বাড়িতে তো বাইরের লোক কেউ আসেনা শোবার ঘরে। আসে কি?
- আমায় জিজ্ঞাসা করার মানে কি?
- এখন থানা পুলিশ ও করতে পারিনা। ঘরে আসে শুধু লক্ষ্মী ঘর ঝাঁট দিতে আর ঘর পুঁছতে। সে কি নিল?
- লক্ষ্মী আজ ২০ বছর এই বাড়িতে কাজ করছে। সেই ওর মা ওকে ১৫ বছর বয়েসে আমাদের বাড়িতে দিয়ে যায়। লক্ষ্মী বিশ্বাসী ও কেন চুরি করবে? ওর বিয়ে দিতে পারিনি। মেয়েটার জন্য বড্ড মায়া হয়। আমার মেয়ে নেই.... ভাবুক হয়ে পড়েন বাবা।

সীতাহার
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী ✍️
প্রথম পর্ব

এই গল্পটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সঙ্গে কোন পাত্র পাত্রীর সম্পর্ক নেই এবং এই গল্পটি আমার নিজস্ব চিন্তাধারা থেকে লেখা। সম্পূর্ণ মৌলিক। এক্ষুনি এই গল্পের প্লট মাথায় এলো তাই সঙ্গে সঙ্গে লিখতে বসলাম।
চিন্ময় অনেকদিন আমাদের বাড়িতে থেকে বাবার ব্যবসার সমস্ত হিসেব পত্র দেখাশুনো করে। ও
বি. কম পাস। হিসেব পত্র ভালোই রাখে। একাউন্টেসের কাজ মোটা মুটি বোঝে। চিন্ময়কে বাবাই পড়িয়েছেন। ওর আপন জন বলতে কেউ নেই।
বাবা ওর ওপর নির্ভরশীল। ওকে অগাধ বিশ্বাস করেন। আমাদের বাড়ির গেস্ট রুমের পাসে একটা ছোট ঘর আছে। ও ওখানেই থাকে। বেশি বয়েস নয়। তা ২৫ -২৬ বছর হবে মনেহয়। আমাদের বাড়িতেই থাকে খায়। বাবা কিছু মাস মাহিনাও দেন। ওর হাত খরচ দিয়ে বাবা ওকে বড্ড বেশি লায় দেন। তাই অনেকেরি দৃষ্টি কটু। এরমধ্যে এক কাণ্ড ঘটলো।
মায়ের প্ৰিয় সীতাহার পাওয়া যাচ্ছেনা। মাকে ঠাকুমা বরণ করে ঐ সীতাহার দিয়েছিলেন। সে হার বাবা ব্যাংকের লকারে রাখতে চেয়েছিলেন কিন্তু মা বলতেন.... না ও হার আমার কাছেই থাকবে..... আমার শাশুড়ির স্মৃতি। অগত্যা বাবা আর সে বিষয় নাক গলান নি!
সকলে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো ঐ হারের ব্যাপারটা। সুম্প্রতি খুকু দির বিয়েতে আমরা বাড়ির সকলে নিমন্ত্রিত তাই সকলে যাই এক চিন্ময় ছাড়া। সে আর পারুল পিসি বাড়িতে থাকে। পারুল পিসি বাল্য বিধবা। উনি ওনার শিব ঠাকুরকে নিয়েই সারাদিন ঠাকুর ঘরে থাকেন। শিব লিঙ্গ স্নান করানো তাকে বেলপাতা চন্দন দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পুজো করা। এ পারুল পিসির নিত্য দিনের কাজ। উনি অর্ধেক দিন উপবাস করেন। বাবা বিরক্তি প্রকাশ করেন কিন্তু উনি শোনেন না। মা যত্ন করে পারুল পিসির জন্য পঞ্চ ব্যঞ্জন রান্না করেন আলাদা করে এবং ঠাকুমার সেই শ্বেত পাথরের থালা বাটিতে ওনাকে মা নিজে হাতে পরিবেশন করেন। পারুল পিসির রান্না, কাঠ কয়লার আঁচে ঠাকুর ঘরের পাশেই হয়। একমাত্র মা ছাড়া কারুর হাতে পিসি খান না। এখনো আমাদের বাড়িতে এই রীতি চলে আসছে। বঙ্কা কাঠ কয়লা কিনে আনে... উনুন ধরিয়ে দেয়। মা বেলা একটা দুটোর মধ্যে রান্না শেষ করে পারুল পিসিকে খেতে ডাকেন। পিসি পুজো সেরে বেলা দুটোর সময় ভোজনে বসেন।
সকাল বেলায় লক্ষ্মী , দালান ঘর , শোবার ঘর, বারান্দা, উঠোন, বৈঠক খানা সমস্ত ঝাঁট দেওয়া, মোছা,পরিষ্কার করা তারপর এক কাঁড়ি বাসুন মেজে যেতে যেতে সেই বেলা একটা। ও অবশ্য আমাদের বাড়িতেই খায়। মাছ এলে মাছ কেটে বেছে জগা ননা কে গুছিয়ে দেয়। হ্যাঁ জগা ননা উদিষ্যl র যাজপুরের। ওর মেয়ে নাকি হেড মিস্ট্রের্স। আমরা ঠাট্টা করে বলি কোন স্কুলের?
ননা বলে...কাঁহিকি বিশ্বাস হাউনি?
নানা তা কেন?
তবে? আমি রান্না করে বাড়িতে টাকা পাঠাই সেই টাকায় আমার মেয়ে বি. এ. , এম. এ পাস করল । বেচারি টিউশনি করে বাকি পড়াশুনো করে আমাদের গ্রামের স্কুলের টিচার হোল। এখন একটা ভালো ছেলে দেখে ওর বিয়ে দেব ঠিক করেছি। কিন্তু আমার মেয়ে বিয়ে করতে নারাজ। ও ওর মাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা। বিয়ের কথা বললে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। মহা মুশকিল। কি করবো? মেয়ে বড় হলে তার বিয়ে না দিলে গ্রামের লোকেরা এক ঘরে করেদেবে। কুৎসা রটাবে।
এইবছর মাঘ মাসে বিয়ের দিন আছে। ভাবছি মেয়েটাকে সৎ পাত্রস্থ করবো।
জগা ননা ভাবুক হয়ে পড়ে.... বোধহয় বাড়ির কথা মনে করে উদাস মনে ঠাকুরকে প্রণাম করে.... বলে জগাই আমার ভরসা। মা বিরজা ঠাকুরানী যাজপুরের জাগ্রত দেবী। ওনার কাছে মানত করেছি মেয়ের বিয়ে হলে পুজো দেব।
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে জগা ননা বলে যায়।
চলবে.....
May be an image of jewelry
All reactions:
Madhabi Chakraborty, Narmada Choudhury and 1 other


*নয়নতারা*
*ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী*✍️
১০.১১.২০২৩ শুক্রবার
বেলা ১১. ৫২
পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ছোট্ট মেয়েটি ঘুরে বেড়াচ্ছিল আপন মনে । সংগে একটা বড় বেলুন । সংগে কেউ বলে মনে হলনা ।পরিচিত কেউ ওকে খুঁজছে এমন ও নয় । তবে কি মেয়েটা একা !
কাছে গিয়ে বলি তোমার নাম কি?
কোন উত্তর নেই !
একটু কাছে গিয়ে কানের কাছে মুখ রেখে একই প্রশ্ন করি । তবুও কোন উত্তর নেই ।
কি আশ্চর্য মেয়েটা কি তবে বোবা কালা ?
কৌতুহল হল মেয়েটির বিষয় ।
আমাকে কিছু বলতে দেখে মেয়েটি মুখে হাত দিয়ে তার ডান বৃদ্ধাংগুষ্ঠি নাড়ায় পরে আবার কানের কাছে নিয়ে ওই একই ইশারা করে। ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকায় ।
আমি বুঝি মেয়েটি বোবা কালা ।
ভারি মুশকিল আমি কি করে ওকে বোঝাই আমার মনের কথা?
মেয়েটি আমার কাছে কি মনে করে আসে তারপর ইশারায় বোঝায় তার বাড়ি ওই দিকে ।
আমি দু হাতে চালা _/\_ করে বোঝাই তোমার বাড়ি?
- মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় । মানে হ্যাঁ ।
- আহারে কত কষ্ট এই নিষ্পাপ শিশুটির মনে । কিন্তু কে তার বাবা মা?
- মেয়েটি আমাকে কিছু বলতে চায় যা দেখে আমি বুঝি ও ওর বাড়িতে নিয়ে যেতে চায় ।
- একেই বলে শিশু যে আপন পর বোঝেনা। বলি চল... হাত দেখিয়ে বলি চল ।
- গুটি গুটি পায়ে এগোই ওর পিছু পিছু ।
- এক পরিত্যক্ত মোটর গ্যারেজের মধ্যে এক বৃদ্ধাকে দেখি সেলাই করতে । একটা ছোট্ট আলো জ্বলছে । বৃদ্ধা ছুঁচ সুতো নিয়ে আপন মনে কি সেলাই করছেন ।
- আমাদের দেখে চকিত আমার মুখপানে তাকিয়ে বলেন, কে তুমি বাবা ? এখানে কেন এয়েছ?
- যাক ইনি কথা বলতে পারেন তাহলে। আমি বলি, মাসি আমি তোমার নাতনী কে একা একা ঘুরতে দেখে নিয়ে এলাম তোমার কাছে । ওকে এখানে ছেড়ে দিয়ে আমি ফিরে যাব আমার ঘরে ।
- ও আমার নাতনী নয়।ওকে আমি এক মেলায় পেয়েছিলাম। সেইথেকেই ও আমার কাছে আছে। ওর কেউ নেই আমারো কেউ নেই। আমি যা রোজগার করি আমাদের দুজনের পেট চলে যায়।
ও ঠিক এই রকমই একা একা ঘুরছিল। অনেক জিজ্ঞ্যেশ করেও ওর বাড়ির ঠিকানা পাইনি। যতটুকু ঠারে ঠোরে বুঝি ওর বাবা মা কেউ নেই ও প্রায় অনাথ। কার সংগে এসেছিল তাও বুঝিনি। দিনকাল যা খারাপ ওই মেয়েকে কেউ বদ উদ্দেশ্যে চুরি করে নিয়ে যেতে পারে তাই আমার কাছে নিয়ে এলাম। প্রায় তিন মাস হয়ে গেল কেউ খোঁজ খবর করে নি। ভাবলাম থানায় দিয়ে আসি কিন্তু থানায় নিয়ে যাচ্ছি বুঝতে পেরে ও ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার মনে হয় ওর থানা পুলিশে ভয় আছে।
- মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে কি বলতে চায়।
-আমি বলি কিছু খাবি?
-মাথা নাড়িয়ে বৃদ্ধার দিকে হাত দেখিয়ে বলে ও দেবে খেতে।
- মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছিল নিশ্চই বড় ঘরের মেয়ে । অবহেলায় আছে জামা কাপড় খুব ই সাধারন.... মাথার চুল উস্কো খুস্কো কিন্তু মুখের হাঁসি আর চোখ দুটোই বলছে নিশ্চই কোন সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে । হয় হারিয়ে গিয়েছে নয় অন্য কোন কিছু রহস্য আছ ।
- আমি ত ফেলুদা নই কি ব্যোমকেশ বক্সি নই যে রহস্যের উৎস জেনে তার পেছনে ঘুরে কিছু সুরহা করব !
- কি করাযায় এই নিষ্পাপ শিশুটির জন্য। চাইল্ড হেল্প লাইনে ফোন করলে হয়। নেট সার্চ করে নাম্বার পেলাম। ওর ফটো মোবাইলে তুলে হোয়াটস এপ এ পাঠালাম। রিপ্লাই এলো। আমরা পৌঁছচ্ছি।
বৃদ্ধাকে বলাতে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তোমাকে কে বলেছে ওই সব করতে । ও আমার কাছে আছে আমার কাছেই থাকবে।
- আমি বলি মাসি ও ওখানে অন্য ছেলে মেয়েদের সংগে ভালো থাকবে। তুমি কি চাওনা মেয়েটি ভালো থাকুক ?
- আমি একা একা এই গ্যারেজে থাকি। আমার কেউ নেই। ও থাকলে আমার ভালো লাগে। যা রোজগার হয় তাতে ওর আমার চলে যায়।
- কিন্তু এরকম ক দিন চলবে? তুমি কি সবদিন ওর কাছে থাকবে?
- তা কেন বালাই সাঠ।
- এর মধ্যে পুলিস এবং চাইল্ড লাইনের কিছু সমাজ সেবিকা এসে হাজির।
- পুলিশ বৃদ্ধাকে নানা প্রশ্ন করেন। বেগতিক দেখে মেয়েটি বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে বোঝায় যে ও ভালো।
মেয়েটিকে চাইল্ড হেল্প লাইনের ম্যাডাম রা মুক বধিরদের বোঝার মত ঠারে ঠুরে কি সব জিজ্ঞাসা করলেন। মেয়েটি যা বুঝলো তার উত্তরে বলে ওর মা বাবা কেউ বেঁচে নেই এক রোড একসিডেন্টে ওর বাবা মা মারা যান। ও কিরকম করে বেঁচে যায় ঈশ্বরের কৃপায়। ওকে পুলিস ধরে নিয়ে গিয়েছিল চাইল্ড হেল্প লাইনে দিতে কিন্তু ও সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। পুলিসকে কেন মেয়েটি ভয় পায় বোঝা যাচ্ছেনা। বৃদ্ধাকে আঁকড়ে ধরে বলে ও ওই মাসির কাছেই থাকবে।
আমি বোঝাই দেখ মা তুমি ওখানে বাচ্চাদের সাথে খেলা করবে, পড়াশুনো করবে, ছবি আঁকবে আরো কত কিছু করবে। এখানে বুড়ি মাসি না থাকলে তুমি কি করবে তখন কোথায় যাবে?
মেয়েটি বুড়িকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। ও হাত নাড়িয়ে বললো ও যাবেনা। ও বুড়ি মাসির কাছে থাকবে। ও বড় হয়ে বুড়ি মাসিকে খাওয়াবো।
মহা মুস্কিল ! আমি বলি তুমি আদ্যামার আশ্রমে ভালো থাকবে। ওখানে তোমার মতন অনেক বাচ্চা আছে। তারা ওখানে ভালো আছে। পড়াশুনো করছে, খেলাধুলো করছে, গান গাইছে, ছবি আঁকছে আবার হাতের কাজ করছে। তুমিও তাই করবে। তুমি ওখানে ভালো থাকবে। তুমি যাবেনা?
বুড়ির চোখে জল। ওর মেয়েটির প্রতি খুব মায়া পড়ে গিয়েছে। মেয়েটিও ওকে জড়িয়ে কাঁদছে।
আমি বলি পুলিশ কে আপনারা না গেলে ও ভয় পাবে কিছুতেই যাবে না। আমি মেয়েটির জন্য ক্যাডবেরি এনেছিলাম। সেটা বুড়ির হাতে দি। বলি মাসি তুমি বললে ও যাবে। তুমি ওকে বোঝাও যে তুমি ওকে দেখতে যাবে।
বহু কষ্টে মেয়েটি রাজি হয় যেতে। চাইল্ড হেল্প লাইনের মহিলারা মেয়েটিকে বুড়ির সঙ্গে নিয়ে সোজা আদ্যা মায়ের আশ্রমে নিয়ে যায়। আমি ভাবি যাক মেয়েটির একটা হিল্লে আদ্যা মা নিজেই করেছেন। আমি ওর নাম নয়নতারা দি। ও আমার নয়ণ তারা। প্রতি সপ্তাহে আমি যাই মেয়েটিকে দেখে আসি। আমার কেমন যেন মেয়েটির প্রতি মায়া পড়ে গিয়েছে। বোধহয় আমার মেয়ে নেই তাই। ও যে আমার নয়ণ তারা। আমার মা দুর্গা। ঈশ্বর ওকে ভালো রাখুন।
© ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী✍️

Thursday, July 22, 2021

আগন্তুক ছোট গল্প ©ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী ✍️

আগন্তুক ছোট গল্প

©ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী ✍️

আরাম কেদারায় বসে সকালের রোদ পোয়াচ্ছি হটাত কলিং বেলটা বেজে উঠলো l এই সাত সকালে কে এলো? মঞ্জু আমার কাজের মাসিকে বললাম দোর খুলে দেখত কে এলো l তোর মাসি বাথরুমে, আমি একটু রোদ পোয়াচ্ছি l অনেকদিন এরকম মিষ্টি রোদ ওঠেনি l ব্যাল কনিতে ফুলের গাছ লাগিয়েছি l বেশ কিছু ফুল ফুটেছে যেমন টগর, বেল ফুল, গোলাপ প্রায় চার রকমের, জবা, নীল অপরাজিতা, রজনীগন্ধা l বাতাসে সুন্দর এক সুবাস l বেশ লাগছে l এই সময় কে এলো?
মেসো এক সন্ন্যাসী এসেছেন বলছেন উনি আপনার সঙ্গে এক কলেজে পড়তেন l অগত্যা উঠে পড়ি l আমার সঙ্গে কলেজে পড়তেন তিনি সন্ন্যাসী! কেমন আশ্চর্য লাগলো শুনতে l সদর দরজার কাছে গিয়ে দেখি খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে কিন্তু নামটা ঠিক মনে করতে পারছিনা l
- ত্রিভুবন , আমি অর্ণব,অর্ণব চক্রবর্তী তোর সঙ্গে পড়তাম l ভুলে গেলি l তবে এখন আমার নাম স্বামী চিন্ময় নন্দ l রামকৃষ্ণ মিশন ,কন্যাকুমারী আমার ঠিকানা l আমাদের ব্যাচ মেট দের নিয়ে যে ডাইরিটা 2012 সালে বেরিয়েছে সেটা আমার অনেক সুবিধে করে দিয়েছে l অনেকেই এরমধ্যে অবসর গ্রহণ করেছে l তুইও 2011 তে রিটায়ার করেছিস দেখলাম l প্রত্যেকের মোবাইল নাম্বার / ল্যান্ড লাইন নাম্বার,ঠিকানা এবং ফটো সহ সমস্ত তথ্য দেওয়া আছে l কাজেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অনেক সুবিধে হবে l তোর কথা অনেক মনে করি ভুবনেশ্বর এলে l তাই তোকে দেখা করতে 2015 সালে এলাম l তোর কেমন লাগছে জানিনা আমার ভীষণ ভালো লাগছে l ভেতরে আসতে বলবিনা l
- আমি অপ্রস্তুতে পড়েযাই l জিভ কেটে বলি ক্ষমা করিস ভাই হঠাত চিনতে পারিনি l আমায় ভুল বুঝিসনা l ভেতরে আয় l ও হ্যাঁ হ্যাঁ অর্ণব! কিন্তু কি করে চিনি বল তোকে কেউ দেখলে চিনতে পারবেনা l কারণ তুই অনেকটা বদলে গিয়েছিস ভাই l আয় আয় l অনেকদিন পর দেখা l তা প্রায় 40 বছর হবে বল !
- হ্যাঁ তা হবে l তোরা সংসার ধর্মে এত ব্যাস্ত থাকিস সবাইকে মনেরাখা কঠিন ব্যাপার । একটা কথা মনে রাখিস সন্ন্যাসীরা কখনো রাগ , অভিমান, ঈর্ষা এসব করেনা l যে করে সে সন্যাসী নয় l- আমরা দুজনে আমার বৈঠক খানায় বসলাম l কলেজ জীবনের কথা সব মনে পড়ে গেল
অনেক দিন আগের কথা মনে পড়ে গেল । আমাদের ক্লাসে নিবেদিতা পড়তো l ও সব মেয়েদের থেকে আলাদা ছিল l দেখতে সত্যি যাকে বলে সুন্দরী তাই কিন্তু তিরিক্ষি মেজাজ l খুব অহংকারী মেয়ে ছিল l কারুর সঙ্গে কথা বলতো না একমাত্র অর্ণব ছাড়া l অর্ণব পড়াশুনোয় ভালো ছিল l বিজ্ঞানের ছাত্র আমরা সকলেই তাই, প্র্যাকটিকাল ক্লাসে গ্রুপের সকলে এক হতাম l কোন এক্সপেরিমেন্ট ল্যাব এসিস্টেন্ট বোঝানোর সময় অর্ণব মন দিয়ে সেটা বুঝত l আমার চোখ নিবেদিতার ওপর, ও কি করছে সেটা নিরীক্ষণ করা l ওকে দেখতাম অর্ণব কে লক্ষ করতো l আর নিজের এক্সপেরিমেন্টের দিকেও নজর রাখতো l মেয়েটাকে বোঝা মুশকিল l
এইসব গোপন কথা অর্ণব কে বলা যায়না l ও চটে যেতে পারে l
এরমধ্যে গিন্নি চলে এলেন l আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম...অর্ণব আমার সঙ্গে এক কলেজে পড়তো আবার আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অর্ণব কে বলি,আমার হোম মেকার আমার জীবন সঙ্গিনী, আমার সুখ দুঃখের সাথী l l দুজনে নমস্কার বিনিময় করলেন l গিন্নি বললেন আপনি চা খাবেন স্বামীজি l
- হ্যাঁ হলে মন্দ হয়না l
- এবার জানতে পারিকি তুই কি করে আমার ঠিকানা জানলি l আমায় ফোন করতে পারতিস আমি নিজে গিয়ে তোকে নিয়ে আসতাম l
- তবে আর ইংরেজরা সারপ্রাইস শব্দটা ভারতীয়দের মধ্যে গেঁথে দিয়েছে কেন l হঠাত দেখার মজাই আলাদা l কি বল? প্রথমেই বলেছি আমাদের ব্যাচ মেটদের নিয়ে যে ডায়রিটা ছাপানো হয়েছে ওতে সকলের ঠিকানা, ফ্যামিলি ফটো ইত্যাদি সব আছে l
- হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক l
- এবার তোর কথা বল l তুই কেন সন্ন্যাস নিলি?
এটার উত্তর দিতে গেলে আমার সম্পূর্ণ ইতিহাস বলতে হয় l তুই জানিস আমি পড়াশুনোয় বরা বর ই ভালো ছিলাম l স্নাতক ডিগ্রি পাওয়ার পর বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করি l সেই সময় আমার সঙ্গে নিবেদিতাও ছিল আমার ক্লাসমেট l মনেপড়ে নিবেদিতা রে !
-আমি না জানার মতন ভান করি। কোন নিবেদিতা বলত ?
- বাহ ভুলেগেলি ! না বৌদির সামনে বলতে লজ্যা পাচ্ছিস !
- হ্যাঁ হ্যাঁ মনেপড়েছে । খুব অহংকারী মেয়েটা ছিল । রুপের আর পড়ায় ভালো বলে ।
- না ও আমার সঙ্গে সর্বদা ভালো ব্যাবহার করত । শোন , আমরা এক ক্লাসে পড়তাম বেনারসে l আমি হোস্টেলে থাকতাম ও ওর মাসির বাড়িতে থেকে ক্লাস করতো l এরমধ্যে সত্যি প্রেম বলে এক বস্তুর ব্যাপারটা উপলব্ধি করি l কিন্তু কেউ প্রকাশ করিনা । দুজনে বেনারসের গঙ্গার বুকে মণিকর্ণিকা ঘাট, হরিশ্চন্দ্র ঘাট ইত্যাদি নৌকা বিহার করি l আমি বোঝাতাম দেখ এই মণিকর্ণিকা ঘাটে কোনদিন চিতা নেভেনা । মানুষ জন্মানর পর মৃত্যু নিশ্চিত বলে জানে কিন্তু সেটা জেনেও নানা অপকর্ম করে । শেষটা তো দেখছ ওই আগুনে দগ্ধ হয়ে যাবে নশ্বর দেহ খানি । কি হবে এই অহংকার , টাকা ,পয়সা , প্রতিপত্তির ? কেউ ভাবেনা , সে এই দেহ ত্যাগ করলে কোন কিছু সঙ্গে নিয়ে যাবেনা তবুও মানুষের স্বভাব বদলায়না ।
- ও বলে তুমি ওই রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছ । সংসারে যখন জন্ম নিয়েছ সংসার ধর্ম পালন কর । তোমার সব কথা দর্শন শাস্ত্রের কিছু নিতি বাক্যের মতন ।
- ওটা তোমার ভুল ধারনা নিবেদিতা । আমিও মানুষ রক্ত মাংসের মানুষ । আমার মধ্যেও প্রেম, প্রীতি ,ভালোবাসা , দয়া , মায়া , ক্ষমা সব আছে কিন্তু সেটা ঈশ্বরের স্বত্বাকে উপলব্ধি করে তার প্রতি ভক্তিভাব রেখে জীবন তরী বাইতে হবে । নিজের কর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান হয়ে এক শৃঙ্খলিত জীবন শৈলী নিজেকে বেছে নিতে হবে তবেই তুমি জীবনে এগুবে ।
- তুমি থাকো তোমার শৃঙ্খলিত জীবন শৈলী নিয়ে । আমাকে আমার মত থাকতে দাও । তুমি বোধহয় হৃদয়ঙ্গম করতে পারছনা আমি কি বলছি এবং কি ভাবছি !
- আমি বুঝি সব বুঝি ।
- ছাই বোঝ ! তুমি একটা নপুংসক সন্ন্যাসী । আমি তোমার কাছে আছি অথচ তোমার কোন অনুভূতি নেই । তুমি আমাকে মড়া পোড়ানো দেখানোর জন্য এখানে আনলে ?
- আমি আমতা আমতা করে বলি এটা তোমার আমার পুরুষত্বের প্রতি অপমান। তুমি আমাকে আঘাত করলে নিবেদিতা । আমি সত্যি সেরকম কিছু ভেবে তোমাকে আনিনি এখানে । আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি কিন্তু ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে বলছি সেটা দৈহিক নয় বরং মনের দিক থেকে ভালোবাসা । আমিতো তোমাকে আমার আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে বলিনি।ওটা সম্পূর্ণ আমার চিন্তাধারা ।
- ঠিক আছে এবার চল । সন্ধ্যে হয়ে আসছে । তোমার দ্বারা ওই বই পড়া আর লেকচার দেওয়া ছাড়া কিছু হবেনা । নিবেদিতা বলে মাস্টার্স ডিগ্রির পর তুমি কি করবে?
- আমি চট করে উত্তর দি পড়াশুনোর কোন শেষ নেই তাই পি. এচ. ডি অবশ্যই করবো যদি সুযোগ পাইত l তুমি ?
- আমি জানতাম তুমি ওই উত্তরটা দেবে বলে । না , আর আমার দ্বারা পড়াশুনো বোধহয় হবেনা l আমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে l আমার কোন ভাই বোন নেই l তাই বাবা আর দূরে ছাড়বেন না l বাবা রিটায়ার করেছেন । তাই আমাকে কাছে থাকতে বলেন । আমি বাবার একসঙ্গে ছেলে এবং মেয়ে দুই । তাছাড়া আমাকে আমার পছন্দ মতন জীবন সঙ্গী বাছতে হবে । আমি সন্ন্যাসিনী হয়ে তোমার ছায়া সঙ্গী হতে চাইনা ।
- ও l আমি কিন্তু তোমাকে আমার ছায়া সঙ্গী হতে কোনদিন বলবোনা । তবে এইজন্য পড়া ছেড়ে দেবে ! এটা একটা যুক্তি হল ! আমি ওর দিকে তাকাই l
-উপায় নেই আমি মেয়ে l তোমার মতন ছেলে হলে হয়তো সিদ্ধান্ত বদলাতাম l আমাকে, বাবা মার দিকটাও তো দেখতে হবে নিজের দিকটাও দেখতে হবে l
- অবশ্যই দেখবে তবে নিজের কেরিয়ার পড়াশুনো তার জন্য জলাঞ্জলি দিতে পারনা l অবশ্য এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত l আসলে আমি চাই তুমি আমার সঙ্গে পি.এচ.ডি. কর ।
- সম্ভব নয় । আমি বেনারস অবধি এসেছিলাম তোমার মতন এক মেধাবী পুরুষের সান্নিধ্য পাবো বলে । কিন্তু এখানে এসে দেখলাম তুমি পড়া আর ওই রামকৃষ্ণ মিশন ছাড়া কিছুই জাননা । পৃথিবীতে এসেছ তার বৈচিত্র্য অনুভব কর । জীবনকে উপভোগ কর । এটাই সংসার ধর্ম ।
যে বয়েসের যা ধর্ম তাই পালন কর । ছাত্রাবস্থায় ব্রহ্মচর্য পালন করেছ তার ফল পেয়েছ । এখন ভালো কোন চাকরি তুমি অনায়াসে পাবে । তবে ঠিক আছে পি.এচ.ডি তোমার স্বপ্ন সেটা পূরণ কর কোন বাধা নেই কিন্তু তা বলে সন্ন্যাস ! সনাতন ধর্ম কি বলে ১) ব্রহ্মচর্য , ২)গার্হস্থ্য , ৩)বানপ্রস্থ , ৪) সন্ন্যাস । তাই সংসার ধর্ম পালন না করে এক লাফে সন্ন্যাস নেওয়া মানে ভগবানের সৃষ্টির বিরুদ্ধে যাওয়া নয়কি ?
-দেখ তোমার যুক্তি আলাদা আমার যুক্তি আলাদা । তোমার নামের সার্থকতা তুমি পূরণ করতে পারলেনা । এ.পি.জে আব্দুল কালাম তিনি চিরকুমার । পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী । ভেবে দেখ তাঁর কথা । তিনি কেন এতো পড়াশুনো করে মিসাইল ম্যান হয়েছিলেন ? তিনিতো অত্যন্ত গরিবের ঘরের এক মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।
-চল অনেক যুক্তি তর্ক হল । ওই স্বামীজিরা তোমার মগজ ধোলাই করেছে । না আমি আমার নামের সার্থকতা করতে চাইনা কারন আমি স্বামী বিবেকানন্দর ভগিনী নিবেদিতা হতে চাইনা ।বললাম তো মাকে আমার মত থাকতে দাও । আমাকে আমার রাস্তা দেখতে হবে ।
এই ঘটনার পরথেকে নিবেদিতা আর আমার সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখেনি । আমিও চাইনি রাখতে ।
আমি তখন যুবক এবং রামকৃষ্ণ মিশনে যাতায়াত আছে l আমার দীক্ষা হয়নি তবে স্বামীজি বলেছেন নিজের যোগ্যতার জন্য তোমাকে আরও পড়াশুনো করতে হবে l উচ্চশিক্ষা যেকোনো ধর্ম গুরুর পক্ষে অনেক প্রয়োজন l রামকৃষ্ণর পথ অনুসরণ করতে চাও তার জন্য নিজেকে যোগ্য প্রমাণ কর l নিজেকে বিকশিত কর l জ্ঞানের শেষ নেই l জ্ঞানী তাকেই বলে যে সংসারের সমস্ত মোহ মায়া ত্যাগ করে সত্যের সন্ধানে নিজেকে উৎসর্গ করে, জ্ঞান বিতরণে নিজেকে প্রস্তুত করে l জ্ঞান আহরণের যেমন শেষ নেই জ্ঞান বিতরণের ঠিক সেইরকম শেষ নেই l
- আমি বলি সত্যি তুই নিবেদিতার মতন মেয়েকে প্রত্যাখান করতে পেরেছিস ? তুই সত্যি ব্রহ্মচারী । তোদের কেমিস্ট্রি জমলোনা । কিরে তুই ? আমার খুব খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য । ও সত্যি তোকে খুব ভালোবাসতো । আমি সেই প্র্যাক্টিকাল ক্লাসেই বুঝেছিলাম । ওর নজর তোর ওপর থাকত । কারুর সঙ্গে কথা বলেনা । খুব ইন্টারেস্টিং লাগছে তোর কথাগুলো l সত্যি তুই একদম আলাদা হয়ে গিয়েছিস l পদ্মপাতায় জল ঢল ঢল করার মতন সংসারে থেকেও তুই সংসারে নেই l এটা কম স্বার্থ ত্যাগ নয় l
- ঠিক স্বার্থত্যাগ কিনা জানিনা 1989 সালে আমার বাবা ইহ ধাম ত্যাগ করেন ঠিক তার এক বছর পর আমার মা l আমার তলায় এক বোন l সে তখন স্নাতক ডিগ্রি সম্পূর্ণ করে বি. এড করছিলো l আমি তাকে ফিন্যান্স করতে থাকি কারণ আমি ডক্টরেট এর জন্য সিলেক্ট হয়েছি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে l একটা প্রাইভেট কলেজে কিছুদিন কেমিস্ট্রি পড়াতাম সেখান থেকে যা উপার্জন হত তার অর্ধেক বোনকে মানি অর্ডার করে দিতাম l বোন পরে স্কুলের শিক্ষিকার চাকরি পায় আমাদের গ্রামের স্কুলে বলেশ্বর জেলায় l ব্যাস আমার আর বন্ধন রইলোনা l আমার ফেলোশিপ মঞ্জুর হয়েগেল l যা টাকা পেতাম আমার পড়াশুনোর খরচ,খাওয়া দাওয়ার, হোস্টেলের খরচ সব ঐ টাকায় হয়েযেত l
- তোর নিবেদিতার কি হল?
- আমার নিবেদিতা ? ও কখনই আমার ছিলোনা । ও চেয়েছিল আমাকে পথভ্রষ্ট করে ওর অনুগামী করে ওর গোলাম করে রাখা । সেটা আমার দ্বারা সম্ভব নয় । আমি যে সংস্থায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে চাই তাতে ওর মতন মেয়ের কোন জায়গা নেই । ওর ব্যাপার আমি জানিনা কারন ও মাস্টার্স ডিগ্রি কমপ্লিট করে ওর বাবা মার কাছে ফিরে যাবে বলে বলছিল l হয়তো চলে গিয়েছিলো আমি খবর রাখিনি l
- সেকিরে ওর সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখিসনি?
- না আমার লক্ষ অন্য ছিল l উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে গেলে ওসব দিকে মন না দেওয়াই ভালো l আমার গুরুজী তাই বলেন l ঠিক বললাম?
- একদম ঠিক বলেছেন স্বামীজি l আমার বৌ ফোড়ন কাটল হাতে চায়ের কাপ আর জল খাবারের ডিস নিয়ে l নিন অনেকক্ষণ কথা বলছেন একটু গলা ভিজিয়ে নিন l
একসঙ্গে সকলে বসে চা জলখাবার খেলাম l
আমার স্ত্রী, অর্ণব কে আজকে আমাদের বাড়িতে মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য অনুরোধ করে l বলে যৎসামান্য রান্না করবো l আপনি সন্ন্যাসী মানুষ আপনাকে খাওয়াতে পারলে আমার নিজের আত্মতৃপ্তি হবে l আমি নিবেদিতা স্কুলে পড়তাম l স্কুলের পর স্কটিশে পড়তাম l আমাদের বাড়ি বাগবাজারে বলরাম মন্দিরের কাছে l আমার সারদা মায়ের আশ্রমে যাতায়াত ছিল l
অর্ণব বলল বাঃ তাহলে তো আপনি আমার কথাগুলো ভালো বুঝবেন l তবে খাওয়ার ব্যাপারটা অর্ণব অনিচ্ছাসত্ত্বে সম্মতি দেয় l
গিন্নি রান্নাঘরে চলে যান আজকের রান্না করতে l
অর্ণব বলা শুরু করে l আমি Ph. D থিসিস জমা দিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী নি l আমি কিন্তু থেমে যাইনি l এক কর্পোরেট সংস্থায় সাইন্টিস্টের চাকরি করি l তিন বছর করার পর কোম্পানি আমাকে আমেরিকায় পাঠায় l ভালো মাস মাহিনা পেয়ে মনস্থির করি এম. বি. এ করার l টাকা যা রোজগার করেছি এই তিন বছরে তাতে অনায়াসেই আমার এম. বি. এ পড়ার খরচ চলে যাবে l আমি ঠিক করলাম এবার চাকরি ছেড়ে এম বি এ করবো l যদি কোন ভালো ইন্সটিটিউট এ সুযোগ পাই l
Stanford University, PaloAlto,California র জন্য প্রস্তুতি আরম্ভ করি । পরীক্ষা দি । পরে ওখান থেকে intimation পাই l বিশ্বের এক শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় l ওখান থেকে MBA করার খরচ আছে কিন্তু আমি স্কলারশিপের জন্য স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি তে আবেদন করি l $40,000 বছরে এবং দুবছরে $80,000. আমার সৌভাগ্য আমি ফেলোশিপ পেয়ে যাই l আমার ভাগ্য সর্বদা বিদ্যা অর্জনের জন্য পথ সুগম করে দিয়েছে l সব সময় আমি পরম পুরুষ প্রভু শ্রী রামকৃষ্ণর আশীর্বাদ পেয়েছি তাই মনে মনে স্থির করি এই এম. বি. এ. সম্পূর্ণ করে আশ্রমের কাজে মন নিবেশ করবো l
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আশানুরূপ ফল প্রদর্শন করতে পারিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে l প্রথম বছর স্কলারশিপ পাই কিন্তু দ্বিতীয় বছর পাইনা l রেজাল্ট ভালো হলনা l কোনমতে MBA সম্পূর্ণ করে ভারতবর্ষে ফিরে আসি l
চলবে
©ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী
চিত্র ঋণ :-গুগুল

2