Sunday, October 14, 2018

ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী আমার হিয়ার মাঝে



     

ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী

আমার হিয়ার মাঝে 
  
কদিন ধরেই বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশে ঘন মেঘ। মাঝে মাঝেই বৃষ্টি ঝম ঝমিয়ে পড়ছে।  আজ ঈপ্সিতা কমলেশ এর এক বিশেষ দিন। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। কমলেশ অফিস থেকে ফেরার পথে একটা ফুলের তোড়া আর তার প্রাণের অধিক ঈপ্সিতার জন্য বিষ্ণুপুর সিল্কের শাড়ি নিয়ে কোনমতে নৈহাটি লোকালে উঠে পড়ে। বেলঘরিয়া ষ্টেশন আসতেই নেমে পড়ে। গাড়ি প্ল্যাটফর্মে নামতেই এক রাশ লোক ঝড়ের বেগে নেমে পড়ে।  
কমলেশ হাতের ব্যাগটা শক্ত হাতে চেপে ধরে কারন তাতে ঈপ্সিতার জন্য শাড়িটা যত্ন করে রাখা। ফুলের তোড়াটা কি করবে ভাবতে যাচ্ছিল হটাৎ পেছন থেকে কে ঠ্যালা দেয়। 
কমলেশ চিৎকার করে ওঠে। কি অসভ্য লোক রে বাবা। মানুষকে এরকম ভাবে কেউ ঠ্যালা দেয় !
- লোকাল ট্রেনে কি প্রথম উঠছেন দাদা ? পেছন থেকে বিদ্রূপের কণ্ঠস্বর শুনে ওর মাথা গরম হয়ে যায়. 
- না আমি রোজকার যাত্রী। তবে এত বাজে অসভ্য লোক দেখতে অভ্যস্ত নই। 
- কাকে অসভ্য বলছেন ? ভিড় ঠেলে মানুষ কোন মতে এগুচ্ছে তার মধ্যে আপনি ফুলের তোড়া নিয়ে ঢুকে মানুষকে অসভ্য বলছেন ! আপনি নিজেকে কি ভাবেন বলুন ত ! অতো ফুলের সখ থাকলে ট্যাক্সিতে চড়ে ফুলের তোড়া নিয়ে আসলেই পারতেন । 
- আমি কিসে যাবো কিসে না যাবো সেটা কি আপনি ঠিক করবেন ? এই বলে কমলেশ নেমে পড়ে। না সে হাতিবাগান থেকে ফুলের তোড়াটা না কিনলেই পারত। বেলঘরিয়া স্টেশন এর কাছে কোন ফ্লোরিষ্টের দোকান থেকে  কিনে নিয়ে গেলে কি হত না ! ভুলটা  তার ই হয়েছে। কথাগুলো মনে মনে ভাবতে ভাবতে কখন বাড়ি এসে গিয়েছে খেয়াল করেনি।
ঘরে ঢুকেই ঈপ্সিতাকে জড়িয়ে ধরে বলে বিবাহ বার্ষিকীর অনেক অনেক ভালোবাসা।    আমি সত্যি তোমাকে পেয়ে ধন্য। 
তুমি ছাড়া আমার নেই কোন পণ্য ।
তুমি আমার অরণ্য । 
তুমি করেছ মোরে বণ্য ।  
- ঈপ্সিতা নিজেকে কমলেশের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে , কি আমি পণ্য ? মানে কমোডিটি ! তোমার এই  ঢং ন্যাকামি আমার আর ভালো লাগেনা। চল হাত মুখ ধুয়ে এক কাপ চা খাও। আমিও তোমার জন্য বসে আছি কখন আসবে বলে !   
- ট্রেনের ঘটনাটা বলল না কমলেশ। ফুল ঈপ্সিতা খুব ভালো বাসে তাই বাছাই করা কাট ফ্লাওয়ার এর তোড়াটা কিনেছিল। সেটা যে ট্রেনের যাত্রীদের পদপিষ্ট হয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেটা বলা হয়নি। তাছাড়া সত্যি বলতে পকেটে আর টাকা ছিলনা নতুন ফুলের তোড়া কেনার। তাই শুধু বিষ্ণুপুর সিল্কের শাড়িটাই ঈপ্সিতাকে বিবাহ বার্ষিকীর উপহার হিসেবে প্রদান করে কিছুটা ধাতস্থ হল।  কেমন হয়েছে শাড়িটা পরে দেখত !
- এখন নয়। তুমি এত দাম দিয়ে শাড়ি কিনলে কেন গো?
 - আহা আমার সোহাগি ! কি করে না কিনি। বছরে এই দিনটার জন্য বসে থাকো। কি  উপহার আমি দিলাম তা নিয়ে একটু কটু মন্তব্য করবে । তবে এবারে তোমার জন্য ফুল আনা হলনা। মনটা খারাপ । 
- তাতে কি হয়েছে , এত দামি শাড়িত এনেছ। এই যথেষ্ট । 
- বলছ ! তবে আমার পাওনাটা দাও।
- যাহ ! 
এখানে বলে রাখি কমলেশ ঈপ্সিতার পাঁচ বছর বিয়ে হয়েছে কিন্তু ঈপ্সিতা সন্তান দিতে পারেনি কমলেশ কে । এই নিয়ে কমলেশের মনে কোন কষ্ট নেই কিন্তু  ঈপ্সিতার মনে কষ্ট আছে। সে নিজেকে অপরাধী মনে করে । অনেক ডাক্তার দেখান হয়েছে কারুর কোন দোষ ত্রুটি নেই বিভিন্ন টেস্ট এর ফলাফল যা বলছে। কমলেশ  এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না । এইতো বেশ আছি । কোন বন্ধন নেই। এই ভাবেই কেটে যাক না দিন গুলো।
ঈপ্সিতার মা মাসি নানা টোটকা করেন ফল কিছুই হয় না। ঈপ্সিতার একটি সন্তান থাকলে তার সময় কেটে যেত। সারাদিন টুক টাক কাজ নিয়ে থাকে।গান করে, ছবি আঁকে , সেলাই করে। ঘরের সমস্ত কাজ গুছিয়ে করে। সারা ঘর ঝক ঝক করে। রান্নাও ভালো করে। 
আজ কমলেশের জন্য ইলিশ পাতুরী, কসা মাংস, ফ্রাএড রাইস, পনির টিক্কা, চাটনি, পায়েস, সংগে কমলেশ কাল যে মিষ্টি এনে রেখেছিল ফ্রিজে । সব সুন্দর করে টেবিলে সাজিয়ে দেয়।  কমলেশ হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে। ট্রেনের কথা বলেনা। তবে ফুলের  তোড়াটা ট্রেনে পড়ে যাত্রীদের পদপিষ্টে নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে হাঁফ ছাড়ে।  
ঈপ্সিতা কথাটা শুনে বিব্রত হয়। 
- তোমার কিছু হয়নি ত ! 
- না আমার আবার কি হবে?
ঈপ্সিতা কমলেশকে খুব যত্ন করে খেতে দেয়।  কমলেশ পরিতৃপ্ত নয়নে ঈপ্সিতাকে দেখে ভাবে সত্যি তার বউ ভাগ্যটা ভালো। আসলে পুরুষ মানুষের মন জয় করতে হলে ভালো  রান্না র প্রয়োজন। ঈপ্সিতা সে বিষয় পটু।  
সারাদিনের খাটুনিতে কমলেশ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।  
ঈপ্সিতা তার মাথায় বিলি কেটে বলে এতই ঘুম!
- হ্যাঁ। খুব ঘুম পাচ্ছে।  
কিছুক্ষণের মধ্যেই নাসিকা গর্জন। 
বেল্কনিতে ঈপ্সিতা বসে একটা রবীন্দ্র সংগীত গাইল. 

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাই নি।

হটাৎ ওর পিঠে কার হাতের স্পর্শ পেল। 
পেছন ফিরে তাকাতেই ‘কমলেশ’ দেখে বলে.... ও তুমি!  
কমলেশ ঈপ্সিতার গানে মুগ্ধ। 

                     ২

কমলেশ ঈপ্সিতার দিনগুলো ভালোই কাটছিল । এরমধ্যে ঈপ্সিতার পীড়াপীড়িতে কমলেশ এক কন্যা সন্তানকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । ঘটনাটা এইরকম ঈপ্সিতার বাড়ির পরিচারিকা (লক্ষ্মীর) তৃতীয় কন্যা সন্তান হওয়াতে তার মাতাল স্বামী নাকি সেই শিশু কন্যা সন্তানটিকে বাড়ির দোতালার ছাদ থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার সময় লক্ষ্মী মাতাল স্বামীর হাত থেকে তার কন্যাটিকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঈপ্সিতার বাড়ি চলে আসে। ঈপ্সিতার পায়ে পড়ে সকল ঘটনার বৃত্তান্ত দেয়। ঈপ্সিতা শুনে তৎক্ষণাৎ থানাতে যাওয়ার হুমকি দেয় কিন্তু লক্ষ্মীর অনুরোধে ব্যাপারটা ধামা চাপা পড়ে যায়। সেইসময় ঈপ্সিতা লক্ষ্মীকে  দিয়ে সর্ত করিয়ে নেয় যে, সে কন্যা সন্তানটিকে লালন পালন করবে কিন্তু লক্ষ্মী যেন তার এই মেয়েটিকে পরে দাবি না করে। আইনত দত্তক নিলে সেই ব্যবস্থাই থাকে যাতে পালিত পিতা মাতার কোন আইনগত সমস্যা পরে না হয়। যেমন বলা সেইরকম কাজ । লক্ষ্মীর স্বামী , লক্ষ্মী এবং ঈপ্সিতা , কমলেশ সকলে কোর্টে কন্যা সন্তানটিকে দত্তক নেয় । কোর্ট কমলেশ ঈপ্সিতার হাতে কন্যাটিকে প্রদান করে নানা আইনি কাগজ পত্র সই সবুদের পর । এখন আর কোন সমস্যা নেই । ঈপ্সিতা কন্যাটি পেয়ে খুব খুশি । তার মা হওয়ার সাধ লক্ষ্মীর মেয়ে পূর্ণ করে । সে এখন মা ।  
লক্ষ্মী ওই বাড়িতেই সারা দিন কাজ করে। তার মেয়েটির মাতৃ স্নেহের অভাব হয়না ।  যেন দেবকী ,যশোদা  দুই মাতার সান্নিধ্যে মেয়েটি ক্রমে বড় হতে লাগে। খুব আহ্লাদী তাই তার নাম ‘আহ্লাদী’ দেয় ঈপ্সিতা। লক্ষ্মীও খুশি ওই নামে । আহ্লাদীর ছয় মাসে অন্নপ্রাশন হয় ঘটা করে। সত্য নারায়ণ পুজো হোম ইত্যাদি হয়। আত্মীয় স্বজন সকলেই আসে । কিন্তু ঈপ্সিতার মা এই পরের মেয়ের তাও পরিচারিকার মেয়ের ঘটা করে অন্নপ্রাশন একদম ই পছন্দ করেন না। ঈপ্সিতা ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় সামাল দেয়। 
কমলেশ , ঈপ্সিতার খুশীতেই খুশী তাই সে এসব বিষয় মাথা ঘামায় না।  
আহ্লাদীর তিন বছর  স্কুলে ভর্তি হয় । স্কুলের ড্রেসে তাকে বেশ ফুট ফুটে দেখায়। লক্ষ্মীর চক্ষে আনন্দাশ্রু । সে পরিতৃপ্ত নয়নে আহ্লাদীকে দেখে দুহাত ভরে আশীর্বাদ করে। আহ্লাদী লক্ষ্মীর চেয়ে ঈপ্সিতাকে বেশি পছন্দ করে। কিন্তু লক্মী যে মা , সে তার জননী তার স্নেহ উপচে পড়ে আহ্লাদীর ওপর। স্কুলে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা সব লক্ষ্মী করে। তার টিফিন বাক্স গোছান , জামা কাপড় কাচা ,ইস্ত্রী করা ইত্যাদি সব কাজ । সে জানে এখানে তার কন্যাটি সযত্নে আছে এবং থাকবে ।  
আহ্লাদীর চার বছর পূর্ণ হয়ে গেল এর মধ্যে। পাঁচে পা দেওয়াতে তার ঘটা করে জন্মদিন পালন করা হল। লক্ষ্মী সব দেখে শান্তির নিঃশ্বাস নেয় । মনে মনে ভাবে সে নিশ্চিন্ত তার মেয়ের ব্যাপারে । ভালো ঘরে মেয়েটি মানুষ হচ্ছে পড়াশুনো করছে এর চেয়ে আর কি বেশি চায় । ভগবান ওকে সুস্থ সবল রাখুক সেটাই তার এক মাত্র ভগবানের কাছে প্রার্থনা ।

Saturday, September 15, 2018

অণু গল্প ভালোবাসার টান ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী ১৪.০৯.২০১৮


  http://galpogucchho.blog.in
  গল্পগুচ্ছ ব্লগ
 
এই গল্পে যে ভালোবাসার কথা উল্লেখ আছে সেটা মনের ভালোবাসা । 
     
 ভালোবাসার টান
   ত্রিভুবন জিৎ  মুখার্জী    

পরিমল বাবু র বাড়িতে নতুন বৌমা আসার পর পরিমল বাবুর আনন্দের সীমা নেই. নিজে দেখে বৌমাকে এনেছেন ঘরের লক্ষ্মী করে, তাই উনি বৌমাকে নিজের মেয়ের-চেয়েও বেশি স্নেহ করেন।    
বৌমা যেমন দেখতে সুন্দর সেইরকম গানের গলা  ।  পরিমল বাবু এমনিতেই রবীন্দ্র সংগীতের ভক্ত তাই বৌমার গলায় প্রায় ছুটির দিন বৈঠক খানায় গানের আসর বসে।
বৌমা , ওনার মেয়ে স্মিতা, নাতনি সব্বাই একে একে গান করে পরিমল বাবুর মন ভরিয়ে দেন।  
সেদিন গিন্নী চা, জলখাবার সব সাপ্লাই করেন রান্না ঘর থেকে।
কেষ্টা (পইমল বাবুর ঘরের ভৃত্য) সবাইকে চা জলখাবার দিয়ে মনের আনন্দে গান শোনে।
- সেও মাঝে মাঝে বলে জগন্নাথের জণাণ (উড়িয়ায় ভজন) শোনাতে. বলে সালবেগের জণাণ  গাওনা দিদি. - ওরা বলে তুই একটু গেয়ে শোনা বলে হেঁসে গড়ায়.
- না দিদিমণি ঠাট্টা নয়. তোমরা সালবেগের জগন্নাথের ভজন শুনলে মোহিত হয়ে যাবে.
- ও তাই ! তা বেশ !! তা তুই মোহিত হয়ে যা। আমরা তোর গান শুনি না হয়। বলে সকলে হাঁসে । কেষ্টা জানে এরা থাট্টা করছে ওকে নিয়ে । কিন্তু সে জানে সালবেগের ভজন খুব সুন্দর ।
মা রান্না ঘর থেকে ডাকেন কেষ্টাকে।
যাই মা বলে কেষ্টা দৌড়োয়।  
পরিমল বাবুর সংসারে সকলের মুখে হাঁসি. যে যার কাজ মন দিয়ে করে.
সকাল সকাল পরিমল বাবু গঙ্গায় স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে  ঢোকেন. এক ঘণ্টা পরে ঠাকুর ঘর থেকে পুজো সেরে বের হন.এরপর কেষ্টা,  বাবুর জল খাবার আনে খাবার টেবিলে.
জলখাবার খেয়ে বাবু উঠে যান হাত ধুতে। ওয়াশ  বেসিনে হাত ধুয়ে তোয়ালেতে হাত পুঁছতেই কেষ্টা,  বাবুর হাতে পান দেয় ।
- বাবু বলেন তোর মা কোথায়?
- মা রান্না করছেন.আমাকে দিতে বললেন ।
- হুঁ... ওকে গাড়ির চাবিটা আর পোর্ট ফলিও ব্যাগ নিয়ে আস্তে বলেন.  কেষ্টা সঙ্গে সঙ্গে হুকুম  তামিল করে।
পরিমল বাবু নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করেন। গাড়ি ড্রাইভ করে অফিস চলে গেলেন ।
রোজকার মতন খাবার টেবিলে দুটো পরটা আর তরকারি ফেলে গেলেন । বাড়িতে ব্রেকফাস্ট করেন কিন্তু  লাঞ্চ অফিসেই করেন।
-গিন্নী ঘরে এসে খাবার টেবিল দেখে বলেন একি আজকেও খাবার ফেলে অফিস বেরিয়ে গেলেন।
খাবার প্লেট টা নিয়ে নিজেই পরটা দুটো খেয়ে নিলেন।
বৌমা সব দেখল কিন্তু মুখে কিছুই বলল না।
পরিমল বাবুর ছোট ছেলে শুভ ভালো করে পাস করলে ওর বাবা ওকে মটর সাইকেল কিনে দেবেন বলেছিলেন।   সে এবারে বেশ ভালোই রেজাল্ট করেছে। তাই তার বাবা কাল মটর সাইকেল কিনে দেবেন বলেছেন। কিন্তু শুভ কাল থাকবেনা.বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে যাবে। কোথায় যাবে কেউ জানেনা।
- বউদি,  হ্যাঁ রে শুভ পিকনিকে না বান্ধবীর বাড়ি কোথায় বলত?
- যাঃ  কি যে বলনা বৌদি  !
- তাই ! জানি জানি সব জানি !!
- কি জানো শুনি ?
- বলব কেন !  
- তাহলে কিছুই জাননা।
- তবে তাই!!
পরের দিন বাবা বলেন শুভ আজ যাবি নাকি বাইক কিনতে? 
- না বাবা.আজ আমি পিকনিকে যাব।
- তবে কাল কিনব।  
- ঠিক আছে বাবা আজ যাই তবে!
 - মাকে বলে যাও।  
- আচ্ছা বাবা।
- এরমধ্যে বৌদি চলে এলেন। কোথায় চললে শুভ? খুব ত পারফিউমের সুগন্ধ।  কি ব্যাপার ?
-  আজ ফেব্রুয়ারি মাসের কত তারিখ?
- ১৪ তারিখ।  ও মা ! তাইত! ভ্যালেন্টাইন ডে ! ভুলেই গিয়েছিলাম।
বাবা রোজকার মতন অফিস ফিরে কাপড় জামা ছাড়ছিলেন এই সময় বৌমা  সামনে তোয়ালে নিয়ে বাবার হাতে দিয়ে বলল,  বাবা আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব !
- কি বল মা !
- আপনি রোজ খাবার টেবিলে জল খাবার ছেড়েদিয়ে যান কেন বাবা ? মা খুব বিরক্ত হন।  
- ও এই কথা। বলে হাঁসতে সুরু করেন।  পরে বলেন  কেন তোমার শাশুড়ি মা খান নি ?
- হ্যাঁ খেয়েছেন কিন্তু গজ গজ করে ওগুলো খেয়েছেন।
- কি বলেছেন তোমার শাশুড়ি মা বলত ?
- বলেছেন প্রত্যেক দিন এই উচ্ছিষ্ট আমাকেই খেতে হয়। খাবার আমি নষ্ট করা পছন্দ করিনা তাই ফেলতেও পারিনা । এদিকে গিলতেও পারিনা । আমার হয়েছে যত জ্বালা !
- তাই ! তা তুমি কি বললে  মা’কে?  
- কি আবার বলব?  আমি ভাবলাম আপনি অফিস থেকে ফিরলে বলব।  
-  বাবা রোজ খাবার ফেলে যান কেন ?
- পরিমল বাবুর চোখে জল। তিনি বলেন আজ দু বছর আগে তোমার শাশুড়ি মা শয্যাশায়ী ছিলেন। গল স্টোন অপারেশন হয়েছিল।  ডাক্তার বলেছিলেন উপোষ তাপাস  না করতে ! কে কার কথা শোনে মা ! সেই বেলা দুটো বাজলে খাবেন আবার নিজের শরীরের ওপর অত্যাচার। তাই আমি খাবার ফেলে যাই। আমি জানি উনি ওই খাবার না ফেলে নিজেই খাবেন। এই বলে বৌমা  মুখের দিকে তাকিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে বললেন , আমি কি ভুল করছি মা?  
বৌমা এই অতভুত ভ্যালেন্টাইন ডে র কাণ্ড দেখে মনে মনে ভাবে এও এক নতুন ভালোবাসার  টান  !!!! 


Thursday, August 30, 2018

আমার প্রথম বাংলা গল্পের বই ২৩ শে অগস্ট ২০১৮ প্রকাশ পেল.প্রকাশক প্রিয় শিল্প প্রকাশন,জাদবপুর,কোলকাতা.



 আমার প্রথম বাংলা গল্পের বই ২৩ শে অগস্ট ২০১৮ প্রকাশ পেল.প্রকাশক প্রিয় শিল্প প্রকাশন,জাদবপুর,কোলকাতা. 
ঋতবাক, দেশ পাক্ষিক পত্রিকা,শব্দের মিছিল, আন্যদেশ,গল্পগুচ্ছে আমার কিছু লেখা ক্ষুদ্র গল্প এবং অণু গল্প ক্রমাগত 
প্রকাশ পেয়েছিল. আপনাদের শুভেচ্ছা এবং আশীর্বাদ কাম্য.ধন্যবাদ.
ত্রিভুবন জিত মুখার্জী. ৩০.০৮.২০১৮.



Sunday, July 22, 2018

বক্র মহাভারত



  
দুর্যোধন বেশ শান্তিতেই ছিল । খাওয়া দাওয়া , সুখ নিদ্রা, মনিবের আদর খাওয়া , মাঝে মাঝে এদিক সেদিক বেড়ানো সব ঠিকই চলছিল । হঠাৎ করে সেই শান্তিতে বিঘ্ন ঘটল । বিঘ্নের কারণ দ্রৌপদী । কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল যে দুর্যোধনের কপালে ভাজ পড়ে গেল ।
একটু খোলসা করে বলি । দুর্যোধন হল একটি কুকুর । শুদ্ধ ভাষায় সারমেয় । তবে দেশি । অবস্থান লোটাসপুরের রতনবাবুর বাড়ীতে । ছোটবেলা থেকেই এখানে আছে । রতনবাবুর গিন্নী ওকে বেশ আদর যত্নেই রেখেছেন । খাওয়া দাওয়া আর ঘুম ছাড়া বিশেষ কাজ নেই । মাঝে মাঝে গরু-ছাগল দেখে ঘেউ ঘেউ করা, আর মেঘ ডাকলে বা পটকা ফুটলে খাটের তলায় সেদিয়ে যাওয়া , এই মোটামোটি রুটিন । দেশি কুকুর, তায় সমস্ত পাড়ার মুখ চেনা তাই বেল্ট লাগাবার বালাই নেই ।  পাড়ার প্রায় সবাই ওকে আদর করে, কেউ বিস্কুট, কেউ ভাত-রুটি ডেকে ডেকে খেতে দেয় । তাই এতদিন বেশ ভালই দিন কাটছিল ।
কিন্তু হঠাৎ পাড়ায় একটা বাচ্চা মেয়ে কুকুরের আবির্ভাব হল । বাচ্চা দেখে প্রথমে সবাই অল্প আদর-যত্ন করল ।  দুর্যোধনও ওকে আদর করল । গিন্নীমার বাহবা পাওয়ার জন্য ও বাচ্চাটাকে গিন্নীমার কাছে নিয়ে এল । বাচ্চাটা দুর্যোধনের পেছন পেছন গিয়ে রতনবাবুর গিন্নীর কাছে গিয়ে হাজির হল । রতনবাবুর গিন্নী করুণাময়ী এবং দয়াময়ী  । উনি বাচ্চাটাকে খেতে দিলেন । খাওয়া আর আদর পেয়ে সেটা সেখানেই থেকে গেল । গিন্নীমায়ের পেছন পেছন ঘোরা শুরু করল ।
দুর্যোধন ভেবেছিল কোন দূরদেশ থেকে কেউ লুকিয়ে একটা বাচ্চা কুকুরকে ওর বাড়ীর সামনে রেখে গেছে । ভয়ে আর খিদেয় কুঁই কুঁই করে কাঁদছে, তাই একবার গিন্নীমার কাছে নিয়ে ইন্ট্রোডাকশন্ করিয়ে কিছু খাইয়ে বিদায় করে দিলেই হবে । গিন্নীমা প্রথমে খাইয়ে অল্প আদর করতেই ওটা গিন্নীমার পা চাটা শুরু করে দিল । এসেছিল সকালের দিকে, সন্ধ্যার মধ্যে কুঁই কুঁই করে আর পা চেটে চেটে ও গিন্নীমার মন গলিয়ে ফেলল । শীতের রাত, ওকে কোথায় রাখা যায়  গিন্নীমা চিন্তায় পড়লেন । পরে একটা পুরোণো গরম কাপড় দিয়ে একটা চলনসই বিছানা বানিয়ে তাকে রাখা হল ।
ব্যাপারটা দুর্যোধনের পছন্দ হল না । খাইয়েছ, আদর করেছ, এবার বিদেয় কর । তাই না ও নিয়ে এসেছিল । কিন্তু এতো দেখি উড়ে এসে জুড়ে বসল ! এতো আদিখ্যেতা কিসের ?  ওর পছন্দ হল না । দুর্যোধন গরম হয়ে অল্প গর-গর করল। সেটাকে আদর করতে করতে গিন্নীমা দুর্যোধনকে বললেন, ‘কিরে দুর্যু, তোর কি ওকে দেখে হিংসে হয়েছে?’ এটা থাকলেই তো খাবারে ভাগ বসাবে, আদরে ভাগ বসাবে । আসুক কাকুমনি, উনিই ভাগাবেন । দুর্যোধন মনে মনে বলল । কাকুমনি মানে রতনবাবু , ঘরের মালিক আর গিন্নীমার ইয়ে মানে কর্তা না কি যেন ।
কিন্তু আজ ওর ভাগ্যটাই খারাপ । রাতে কাকুমনি কাকে যেন দাবা খেলায় হারিয়ে বাড়ী ফিরলেন । মনটা বেশ হালকা ফুরফুরে । গিন্নীমা ডেকে দেখালেন, ‘দেখে যাও ।‘ কাকুমনি গিয়ে কাপড়ের ভেতরে পুচকুটাকে দেখে বললেন, ‘এটা কোথা থেকে এলো ?’ ‘কেউ হয়তো ছেড়ে গেছে । এত মিষ্টি মুখটা, দেখ দেখ ।‘  ‘বাঃ, বেশ আদর আদর তো । পিট পিট করে দেখছে ।‘  ‘এদিকে দুর্যুর হিংসে হয়েছে । রাগে গর্ গর্ করছে ।‘  ‘ঠিক নাকি ? তাহলে এর নাম দ্রৌপদী রেখে দাও । দুর্যোধন যেমন দ্রৌপদীকে হিংসে করত ।‘  হে ভগবান আজই তুমি কাকুমনিকে দাবায় জেতালে ! হারলে তো এক্ষুণি ঘর থেকে বের করে দিত ।
যাই হোক, দ্রৌপদী রতনবাবুর বাড়ীতে থেকে গেল । এখন খাওয়াটা দু’ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়, যদিও পরিমান যথেষ্টই থাকে । কিন্তু আদরটা দু’ভাগে ভাগ হওয়াটাই বেশী মনে লাগে । আগে এই আদরের একছত্র অধিকারী ছিল দুর্যোধন, এখন দ্রৌপদীও আদর পাওয়া শুরু করেছে । যখন দ্রৌপদীকে গিন্নীমা ‘দ্রুপী-দ্রুপী’  বলে ডাকে আর দ্রৌপদী লেজ নেড়ে নেড়ে দৌড়ে যায়, তখন দুর্যোধনের বুক ফেটে যায় । কিছু বলাও যায় না । ঘ্যাক্ করলে গিন্নীমা বলেন, ‘তোর এতো হিংসে কেন রে দুর্যু । তোকে কি আদর কম করছি ? ‘ কে সেই জ্বালা বুঝবে ?
তবে দুর্যু দ্রুপীকে বলে দিয়েছে, গিন্নীমা তোকে আহ্লাদ করছে, তুই সেখানেই থাকবি । আমার কাছে ঘুর ঘুর করবি না । তোকে আমি দেখতে পারি না । দ্রুপী মনে মনে কষ্ট পেয়েছে তবে মুখে কিছু বলেনি । তবে চেষ্টা চালাচ্ছে দুর্যুর মন পাওয়ার । সেদিন দ্রুপী একটা মরা মুরগী পেল । মুখে করে নিয়ে এসে দুর্যুকে দিল, ‘খেয়ে নে, তোর জন্য এনেছি ।‘ দ্রুপী দুর্যুকে পটাবার চেষ্টা করল । ‘ হুঃ ।‘ দুর্যু খাওয়া শুরু করল । কিন্তু দ্রুপীকে কোন ধন্যবাদ দিল না । এমন একটা ঘ্যাম ভাব করে রাখল যে ওকে সেবা করা দ্রুপীর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে । খাওয়া শেষ করে দুর্যু নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ।
দিন যায় মাস যায় দ্রুপী আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে । কবে যে বাচ্চা থেকে কিশোরী হয়ে  যুবতী হয়ে গেল দুর্যুর চোখেই পড়ল না । দুর্যু দ্রুপীকে তেমন পাত্তা দেয় না, দ্রুপী তবুও ওর মন পাওয়ার চেষ্টায় থাকে । তবে রতনবাবু আর গিন্নীমা দু’জনকেই সমান আদর করেন ।
এক সকালে বাইরের একটা ছোট কুকুর এসে রতনবাবুর বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক দেখল । দুর্যোধন হাক লাগলো , ‘এই তুই কে রে ?’ ‘আমি সহদেব ।‘ ‘এখনে কি লাগে ?’ ‘এখানে একটা মেয়েকে দেখলাম মনে হলো –‘ ‘তাতে তোর কি ?’  ‘সে সব বলা যাবে না ।‘  ‘ফুট এখান থেকে ।‘ সহদেব ধমক খেয়ে চলে গেল ।
পরেরদিন সহদেবের সাথে আরেকটি কুকুর এলো । এবার দু’জন মিলে  রতনবাবুর ঘরের আশেপাশে শুঁকতে লাগল । তখন দ্রুপী বাড়ীর ভেতর থেকে সামনের রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ালো । তাকে দেখে ওরা দু’জন এগিয়ে এলো । ‘ও-  তোমার খবরই পেয়েছিলাম । তোমার নাম কি ?’  ‘আমি দ্রৌপদী, তোমরা কারা ?’   ‘আমরা নকুল আর সহদেব । দাদা এই সিজনের বিয়ে করবে, তাই পাত্রী সন্ধানে পাঠিয়েছে ।‘  ‘কি নাম তোমাদের দাদার ?’  ‘যুধিষ্ঠির ।‘  এমন সময় দুর্যুর নজর এদিকে পড়ল । ও হৈ হৈ করে এগিয়ে এলো । ‘এই, তোদের এখানে কি লাগেরে ?’             ‘কেন তোর কি দরকার ?’                 ‘আরে !আমার বাড়ীর গেটে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করছিস আমার কি দরকার ! হারামজাদা ফুট্ ।‘  দুর্যু দম দেখাতে ওরা দু’জন ভাগা মারল । তবে যাবার আগে শাষিয়ে গেল, ‘দাঁড়া সেজদাকে বলে তোর দম বের করব ।‘  গিন্নীমার সাথে দ্রৌপদী গেটে দাঁড়িয়ে সব দেখল । ‘ সেজদা কে ?’ ‘অর্জুন ।‘ যেতে যেতে ওরা দ্রৌপদীর প্রশ্নের জবাব দিয়ে গেল । দুর্যু দ্রুপুকে এড়িয়ে যেতে গিয়েও একবার চোখে পড়ল । দ্রুপু যুবতী হয়েছে । দেখতেও সুন্দর হয়েছে । তবে কালকের বাচ্চাকে কে পোছে ! এদিকে দ্রুপু দুর্যুকে অল্প খাতির করল, ‘কি রে দুর্যু কেমন আছিস ?’ ‘ চুপ যা দেখি, মেলা বকবক করিস না ।‘  দুর্যু ওকে পাত্তা না দিয়ে চলে গেল ।
রাতে রতনবাবুর স্ত্রী রতনবাবুকে বললেন, ‘তোমার দ্রৌপদী বড় হয়েছে বুঝলে । পেছনে বেপাড়ার কুকুর ঘোরাঘুরি শুরু করেছে ।‘ ‘রতনবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ তাই তো । শ্রাবণমাস চলছে, ওদের সিজন্ শুরু হয়েছে । ‘
পরের দিন দুপুরে আবার দুটো কুকুর এলো । একজন কালকের দেখা নকুল অন্যজন নতুন । নকুল গেটের সামনে এসে হাঁক লাগালো, ‘দ্রৌপদী , ও দ্রৌপদী –‘  দূর থেকে তা দেখে দুর্যু দৌড়ে এলো । ‘ঐ তোদের কি লাগেরে ?’  এই যে সেজদা কাল এটা আমাদের দম দিয়েছিল । অর্জুন দুর্যুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঐ, একদম ফালতু কথা না । কামড়ে ছিড়ে ফেলব । যা, নিজের কাজে যা ।‘  ‘ওরে পাগল, তুই কোথায় দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছিল জানিস ? হাড্ডি ভেঙে রেখে দেব । ভাগ এখান থেকে ।‘  ‘তবে রে-‘  অর্জুন ঝাপিয়ে পড়ল দুর্যুর উপর । দুর্যুও মহাপরাক্রমে ঝাপিয়ে পড়ল অর্জুনের উপর । কামড়া-কামড়ি হল, পটকা-পটকি হল, তবে হৈচৈ শুনে পাড়ার কিছু ছেলে ঢিল ছুড়ে ওদের থামালো । তবে যেতে যেতে অর্জুন শাষিয়ে গেল, ‘আজ ছেলেগুলোর জন্য বেচে গেলি । কাল মেজদাকে নিয়ে আসব, দেখি তোকে কে বাচায় ।‘  ততক্ষণে দ্রৌপদী গেটে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘মেজদা কে ?’  নকুল বলল, ‘মেজদা হল মহাবীর ভীম ।‘  ‘তাহলে যুধিষ্টির কে ?’  ‘ও হল বড়দা । ওই তোমাকে প্রথমে বিয়ে করবে, তারপর আমরা বাকি চারভাই একে একে তোমাকে বিয়ে করব ।‘  ওরা চলে গেল । ওরা চলে যেতে দ্রুপী দুর্যোধনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ তোর চোট লেগেছেরে দুর্যু ?’  অর্জুন এতো সোজা মক্কেল না, দুর্যুকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ দিয়েছে । আরও একটু সময় লড়লে হয়তো দুর্যুকে পেড়ে ফেলত । কিন্তু এই কথা স্বীকার করা প্রেসটিজের ব্যাপার । তাই দুর্যু বলল, ‘ফুঃ, শালাকে চ্যাপ্টা করে দিতাম ।  শুধু পাড়ার ছেলেরা মাঝখানে চলে এলো বলে ।‘ এরপর ও দ্রুপীর দিকে ভাল করে তাকালো । কি এমন হল যে হঠাৎ করে এত কুকুর দ্রুপীর খোঁজ করছে ? হ্যাঁ , মানতেই হবে যে দ্রুপী বেশ সুন্দর হয়েছে, তা বলে-
রাতে গিন্নীমা রতনবাবুকে বললেন, ‘ দ্রুপীকে নিয়ে তো হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেছে । আজ তো বেপাড়ার দুটো কুকুরের সাথে মারামারি হয়েছে দুর্যুর । পাড়ার ছেলেরা ছিল বলে, তা না হলে দুর্যুর মুশকিল ছিল ।‘
আগের দিনের অর্জুনের সাথে টক্কর দিয়ে দুর্যু বুঝে গেছে যে মামলা সুবিধের নয় । তারপর ওরা বলে গেছে কাল মেজদাকে নিয়ে আসবে , তাই নিজের সেফটির জন্য ও বন্ধু দুঃশাষনকে ডেকে নিল । তেমন দরকার পড়লে দু’জন মিলে ফাইটিং করবে । দুপুরের দিকে নকুল, অর্জুন আর একটা বিশাল কুকুর এসে হাজির । দুর্যু আর দুঃশাষণ গেটের সামনেই বসে ছিল , দ্রুপীও সাথেই ছিল । আজ দ্রুপীর দিকে তাকিয়ে দুর্যু মোহিত হয়ে গেল । শ্রাবন মাস পড়ার পর থেকে মনটা যেন কেমন লাগত, কিন্তু কেন তা বুঝত না । এখন দ্রুপীর এত মন ভোলানো রূপ দেখে মনটা আবার কেমন কেমন করে উঠল । ওদিকে তাকিয়ে দেখে দুঃশাষণও দ্রুপীর দিকে আড় চোখে দেখছে । তখনই ওই তিনজনকে এদিকে আসতে দেখা গেল । ‘ওরে বাবারে ! ওটা তো ভীম । আমি পালাই ।‘  দুঃশাষণ সব ভুলে উল্টো দিকে দৌড় লাগালো । সেদিকে তাকিয়ে দুর্যু দেখল ওরা তিনজন গেটের কাছে চলে এসেছে । একে তো তিনজন । তার উপর কাল অর্জুনের সাথে টক্কর দিয়েই কিছুটা শিক্ষা হয়েছে । এদিকে মেজদা ভীমকে দেখে দুঃশাষণ যে ভাবে পালালো, দুর্যুর মোটেই ভাল লাগল না । ভীম দুর্যোধনকে পাত্তাই দিল না । নকুলকে বলল, ‘নকুল, দ্রৌপদীকে নিয়ে আয় ।‘  নকুল গেট পেরিয়ে এসে দ্রৌপদীকে বলল, ‘চলো আমাদের সাথে ।‘  ‘কোথায় ?’  ‘বড়দার কাছে । বড়দা তোমাকে বিয়ে করবে ।‘  ‘এই, এই হচ্ছেটা কি ?’  দুর্যু চিৎকার করল । অর্জুন বলল, ‘এই , একদম চুপ । কালকের মার ভুলে গেছিস ?’  দুর্যু ভোলেনি  । কিন্তু দ্রুপীর সামনে এরকম অপমান সহ্য করা যায় না । তা ছাড়া ক’টা পাড়ার ছেলে আশেপাশেই আছে । তাই ও হল্লা করল, ‘আমার পাড়ায় আমার সাথে দাদাগিরি !’ ও গর্ গর্ করে অর্জুনের উপর ঝাপিয়ে পড়ল । লেগে গেল পটকা পটকি। নকুলও সাথ দিল অর্জুনের । হাল্লা চিল্লা দেখে পাড়ার ছেলেরা ছুটে এসে পাথর মেরে ওদের ছাড়ালো । তবে ফাইটিং হয়েছে বটে । জান প্রাণ লড়িয়ে দিয়েছে দুর্যু , এক তো দ্রুপীর কাছে ইজ্জতের কথা, দ্বিতীয়ত কালকে অর্জুনের সাথে  ফাইটিং-এর বদলা । তবে পরিশ্রমও হয়েছে । এদিকে যখন এসব ফাইটিং চলছিল তখন ভীম দ্রুপীকে বলল, ‘ওরা ফাইটিং করুক, তুমি আমার সাথে চলো । দাদা অপেক্ষা করছে ।‘  ‘কেন ?’  ‘দাদা তোমাকে বিয়ে করবে ।‘  ‘আর তোমরা ?’  ‘আমরাও বিয়ে করব । প্রথমে দাদা, এরপর আমি , এরপর অর্জুন, নকুল, সহদেব ।‘  ‘আর দুর্যোধন ?’  ‘ওর আবার আমাদের মধ্যে কি দরকার ? ও অন্য কাউকে বিয়ে করবে ।‘  ‘না, আমি এভাবে ওকে ছেড়ে যেতে পারিনা । ওকে আমি কবে থেকে মনে মনে চাই ।‘  ‘ না , তুমি আমাদের সাথে চল ।‘  ‘না, আমি নিজে গিয়ে বিয়ে করব না । তোমার দাদা যদি নিজে এখানে এসে আমাকে বিয়ে করে তাহলে অন্য কথা ।‘  অল্প চিন্তা করে ভীম রাজি হল । ‘ঠিক আছে , কাল দাদাকে নিয়ে আসব । চলরে অর্জুন, চলরে নকুল, কাল দাদাকে নিয়ে আসতে হবে ।‘ ওরা যাবার সময় দুর্যু ভীমের সামনে চলে এসেছিল । ভীম ইচ্ছে করে দুর্যুকে একটা ধাক্কা মারল, দুর্যু তিন হাত দূরে ছিটকে পড়ল । একবারেই বুঝে গেল ভীমকে দেখে দুঃশাষণ কেন পালিয়েছিল ।
রাতে গিন্নীমা রতনবাবুকে বললেন, ‘আজ তো দুর্যুর সাথে বেপাড়ার কুকুরদের আবার মারপিট হল । যা সাইজের একটা কুকুর এসেছিল, বাপরে !’  ‘দুর্যু একা ছিল ?’ ‘ সাথে ওর এক বন্ধুকে নিয়ে এসেছিল কিন্তু অন্যদলকে আসতে দেখে ওটা পালিয়েছে ।‘
হায় কপাল । দুর্যু মাথা চাপরায় । যে দ্রুপী ওর মন পাওয়ার এত চেষ্টা করেছে, যে দ্রুপী ওকে এত ভাবে চেয়েছে, যে দ্রুপীকে সে একবারও পাত্তা দেয় নি , সেই দ্রুপীর টানে আজ পঞ্চপাণ্ডব এসে উপস্থিত ।  দুর্যোধন কত জনের কাছে সাহায্য চেয়েছে । দুঃশাষণ, কর্ণ, শকুনি, কৃপাচার্য কেউ রাজি হয় নি । ভীমার্জুনের নাম শুনে সবাই পিছিয়ে যায় । দ্রুপী বুদ্ধি করে ভীমকে বলেছিল যে যুধিষ্ঠির যেন একদিন পরে আসে । ইচ্ছে ছিল, একদিনের মধ্যে যদি দুর্যু কোন উপায় বের করতে পারে – কিন্তু কিছু হল না ।
পরের দিন যুধিষ্ঠির এলো । সঙ্গে ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব । দ্রৌপদীকে মাঝখানে রেখে পাঁচ ভাই একটা বুহ্য রচনা করে বসল । এরপর যুধিষ্ঠির  খুব সুন্দর করে গুছিয়ে বলল, ‘দ্রৌপদী, গুরদেবের আদেশে আমরা বংশরক্ষা করার জন্য একটি পাত্রী  খুঁজছিলাম । তোমাকে খুঁজে পেয়েছি ।   আমরা পাঁচ ভাই তোমাকে একে একে বিয়ে করব এবং ফুলশয্যা করব । এরপর চলে যাব । এরপর যদি তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাও , তা তোমার ইচ্ছে ।‘  এরপর বুহ্যের বাইরে থাকা দুর্যোধনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার বলা কথা গুলো নিশ্চয়ই শুনেছ । আমরা শান্তি পূর্ণভাবে বিয়ে করতে চাই , তুমি এখানে থাকতে পার অথবা কোথাও গিয়ে পাঁচদিন পর ফিরে আসতে পার । আজ আমি বিয়ে করে ফুলশয্যা করব , এরপর একদিন পর পর বাকি ভাইরা । পাঁচদিন আমরা ব্যস্ত থাকব । সুতরাং…’
আর একবার নিজের মাথা চাপড়ে দুর্যোধন সেখান থেকে চলে যাওয়ার মনস্থ করল ।

Thursday, July 12, 2018

২০২০ তে মহাপ্রভুর নাগার্জুন বেশ / ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ১২.০৭.২০১৮


 
    ২০২০ তে মহাপ্রভুর নাগার্জুন বেশ / ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী /  ১২.০৭.২০১৮ 
উড়িষ্যায় কার্তিক মাসে পঞ্চকতে কেউ আমিষ ভোজন করেন না। এই পাঁচ দিন কে বক পঞ্চক বলে কারন , বলে বক ও এই পাঁচ দিন নাকি মাছ খায়না। একাদশী থেকে পূর্ণিমা অবধি এই পাঁচ দিন পঞ্চক পালন করেন। যে বছর পঞ্চক ছয় দিন পড়ে অর্থাৎ দ্বাদশী ত্রয়োদশী কিম্বা চতুর্দশী তিথি র মধ্যে কোন এক দিন যদি মল তিথি পড়ে তবে সেই বছর মহাপ্রভুর রত্ন সিংহাসনে নাগার্জুন বেশ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু একাদশী কিম্বা পূর্ণিমা তে মল তিথি পড়লে এই বেশ হয়না। 
দীর্ঘ ২৫ বছর পর ২০২০ সালে কার্তিক মাসে ছয় দিন পঞ্চক পড়েছে তাই ২৭.১১,২০২০ তারিখ শুক্রবার দিন মহাপ্রভুর রত্ন সিংহাসনে নাগার্জুন বেশ অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন শুক্ল দ্বাদশী মল দিবস পড়ছে তাই ওই বিশেষ দিনে নাগার্জুন বেশ হওয়ার বিধি আছে বলে সামন্ত চন্দ্রশেখর পাঁজির গণক জ্যোতির্বিদ বাচস্পতি বৈকুণ্ঠ নাথ নায়েক বলেন।
২০২০ সালের নভেম্বর ২৫ তারিখ থেকে নভেম্বর ৩০ তারিখ পর্যন্ত ৬ দিন পঞ্চক পড়ছে । নভেম্বর ২৫ বুধবার একাদশী , নভেম্বর ৩০ সোমবার কার্তিক পূর্ণিমা । নভেম্বর ২৭ শুক্রবার কার্তিক শুক্ল দ্বাদশী(মল দিবস) তাই ওই দিন নাগার্জুন বেশ হবে স্থির হয়েছে। এ বিষয় শ্রী মন্দির প্রশাসন থেকে স্বতন্ত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পেলে এই বেশের জন্য সমস্ত আয়োজন সুরু হবে।
যে বছর নাগার্জুন বেশ অনুষ্ঠিত হয় সেই বছর তিন ঠাকুরকে এই বেশে দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয়না বলে প্রবাদ আছে। তাই এই বেশ দেখতে বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় ।
নাগার্জুন বেশ কোন কোন বছর অনুষ্ঠিত হয়ে ছিল:-
১৯৬৬ সালে ২৬.১১.১৯৬৬ র মল ত্রয়োদশীতে মহাপ্রভুর নাগার্জুন বেশ হয়
১৯৯৩ সালে ২৬.১১.১৯৯৩ র মল ত্রয়োদশীতে মহাপ্রভুর নাগার্জুন বেশ হয়
১৯৯৪ সালে আবার ১৬.১১.১৯৯৪ কার্তিক ত্রয়োদশীতে মহাপ্রভুর নাগার্জুন বেশ হয় ।
১৯৯৩ সালের নাগার্জুন বেশের সময় দলা চটকাতে ৬ জন তীর্থ যাত্রী মন্দির পরিসরে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হন(মৃত্যু বরণ করেন) তাই সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।
নাগার্জুন বেশ কিরকম হয়:-
এই বেশে তিন ঠাকুরকে যোধ্যা বেশে সাজান হয় । পুরীর সাহি যাত্রার সঙ্গে এই বেশের সম্পর্ক আছে । জরির কাপড় এবং বেত নির্মিত এই বেশে তিন ঠাকুর যোধ্যা রূপে মর্তে আগমন হয়। কোমরে নাগাতটি , তীর ধনুক , ছুরি , বাঘের নখ , ঢ়াল , তরোয়াল , মাথায় মুকুট শোভাপায় । ঠাকুর শ্রী-হস্তে তীর ধনুক ধারণ করেন। বলভদ্র হল মূষক , জগন্নাথ শঙ্খ চক্র । এই বেশের জন্য সব ঠাকুর শ্রী পয়র ও শ্রী হস্ত পরে রত্ন সিংহাসনে অধিষ্ঠান করেন।