Wednesday, July 24, 2013

নেতজী সুভাষ চনদ্র বসু মৄত্যু রহস্য সুশানত কর।




সুভাষ চন্দ্রঃ মৃত্যু নিয়ে এক ধ্রুপদি শিল্পের স্রষ্টা

( লেখাটি বেরিয়েছিল আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে গোপাল বসু সম্পাদিত তিনসুকিয়ার ছোট কাগজ 'দৃষ্টি'র সুভাষ জন্মদিনে বিশেষ ক্রোড়পত্র হিসেবে। আজো লেখাটি সমান প্রাসঙ্গিক ভেবে এখানে তুলে দিলাম। মূল লেখাটিও ছবিতে রইল। বানান এবং ছাপার ভুল ছাড়া আর কিছুই পালটানো হয় নি)       
      কটা লোকের  জন্মের মধ্যে তার নিজের কি কৃতিত্ব থাকে? কবে, কোথায়, কোন ঘরে জন্ম নেবে সে ঠিক করে? এখানে তার নিজেরও স্বাধীনতা কই? সে তো ঠিক করে জীবনটাকে। নির্মাণ করে তার মৃত্যুটাকে। আর যাঁরা অসাধারণ , যাঁদের মহান বলতে পারলে আমাদের আত্মা তৃপ্তবোধ করে তাঁরা রীতিমত সৃষ্টি করে। সৃষ্টি করে তাঁর মৃত্যুটাকে। যে মৃত্যুর নামে সাধারণের আত্মা আঁৎকে উঠে, অসাধারণেরা তারই নামে গেয়ে উঠেন, “মরণরে তুহুঁ মম শ্যাম সমান।” আর সে শ্যামের জন্যেঃ
“মন্দির বাহির কঠিন কপাট।
চলইতে শঙ্কিল পঙ্কিল বাট।।” তুচ্ছ করে করে এসে যাঁরা অভিসার করেন স্বাধীনতার তাঁরাইতো মূর্ত প্রতীক।
              সুভাষ চন্দ্র বসু এমনই এক মৃত্যু সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর নিজের জন্যে। ভারত মায়ানমার সীমান্ত যুদ্ধে বৃটিশের গোলাবারুদের ঘায়ে তাঁর মৃত্যু হতে পারত। হলো তাইহোকু বিমান বন্দর ছাড়ার মুহূর্তখানিক পরে, দুর্ঘটনায়। তাতেই বা কি? কি সুন্দর সে মৃত্যু! দুশো বছরের পরাধীনতাকে উপড়ে ফেলে দেশ আর দেশের মানুষকে মুক্ত করতে গিয়েইতো? প্রথমে জাতীয় কংগ্রেস ও পরে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বোচ্চ সংগঠক হবার যোগ্যতা অর্জন করতে করতে জীবনটাকে গড়েছিলেন বলেই তো?
             এমন সুন্দর মৃত্যু কবে কোন সাধু সৃষ্টি করেছিল? অথচ আমরা একে স্বীকারই করলাম না। আমরা বিশ্বাস করি সুভাষ বসুর মত এত সুন্দর মানুষটা এতো সুন্দর মৃত্যু বরণ করতেই পারেন না! শৌলমারি না কোথাকার সাধুর ভেক ধরে কাপুরুষের মতো পালিয়ে বেড়াতে পারেন।          
         সুভাষচন্দ্রের দুর্ভাগ্য এই তিনি সফল হলেন না তাঁর লক্ষ্যে। তাই আমাদের কাপুরুষ, ভয় –বিহ্বল, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন পাল্টালো না। সে রইল কুৎসিত আগের মতো। সে আমদের কৌৎসিত্য যে আমরা সুভাষের জীবন ও মৃত্যুর সৌন্দর্য বুঝলাম না। সেনানায়ক সুভাষ নয় সাধু সুভাষের কল্পনা আমাদের বেশি প্রিয়। কেন ফকির বা পাদ্রীও নয় কেন? তাঁকে হিন্দুর একার সম্পদ বলে ভাবি বলে তো? তাঁকে শরীরে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে তিলে তিলে চেতনায় তাঁকে মেরে ফেলার সাধনায় আমাদের ক্লান্তি নেই!
          চে গুয়েভারা ছিলেন আর্জেন্টিনার লোক, কিউবার বিপ্লবে সফল নেতৃত্ব দিয়ে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। পরে বলিভিয়া গেলেন যেখান থেকে মার্কিনী ভাড়াটে শাসকদের তাড়াতে বলিভিয়ার জঙ্গলেই প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় সংঘর্ষেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু নিয়েও কম রহস্যের জলঘোলা হয় নি। অথচ তাঁর অনুগামীরা সে মৃত্যুকে বিশ্বাস করেছে। তাতে লাভ হয়েছে এই যে শুধু বলিভিয়াতে নয়, শুধু কিউবা বা আর্জেন্টিনাতে নয়, সারা লাতিন আমেরিকাতে হাজারো তরুণ সেই তখন থেকে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখছে সাধনা করছে সৃষ্টি করবে মৃত্যু—চে গুয়েভারার মতো। যেমন কোন বাঙালি তরুণ বা তরুণী প্রথম কবিতা লেখে রবীন্দ্রনাথের মতোঃ কিম্বা নজরুলের মতো। এও তেমনি।
        চে’কে নিয়েও ভক্তির বাড়াবাড়ি আছে। চে’র ছবি বা মূর্তি ঘরে রাখা, তাঁর জন্ম মৃত্যুদিন পালনতো তুচ্ছ। চে’র মতো চুল দাড়ি রাখা, পোষাক পরা, পোষাকে চে’র ছবি এঁকে তৃপ্তি হয় না—শরীরে খোদাই করে টাট্টু করা। সুভাষ বসুর লেখা কেউ পড়ে না, পড়ে ‘ শৌলমারির সাধু কি নেতাজী ছিলেন?’ জাতীয় পয়সা রোজগারের ধান্দায় লেখা পাতি বই। চে’র রচনা সবাই হজম করে; মুখে মুখে ফেরে তাঁর কবিতা। এসবে প্রশংসনীয় তেমন কিছু নেই। কিন্তু এ হচ্ছে চে’কে প্রচার করার নমুনা।
      
  চে যে তাঁর ধ্রুপদি শিল্প কর্ম—তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে কি দারুণ ভাবে বেঁচে আছেন সে আঁচ করা যায় যখন দেখি সারা লাতিন আমেরিকাতে মার্কিনী নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়ন বিরোধিতাটা ফুটবলের মতো, লোকের জাতীয় ধর্ম হয়ে গেছে। আর পেলে-মারাদোনার মতো সে ধর্মের দেবতা চে গুয়েভারা। স্বাধীনতার যে কোন সংগ্রাম, যে কোন মিছিলে  ছবির চেহারাতেও চে থাকেন সবার আগে, সবার সামনে। সারা বিশ্ব কান পেতে শোনে চে’র হৃদস্পন্দন।
         এবার কল্পনা করুন সুভাষ থাকেন কই? এ হীনতা আমাদের। সুভাষ বসুর নয়। স্বাধীন ভারতের কোন সংগ্রামের ময়দানে, লড়াইর ময়দানে—বিশ্বায়ন বিরোধী লড়াই নয় বাদই দিলাম—সুভাষ বসুর নাম নিতে কখনো কাউকে দেখব? অনশনে বসলে গান্দির ছবি মালা দিয়ে সাজিয়ে রাখার সংস্কৃতি অসমেও আছে। মৃত্যুর শিল্পীদের সম্মান জানাবার এর চেয়ে বেশি যোগ্যতা আমরা অর্জন করিনি। আমরা তেইশ জানুয়ারি করি। ওখানে একটু গানবাজনা করি আর খেলাধুলা করি। ক্যারাম খেলি। সুভাষ বসু ক্যারাম খেলার প্রতীক!!?
         সুভাষ বসু কি ছিলেন তা যার গরজ আছে তিনি নিজের অধ্যয়ন অনুশীলনে আবিষ্কার করেন। আর এ নিয়ে লেখাটা খউব জরুরি নয়।
          এখন সময় বোধহয় আত্মসমালোচনা করার । আমাদের চেতনার গভীরে বৃটিশ-মার্কিনীদের সেবাদাসদের বিরুদ্ধে লড়াই করার। মনে রাখতে হবে, শুধু কমিউনিষ্টরা তাঁকে ‘কুইসলিঙ্ক’ বলেছিল বলে, আমরা আসলে নিজেদের অপরাধ আড়ালই করি। বরং ঐ জনযুদ্ধের বছর কয় বাদ দিলে কমিউনিষ্টরা সুভাষ বসুর সহযোগীই ছিল। জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরে সুভাষও বামপন্থী বলেই পরিচিত ছিলেন। চীন দেশের ডাঃ সান ইয়েৎ সেন-এর মতো রুশ বিপ্লবের প্রতি সুভাষচন্দ্রের ছিল অপার শ্রদ্ধা। আমাদের ভুলে গেলে চলবে কেন যাঁরা সুভাষকে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে থাকতে দিলেন না তাঁরা কমিউনিষ্ট ছিলেন না। ভুললে চলবে কেন কংগ্রেস ছেড়ে ফরোয়ার্ড ব্লক গড়লে আমাদের অকমিউনিষ্ট পূর্বসূরীরা দলে দলে অনুগামী হন নি। এবং যখন তিনি মায়ানমার সীমান্তে যুদ্ধ করেছিলেন তখন তাঁর আশামত তাঁর সমর্থনে দেশে গণ-অভ্যুত্থান আমরা গরে তুলিনি। যা হবার হয়েছিল বিমান দুর্ঘটনার পর বন্দি মুক্তির আন্দোলনে। ঐ দুর্ঘটনার পরই হয় আমাদের ঘুম ভেঙ্গেছে কিম্বা ভোল পাল্টেছে। আমরা সুভাষদ্রোহী থেকে ভক্ত হয়েছি। তাও কোন সুভাষের? সেনানায়ক নয় রহস্যবাদী সাধু সুভাষের।
      
      বৃটিশের অর্ধ সমাপ্ত কাজের ভার আমরা নিয়েছি ভক্তের বেশে। আমরা তাঁকে ক্যারাম খেলার প্রতীক করে তুলেছি। করে তুলেছি বাঙালিয়ানার প্রতীক। লক্ষ্য করুন চে কিন্তু সারা লাতিন আমেরিকার সম্পদ। আমরা ২৩ জানুয়ারি বলে তাঁর নামে আরো এক তিথি বের করেছি, বুদ্ধ পূর্ণিমা বা কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর মতো। অবতারদের যেমন তাঁদের জন্মের উপরও একটা কর্তৃত্ব থাকে, সুভাষ বসুরও ছিল বলে আমরা কল্পনা করে নিয়েছি। অবতারেরাও পরলোকে গেলে মরদেহ ধরে রাখিনি আমরা। সুভাষ বসুকে পরলোকে যেতে দিতে তৈরিই নই। মনে করি তিনি কোথাও  কারারুদ্ধ আছেন আর পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিন লাদেনকে ধরার চাইতেও ঐকমত্য আছে সুভাষ বসুকে কারাগারে রাখার পক্ষে। তাই কোথায় কি ভাবে আছেন তা নিয়ে কেউ টূঁ শব্দটি করে না। লাদেন সাদ্দামের চেয়েও ওদের ভয় বেশি সুভাষকে?!
              আমরা মনে করি সুভাষ কোথাও লুকিয়ে আছেন সাধুর বেশে। সময় হলে বেরিয়ে আসবেন। তা লুকিয়ে তো বিন লাদেনো আছেন। এ সত্বেও তাঁকে নিয়ে ইঙ্গ-মার্কিনদের কী ভয়। তা সুভাষ বসুর কোনো গোপন সক্রিয়তাও দেখিনা, না দেখি তাঁকে নিয়ে কারো কোনো ভয়!
            সুভাষ কারাগারে আছেন অথচ জেল ভাঙার পরিকল্পনা করছেন না? আজকের হাইটেক যুগের কোনো সুযোগ নিতে পারছেন না? জেলের ভেতরে একটাও বিশ্বস্ত লোক তৈরি করতে পারছেন না, যে বাইরে খবর পাঠাবে? বাইরে তাঁর একজনও অনুচর নেই, যে নিশ্চিত খবর দিতে পয়ারে সুভাষ আছেন কোথায়? অথচ আজকের মানুষ সন্ধান করছে পৃথিবীতুল্য দ্বিতীয় গ্রহটি আছে মহাবিশ্বের কোন ছায়াপথে, কতদূরে?
            সুভাষ সাধু হয়ে আছেন! যতদূর জানি স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনায় দারুণ ভাবে প্রভাবিত ছিলেন তিনি। সুভাষের এ দীর্ঘ আত্মগোপন বিবেকানন্দের দর্শনের কোন ব্যাখ্যায় সমর্থন মিলবে? অথবা বিবেকানন্দের দর্শনে সেই দুর্ঘটনার পর আস্থা হারালেন তিনি? কার দর্শন, কোন দর্শন সমর্থন করবে এ দীর্ঘ আত্মগোপন?
         
সুভাষ এখন শুধু একটি রাস্তার নাম এবং হিন্দু বাঙালি এবং অসমিয়ার কাজিয়ার নাম
 সমর্থন করে শুধু ভীরুতার দর্শন আমাদের যে ভিরুতা ভয় পায় এমন কি রাজনীতির ‘র’ উচ্চারণে। ভালোবাসে শুধু গাইতে আর খেলতে? সে সুভাষের মতো বীর পূজাতে আত্মগ্লানি মুক্ত হবার প্রয়াস করে আর দীর্ঘজীবি কাপুরুষ কিম্বা সাধু বানিয়ে সুভাষকেও নামিয়ে আনে নিজের সারিতে। এভাবে সে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে সুভাষের শিল্পকে ধ্বংস করে। মারে সুভাষকে।
            
 চিতাভস্মকে পেছনে ফেলে নেতাজি কন্যা
            বাইরে ২৩ জানুয়ারি জন্মদিন বটে- কিন্তু এদিনেই তাঁকে আটকে মেরে ফেলবার দিনও বটে। কোনোদিন যদি কেউ তাঁর সত্যিকারের মৃত্যুদিন পালনে সাহসী হয় বোধকরি সেদিনই সে মৃত্যুর ঔজ্জ্বল্য আমাদের পথা দেখাবে। নতুবা আমাদের মনও শত্রুর কাছে বন্ধক রেখে দিতে, কিম্বা সাধু হয়ে পালিয়ে বেড়াতে আমাদেরই বা বাধা কিসে? তাইতো করছেন আমাদের কল্পনার icon. সুতরাং সুভাষ হবেন না চে গুয়েভারা। মার্কিনিরা বা বৃটিশেরাও তাঁকে ভয় পাবে না—তারা করে করে খাবে। প্রেত নৃত্য নাচবে আমাদের বুকের উপর। সেই নৃত্যেই আমরা হব আহ্লাদে আটখানা। জর্জ বুশ আর টনি ব্লেয়ারদের আমরা আজকাল এতো ভালোবাসি সে এমনি এমনি? অথচ চে’র দেহ আর্জেন্টিনায় আমেরিকানরা কী মারই না আজ খাচ্ছে। চাভেজ-এর ভেনেজুয়েলা, লুলার ব্রাজিল মার্কিনীদের ঘাড় ধরে বাইরের দরজা দেখাচ্ছে। এইতো চে। আমাদের সুভাষ ঠিক এভাবেই আমার বেঁচে উঠবেন তো? চাভেজ কিম্বা লুলার চেহারা নিয়ে এই দেশে এই ভারতে আমাদেরই কেউ মাথা তুলে দাঁড়াবে তো? কেউ দাঁড়ালেই আমরা তাঁর সাথী হব তো? 

Tuesday, July 16, 2013

প্রভু জগন্নাথ মহাপ্রভুর ১৬ কলা ঃ-






প্রভু জগন্নাথ মহাপ্রভুর ১৬ কলা ঃ-

১ম কলাঃ- নিবৃতি , সংসারের মধ্যে থেকে সাংসারিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার কলা।
২য় কলাঃ- প্রতিষ্ঠা, সৎ মার্গ তে থেকে যশ অর্জন করার কলা।
৩য় কলাঃ- বিদ্যা , নিস্বার্থ ভাবে জনহিতকর বিস্তার তথা বিদ্যা দান করার কলা।
৪র্থ কলাঃ- শান্তি , মন ও মস্তিষ্ক র মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করে স্থির চিত্ত্যে থাকা।স্থিতপ্রঙ্গ।
৫ম কলাঃ-ইন্দিকা, নিজের অন্ত্ঃ শক্তিকে সংগ্রহ করার কলা।
৬ষ্ঠ কলাঃ- দীপিকা, শক্তির সৎ এবং উপযুক্ত প্রয়োগের কলা।
৭ম কলাঃ- রেচিকা, নিজের দুষ্ট প্রকৃতিকে চিনে,তাকে সিকার করা এবং তাকে পরিত্যাগের কলা। (এটা আজকের যুগে বিরল)
৮ম কলাঃ- মোচিকা, মায়া ও মোহর থেকে মুক্ত রাখা নিজেকে ।
৯ম কলাঃ- পরা , নতুন দিশা র লক্ষে নিজেকে পরিচালিত করা এবং লক্ষ্য স্থাপন করা।
১০ম কলাঃ- অমৃত , অমৃত তুল্য কথার প্রয়োগ এবং তাকে অমৃতর মত বিস্তার করার কলা।
১১দশ কলাঃ- সুক্ষ , সৎ সুক্ষতার বিচার করার কলা । সুক্ষ বিচার শক্তি অর্জনের কলা ।
১২ দশ কলাঃ- জ্ঞান অমৃত, জ্ঞান অর্জন করে তাকে অমৃতের মত বণ্টন করা ।
১৩ দশ কলাঃ- অপার আনন্দ বিস্তার করা ।
১৪ দশ কলাঃ- নিজের কর্ম দ্বারা সমাজের কল্যাণ করা ।
১৫দশ কলাঃ- ব্যাপিনী , সত্যকে সর্বব্যাপী করার কলা।
১৬দশ কলাঃ- ব্যোম রুপা , আকাশের মত নিজের বিরাট ব্যক্তিতে সকলকে আকৃষ্ট করা বা সম্মোহিত করা।

Monday, July 8, 2013

কৈলাসে কলহ [ সব চরিত্র কাল্পনিক ] - অরুণ চট্টোপাধ্যায়


মা মহামায়া নিজের ত্রিনয়নটা সামলে সুমলে রাখে । সরবক্ষন লক করা থাকে । কারণ যদি কোনও কারণে রাগের মাত্রাটা বেড়ে যায় তো ত্রিনয়ন লিক করে আগুন ঠিকরোতে পারে । সেজন্য শুধু লককরাই নয়, একটা ভালভ-এর ব্যবস্থা করেছে । শরীরের হরমোনাল সিস্টেমের ফিড ব্যাক কনট্রোলের মত ব্যবস্থা ।  শরীরের রাগ একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছলে তবেই ত্রিনয়নের ভালভ খুলবে । আবার রাগ মাত্রার নীচে নামলেই সে ডিসচার্জ বন্ধ করে দেবে ।

আসলে সবকিছুর মত এখন ভগবানও ডিজিটাল হয়ে গেছেন কিনা । টাকা আনার মত ছোটখাট বিষয় এই ডলারের যুগে অচল । তাই আনালগ (পড়ুন অ্যানালগ) সিস্টেম বাতিল হয়েছে ।  তা, যা বলছিলাম । বাবা সাতসকালে ধ্যানে বসেছেন ।হাতের তেলোয় একটা চ্যাপ্টা মোবাইল। যেটা নিয়ে এখন মর্তবাসী সর্বদা ধ্যানে মগ্ন সেটা এখন স্বর্গে দেবতাদের হাতে হাতে । কি করবে - ডিজিটাল স্বর্গ যে ।
ধুতুরার সরবতের গ্লাসটা এনে রাখার সময়ই চোখে পড়ল মহামায়ার ।  একি - এখন ধ্যানে বসার সময় নয় ? মেডিটেশনের কত উপকার তা কি মহেশ্বর জানে না ? আর ঠিক তখনই রাগটা তার মাথায় চড়ে বসল ।  কিন্তু এখানে তার ত্রিনয়ন লিক করার সম্ভাবনা নেই। মহাদেবের ত্রিনয়নের জোর একটু বেশি (স্বর্গটাও বোধহয় পিতৃতান্ত্রিক )। এখানেও সেই ফিড ব্যাক কনট্রোল । তাছাড়া একটা অ্যাটমিক পাওয়ার কি আর একটাকে ঘাঁটায় নাকি ? আরে রাম কহো । বড়জোর পায়ে পা লাগিয়ে গায়ে একটু তাপ দেওয়ার চেষ্টা এই যা । আর ওই পরমপুরুষের সাজেশন মেনে একটু আধটু ফোঁস ফাস করা । সেটা তো করতেই হবে নাকি ? নাহলে টেকা যাবে দুনিয়ায় ?
যা বলছিলুম। বাবার হাতে মোবাইল । নারদের নতুন আনা মোবাইল । বাবা বিষ্ণুর দেয়া । দেয়ার সময়ই বিষ্ণু নীরব হাসি হেসেছিলেন । নারদ এর গভীরে লুকিয়ে থাকা অর্থটা অনুধাবন করে মনে মনে হেসেছিল । লাগ ভেলকি লাগ । কৈলাসে এবার কলহ লাগল বলে । নারদ নিজের মনে শুধুবলল, নারদ ! নারদ !!
মোবাইলে বাটন নয় টাচ স্ক্রিন । আহা পরশের কি পুলক আর চমক ! একটু কষ্ট নেই, নেই এতটুকু ঝামেলা । একটা আঙ্গুলের মধুর পরশ মুহূর্তে খুলে দিতে পারে চরম এক সুখের জগত ।
মহাদেব বসে প্র্যাকটিস করছেন । একটা সুন্দরীর বুকের ওপরে আঙ্গুলের মৃদু পরশে খুলে গেল একটা নাচের সীন । হাতের সরবত হাতেই রইল । মহামায়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখে যাচ্ছেন ।আর ভোলানাথ তো ধ্যান করছেন – মোবাইল হাতে ডিজিটাল ধ্যান । মহামায়ার মনে হল এটা একটা বলিউডই সিনেমা । তারপর মনে হল টলিউডিও হতেপারে । আবার হলী হুডিও হতে পারে । আজকাল হুডখোলা আর কার না ?
এতক্ষন তবু রাগ আর দুঃখ চেপে সব সইছিল । কিন্তু আর তো সয় না । ত্রিনয়ন এলারম বাজাতে শুরুকরেছে ।  আরে একি ! বাবা কিনা সাত সকালে ফেসবুক খুলে বসেছে ? নিজের প্রোফাইল । মহামায়ার সামনে । ফ্রেন্ড লিস্ট খুলতেই দেখা গেল । আরে একি ! উর্বশী, রম্ভা এরকম কত সুন্দরী সেই লিস্টে ।  কিন্তু সব ডিজিটাল – তাই ঘাগরা কাচুলি-ওড়নার বদলে সব বিকিনি পরে ফেলেছে । হায় হায় এবার কি হবে ? স্বর্গটাকেও কিনা বুক করে ফেলল ফেসবুক ? হরি হে মাধব – বাথটবে কি গা ধোব ?
কোটী কোটী ফেসবুক-সুন্দরীর লিস্ট কুটিকুটি করে ফেলতে ইচ্ছে হল মহামায়ার । কিন্তু এ যে সব ডিজিটাল – মানে মায়া । মহামায়ার থেকেও বড় মায়া । রাগে মোবাইলটা ভেঙ্গে ফেললেও কি আর সুন্দরীরা যাবে ? এই সুন্দরীদের ধ্যান করবে রোজ মহাদেব  ? হায় হায় বিষ্ণুদেব তোমার মনে মনে এই ছিল ?
- কি, কি করছ তুমি ? রাগে কাঁপতে কাঁপতে মহামায়ার প্রশ্ন, এই তোমার ধ্যান ? এসব কি হচ্ছে ? আবার ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছ ?
মহাদেব মুখ তুললেন । গলার স্বর ভারি শান্ত । না হয়ে উপায় কি ? ভাঙ্গের সরবতটা যে এখনও বউ হাতছাড়া করে নি । একটু না তেলালে যে ও ফিরিয়ে নিয়ে যাবে । বললে, প্রিয়ে, তুমি হলে জগতের সেরা সুন্দরীদের সেরা । তুমি হলে মিস হেভেন । তুমি যখন রেগে যাও তখন মনে হয় একশটা সুন্দর লাল গোলাপ গন্ধ বিকিরণ করতে করতে এগিয়ে আসছে ।
মহামায়া একটু নরম হয়ে পড়ছে নাকি ? তার ত্রিনয়নের চার্জ কি কমে যাচ্ছে ? দনুজ দলনী দুর্গা কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন ? ভাবছেন ত্রিনয়নের চার্জ আরটা আনতে যাবেন কিনা।
- হেপ্রিয়ে । মহাদেব আবার শুরু করেছেন, তুমিই আমার ধ্যান । আমি কি করে অন্য সুন্দরীদের–
-- চুপ কর। এসব ডায়ালগ গল্প উপন্যাসে অন্তত কয়েক কোটী বার লেখা হয়েছে । ভেবেছ  এই সব বস্তাপচা ডায়ালগে ভুলব আমি ? আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না । ফেসবুকের একাউন্ট তুমি এক্ষুনি ডি -একটিভেট করবে কি না বল ?
- আহা এটাতো বিষ্ণুর দেয়া । দেখ না বিষ্ণুই আমার প্রথম ফ্রেন্ড ।
- সে কি বিষ্ণু তোমার ফার্স্ট ফ্রেন্ড ? আমি নই ?
মহাদেব বললেন, ডার্লিং তোমাকেই তো আমি করতুম কিন্তু তুমি যে ফেসবুক পছন্দ করই না । তাই –
মহামায়া কাঁদতে কাঁদতে বললেন, কে বললে ? আমাকে ফ্রেন্ড করবে না তাই বল ।
মহামায়ার হাত একটু বোধ হয় ঢিলে হয়ে আসছিল । শিব উঠে সরবতটা সে হাত থেকে নিয়েই ঘোঁট ঘোঁট করেখেয়ে ফেললেন সবটা ।  তারপর হেসে বললেন, ফ্রেন্ড যে করব তোমারও একটা একাউন্ট থাকা চাই তো ?
- খুলে দাওনা বাপু ।
কলহটা হয়ত মিটেই যাচ্ছিল কিন্তু নারদ অলক্ষ থেকে একটু হাসল । নিঃশব্দে বলল, নারায়ন নারায়ন !
মহামায়ার চোখ পড়ে গেল মহাদেবের জটার দিকে । আরে এটা এমন ফুলে উঠেছে কেন ? কি   লুকিয়ে রেখেছে এখানে ভোলানাথ ? কিছু বলা যায় না কোনও সুন্দরীকে হয়ত –
- ওখানে  কি? তোমার জটার মধ্যে । কি একটা উঁকি পাড়ছে মনে হচ্ছে ?
মুহূর্তে যেন শিব দুর্গার যৌথ তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল । মহাদেব কিছুতেই জটায় হাত দিতে দেবে নাআর জটায় হাত না দিয়ে দুর্গাও ছাড়বে না ।
- আরে আরে করছ কি ? অনর্থ হয়ে যাবে যে । জগত ভেসে যাবে যে ।
- যায় যাক। বলে টেনে জটা খুললেন মহামায়া । পাকের পর পাক খুলতে লাগল জটার । আর স্রোতের পর স্রোত বয়ে যেতে লাগল গঙ্গার । ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ভগীরথের শাঁখের আওয়াজ ।
না জটার ঘোরপ্যাঁচ আর আটকে রাখতে পারল না গঙ্গাকে । বেরিয়ে এসে মহামায়াকে প্রনাম করে বলল,মা কি বলে যে তোমায় কৃতজ্ঞতা জানাব বুঝতে পারছি না । ওঃ আমার কি গা চুলকচ্ছিল যেকি বলব মা । জটাটা একটু সাবান সোডা দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে পার না মা ?
আবার প্রনাম করল ভগীরথও । বলল, মা সগর রাজার ষাট হাজার ছেলেকে বাচাতে হবে মা । মা গঙ্গাকে চাই । আপনি মুক্ত করে দিয়ে কি ভাল যে করলেন ।
মহামায়া যে কি করবেন তা বুঝতে পারছেন না । সত্যি তো ঝগড়ার ফল তবে মাঝে মাঝে ভালও হতে পারে ? শিব এবার ধ্যানে বসলেন । সত্যিকার ধ্যানে ।
সবজান্তা বিষ্ণু ওদিকে হাসছেন । নারদ বলতে যাচ্ছিল, নারদ নারদ !  মুখে আসার আগেই পালটেনিয়ে বলল,  নারায়ন নারায়ন !

[ প্রথম ভাগ ]
কেসবুক (কৈলাস সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইট ) KSBOOK(KAILASH SOCIALI NETWORKING SITE)
- অরুণ চট্টোপাধ্যায়
মর্তে প্রতি বছর একবার করে আসতে আসতে মর্তের একেবারে প্রেমে পড়ে গেছেন মা মহামায়া । অনেক দিন ধরে লক্ষ করে দেখেছেন মর্তবাসীরা আজকাল খুব কম ঘুমোচ্ছে কিম্বা অনেক বেলায় উঠছে ।
কৌতূহল হল । কিন্তু কি করা যায় । মর্তবাসীরা কখন ঘুমোবে বা কখন জাগবে এ তো তাদের মৌলিক অধিকার । তিনি তো তাদের এই fundamental right ছিনিয়ে নিতে পারেন না ।
কিন্তু প্রশ্ন হল তার ধ্যান ছেড়ে দিয়ে মানুষ এখন কার ধ্যান করছে ? কৈলাসে ফিরে বাবা মহাদেবকে প্রশ্নটা করতেই তিনি একবার নিজের সিদ্ধির গেলাসটার দিকে তাকিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে drug addiction.
বলেই আবার ধ্যান মগ্ন হলেন ।
মহামায়ার মনে তো কৌতূহলটা জারিই র‍য়ে গেল । তাই এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস করা নয় । রাতের আঁধারে বেরোলেন সারপ্রাইস ভিজিটে । ভাবলেন প্রথম যে জানলায় আলো জ্বলবে তাকেই তিনি টারগেট করবেন ।
কিন্তু হায় । না না সব ঘরে হয় আলো নেভানো, নয় নাইট ল্যাম্প জ্বলছে । ভাবলেন তাহলে তাঁর অনুমান মিথ্যে । ফিরে গিয়ে ছেলে গনেশকে বললেন । গণেশ নিজে সিদ্ধি খান না । সিদ্ধি দ্যান অন্যকে । শুঁড় নেড়ে বললেন, না মা । তুমি জান না । ওরা সব জেগে আছে । ঘরে ঢুকে দেখ । তাহলেই বুঝতে পারবে ।
সেই মত পরের দিন চুপি চুপি আবার গেলেন । প্রথমেই পড়ে গেল একজন তরুণের ঘর । বিছানায় বসে নিজের lap এর top -এ laptop নিয়ে কি যেন নিয়ে মেতে আছে । মা স্বয়ং নিজের চেহারায় আবির্ভূত হলেন । হুঁশ নেই ছেলেটার । সে তখন এক তরুণীর ছবিতে আত্মস্থ । তারপর দেখলেন সে কি লিখল । একটু পরে আর একটা লেখা আবার নিজে থেকেই হয়ে গেল । আবার তরুণ উত্তর লিখল।
মা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে জানলেন এরা প্রেম করছে । এবং আরও জানলেন এরা কেউ কাউকে জানে না, চেনে না । এমন কি এরা যে সত্যি সত্যি এরা তাও এরা জানে না । এই না জানাটাই এদের মস্ত এক আনন্দ আর সাহস দিয়েছে । এরা ডেস্পারেট । পরস্পরের প্রতি এরা যে যা পারছে করে যাচ্ছে । যোগবলে মহামায়া জানলেন, এই খুপরিটার নাম হল মেসেজ বক্স । এর মধ্যে যে যাই কর মহামায়া তো দূরে থাক শিবের বাবাও টের পাবে না। আর শিবের বউ হয়ে তিনিই বা কি করে টের পান ?
মহামায়ার কৌতূহল হল । এরা কি করছে দেখি তো । যোগবলকে লাগালেন কাজে । চট করে ওপাশের মেয়েটা হয়ে গিয়ে বললেন, কি হচ্ছে বাচ্চু । অনেক রাত হয়েছে এবার শুতে যাও ।
এপাশ থেকে ছেলেটা লিখল, আর একটু ডার্লিং । সবে তো তোমার লিপের দিকে এগিয়েছি । লিপস্টিকটা তো ঘসে তুলি নি এখনও । এর পর আরও কত কি –
ছ্যা ছ্যা । তারপর ভাবলেন, এরা সব অল্প বয়েসই ছেলে মেয়ে তো হতেই পারে । টিন –এজার । টিন দিয়ে তো এদের ঘিরে রাখা যাবে না । গেলেন এক বিবাহিতর ঘরে । ওরে বাবা এ তো আরও সাংঘাতিক । ওই টিন – এজাররা তো জানে অল্প । কিন্তু এরা বেশি জানে আর তাই –
নির্ঘুম লোক বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে গেল । দেশ থেকে চললেন দেশে । দেখলেন সারা পৃথিবী কেউ এখন আর ঘুমিয়ে নেই । তখন শুরু হল তাঁর তত্ত তল্লাশ । জানলেন এরা সব মেতে আছে যাতে তার নাম নাকি ফেসবুক । এটা এখন খুব সহজ –লভ্য । কম্পিউটার ল্যাপটপ এসবেরও কিছু দরকার নেই । মুঠোফোন নামে একটা যন্ত্রে আঙুলের মৃদু স্পর্শেই মুঠোয় চলে আসবে সারা দুনিয়া । কর লো দুনিয়া মুঠঠি মে / ভর লো লাইফ ছুট্টি সে ।
[ চলবে ]

Saturday, June 22, 2013

তুমি যে আমারে চাও আমি সে জানি।






১৮৮৪ র ১৯ সে এপ্রিল । আত্মহত্যার চেষ্টায় আফিম খেলেন কাদম্বরী দেবী – জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী। রবিন্দ্রনাথ এর নুতনবউঠান। মারা গেলেন দুদিন পর, ২১ শে এপ্রিল ।
এই দুদিন মৃত্যুর সঙ্গে কিভাবে যুদ্ধ করেছিলেন কাদম্বরী দেবী ? তাঁর শেষ চিকিৎসার জন্য প্রথম দিনেই এসেছিলেন সাহেব ডাক্তার ডি বি স্মিথ । ৪০০ টাকা খরচ করে আনা হয়েছিল তাঁকে, চেকে টাকা দেওয়া হল। এরপর ওষুধ এলো ২৫ টাকার । বাড়িতে তো আর সাহেব ডাক্তারকে রাখা যায় না । কিন্তু কাদম্বরী দেবীর অবস্থা ক্রমসই খারাপ হচ্ছে । তাঁর শ্বাসকষ্ট বাড়ছে । আরও গভীর হচ্ছে তাঁর আচ্ছন্নতা। বিশেষ ভয় রাত্রের দিকে। তখন হাতের কাছে ডাক্তার পাওয়া সহজ নয়। তাই সাহেব ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা চললেও রাত্রে বাড়িতে রাখা হল এক জোড়া বাঙালি ডাক্তার – নীলমাধব হালদার ও সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় । তেতলার ঘরে রাখা হয়েছে কাদম্বরী দেবিকে। এঘরে কেউ থাকেন না । সুতরাং ঘরে আলো নেই। এই ঘরের জন্য দেড় টাকা খরচ করে বাতি এলো । বাতির আলোয় নিঃসাড় পরে আছেন কাদম্বরী । তাঁর শরীর থেকে প্রানের আলো ক্রমে চলে যাচ্ছে । অবস্থা খারাপ হতে, এলেন আরও একজন দামি ডাক্তার ভগবৎ চন্দ্র রুদ্র । ইনিও থাকলেন রাত্রিবেলা । এতগুলি ডাক্তারের জন্য দুবেলার মহাভোজ আস্তে লাগলো উইলসন হোটেল থেকে। কিন্তু এঁদের সমবেত প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে ২১ শে এপ্রিল সোমবার সকালে মারা গেলেন কাদম্বরী দেবী। জ্যোতিরিন্দ্র-রবীন্দ্রের প্রবল পরাক্রমি পিতৃদেব গ্রিহকরতা, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কঠোর আদেশে লোপাট করা হল আত্মহত্যার সফল প্রমান। ঘুষ দিয়ে বন্ধ করা হল সংবাদপত্রের মুখ । কোন সংবাদ পত্রে ছাপা হল না কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু সংবাদ। তাঁর দেহ মর্গে পাঠানো হল না । পাছে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ওই পরাক্রমি পুরুষ দেবেন্দ্রনাথেরই হুকুমে বা নেপথ্য প্ররোচনায় হারিয়ে গেল করোনার রিপোর্ট । কাদম্বরী দেবীর অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া অবশ্যইত ’কাঠ খাট ঘৃত চন্দন ধুপ’ প্রভৃতি সহযোগে হয়েছিলো নিমতলা শ্মশানে পণ্ডিত হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নের তত্ত্বাবধানে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ । ... অনুপস্থিত তাঁর স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ...!!!
শোনা যায় কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যার পরই মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মেজবউঠাকুরুণ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বেড়াতে গেলেন জাহাজে করে। পরে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও নিয়েছিলেন ... !!! ( সংগৃহীত গ্রন্থ থেকে নেওয়া )


তুমি যে আমারে চাও আমি সে জানি।
কেন যে মোরে কাঁদাও আমি সে জানি।।
এ আলোকে এ আঁধারে কেন তুমি আপনারে
ছায়াখানি দিয়ে যাও আমি সে জানি।।
সারাদিন নানা কাজে কেন তুমি নানা সাজে
কত সুরে ডাক দাও আমি সে জানি।
সারা হলে দে'য়া-নে'য়া দিনান্তের শেষ খেয়া
কোন্‌ দিক-পানে বাও আমি সে জানি।।



তাই তোমার আনন্দ আমার 'পর
তুমি তাই এসেছ নীচে-
আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর,
তোমার প্রেম হত যে মিছে ।।
আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা,
আমার হিয়ায় চলছে রসের খেলা,
মোর জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে
তোমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে ।।
তাই তো তুমি রাজার রাজা হয়ে
তবু আমার হৃদয় লাগি
ফিরছ কত মনোহরণ বেশে,
প্রভু, নিত্য আছ জাগি ।
তাই তো, প্রভু, যেথায় এল নেমে
তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে
মূর্তি তোমার যুগলসম্মিলনে
সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে ।।

Thursday, June 13, 2013

রুদ্রাক্ষ ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জ্জী ১৭.০৮.২০১২

রুদ্রাক্ষ 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জ্জী ১৭.০৮.২০১২

ছোট্ট গ্রাম, নাম তার হরিনারায়ানপুর । চাষ আবাদ করে চলে গ্রামবাসীরা । অর্থনৈতিক সাচ্ছলতা নেই বললেই হয় । কৃষি প্রধান গ্রাম । সকলেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠিন পরিশ্রম করে সংসার চালায় । যে বছর ভাল বৃষ্টি হয় ফসল ভাল , নাহলে কপালে হাত । ফি বছর বন্যা তে গ্রাম প্লাবিত হয় আর ফসল হানি হয় । গ্রামে কুঁড়ে ঘরই বেসি । যারা গ্রাম ছেডে সহরে চলে গিয়েছে তারা প্রায় গ্রামের মুখ দেখেনা বললেই চলে ।দুর্গা পুজর সময় আসে , কদিন থেকে চলেযায় । এমনি এক গ্রামের বাসিন্দা কুঞ্জ বিহারি প্রধান । তার এক মাত্র ছেলের নাম রুদ্রাক্ষ প্রধান ।ডাক নাম রুদ্র । শিব রাত্রীর দিন রুদ্রাক্ষ র জন্ম তাই নাম রুদ্রাক্ষছেলেটা ধীর স্থীর মিষ্ট স্বাভাবের । 
কুঞ্জ আর তার স্ত্রী , লক্ষ্মী দুঃখে কষ্টে দিন কাটাত । রুদ্রাক্ষ গ্রামের স্কুল এ ক্লাস থ্রী তে পডত । ভালই পডাশুন করত । মাস্টার মশাই রুদ্রাক্ষ কে খুব স্নেহ করতেন । মা বাবার চোখের মণি যেমন গুনে তেমন কাজে । পডাশুন থেকে আরম্ভ করে ক্ষেত খামারের কাজ সব ই করত রুদ্রাক্ষ বাবার সঙ্গে । 
একদিন গ্রামেতে লোকের ভিড । অনেক গাডি তার সঙ্গে কিছু নেতা , গ্রামের মোডল নিশিকান্ত চৌধুরী । বাবুদের দেখে গ্রামের ছেলে ছোকরা, বুড বুডি সকলেই একজোট হল। নিশিকান্ত বাবু বললেন, এই গ্রামের সুদিন এল । আপনাদের আর দুঃখ কষ্ট থাকবে না ।আপনারা এবার গাডি ঘোঁড়া চোডে বাবুদের মত থাকবেন । এখানে বাঁধ হবে । সরকার আপনাদের জন্য এখানে বাঁধ করলে কৃষির উন্নতি সাধন এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সাচ্ছলতা আসবে । আপনাদের ছেলে মেয়ে পডাশুন করে অনেক বড হবে ।বিস্থাপিত ৭২৬ পরিবারের জন্য সরকার আলাদা বসতি নির্মাণ করবেন । আজ তাই আপনাদের কাছে আমাদের অঞ্চলের মাননীয় বিধায়ক, শ্রী ভগবান চৌধুরী মহাশয় উপস্থিত থেকে এই প্রকল্পের বিষয় বিস্তারিত সূচনা দেবেন। সভাতে, করতালীর বদলে বিরোধিতা আরম্ভ হল। স্কুলের এক শিক্ষক শ্রী পঞ্চানন প্রধান বিরধিতার সুর আরম্ভ করে বললেন,সরকার আগে বিস্থপিতদের জন্য নতুন বসতি,রাস্তা,স্কুল,ডাক্তারখানা,পানীয় জলের ব্যাবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ করুন তারপর আমরা এই বিষয়ে সম্মতি জানাবো । নিশিকান্ত চৌধুরী খেঁপে লাল। গর্জে উঠলেন আপনার মাস্টারিটা বিধায়াক মহাশয় এক্ষুনি ঘুঞ্চিয়ে দেবেন, আপনার সাহস ত কম নয়! শিক্ষক মহাশয় বিনম্রতার সঙ্গে বললেন আপনারা এই গরীব গ্রামবাসী দের জমি নিয়ে নেবেন আর তার বিনিময়ে যা যা ঘোষণা করছেন তার ... বিধায়ক মাহাশয় হাত থামিয়ে নিশিকান্ত কে বসতে বললেন । তার পর শুরু করলেন আমি এখানে কারুর পেটের দানা ছিনিয়ে নিতে আসিনি বরং কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে এসেছি

আপনারা ধৈর্য্য ধরে শুনুন সমস্ত বিষয়টা তারপর আপনাদের কথা শুনব। এই যোজনার জন্য সরকার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন এবং এর সুবাদে সমুদায় ৯৯৫০ হেক্টার জমিতে সেচের সুবিধে হবে । আপনাদের পরিবারের কেউ একজন সরকারি চাকরী পাবে। সাতটি পুনর্বসতি কলোনি তে সকল বিস্থাপিতদের থইথান করা হবে । 
এর মধ্যে কিছু লোক চেঁচা মিচি শুরু করে দেয় । নিশিকান্ত সরকারী দালাল আমরা এ ভিটে মাটি ছাডবোনা। আমাদের বাপ দাদার ভিটে মাটি ছেডে কোথাউ যাবনা । ছেলেদের চিৎকারের সঙ্গে অন্যরাও সুর মেলাল । বিধায়ক মহাশয় জত বোঝালেও কেউ রাজি হলনা কি চিৎকার থামল না । অগত্যা সরকারি বাবুদের নিয়ে সবাই ফিরে গেলেন । 
তার পরের দিন পুলিশ এসে পঞ্চানন বাবুকে ধরে নিয়ে যায়
প্রথমে পঞ্চানন বাবু ওয়ারেন্ট দেখতে চান কিন্তু পুলিশ কিছু না দেখিয়েই ধরে নিয়ে যায় তাঁকে । সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকে যে জার ঘরে চলে যায় । রুদ্রাক্ষ সব দেখে নির্বাক হয়ে যায় । বয়স অল্প হলেও তার মনে প্রতিবাদের বহ্নিশিখা জ্বলতে থাকে সে বোঝে যা হচ্ছে সেটা অন্যায় ।তাই পেছন থেকে পুলিশ এর জীপ কে লখ্য করে ঢিল ছোঁড়ে । বাড়িতে দউড়ে চলে যায়। বাবাকে বলাতে, বাবা গুম হয়ে বসে থাকেন, মা কিছু বললে বিরক্ত হন । আকাশ পানে চেয়ে কিছু বিড় বিড় করেন।
এর পরের ঘটনা গ্রামেতে ক্যাম্প বসে । তাহসিলদার, আর আই,আমিন চেন নিয়ে মাপ জোপ আরম্ভ করে দেয় । পল্লিসভা হয়

তাতে কিছু লোক নিশিকান্ত বাবুর গুণ্ডাদের ভয়ে টুঁ শব্দটি করেনা। হঠাৎ বাবা বাডিথেকে একটা কাটারি নিয়ে নিশিকান্তর দিকে দৌড়ন রাগে গজরাতে গজরাতে বলেন তোর চোদ্দ পুরুষের বাপের জমিদারী যে আমাদের জমি নিতে এসেছিস । সবাই রে রে করে বাবাকে আটকান । তহসিলদার বোঝান তোমরা ক্ষতি পুরন পাবে । অনেক টাকা পাবে । এখানে সই কর । বাবা কাগজটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলেন । রাগে বলেন বাবু আপনারা আমাদের অন্ন র থালা ছিনিয়ে নিয়ে টাকা দেখাচ্ছেন । টাকা আমরা চাইনা । নিশিকান্ত গর্জে উঠে বলল , এই কুঞ্জ তোর গায়ে মেলা চর্বি হয়েছে না ? দেখাচ্ছি তোকে মজা। গ্রামের উন্নতি চাসনা তো গ্রাম ছেডে চোলেযা ।
পরের দিন পুলিশ এসে কুঞ্জকেও নিয়ে গেল কোন ওয়ারেন্ট না থাকা সত্তেও । দেশের আইন ব্যাবাস্থা র প্রতি কুঞ্জর ঘৄনা ধরেগেল । পুলিশের দারোগা বাবু বল্লেন , তোর এত সাহস তুই লোক প্রতিনিধির কথা না শুনে কাটারী নিয়ে মারতে গিয়েছিলিশ ; সেটা কি অস্বিকার করবি । সাক্ষীপ্রমান তোর বাডির লোক ই দেবে ।ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন কি ? কুঞ্জর নিজের জন্যে চিন্তা হয়না । তার বউ ছেলের যদি কোন ক্ষতি হয় তারচে তার মৄত্যু ভাল । হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো । হাজতে নিশিকান্ত আর ভগবান চৌধুরী , বিধায়ক এসে কুঞ্জ কে বল্লেন ,” দেখ কুঞ্জ আমরা তোমাকে ইচ্ছে করলেই জেল হাজতে পাঠাতে পারি কিন্তু তাতে কি লাভ তোমার বউ ছেলে না খেয়ে মারা যাবে ।নিশিকান্ত বলে , তুই কি তাই চাস ?” কুঞ্জ হাউ হাউ

করে কেঁদে বলে ,”না বাবু ওরকমটি করবেন না ! আমি আপনারা যা চাইবেন তাই করব ।নিশিকান্তর ক্রুর হাঁসি কুঞ্জ র চোখে এড়ালোনা। কথায় আছে হাতি কাদায় পডলে ব্যাং এও লাথি মারে । কুঞ্জ র অবস্থা কিছুটা তাই । দারোগা বাবু বল্লেন , বাবুদের অশেষ দয়া তা নাহলে তোর নামে ৪ টে দফা লাগিয়ে তোকে জেলে ভরতাম বুঝলি । কালকেই কোরট্ এ হাজির করা হত ৷ভগবান বুঝলি সাখ্যাৎ ভগবান , যেমন নাম সেইরকম কাজ । আমাদের বিধায়ক মহাশয় তোকে ছাডাতে নিজে এসেছেন ।তুই কিনা কাটারি নিয়ে গিয়েছিলিশ মারতে । ধর্ম নেইরে এ জুগে ধর্ম নেই । যার ভাল করবি সেই তোকে বাঁশ দেবে । আঃ কি হচ্ছে ? বিধায়ক বলেন । আমি যে জন্য এসেছি সেটা করুন । এই সময় বাইরে লক্ষীর গলার আওয়াজ এল !লক্ষী গজরাতে গজরাতে ভেতরে ঢুকলো , আ মরন মিনশে! আদিখ্যেতা দেখলে গা জ্বলে যায় !! আমার বর ছাডা কি কেউ ছিলনা এ গেরামে মুখপোডারা ? হাজতে ভরতে তোদের হাথ কাঁপলোনা ? কাল থেকে মানুষটা ভাতে মুখ দেয়নি । শুকিয়ে রোগা কাঠি হয়ে গেছে গা । মরন হয় না তোদের ? আমি যদি কোন পাপ না কোরে থাকি এর যবাব দিও হে ঠাকুর ! তুমি ভরষা !!
দেখছিস কুঞ্জ তোর বউ এর চোপা?” দারগা বাবু বলে উঠলেন । স্যার এর একটা বিহিৎ করুন । মেয়েমানুষের চোপা ! এই কে তোকে থানাতে আসতে বলেছে? যা এক্ষুনি । নাহলে এক্ষুনি তোকেও লক আপ এ 

ভর্তি করে দেব । সাধে কি আর বলে মেয়ে মানুষ ? মুখের কথা দেখ ? যেন খই ফুটছে । উঁহ ! দারোগা বলেন। গরিবের কি কেউ নেই ? আমি কি সাধে এখানে এয়েছি ?লক্ষী ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আমরা এখানে কুঞ্জ কে ছাডাতে এসেছি । আপনি ঘরে যান । সব ঠিক হয়ে যাবেযাচ্ছি যাচ্ছি । কে আর থানাতে আসে বাবু গরজ না পড়লে।লক্ষী গজরাতে গজরাতে থানা ছেড়ে চলে যায়।
দেখলেন স্যার দেখলেন এদের । এরা লাথির ভাষা বোঝে ভালো কথা বললে মাথায় চড়ে।
 কুঞ্জ র মনে হচ্ছিল গিয়ে ঠাস্ করে এক থাপ্পড মারে নিশিকান্ত কে । কিন্তু ওর হাত পা বাঁধাছিঃ শেষে কিনা থানাতে? লজ্যা ঘৄনাতে নিজেকে ছোট মনে হয়।কিন্তু মাস্টার মোসাই ? কি অভিসন্ধী এদের কে জানে ? বলা মুশকিল । বাডি গেলে যানতে পারব ? লক্ষী ত্ত বা কেমন? থানায় কখন মেয়েছেলে আসে ? সবাই কি ভাবল? 
কুঞ্জ বাড়ি ফিরল তার পরদিন মাষটার মোসাই ও ফিরে এলেন । মাষটার মোসাইএর এখানে কেউ থাকেন না ।উনি একাই এই গ্র।মে প্রায় বছর দশেক আছেন ।তিনি নিজে ছাত্রদের শিখিয়েছেন অন্যায়কে সহ্য করা এবং অন্যায় করা দুটই এক অপরাধ । অন্যায়কে প্রতিবাদ কর হিঁসা দিয়ে নয় যুক্তি দিয়ে । কুঞ্জ যেটা করল সেটা ভূল । সে ভূলের মাসুল তাকে দিতে হল। 
হাজৎ থেকে ছাডা পাওয়ার পর কুঞ্জ ঘরে ফিরে যায় । দু দিন হল খেত খামারের কাজ না হওয়াতে ফসলের ক্ষতি হতে পারে । আজকাল জা পোকার উৎপাত কন কিটনাশক ই কাজ করে না । গ্রামের গ্রাম সেভক যে কিটনাশক এর চিরকুট টা লিখে দিয়েছিলেন সেটা কিনে এনেছিল কিন্তু  স্প্রে করা হয়ে ওঠেনি । আজকে দেখা যাক ফসলের অবস্থা বুঝে স্প্রে করবে । রাস্তায় যেতে যেতে রুদ্রর জন্য ভাবে । ওকে এই গ্রাম থেকে সহরে পাঠিয়ে দেবে ওর কাকার কাছে । বলাবাহুল্য ভাইকে অনেক কষ্টে ডাক্তারি পড়াতে পেরেছে ।এখন সে মস্ত ডাক্তার . রুদ্র পডাসোনাতে ভালো তাই ওর সম্ভাবনা বেশি ডাক্তার হবার। ভাইএর ডাক্তারি পডার খরচ সামলাতে না পেরে কুঞ্জ জমি বন্ধক রাখে নিধিরাম বেনের কাছে । আজ সাত বছর হল সুধ গুনছে । এই সব চিন্তার সঙ্গে গোল ঘাঁট বেঁধে যায় ।   জমি তে গিয়ে যা কুঞ্জ দেখল সেটা ওকে আরো আঘাত করলো . ওর জমি মাপ জোপ হচ্ছে দেখে কুঞ্জ হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো আমিন কে.
আমিন : " নিধিরাম তার নামে জমি করিয়ে নিয়েছে ,এখন রেকর্ড তার নামে  তুই আপত্তি করিসনি কেন সেটেল্মেন্টেএ ? "
কুঞ্জ ঃ আমার কাছে কি কোন নোটিস এসেছে যে আমি আপত্তি করব ?
আমিনঃ নোটিস তো তোর নামে পাঠান হয়েছে তুই পাসনি ত আমরা কি করব?
কুঞ্জ ; মানে ? আমার জমি আমার বাপ দাদারআমলের ; নিধিরাম এর নামে কি করে হয় ?
আমিনঃ হয় হয় ! তুই কি আইন জানিস ? তোর ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেশ কর সব ঠিক করে বুঝে যাবি । ও বধ হয় সই করে দিয়েছে । কুঞ্জর মাথায় বজ্রাঘাত পড়লো যেন !কুঞ্জ বিশ্বাস করতে পারলনা? সেদিন রাত্রে
      কাছের সহরে টেলেফোনে বুথ থেকে কুঞ্জ টেলেফোনে করে । কিছুক্ষনরিংহওয়ার পর ওপার থেকে হ্যালো স্বর আসে . কুঞ্জ র ভাই এর কন্ঠ স্বর ভেসে আস.তুই কেমন আছিস রে নিতাই ? ভালো! ! কেন এত রাত্রে ? হ্যাঁরে নিতাই আমাদের জমির কোনো কাগজে কি তুই সই করেছিস ?আমাদের মানে ? ওটা কি একা তোমার নাকি ?আমার ভাগ আমি বেচে দিয়েছি। কাল অপারেসন আছে ঘুমতে দাও।কুঞ্জ আর নিজেকে সামলাতে পারলনা হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো । ফোনতার হাত থেকে পডে গেল । বাডিতে ফিরে এলো । যে কিটনাশক কিনে এনেছিল পোকা মারার জন্য সেটা সকলের অজান্তে খেয়ে দিল রাত্তিরে । কি হল ? কি হল ? লক্ষী, কুঞ্জকে বমি করতে দেখে ঘাবডে যায় । কি হল ? মাগো আমার সর্বনাশ হল গো । দৌড়ে যায় পাশের বাডিতে সুভ্র কে খবর দিতে । বলে মাষ্টার মোশাই কে খবর দিতে ডাক্তার কে ডাকার জন্য । এ গ্রামে ডাক্তার নেই আছে এক কম্পাউন্ডার, সেই সব রোগি দেখে আর অসুধ দেয় ।কম্পাউন্ডার এসে দেখেন মুখ থেকে গেঁজা বেরুচ্ছে । দেখে সন্দেহ হয়। এটাতো সুইসাইড কেস ।রুদ্রাখ সব দেখছিল শুনছিলকিছুই মুখ থেকে সব্দ না করে গুম হয়ে বসে ছিল । হঠাৎ বাবা যে  কাটারি টা নিয়ে নিশিকান্ত কে তাডা করেছিল সেটা নিয়ে দৌড়তে লাগলো । সবাই কে মেরে ফেলব । আমার বাবাকে আমায় ফিরিয়ে দাও নাহলে সকলকে মেরে ফেলব । আমার বাবাকে আমায় ফিরিয়ে দাও নাহলে সকলকে মেরে ফেলব । রুদ্রাক্ষ আর পরের দিন ফেরেনি কথায় গেল কেউ জানেনা । এরকম হাজার হাজার রুদ্রাক্ষ র জন্ম হচ্ছে এ দেশে এরকম হাজার হাজার কুঞ্জ দারীদ্রের কশা ঘাতে মৄত্যু কে স্বাগতম করতে বাধ্য হচ্ছে । থেকে জাচ্ছে কিছু নিশিকান্ত,নিতাই,নিধিরাম,পুলিশ দারোগা র মতন স্বার্থপর রক্ত শোষা মানুষ রুপি পসু । পরের দিন কাগজে বড বড করে বেরুলো হরিনারায়নপুর এ চাষী মৃত্যুএন জি ও, পত্রকার , বিরোধীনেতাদের শ্রোতছুটল । কেউ কি রুদ্রাক্ষর খোঁজ নিল? কেন কুঞ্জ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল? কি হবে লক্ষী র সিঁদুরের ? কেউ কি তার সোয়ামি কে ফেরাতে পারবে গা ? এ প্রশ্ন আপনাদের কাছে রাখলাম। পরের দিন সকালে কাগজে বড বড করে বেরুলো হরিনারায়নপুরে চাষী আত্মহত্যা । সামনে বিধান সভাতে গরমা গরম বিতর্কের জন্য। হা হুতাষ,সান্ত্বনার ফোয়ারা ছুটল। আসোল ঘটনা কেউ জানলোনা। কুঞ্জ কিসের জন্য আত্মহত্যা করেছে !!

**‘অন্যনিষাদে’ প্রকাশিত 

রবীন্দ্রনাথের কোনো বিকল্প নাই-




রবীন্দ্রনাথের কোনো বিকল্প নাই-
 রাজিব » ১৩ জুন, ২০১৩, বৃহঃবার, ২০:৪৪
·         ইতিহাস
রবীন্দ্রনাথের একটি আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল- সংলাপের আসরে বসে অনুরুদ্ধ হলে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে নূতন গল্প ও উপন্যাসের প্লট তৈরি করে দিতে পারতেন।বিস্মিত হতে হয় এই দেখে যে কত প্রথম সারির সাহিত্যিক কবির থেকে প্লট সংগ্রহ করেছেন তাঁদের গল্পের জন্য। এই সব প্লট থেকে জন্ম নিয়েছে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সব কীর্তি।প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের দেবীগল্পটি বহুপঠিত এবং সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের কল্যাণে বহু-আলোচিত। নব-কথা গল্পসংকলন-ভুক্ত এই গল্পটির প্লটও রবীন্দ্রনাথের রচনা। নব-কথা-র দ্বিতীয় সংস্করণে প্রভাতকুমার নিজেই সেকথা উল্লেখ করেন।বিখ্যাত সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের থেকে একটি প্লট পেয়েছিলেন। তিনি হলেন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় ওরফে বনফুল। নির্মোক-এর অমর নামক চরিত্রটি বনফুল সৃষ্টি করেছিলেন পত্রযোগে প্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথের এই প্লটটি অনুসরণে।
অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী শরৎকুমারী চৌধুরাণী ঠাকুরবাড়ির বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। শরৎকুমারীর সাহিত্যরচনার অনুরাগী ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও। এই শরৎকুমারীকে রবীন্দ্রনাথ একটি প্লট দিয়ে গল্প রচনা করতে অনুরোধ করেছিলেন। পাঁচ-সাত দিনের মধ্যেই শরৎকুমারী সেই প্লট অবলম্বনে লিখে ফেলেন তাঁর যৌতুকগল্পটি। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ সেকথা জানতেন না। একই প্লট তিনি চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দেন। চারুচন্দ্র সেই প্লট অবলম্বনে লেখেন চাঁদির জুতোগল্পটি, যেটি স্থান পায় তাঁর বরণডালা গল্পসংকলনে।হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা থেকে জানা যায়, “বন্ধুবর চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ঐভাবে রবীন্দ্রনাথের মুখে মুখে সৃষ্ট কয়েকটি আখ্যানবস্তুর সদ্ব্যবহার করতে পেরেছিলেন।চারুচন্দ্রের চারটি উপন্যাসের প্লট রবীন্দ্রনাথের থেকে পাওয়া স্রোতের ফুল, দুই তার, হেরফের ও ধোঁকার টাটি।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চমৎকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল অনেক দিন। শেষের দিকে তা একেবারে বিষিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে ঈর্ষার করার কোনও কারণই নেই দ্বিজেন্দ্রলালের। তাঁর জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাননি। তাঁর সুনাম বাংলার বাইরে ছড়ায়নি। দুজনেই কবি। দুজনেই গান সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথও নাটক লেখেন, কিন্তু নাট্যকার হিসাবে দ্বিজেন্দ্রলাল অনেক বেশি জনপ্রিয়। দুজনেই অভিজাত পরিবারের সন্তান।সারা জীবনে রবীন্দ্রনাথ কখনও নিন্দুকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাননি। কোনও আক্রমণেরই তিনি প্রতিআক্রমণ-অস্ত্র শানাননি। তা বলে কি তিনি আঘাত পেতেন না? সামান্যতম আক্রমণেই তিনি আহত হতেন। তিনি লিখেছেন, কটাক্ষ যতই ক্ষুদ্র হইক, তাহারও বিদ্ধ করিবার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই সব আঘাতের কথা তিনি অতি সন্তর্পণে গোপন রেখেছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল যখন থেকে রবীদ্র-বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন, তখনও একাধিকবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রশংসা করেছেন।
একধিক প্রবন্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি যে দুটি অভিযোগ এনেছেন, তা হল দুর্বোধ্যতা এবং অশ্লীলতা। দ্বিজেন্দ্রলালের মতে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা অস্পষ্ট এবং অস্বচ্ছ। তাই তার মধ্যে চিন্তার গভীরতা নেই। আর তাঁর কবিতার নীতিহীনতা দিয়ে তিনি কলুষিত করছেন এই সমাজকে। দুই কবির মধ্যে নীতিগত বিরুদ্ধ মত থাকতেই পারে। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলালের সেই প্রতিবাদের ভাষাই যে কুৎসিত।সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন যে, দ্বিজেন্দ্রলাল একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রতি একটি চিঠি লেখায় ব্যস্ত ছিলেন, একটু পরেই তাঁর মাথায় বজ্রাঘাত হয়। স্ত্রীলোকেরা তাঁর মাথায় ঘড়া ঘড়া জল ঢালতে থাকেন, তাতে সব কাগজপত্র ভিজে যায়। একটি চিঠিতে শুধু রবীন্দ্রনাথের নামটি পড়া যাচ্ছিল। তাতেই অনুমান করা যায় যে, দ্বিজেন্দ্রলাল সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সব বিবাদ মিটিয়ে আবার পুনর্মিলনের আশাই ব্যক্ত করেছিলেন।
কবি জেনেছেন সুশাসনের জন্য চাই দেশজ ভাবনা। দেশের তরুণ সমাজকে এ কারণে করেছেন উদ্বুদ্ধ। শাণিত করতে চেয়েছেন তাদের কর্মক্ষমতা। বুঝিয়েছিলেন আধুনিক বা সভ্য হওয়ার জন্য ইউরোপীয় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বলেছেন, ”দেশের জন্য স্বাধীন শক্তিতে যতটুকু কাজ নিজে করিতে পারি তাহাতে দুই দিকে লাভ, সেটা ফল লাভের চেয়ে বেশি বৈ কম নয়।তিনি মনুষ্যত্বের ধারণা, সংস্কৃতির বার্তা যুবসমাজের কাছে পৌঁছে দিতে স্থাপন করেছেন শান্তিনিকেতন। কারণ তিনি জানতেন যে, সামরাজ্যবাদী ইংরেজ সরকার কর্তৃক শিক্ষার আলো ছাত্রদের কাছে পৌঁছবে না। তাই তিনি দেশে বিদেশে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন।সৃষ্টির স্রোতধারা প্রবাহিত হয় দুই খাতে। কখনও সেই খাত স্রষ্টাই খনন করেন। আবার কখনও তিনি মরা নদীর সোঁতায় সৃষ্টিস্রোতের নতুন প্লাবন আনেন। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিপ্রতিভার নেপথ্যেও এমন কিছু কিছু মরা নদীর সোঁতা ছিল।
১৬ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ বিলাতে অবস্থানরত জগদীশচন্দ্র বসুকে যে চিঠি লিখলেন, তাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক প্রস্ত চর্চা করে শেষ দিকটাতে লিখলেন : 'একটা খবর তোমাদের দেওয়া হয় নাই। হঠাৎ আমার মধ্যমা কন্যা রেণুকার বিবাহ হইয়া গেছে। একটি ডাক্তার বলিল, বিবাহ করিব_আমি বলিলাম কর। যেদিন কথা তার তিন দিন পরেই বিবাহ সমাধা হইয়া গেল। এখন ছেলেটি তাহার অ্যালোপ্যাথিক ডিগ্রির ওপর হোমিওপ্যাথিক চূড়া চড়াইবার জন্য অ্যামেরিকা রওয়ানা হইতেছে। বেশি দিন সেখানে থাকিতে হইবে না। ছেলেটি ভালো, বিনয়ী ও কৃর্তী।'

আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে-
রাখিয়া জ্বালি আলো।
তুমি তো ভালোবেসে আজি একাকী শুধু আমারে
বসিতে হবে ভালো।
আমার রাত্রি তোমার আর হবে না কভু সাজিতে
তোমার লাগি আমি
এখন হতে হৃদয় খানি সাজায়ে কুল রাজিতে
রাখিব দিনযামী।