Friday, March 23, 2018

আবিষ্কারের নেশা ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী



  এই গল্পটির জন্য আমি ১.০২.২০১৮ তে ২০০০ টাকা সম্মান জনক পুরষ্কার পেয়েছে আনন্দ বাজার পত্রিকা থেকে. ১৭ ই জানুয়ারি ২০১৮ 'দেশ' পত্রিকার ৩২ পৃষ্ঠায় আমার লেখা গল্প 'আবিষ্কারের নেশা' প্রকাশিত । আপনারা গল্পটি পড়ে সুচিন্তিত মন্তব্য পোষ্ট করবেন।



শালিনীর চোখের জল যেন শ্রাবণের ধারার মত অবিশ্রান্ত বয়ে যায় । কিছুতেই ভুলতে পারেনা বাবার সেই অকাল মৃত্যুর দিনের কথা । বাবl ছিলেন শালিনীর রোল মডেল। ওনার অকাল মৃত্যু , ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলনা । বাবাই তাকে বলেন প্রত্যেক মেয়ের উচিৎ পড়াশুনো করে উপযুক্ত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে , যাতে , সে পরনির্ভরশীল না হয়।
একাকীত্বর মধ্যে বাবার কথাগুলো মনে পড়ে ,“ মৃত্যু , ধ্রুব সত্য কিন্তু তাকে কেউ সহজ ভাবে নিতে পারেনা মা । আজ আমি রোগ শয্যায় পড়ে আছি কাল হয়তো থাকবোনা । তখন তোরা আমার ছবি টাঙিয়ে ফুলের মালা দিয়ে তিনটে ধুপ জ্বালিয়ে আমাকে স্মরণ করবি কিন্তু আমি নিজেও জানি না তোদের ডাক আমার কাছে পৌঁছবে কি না ! খুব আশ্চর্য লাগে আমার !” বাবার কথাগুলো ঠিক কিনা জানে না কিন্তু অবাধ্য অশ্রু বুঝতে চায়না।অনেক সময় সব রিসার্চ ফেলে ওর মনে হয় “মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায় ও কি করে” বইটা এনে পড়ে । আবিষ্কারের নেশা তাকে সংসারের সব সুখ দুঃখ ভুলে টেনে নেয় তার কাজের যায়গায়............ এর পর
আবিষ্কারের নেশা
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী
প্রথম পর্ব
শালিনীর থিসিসটা “এপ্লিকেশন অফ ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্লায়েড ইলেক্ট্রনিক্স” যেটা ন্যানো ফিজিক্সের বিষয়। বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে যোগা যোগ করতে চায়। শালিনীর প্রফেসার ওকে দিয়ে এই রিসার্চ ওয়ার্ক করিয়ে ছিলেন। নতুন বিষয়ের নতুন দিগন্ত , তাই ভুরি ভুরি প্রশংসা পায় শালিনী। আজ বাবা বেঁচে থাকলে কখনো শালিনীকে বিয়ের জন্য উৎব্যাস্ত করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন আরো রিসার্চের জন্য।
কলেজ থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে। আজকে শুক্রবার। প্রায় এরকম হয় বিশেষ করে শুক্রবার দিন। বাসে লোকে বাদুড় ঝোলার মতন অফিস ,স্কুল - কলেজ থেকে বাড়ি ফেরে। কি অবস্থা কোলকাতার ! লোকগুলো প্রাণ হাতে নিয়ে যাওয়া আসা করে।
শালিনী কি করে বাড়ি ফিরবে? উল্টো-ডাঙ্গায় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। লোকের ভিড়ে ভিড়। বাসের চেয়ে লোকের সংখ্যা ক্রমশ বেশি হচ্ছে। ও এরকম বাদুড় ঝোলার মতন বাসে উঠতে পারবে না। খুব চিন্তায় ছিল। অটো এই রুটে বেশি জায় না আজকাল। তবুও অটোর ভরসায় দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ ‘অয়ন’ ( শালিনীর ক্লাস মেট ) এসে ‘শালিনীর’ কাছে দাঁড়াল।
অয়ন ঃ “ কি ব্যাপার? বাড়ি ফিরবে কি করে? বাসের অবস্থা দেখছ !”
শালিনী ঃ “তুমি কোন দিকে যাবে?”
আমি ‘বাঙ্গুর’ , তুমি?
আমি ‘তেঘোরিয়া!’
বাসের আজ খুব বাজে অবস্থা। কেষ্টপুরে এতো রাস্তা জ্যাম থাকে , কি করে যাবে?
যেতে ত হবেই।
চল অটো আসছে উঠে পড়ি। দেরি করনা।
কিন্তু কিন্তু করে অটোতে উঠলো শালিনী ...। পার্সের অবস্থা খুব একটা ভালোনা ... দুটো কুড়ি টাকার নোট আছে। তবুও অন্য উপায় নেই দেখে উঠে পড়ে । বাড়ি পৌঁছতে সেই সাতটা সোয়া সাতটা ত হবেই। গিয়ে স্নান সেরে কালকের ক্লাসের জন্য প্রিপারেসন। হ্যাঁ , শালিনী ‘ফিজিক্স’ পড়ায় ‘স্কটিশে’। ও , পি.এচ.ডির পর ভাবা এটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) এবং ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্স , ভুবনেশ্বরে এক সঙ্গে দু জায়গায় সাইন্টিস্টের জব পায় , কিন্তু কোলকাতা ছাড়বেনা শালিনী ! তাই স্কটিশে অধ্যাপিকার অফারটা আপাততঃ একসেপ্ট করল।
অয়ন , শালিনীর ক্লাস মেট। ও এম.টেকের পর আই আই এম , কোলকাতা (জোকা) থেকে এম বি এ করে একটা মাল্টি ন্যাশনাল ফার্মে আছে। মাঝে মাঝে দ্যাখা হয় শালিনীর সঙ্গে ব্যাস আর কিছু না।
কোম্পানির থেকে এই জন্য বলে গাড়ি কিনতে। আমি গাড়ির লোণ নিতে কুণ্ঠা বোধ করছি কারন এই জব ছেড়ে দেব শিগগিরি। নতুন চাকরী ..ওই লোণের ঝামেলায় পড়তে চাই না ..... কথাগুলো একসঙ্গে বলে অটোয় উঠে পড়ে অয়ন।
শালিনী ও উঠে পড়ে ওর পেছনে। আজকাল রাস্তা ঘাটে একটা পুরুষের প্রয়োজন সঙ্গে থাকা ...তাই বিনা দ্বিধায় উঠে পড়ে শালিনী।
অয়ন বাঙ্গুরে নেবে জায়। বাগুইহাটির কাছে আবার জ্যাম ..... তখন ৭টা বেজে গিয়েছে। আর একটুখানি রাস্তা ... দুর নিজের গাডি থাকলে এসবের ঝামেলা থাকেনা। কিন্তু কোলকাতার রাস্তায় ড্রাইভিং ...! রক্ষে কর! কথাটা ভাবতেই একটা গোলমালের আওয়াজ পেল।
রে রে করে এক অটো চালক এক ভদ্রলোক এর সঙ্গে বচসা করছে । রাস্তার লোকগুলো বোবার মতন হেঁটে পার হচ্ছে। জেন কিছুই হয় নি ! নির্বিকার !! আসলে কোলকাতায় থাকলে চোখ কান মুখ সব বন্ধ রাখা দরকার। কথাগুলো কানে এল ; ৮ টাকা ভাডা ১০০ টাকা দিলে আমি কি টাকার গাছ রেখেছি? কত খুচরো নিয়ে ঘুরবো। শালা সকাল থেকে মাল পড়ে নি পেটে। খুচরো কোথা থেকে পাবো । পকেটে খুচরো নিয়ে গাড়িতে উঠতে পারেন না ?
লোকটিও ছাড়ার পাত্র নয় তিনিও বলছেন , আমরাই বা খুচরো পাই কোথা থেকে? একশো টাকা বার করলেই শেষ। ভদ্রলোক লোকাল বোধ হয় নাহলে এতো সাহস হবে না ! সমানে বচসা চালিয়েছেন।
আপনার কাছে ভাঙ্গানি আছে দাদা?
কত?
২০ টাকা!
হয়েযাবে দিদি। আপনি কোথায় নাববেন?
লোকনাথ বাবার মন্দিরের কাছে।
ওখান অবধি ২০ টাকাই ভাড়া ।
শালিনী র যেন গা থেকে জ্বর নাবলো। প্রত্যেক দিন অটো আর প্যাসেঞ্জারের মারপিট রক্তা রক্তি কাগজে দেখে ওর রাস্তা ঘাটে ভয় করে। কাল খুচরো সঙ্গে রাখবে। বাসের ওপর ভরসা নেই। বাস মালিকেরা স্ট্রাইক এর ডাক দিয়েছিল। ডিসেলের যা দাম বেড়েছে! ওদের ই বা দোষ কি? তবে ভাড়া বাড়েনি রক্ষা।
ঘরে পৌঁছে একটু ফ্রেশ হয়ে নেয় তারপর সোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ে । শাওয়ার খুলে স্নান। আঃ ! রোজ রোজ এই বিচ্ছিরি জার্নি যেন পোষায় না। এর একটা বিহিত করতে হবে। এ মাসে মাইনে পেলে একটা লোণ করবে ... কারের লোণ। বাজেটের পর কারের দাম কমেছে। দেখি ব্যাঙ্ক ম্যানেজার কি বলেন? শালিনীর জামাই বাবু সল্ট লেক স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। উনি যদি কিছু আডভাইস করেন ত। ওর পে সার্টিফিকেট এর জন্য কাল এপ্লাই করবে প্রিন্সিপাল কে। হয়ে যাবে বোধ হয়। তবে ও তো ইউ জি সি স্কেল পায় নি । এদিকে ৭ম পে কমিশন বসে গিয়েছে। সত্যি গরিব মানুষ গুলো কি খাবে এর পর? হু হু করে যা দাম বাড়বে । ইলেকশনের পর .. কি দেশের অবস্থা .. কেউ বোঝার নেই ! আশ্চর্য !!
মা , চা নিয়ে হাজির।
তুমি কেন আনলে মা? আমি নিজে বানিয়ে নিতাম।
থাক মা। আর ও টুকু করতে হবে না। স্বশুর বাড়ী গিয়ে কর। এখন তোমার মা বেঁচে আছে।
সন্ধ্যে বেলায় বাজে কথা বোলোনা মা ! তুমি কি করে জানলে , আমি , তোমার ওই 'শ্বশুর বাড়িতে' যাবো বলে?
আমার নয়.. তোমার মা , সবাই যায়। তুমিও যাবে।
আর যদি আমি না যাই। আমি যদি তোমার কাছে থাকি। আপত্তি আছে?
আদিখ্যেতা দেখো মেয়ের ! হ্যাঁ আছে মা। সব দিন তো আমি বেঁচে থাকবো না!
তোর সঙ্গে ওই ‘অয়ন’ বলে ছেলেটা পড়তো না! কেমন দেখতেরে ওকে? নিয়ে আয় না এক দিন।
কেন বলত? আমি ডাকলেই ও আসবে কি করে বুঝলে? ওর সঙ্গে আর দেখা হয় না আমার। আমাকে ও সব বলবে না। আমার এখন কিছুই হলনা ... তোমাদের মেয়েকে বাড়ি থেকে বিদেই না করলে ভাত হজম হয় না?
ও মা সে কি কথা? আমি তাই বলেছি নাকি? এই যে বললি অয়ন তোর সঙ্গে এক ই অটোতে এলো বলে!
তাতে কি হয়েছে? অটোতে এলো বলে ওমনি তাকে বাড়িতে ডাকতে হবে? তুমি যে কি না মা! আশ্চর্য! তোমরা পারো বটে!!
ঠিক আছে , আমি তোর মামাকে বোলব একটা বিজ্ঞাপণ দিতে "আনন্দ বাজার পত্রিকাতে" , “পাত্র পাত্রী কলমে”।
কিসের?
চা টা খেয়ে নে মা। জুড়িয়ে যাচ্ছে যে।
তোর বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে কি এসব চিন্তা করতে হত রে মা? সব ই গোবিন্দের ইচ্ছা।
দেখ মা আমাকে ওই বিয়ে ফিয়ের ব্যাপারে বিরক্ত করলে আমি কিন্তু বাইরে চাকরি নিয়ে চলে যাবো। "গোবিন্দের ইচ্ছে" ত 'গোবিন্দর' ওপর ছেড়ে দাও না !
তবে কি সারা জীবন আইবুডো মেয়ে বসে থাকবে ঘরে ?
ওই সব গেঁও কথা শুনতে আমার একদম ভাল লাগেনা। কলেজ থেকে ফিরেছি আমাকে একটু রেষ্ট নিতে দাও। তোমার ওই এক ঘেয়ে ঘ্যান ঘ্যান আমাকে এই ঘর ছাড়তে বাধ্য করবে। আমাকে পরে দোষ দিওনা ! কথাটা বলে গট গট করে চায়ের কাপ হাতে নিজের ঘরে চলে গেল শালিনী।
শালিনীর মা হতবাক হয়ে মেয়ের কথা শুনছিলেন। মনে মনে ভাবলেন আজকালকার মেয়েরা দুটো লেখা পড়া শিখে নিজেদের কি মনে করে? আমি হলাম গেঁও! কথায় বলে,“সোমত্ত মেয়ে ঘরে থাকলে মায়ের গলায় মাছের কাঁটার মতন আটকে থাকে। না পারবে গিলতে না পারবে ফেলতে।” আমার হয়েছে যতো জ্বালা!! এইবলে রান্না ঘরে চলে গেলেন।
শালিনী র মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠলো।
হ্যালো। কে বলছেন?
অয়ন। একটা সুখবর আছে। আমি গাড়ি কিনছি।
তাই ! কংগ্রাচুলেসন। কি গাড়ি ?
ফক্স ওয়াগন এর এর ‘পোলো’ মডেলটা আমার প্রিয় ওটাই কিনছি। কোম্পানী ৪% ইন্টারেস্টে লোন দিচ্ছে। বাবা বললেন ,“কিনে নাও। এখন যা কোলকাতার রাস্তার অবস্থা , রাস্তার ধুলো আর পলিউসন থেকে রক্ষ্যা পাবে। পরে ফ্লাই ওভার হয়েগেলে গাড়ি চালাতে অসুবিধে হবে না।” ড্রাইভিং টা জানি তবে আরেকটু হাত পাকাতে হবে।
হুম। ঠিক বলেছেন তোমার বাবা। কবে খাওয়াচ্ছো?
যদি বল কাল।
কাল আমার একটা ক্লাস আছে। ঠিক আছে বলব। বাই।
শালিনী খুব একটা সায় দেয় না অয়ন কে। শালিনী অয়ন দুজনেই পড়া শুনয় ভাল ছিল। শালিনী র ফিজিক্স ভাল লাগতো তাই অনার্স নিয়ে পড়ে। পরে এম এস সি , পি এচ ডি করে । এখন ও ডক্টর শালিনী সান্যাল।
অয়ন প্রথম থেকেই আই আই টি র জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। বি টেক এর পর ক্যাট দিয়ে জোকা তেই এম বি এ করে মার্কেটিং এ। ফেলোশিপ করতে পারতো কিন্তু ভালো চাকরির অফার পেয়ে কাজে জএন করে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি হিসেবে। পরে মার্কেটিং ম্যানেজার হয়ে কোলকাতায় পোস্টিং পায় একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে। পে প্যাকেজ ভালো তা ছাড়া কোম্পানির ফ্যাসিলিটি অনেক।
শালিনী কোম্পানি জব একদম পছন্দ করে না। বলে গলায় লেংটি(টাই) বেঁধে কোম্পানির দালালি যা মার্কেটিং তাই। যতই মাইনে পাও না টিচিং জব শ্রেষ্ঠ। ওতে নিজের সাবজেক্টের সম্পর্কে ছাত্র/ছাত্রী দের আকৃষ্ট করা তাদের ভালো করে বিষয়টা বোঝান। রিসার্চ করা। এ সব সমাজ সেবার কাজ। ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ আছে মার্কেটিং এ আছে? আয়ন খুব ভাল ছেলে জানি কিন্তু ও কি করল? নিজের মাথাটা কোম্পানিকে বিক্রি করে দিল! ভাল সেলস দেখালে উন্নতি নাহলে ...! এরা টাকা ছাড়া জীবনে আর কিছুর মূল্য বোঝেনা । খুব মেটেরিয়ালিসটিক হয়ে যায়। খুব একটা শান্তিতে থাকে না। কাজের প্রেসারে খিট খিটে হয়ে যায়। অকাল বৃধ্য হয়ে চুল উঠে টাক পড়ে জায়। ম্যাগো টাকটা শালিনী একদম পছন্দ করে না। নিজেই নিজের মনে কথাগুলো ভাবতে থাকে ,কিন্তু একি তারতো এ সব ভাবার দরকার নেই। মাথাটা ঝাঁকিয়ে নোট টা প্রিপায়ার করছিল বি এস সি পার্ট ওয়ানের থার্মোডাইনামিক্সের ক্লাসের জন্য।
শালিনীর ক্লাস শেষ না হতেই অয়নের ফোন। অনিচ্ছা সত্যে কল রিসিভ করে “হ্যালো” বলল।
আসছ ত!
কোথায়?
পার্ক হোটেলে।
ও বাবা আমি ওসব জায়গায় জাইনা। আমি ফুচকা খেতে ভালো বাসি গল্প করতে করতে।
কি ফুচকা? তুমি কি বাচ্চা?
হ্যাঁ। তুমি চলে এস আজ আমি খাওয়াচ্ছি তোমায়। দেখবে কিরকম টেস্ট।
সরি ম্যাডাম আমি রাস্তার জিনিষ খাই না। ওতে হেপাটাইটিস হয়। তোমার টেস্ট টা সেই স্কুল পডুয়া মেয়েদের মতন। একটু মড হও। ডক্টরেট করেও ...।
না না আমি মড কোনদিন হতে পারবো না আয়ন। আমি আমিতে থাকতে চাই।
তবে তোমার সঙ্গে আমার কেমিস্ট্রি ঠিক মিলবে না।
আমিত মেলাতে চাইনা। তুমি কল করেছিলে আমি করি নি। আর কেমিস্ট্রি র কথা আসছে কোথা থেকে? আমরা শুধু বন্ধু তাই নয় কি?
অয়ন অপমানিত মনে করল নিজেকে। ছিঃ একটা অর্ডিনারি শিক্ষিকা সে কিনা এতো ডাঁটের কথা বলে ! আর না। ওকে বাই এজ ইউ লাইক। বলে ফোন কেটে দিল।
শালিনী ওটাই চাইছিল। ও এক দম ওই হোটেলে বসে হ্যা হ্যা করে শস্তা মেয়েদের মত কারুর ঘাডে খাওয়া পছন্দ করে না। নিজের ঘর আর কলেজ ছাডা কোথাউ কারুর সঙ্গে যায়নি। প্রফেসাররা তাই ওকে খুব স্নেহ করতেন ইউনিভার্সিটিতে।
এদিকে মা , মামাকে দিয়ে এক বিজ্ঞাপণ দিয়েছেন। হঠাৎ রবিবারের আনন্দ বাজার পত্রিকায় পাত্র পাত্রী বিজ্ঞাপনের পেজটাতে লাল কালি দিয়ে গোল করা দেখে বিস্ময় হয় শালিনীর। পড়ে দ্যাখে , ওমা এত তার জন্যই ...। মামা এলে দেখাচ্ছি মজা। আমাকে কি পেয়েছে এরা। একটা কমোডিটি না কি? খুব রাগ হয় মা’র ওপর।
হঠাৎ ল্যান্ড ফোনে রিং হয়। ও ঘর থেকে মা ছুটে আসেন ফোন ধরতে।
হ্যালো ! কে বলছেন?
আপনি একটা বিজ্ঞাপণ দিয়েছেন ...।
হ্যাঁ।
মায়ের কাছ থেকে ফোনটা ছাড়িয়ে ... মেয়ের মাথা খারাপ আছে আর কালো বেঁটে চলবে !!
ও দিক থেকে লাইন কেটে যায়।
একি করলি শালু?
ঠিক করেছি। যার বিয়ে তার মতা মত নিয়েছ? কি ভাব তোমরা? আমি 'গোলাম' না 'বাজারের মাছ' ? কি ভাবো তোমরা?? এরকম করলে আমি সত্যি ঘর ছেড়ে চলে যাব। রাগে থর থর করে কাঁপে শালু। রেগে গেলে শালিনীর জ্ঞান থাকেনা । লঘু গুরু কিছুই মানে না ।
মায়ের চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু। মা চায়ের কাপটা শালুর হাতে দিয়ে বলেন , "আমাকে শান্তিতে মরতে দিবি না তুই? তোর বাবা আমাকে কি জ্বালা যন্ত্রণায় রেখে গেলেন। মেয়ের মাথায় এমন বিষ ঢুকিয়ে গিয়েছেন মেয়ে বিয়ের নামেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে । আমি বিধবা মানুষ কতদিন এই জ্বালা সহ্য করব । ভগবান আমায় রেহাই দাও এই মেয়ের হাত থেকে" ।
তুমি শান্ত হও মা। বাবকে কেন টানছ এর মধ্যে। উনি কি স্বর্গে গিয়েও শান্তি পাবেন না ! তোমার গলার কাঁটা আমি.. বাবার ছিলাম না ! আমার বিয়ের কথা একদম ভেবো না। সময় হলে আমি নিজেই তোমাকে বলব। তবে এখন না। শান্ত হও। আমার অনেক কাজ বাকি।
আমি জানি রে সে দিন আসবে না। আমি ত তোর মা আমি জানি তোকে! তুই মা’ হলে বুঝবি।
আমার ওইরকম মা হওয়ার প্রয়োজন নেই যে মা তার সন্তানকে বুঝতে চায় না!
এই কাটা কাটা কথা আমি সহ্য করব কিন্তু পরের ছেলে সহ্য করবে কেন?
আমিতো কারুর মাথার দিব্বি দি নি আমার কথা সহ্য করতে। তুমি কেন আমাকে বুঝতে চেষ্টা করনা। আমি আর পাঁচটা মেয়ের মত স্বামী ঘর দোর বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে থাকতে চাই না পৃথিবীতে। পৃথিবীতে আরও অনেক কাজ আছে যা মেয়েরা করতে পারবে। করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। এই বিশাল পৃথিবী তার প্রত্যেক কোনে আছে বিভিন্ন মানুষ তারা সুধু বাচ্চা জন্ম না দিয়ে দেশের অনেক উপকারে আস্তে পারে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ এই জন্য অসফল হচ্ছে আমাদের দেশে। ছেলে মেয়ে চাকরি পেলেই মা বাবাদের মাথা ব্যথা ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করা। এতে কি হচ্ছে? অনেক ভাল ব্রেন নষ্ট হচ্ছে।
আমি অত পড়াশুন করিনি তোর মত। আমি তাই জানিনা মা। আমার ভাবনা চিন্তা তোর সঙ্গে কোন দিন খাপ খায় নি...........
বেলা বারোটা নাগাদ দিদি জামাই বাবু এলেন। সঙ্গে টুকাই।
মা রকমারি রান্না করে রেখেছেন। সেকেলে শ্বাশুডিদের মত মাথায় ঘোমটা দিয়ে জামাই বাবু কে বলেন, “এসো বাবা এসো।”
টুকাই শালিনীকে দেখে দউড়ে আসে। মাসি আমার ক্যাডবেরি টা দাও।
দাঁড়া আনছি বলে ফ্রিজের দিকে এগুলো।
শ্রাবন্তি, শালিনীর দিদি আর অর্ক শালিনীর জামাই বাবু। দুজনেই মাকে কিছু জিঙ্গাসা করতে যাচ্ছিল শালিনীকে দেখে চুপসে গেল।
শালিনী বুঝেও না বোঝার ভান করল। জিজু কি খবর তোমার? অর্ক কে দেখে বলল শালিনী।
তুমি না থাকলে মন উদাস থাকে সখী।
তাই তবে দিদিকে ছেড়ে এখানেই থাক ঘর জামাই হয়ে।
তাও আচ্ছা সখী।
তবেরে দেখাচ্ছি তোমাকে।
সকলে হেঁসে ফেলে। সত্যি অর্ক-দা খুব মাই ডিয়ার।
টুকাই বলে ,“ঘর জামাই কি গো মা”?
শ্রাবন্তি বলে, গোয়ালে চাষির ঘরের বলদ। গলায় দড়ি বাঁধা থাকে । খেতে দিলে খায় আর জোয়াল কাঁধে গরুর গাড়ি টানে। তাকে বলেই "ঘর জামাই"। বুঝলি।
যা: কি সব বাজে কথা বলে মা। একদম বাজে। মিথ্যা কথা বলছ তুমি।
শালিনী , টুকাইকে ক্যাডবেরি দিয়ে বোঝায় পরের ছেলেকে ঘরে খাইয়ে দাইয়ে রাখাকে ঘর জামাই বলে। এখন এটুকু জান পরে বড় হলে পুরোটা জানবি।
অর্ক বলেন, “শালু তোর জন্য তবে তাই দেখি।”
ভাল হবেনা বলছি অর্ক-দা।
তোর অয়নের খবর কি? আমাকে ফোন নাম্বারটা দে না ! আমি কথা বলে দেখি।
তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে শালিনী। কি? সে খবর ও মা তোমাদের দিয়েছে।
মা! মা!
কি হল? অত চ্যাঁচাচ্ছিস কেন?
তুমি কেন এই সব বল আমার নামে। কি পাও?
কি বলেছি?
গট গট করে নিজের ঘরে ঢুকে যায় শালিনী।
কম্প্যুটার খুলে সিভি ফাইলটা খোলে। মনে মনে ভাবে বার্কের কিম্বা ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্সের চাকরিটাতে আবার এপ্লাই করব। খুব ভুল হয়েছে ঘরে থাকা। বাইরে গেলে এক্সপোসার হবে। এই স্কটিশে আমার ভবিষ্যৎ কি? ইউ জি সি পেতে অনেক দেরি। সেই থোড় বড়ি খাড়া ... খাড়া বড়ি থোড়!! ওর প্রফেসারের সঙ্গে যোগা যোগ করে হায়ার রিসার্চের কথা মনে মনে চিন্তা করে। বাবা ওর নামে যে টাকা রেখে গিয়েছেন সেটা নিয়ে ফরেনের কোন ভাল ইউনিভার্সিটিতে পোষ্ট ডক্টরেট রিসার্চ করলে উন্নতি আছে বিদেশের ডিগ্রীর দাম আছে। শালিনীর থিসিসটা “এপ্লিকেশন অফ ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্লায়েড ইলেক্ট্রনিক্স” যেটা ন্যানো ফিজিক্সের বিষয়। বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে যোগা যোগ করতে চায়। শালিনীর প্রফেসার ওকে দিয়ে এই রিসার্চ ওয়ার্ক করিয়ে ছিলেন। নতুন বিষয়ের নতুন দিগন্ত , তাই ভুরি ভুরি প্রশংসা পায় শালিনী। আজ বাবা বেঁচে থাকলে কখনো শালিনীকে বিয়ের জন্য উৎব্যাস্ত করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন আরো রিসার্চের জন্য। ওর প্রফেসার বিদেশে অনেক ভালো অফার পেয়েছিলেন কিন্তু উনি ভারতে ফিরে কোলকাতা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতাই শ্রেয় মনে করেন। সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শালিনী স্কটিশে অধ্যাপিকার চাকরিতে যোগদান করে। কিন্তু ওখানেও মন বসে না কারন ও আরও অনেক রিসার্চ করতে চায়। আমেরিকাতে গেলে সম্ভব। আমেরিকা জাওয়ার টাকা নেই। যেটুকু পুঁজি আছে সেটা ফুরলে চলবে কি করে? তাই কোলকাতা থেকেই রিসার্চ এর চিন্তা করে।
স্কটিশ থেকে ছুটি নিয়ে নেয় এক মাসের। মনে অনেক স্বপ্ন অনেক আশা উদ্দীপনা আর আবিষ্কারের ব্যগ্রতা ওকে সব পেছনে ফেলে এগিয়ে নিয়েছে। পোষ্ট ডক্টরাল প্রোগ্রাম এর জন্য ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে সিলেক্টেড হয়। ফেলোশিপের টাকায় অনায়াসে চলবে। আর শালিনীকে কেউ বিরক্ত করবে না বিয়ের জন্য।

আবিষ্কারের নেশা
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী
দ্বিতীয় পর্ব
কম্প্যুটার খুলে সিভি ফাইলটা খোলে। মনে মনে ভাবে বার্কের (ভাবা এটমিক এনার্জি কমিশন) কিম্বা ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্সের চাকরিটাতে আবার অ্যাপ্লাই করব। খুব ভুল হয়েছে ঘরে থাকা। বাইরে গেলে এক্সপোসার হবে। এই স্কটিশে আমার ভবিষ্যৎ কি? ইউ জি সী পেতে অনেক দেরি। সেই থোড় বড়ি খাড়া ...খাড়া বড়ি থোড় ! ওর প্রফেসারের সঙ্গে যোগা যোগ করে হাইয়ার রিসার্চের কথা মনে মনে চিন্তা করে। বাবা ওর নামে যে টাকা রেখে গিয়েছেন সেটা নিয়ে ফরেনের কোন ভাল ইউনিভার্সিটিতে পোষ্ট ডক্টরেট রিসার্চ করলে উন্নতি আছে। বিদেশের ডিগ্রীর দাম আছে। শালিনীর থিসিসটা “এপ্লিকেশন অফ ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্পলায়েড ইলেক্ট্রনিক্স” যেটা ন্যানো ফিজিক্সের বিষয়। বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে আই আই এস সী , বেঙ্গালুরু তে যোগা যোগ করতে চায়। আজ বাবা থাকলে ওকে নিশ্চয় উৎসাহ দিতেন হাইয়ার রিসার্চের জন্য পরের দিন বেঙ্গালুরুর ফ্লাইটে শালিনী চলে-গেল। ওখানে এক বান্ধবীর ফ্ল্যাটে ওঠে। সকালে আই আই এস সী ( Indian Institute of Science) এতে যায়। Carbon Nano tube Based Sensors Funded by: DST, Project no. 563 কাজে সুযোগ পায় প্রফেসর ডঃ অরুণাভ চক্রবর্তীর আন্ডারে। শালিনী যা চাইছিল তাই পেল এখানে।
এরমধ্যে অয়নের সঙ্গে হঠাৎ দেখা একটা শপিং মলের কাছে। শালিনীকে দেখে অয়ন হতভম্ব হয়ে যায়। দুজনে চোখা চোখই হয়। ওরা অপোসিট ফুট ধরে হাঁটছিল পরস্পরকে দেখে দুজনেই দাঁড়ালো।
“কি ব্যাপার এখানে”? অয়নের প্রশ্নের অপেক্ষায় যেন ছিল শালিনী
“কেন আমার কি এখানে আস্তে মানা”! ভুরু কুঁচকে শালিনীর জবাব অয়নকে ছুঁড়ে।
তা কেন!
তবে?
কৌতূহল! , মানে just inquisitiveness বলতে পারো।
মেয়েদের ব্যাপারে কৌতূহল থাকা মোটেই ভালো না Mr Ayon Banerjee , am I correct!
Yes Madam!
কোথায় উঠেছ?
কেন যাবে নাকি সেখানে?
আবার ওই এক উত্তর just for inquisitiveness!
আমারও এক উত্তর মেয়েদের ব্যাপারে কৌতূহল থাকা মোটেই ভালো না Mr Ayon Banerjee!!
দুজনেই হা হা করে হেঁসে ওঠে।
কফি খাবে?
তা হলে মন্দ হত না!! তবে পেমেন্ট আমি করবো।
তোমায় নিয়ে পারা মুস্কিল। কেন আমি দিলে ক্ষতি কি?
না না আমি দিলে তোমার ক্ষতি কি শুনি?
তর্ক কোর না আজ অন্তত আমার কথা একটু রাখ শালিনী। চল কে এফ সী কাউন্টারে জাই।
অয়নের সান্নিধ্য এই বিদেশ ভুঁইতে খারাপ লাগ-ছিলনা। সত্যি নারীর কাছে পুরুষ মানুষের প্রয়োজন আছে ; নারী যতোই উচ্চ শিক্ষিতা , উচ্চ পদাধিকারী হোক না কেন!এটাই বোধ হয় প্রকৃতির নিয়ম।
হঠাৎ অয়ন বলে ,“কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কি ভাবছ? ”
কিছু না! বিব্রত বোধ করে শালিনী। কি আবার ভাববো। মা একা আছেন ওনার কথাই মনে হচ্ছিল!! কেমন আছেন কে জানে?
কেন ফোন করনি?
হ্যাঁ রাত্তিরে করি কিন্তু কাল করিনি। সত্যি মা’কে ফোন করেনি শালিনী।
অয়নকে ঘুণাক্ষরেও যানতে দি লোনা ওর কথাই ভাবছিল বলে ~! মেয়েরা পারেও বটে!! অয়ন কিছু স্ন্যাক্সের অর্ডার দেয়। কে এফ সী চিকেন আর পিটযা।
এতোগুলো কেন আনাচ্ছ? আমি অত খাইনা!
জানি আজ খেতেই হবে। তুমি ত কফি খাওয়ালে আমি মানা করিনি এবার আমি যা খাওয়াবো তুমি প্লিজ মানা করনা।
আমি ওসব খাইনা অয়ন। আমরা ভেতো বাঙ্গালী ওই সব খাবার খেলে পেটের অসুখ হবে , তখন কে দেখবে?
কেন! আমি , আমি দেখবো!!
আহারে! কি আমার কলির কেষ্ট ~ আমায় করবে তুষ্ট?
নাইবা হলাম কলির কেষ্ট ~ তোমার জন্য নয় করবো কষ্ট!
দুজনেই হা হা করে হেঁসে ওঠে।
খাওয়া শেষ করে অয়ন শালিনীকে ছেড়ে আসে কোরমঙ্গালা অবধি ট্যাক্সিতে।
রাস্তায় অনেক কথা হয়। শালিনীর পোষ্ট ডক্টরেট এর জন্য ফেলোশিপ। রিসার্চ এর স্কোপ ইত্যাদি ইত্যাদি।
অয়ন এখন বেঙ্গালুরুতেই থাকে নতুন কোম্পানিতে। মাঝে মাঝে চেন্নাই , দিল্লী জায় কোম্পানির কাজে।
শালিনী এখন আর অয়ন কে অপছন্দ করেনা কেন নিজেই জানেনা। আসলে বন্ধু হিসেবেই ওকে গ্রহণ করেছে। নিজের মনকে বোঝায় বন্ধুত্বতে দোষ কি?
ডঃ অরুণাভ চক্রবর্তীর সব সময় ব্যস্ত থাকেন নিজের রিসার্চ নিয়ে। শালিনীকে গাইড করছেন একটা নতুন বিষয় নিয়ে কার্বন নেনো টিউব বেসড সেন্সার্স। বেশ কিছু তথ্য ভিত্তিক কনফারেন্স এবং সিম্পোজিয়াম এর মধ্যে সময় কাটে সকলের। পরিবেশটা সরস্বতীর আরাধনা ছাড়া কিছু নেই। যে যার রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত। খাওয়ার সময় থাকেনা এদের। এরা এতোই মসগুল হয়ে থাকে রিসার্চ নিয়ে। শালিনী জীবনে অনেক রিসার্চ করলো। নতুন কাজ প্রায় শেষ হতে চলেছে। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টের টাকা এই বছর শেষ। এর পর কি?
হঠাৎ অয়নের ফোন। হ্যালো! বল অয়ন।
আজ শনিবার আমার অফিস ছুটি।
কিন্তু আমার নয়।
জানি , ছুটি নাওনা!
হুম দেখছি। “আমাদের প্রোজেক্ট এর কাজ প্রায় শেষ। এবার বাড়ী যেতে হবে। ফেলোশিপের টাকা আর পাবো না। আবার সেই মায়ের ঘেন ঘেনানি”। কথাগুল্প মনে মনে ভাবে শালিনী।
কি হল? উত্তর দিচ্ছ না কেন?
অয়ন তোমাকে একটা কথ বলি। তুমি কিছু মনে করবে না বল।
ঠিক আছে বল। আচ্ছা কথাটা না হয় দেখা হলেই বলবে। আমি আসছি তোমাকে নিতে।
মানা করতে পারলো না শালিনী। কিছু একটা অলস আবেগের বসে বলে বসে “ঠিক আছে এস কিন্তু রাত করতে পারবোনা ”।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অয়ন এসে হাজির।
চল।
কোথায়?
চলইনা।
‘আই-নক্স’ এ SANDLER BARRYMORE ‘BLENDED’।
হলে সিনেমা দেখতে দেখতে পপ কর্ন খাচ্ছিল দুজনে। আজ জেন শালিনী জীবনের সব বাঁধন থেকে মুক্ত। নিজেকে হারিয়ে দিতে চায় অয়নের কাছে। কিন্তু তাতে শালীনতা থাকা প্রয়োজন।
হঠাৎ বেড় রুম সিন শালিনীকে বিব্রত করে। নায়িকার অনাবৃত বক্ষ যুগল আর ঘন ঘন চুম্বনের দৃশ্য অয়নকেও কিছুটা উত্তেজিত করে ফেলে।
শালিনীর হাত অজান্তে স্পর্শ করে ফেলে।
শালিনী হাত সরিয়ে নেয় এবং উঠে পড়ে বলে , “চল রাত অনেক হয়েছে আমার আর ভালো লাগছেনা”।
সেকি! মাঝ খান থেকেই চলে যাবে?
হ্যাঁ যেতেই হবে লোকের সামনে অসভ্যতামি আমি পছন্দ করি না। তোমার জানা উচিত ছিল। চোখথেকে অগ্নি বর্ষণ হচ্ছিল।
কিছু সিন ক্রিয়েটের আগেই অয়ন বাধ্য ছেলের মত উঠে পড়ে।
অয়ন বিব্রত বোধ করে। বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সির খোঁজ করে। শেষে শালিনী আর ও উঠে পড়ে একটা ট্যাক্সিতে। কিন্তু একি! শালিনী সামনের সিটে ড্রাইভারের কাছে বসে!!
রাস্তায় কোন কথাই হয় না। অয়ন অপরাধীর মত পেছনে চুপটি করে বাধ্য ছেলের মত বসে-পড়ে। মনে মনে ভাবে এই মহিলার জেদ ভাঙ্গতেই হবে। এটা তারকাছে চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়। কিন্তু এই মহিলা অন্যদের মত সোজা সরল নয়। এরমধ্যে সৌন্দর্যের ছিটে ফোঁটা নেই। রুক্ষ বাস্তব ধর্মী এক অহংকারী মহিলা। এর কাছে কামনা বাসনা প্রাধান্য পায়না। তবে কি সত্যি তাই? আরও ভেতোরে ঢুকতে হবে বুঝতে হবে। সে যে ব্যাপার টা করলো তাতে ভুল থেকে গেল। এখন হয়তো শালিনী আর কথা বলবে না কিছুদিন।
শালিনীর বাসা এসে-গেল। গাড়ী-থেকে নেবে ড্রাইভারের হাতে ১০০ টাকার নোট দিয়ে বলে “ভাই সাব মিটারে কিত্না হুয়া”?
৯০ রুপিস মাদাম। ঠিক হ্যায় রখ লিজিয়ে।
অয়নকে গুড নাইট বলে নেবে গট গট করে হেঁটে যায় উত্তরের অপেক্ষা না রেখে।
অয়নও ও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।
আবিষ্কারের নেশা
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী
৩য় পর্ব
এখানকার কাজ শেষ। বাড়ী ফেরার তাড়া। ইয়শোওন্তপুর হাওড়া সুপারফাষ্ট এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে। শালিনী একাই ফিরছে ২ এসি কোচে। সঙ্গে একটা ট্রলি ব্যাগ আর কিছু ছোট খাটো জিনিষ। খুব ব্যস্ত লাগছিলো। অনেকটা পথ কোরমঙ্গালা থেকে ইয়শোওন্তপুর ষ্টেশন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বগিতে উঠে। জিনিষ পত্র ঠিক জায়গায় রেখে একটা টাইম ম্যাগাজিন নিয়ে বসলো। যে যার বার্থ এ উঠে বসছে। সামনের বার্থের এক ভদ্রমহিলা শালিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন “কোলকাতা যাবে বুঝি?”
হ্যাঁ। আপনি?
আমিও। সঙ্গে কেউ নেই?
‘না’ ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে ওলটাতে।
ও! আমিও একলা যাচ্ছি মা। তাই ভাবলাম তোমার সঙ্গে একটু কথা বলে সময় কাটাবো।
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। বলুন না।
আমি এখানে আমার ছেলে বৌ এর কাছে এসেছিলাম।
আপনার ছেলে কি করেন?
ছেলে বৌমা দুজনেই ইনফোসিসে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
ও তাই! ভালো।
তুমি?
আমি! আমি আপাতত কিছু করিনা।
তোমার বিয়ে হয়েছে?
কথাটা শুনেই শালিনী বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে। আমায় কি দেখে মনে হচ্ছে আমি বিবাহিতা?
না মা। জিগ্যেস করলাম বলে কিছু মনে করনা।
না না। আচ্ছা মাসিমা বিয়ে ছাড়া কি মেয়েদের কিছু কাজ নেই! বিয়ে না করে কি মেয়েরা সমাজের অন্য কোন ভালো কাজ করতে পারে না! আপনার কি মনে হয়।
কাজ তো অনেক আছে মা। কেউ এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছে , কেউ ক্রিকেট খেলছে , কেউ সাঁতার কাটছে , কেউ সিনেমা করছে .......
এগুলো সমাজের মঙ্গলের কাজ কিনা জানিনা তবে হ্যাঁ নাম যশের জন্য ঠিক আছে।
তুমি কি কিছুই কর না মা?
দেখে কি মনে হচ্ছে আপনার? ... উল্টো প্রশ্ন শালিনীর।
কিছু একটা কর নিশ্চয়। কি কর মা?
কলেজে পড়াতাম এখন পড়াইনা। বেকার বলতে পারেন।.... ইচ্ছে করেই কিছু খুলে বলল না , আবার বিয়ের কথা না পেড়ে বসেন মহিলা। ম্যাগাজিনটায় চোখ বুলতে লাগলো। প্রত্যেক বয়স্কা মহিলাদের এই এক প্রশ্ন ; বিয়ে , ছেলে মেয়ে বিরক্ত লাগে এক ঘেয়ে কথা শুনতে। অন্য কোন প্রশ্ন নেই?
মহিলা , মনের মতন উত্তর না পেয়ে চুপসে গেলেন। উনিও একটা বোই বার করে মুখের সামনে ধরলেন।
খুব অলস লাগছিল শালিনীর। অনেকটা পথ এক টানা অটো তে। সেই সকালে বেরুন। ট্রেনে এসির ঠাণ্ডাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানেনা। টি টি র ডাকে উঠে পড়ে।
টিকিট চেকিং এর পর আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সামনের মহিলাও ঘুমিয়ে পড়েন।
রাতে ট্রেনের জঘন্য খাবার খেতে রুচিতে বাধলেও উপায় নেই। ডিনারে , ভেজ খেয়ে আবার শুয়ে পড়ে। আসলে জেগে থাকলেই ভদ্রমহিলার প্রশ্ন বাণে জর্জরিত হতে হবে। অহেতুক কথা বাড়বে তার চেয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়।

আবিষ্কারের নেশা
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী
৪র্থ পর্ব
হাওড়া ষ্টেশন এ গাড়ী ইন করে প্রায় আধ ঘণ্টা লেটে। নিজের লাগেজ গুছিয়ে প্ল্যাট ফর্মে হাঁটা দেয়।
প্রি পেড ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে পড়ে।
বাড়ি পৌঁছে শান্তি। সোজা বাথ রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়।
মা’ জল খাবার নিয়ে মুখের সামনে , সঙ্গে চা।
চলে এলি ভালো হল। বাবা আমার চিন্তা গেল। মেয়টা কোথায় রইলো কি খেল!
প্রত্যেক দিন ত তোমায় ফোন করতাম। তবু চিন্তা!
হবেনা?
কেন?
ও তুই বুঝবিনা। বই ছাড়া ত কিছু জানিশনা। নে খেয়ে নে। পরে কথা হবে।
সত্যি খিধে পাচ্ছিল। ট্রেনের যা খাবার! গা গুলোয় খেলে। লোকে বাধ্য হয় তাই খায়।
বিকেলে দিদি এলো।
কিরে শালু ফিরে এলি?
কি করতাম তাহলে?
কেন তোর রিসার্চ!
শেষ করেই ত এলাম। ছোট প্রোজেক্ট। এবার দেখি কি করি। নাইজারে (NISER) সাইন্টিস্ট চায় দেখি পাই কিনা। ওটা ভালো ইন্সটিটিউট , মাইনে ভালো। পেলে চলে যাবো। আমাকে আমার রিসার্চ চালিয়ে যেতে হবে , আমার টার্গেটে না পৌঁছন পর্যন্ত।
সারা জীবন টা কি এই করেই কাটাবি?
এ ছাড়া আর কি করবো বল? আমি ত তোদের মত গুছিয়ে ঘর সংসার করতে পারবো না।
কেন পারবি না! আমারা কি পারতাম? পারতে হবে সংসারের সেই নিয়ম।
এই খানেই তোর আমার মধ্যে মত ভেদ! “ওই সংসারের সেই নিয়ম” কথাটা আমি মানতে রাজি নই।
অফিস থেকে জিজু এসে হাজির। টুকাই আগে থেকেই এসে গিয়েছে। মাসির কাছে বেঙ্গালুরুর গল্প শুনছে।
হঠাৎ বাইরে রাস্তায় একটা প্রাইভেট কার আমাদের বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালো।
কার থেকে সু-টেড বুটেড এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এবং সঙ্গে এক ভদ্রমহিলা। হাতে মিষ্টি।
শালিনী কিছুই বুঝলোনা। ও নিজের ঘরে চলে গেল। এনাকে ত কোন দিন আমাদের বাড়ী দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না। ইনি কে? হঠাৎ মাথায় কারেন্ট লাগার মত একটা শক পেল। অজ্ঞান হয়ে গেল শালিনী। ভাগ্যিস বিছানায় পড়ে গিয়েছিল নাহলে কি হত কে জানে।
টুকাই ঘরে ঢুকে মাসিকে বিছানায় ও ভাবে পড়ে যেতে দেখে তার মাকে ডাকে। টুকাইয়ের ডাকে দিদি গিয়ে দ্যাখে শালিনী বিছানায় অস্বাভাবিক ভাবে পডে গিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে ডাক্তার আসেন। অর্ক নিয়ে আসে সঙ্গে করে।
যারা এসেছিলেন তারা হতভম্ব। বাড়ী সুধু সকলের হৈ চৈ। কি হল কি হল?
ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা বৈঠক খানায় বসে আছেন। কেউ কাছে নেই অথচ যেতেও পারছেন না ওনারা।
শেষে ভদ্রমহিলা ভেতরের ঘরে গিয়ে দেখলেন শালিনী বিছানায় শুয়ে। ডাক্তার , প্রেশার পালস দেখে জ্ঞান ফেরানোর জন্য চিকিৎসা সুরু করেন।
শালিনীর মা কপালে হাত জোড় করে ঠাকুর কে ডাকতে শুরু করেন।
কিছুক্ষণ পরে শালিনীর জ্ঞান ফেরে। ডাক্তার বাবু অর্ক কে কিছু প্রেসক্রিপশন দিয়ে চলে যান। অর্ক সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ নিয়ে আসে।
শালিনীর মা’র এতক্ষণ খেয়াল ই ছিল না ঘরের অতিথিদের কথা। কাছে গিয়ে হাত জোড় করে বলেন মেয়েটা বেঙ্গালুর থেকে এসে খুব দুর্বল লাগছিল। আজ কি যে হল আপনারা আসার সঙ্গে সঙ্গে এরকম অজ্ঞান হয়ে জাওয়া এই প্রথম বার ....
না না আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। এটা তো অপ্রত্যাশিত। কেউ কি জানতো এরকম হবে বলে। আমরা বরং আরেক দিন আসবো কেমন!
শালিনীর দিদি ও ঘর থেকে আসে চা জলখাবার নিয়ে।
মা বলেন ব

Saturday, March 17, 2018

পঙ্কজ ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ১৮.০৩.২০১৮ / রবিবার বেলা ১১.২৪ /



    পঙ্কজ
ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ১৮.০৩.২০১৮ / রবিবার বেলা ১১.২৪ /
কখন কখন মানুষের এমন বিপদ আসে,যে তার পক্ষে বাঁচা অসম্ভব হয়ে ওঠে।ঠিক সেই সময় কেউ বিপদ থেকে উদ্ধার করলে হয়তো সে নিশ্চিত মরণ থেকে রক্ষ্যা পায়। সেইসময় বিপদে পড়েথাকা ব্যক্তিটির কাছে যে তাকে বাঁচাল সে হয়ে জান সাক্ষাত ভগবান। নয়কি?

পঙ্কজ পাঁজা । নবম শ্রেণীর ছাত্র । ছিপ ছিপে গড়ন । মিস কালো রং । পড়াশুনোয় অষ্টরম্ভা । স্কুলের মাষ্টার মশাই প্রায় ওকে ক্লাস থেকে বের করে দেন। উনি প্রায়ই অসন্তুষ্ট হন  পঙ্কজের ওপর  কারন পড়াশুনোয় পঙ্কজের একদম মন নেই। গ্রামের নদীর ধারে পঙ্কজের ঘর সারা দিন ওই নদীতে সাঁতার কাটা, ছিপ নিয়ে মাছ ধরা ইত্যাদি । ক্লাসে প্রায় সব বিষয়ে ৩০এর নিচে নম্বর। তবে হ্যাঁ খেলা ধুলোয় ও খুব ভালো । দৌড়ন , সাঁতার কাটাতে ওর জুড়ি কেউ নেই । এ ছাড়া বাস্কেট বল , ভলি ত আছেই। মাষ্টার মশাই বলেন যা স্পোর্টস হস্টেলে গিয়ে থাক আমার মাথা খাসনে।
পঙ্কজ মাথা চুলকে বলে,সার আমার দ্বারা পড়াশুনোটা হবেনিকো । ওই স্কুল ফাইনাল অবধি  আমাকে একটু সহ্য করেন । ওটা পাস করলেই পড়া ছেড়ে স্পোর্টস হস্টেলে নাম লেখাবো । দেখবেন সার আমার নাম একদিন কাগজে বেরুবে তখন আপনি বলবেন এই পঙ্কজ আমাদের স্কুলের ছাত্র । আমার ছাত্র । গর্বে আপনার ........
সার ধমকে উঠলেন থাম থাম ! তোর জন্য আমার গর্ব হবে কেন ? তুই অঙ্কে ১০ , ইংলিশে ১৫ এমনকি বাংলায় মাত্র ২৫ পেয়েছিস এবার । কি করে তুই আশা করিস স্কুল ফাইনালটা পাস করবি ? তোর মতন গর্দ্ধব অপদার্থ ছাত্রর জন্য আমার গর্ব হবে ? ছ্যা ছ্যা !! যা বাড়ি যা । বাবাকে বল তোকে স্কুল থেকে টি.সি নিয়ে অন্য গ্রামের স্কুলে ভর্তি করবেন । কাল একবার আমায় দ্যাখা করতে বলিস তোর বাবাকে।
পঙ্কজ মাথা চুলকিয়ে বলে এমন শাস্তি দেবেন না সার । আমি বাবার কাছে মার খাবো ।
তাই খা । আমার মাথা খাসনে। সরকারের নিয়ম স্কুলে ছাত্রদের শাস্তি দেওয়া যাবেনা । তোদের মতন গাড়ল ছাত্রদের নিয়ে কি হবে ?
পঙ্কজ মাথা চুলকোয় আর মাষ্টার মশাইয়ের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
রবিবার সকালে পঙ্কজ প্রত্যেক দিনের মতন নদীর ধারে যায়। আনমনা হয়ে আপন মনে নদীর পাড়ে ঘুরছিল । মাথায় একটা চিন্তা স্কুল ফাইনাল টা কি করে পাস করে ।
হটাত প্রায় মাঝ নদীতে হাত দেখতে পেয়ে ঝপাং করে জলে ঝাঁপ দিল। দ্রুত গতিতে সাঁতার কেটে হাতটা যে জায়গায় দেখা যাচ্ছিল ওইদিকে সাঁতরে চলে গিয়ে হাতটা ধরে হিড় হিড় করে টেনে আনে পাড়ের দিকে। পঙ্কজ জানে হাত ধরে না টানলে ডুবে যাওয়া লোক প্রাণের দায়ে যে বাঁচাতে আসে তাকে আঁকড়ে ধরে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। ভগবানের অশেষ করুণা মহিলাটিকে পঙ্কজ বাঁচাতে পেরেছে।
এক পেট জল খাওয়ার জন্য পেট ফুলে জয় ঢাক। পাড়ে তখন লোকের ভিড় । একজন এসে মহিলাটির পেটে চাপ দিয়ে জল বার করে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহিলাটি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সবাই বলে আজ পঙ্কজ না থাকলে এই সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে মহিলাটি কখনই বাঁচত না। গ্রামের এক ধনি পরিবারে বৌ মহিলাটি । নদীতে স্নান সারতে এসে চোরা বালিতে পা পড়ে যায়। স্রোতের টানে মহিলাটি  প্রায় মাঝ নদীতে চলে যায় ।
পঙ্কজ কে দেখে মহিলাটি বলেন তুমি আমার কাছে ভগবান ভাই। আজ তুমি না থাকলে আমি কিছুতেই বাঁচতাম না। সকলে পঙ্কজ কে ধন্য ধন্য করে।
গ্রামের প্রধান এবং ব্লক অধিকারীর সুপারিশে জেলা শাসক স্বয়ং গ্রামে এসে পঙ্কজ কে প্রশংসা পত্র প্রদান করেন।  ওর নাম এই রাজ্য থেকে রাষ্ট্রপতির সাহসিকতার মেডেলের জন্য সুপারিস করা হয়। পরের বছর প্রজাতন্ত্র দিবসে পঙ্কজ সাহসিকতার জন্য মেডেল পায়। কাগজে নাম এবং ফটো বেরোয় ।
পঙ্কজ মাষ্টার মশাইকে দেখা করতে স্কুলে যায় । গড় হয়ে প্রণাম করে।
মাষ্টার মশাই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটাই কথা বলেন , আমি এবং আমার স্কুল সত্যি আজ  গর্বিত তোর জন্য । সত্যি তুই সাহসী ছেলে । তোর কথা অক্ষ্যরে অক্ষ্যরে ফলেছে।  এইরকম সাহসের কাজ সর্বদা করবি । ভগবান তোর সহায় হবেন।

সকলের দ্বারা পড়াশুনো হয়না। কিন্তু সে তার সাহসিকতা দিয়ে অনেক সময় উল্লেখনীয় কাজ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই গল্পটি তার ই এক প্রতিচ্ছবি । 
৬০৪ শব্দ   

Wednesday, February 28, 2018

         
        মৌসুমি দাস ঘোষ 
       ৬৪/বি কালিচরণ লেন                                
  

রাত একটা বাজে। নিঝুম নিস্তব্ধ ৬৪/বি কালিচরণ লেনের ভাড়া বাড়ির বড় খাটটার ওপর অতিশ গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু পারমিতার চোখে ঘুম নেই। ধীরে ধীরে পূবের বড় জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো পারমিতা। খোলা জানালা দিয়ে নির্নিমেষে চেয়ে রইলো বাইরের আকাশটার দিকে। সন্ধ্যেবেলার জমাট মেঘটা কেটে যাওয়াতে একটা দুটো করে বেশ কিছু তারা এসে ভিড় জমিয়েছে নিকষ কালো আকাশটার বুকে। কোনটা মিটমিট কোনটা বা স্থির হয়ে আলো দিচ্ছে। ৬৪/বি কালিচরণ লেনের এই বাড়িটাতে আসার পর থেকে কবে যে এভাবে আকাশের দিকে চেয়ে তারা দেখেছে মনে করতে পারলো না পারমিতা।

ছোটবেলায় ছাদে বসে বাবার সাথে প্রথম তারা দেখার শুরু। মনে আছে গরমকালে লোডশেডিং হলে বাবা ছোট্ট পারুকে নিয়ে ছাদে এসে বসতেন। আঙ্গুল দিয়ে দিয়ে তারা চেনাতেন, “ওই দেখ ধ্রুবতারা, ওই লালচে রঙের তারাটা হল মঙ্গলগ্রহ আর সাদা ঝকঝকে উজ্জ্বল যে তারাটা দেখছিস, ওটা হল বৃহস্পতি। আকাশের ওই তারাদের ভিড়ে মিশে আছেন তোর ঠাকুরমা, তোর মা। ওইখান থেকে ওঁনারা আমাদের দেখছেন, আমাদের কথা শুনছেন”।

চোখের কোনটা ভিজে উঠলো পারমিতার! অনেকদিন পর মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ছে! খোলা জানালা দিয়ে আকাশের বুকে তারাদের ভিড়ে কেবলি তাঁদের খুঁজে বেড়াচ্ছে! মা সেই কোন ছোটবেলায় আকাশে চলে গেছেন! বাবার কাছেই বেড়ে ওঠা। আর সব মেয়েদের মত মায়ের সঙ্গ পায়নি বলে ছোট থেকেই পারমিতা একটু ভীতু, মুখচোরা, প্রতিবাদ না করে মানিয়ে চলা গোছের মেয়ে। বাবা মেয়েকে যথেষ্ট আগলে রেখেছেন, তবুও মায়ের স্থান তো নিতে পারেন নি। মেয়েলী সমস্যার সমাধানে মায়ের সাহায্য থেকে বঞ্চিত পারমিতা একটু বেশিই নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

যদিও আজ বেশি করে বাবার কথাই মনে পড়ছে! এতদিনে সে বুঝে গেছে গুরুজনেরা যা বলেন বা করেন, সবটাই সন্তানের ভালোর জন্য। বাবা প্রথম যেদিন অতিশকে দেখেছিলেন সেদিনই প্রবল আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু পারমিতা তখন অতিশের প্রেমে এতটাই উন্মত্ত যে বাবার আপত্তির কথা ভাল তো লাগেইনি বরং যে বাবা পারমিতার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে না করে ছোট্ট মেয়েটাকে আঁকড়ে এতদিন বেঁচেছিলেন, সেই বাবাকে নিজের চরম শত্রু বলে মনে করেছিল। আর তারপর একদিন বাবাকে না জানিয়ে মাত্র চার মাসের প্রেমিক অতিশের চাপে কলেজ থেকে বাড়ি না ফিরে, নদীর ধারের কালী মন্দিরে কোনোরকমে বিয়েটা সেরে সোজা এসে উঠেছিল ৬৪/বি কালিচরণ লেনের অতিশের ছোট্ট এই ভাড়া বাড়িতে।

তখন অতিশ একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ছিল। পারমিতা সবে কলেজের প্রথম বর্ষ। পরবর্তীতে অতিশ বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মীতে প্রোমোশন পায়। কিন্তু পারমিতা আর পড়াশুনা করেনি। এদিকে এভাবে বিয়ে করার জন্য বাবার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না ওদের। তারপর অভিমান করে থাকতে না পেরে এক বিকেলে স্নেহ বৎসল বাবা নিজেই এসেছিলেন একমাত্র মেয়ের বাড়িতে। তারপর থেকে আসা যাওয়া শুরু হলেও অতিশ কোনোদিন পারমিতার বাবাকে ভাল চোখে দেখেনি। পারমিতাকেও বাবার বাড়ি যেতে দিত না। যদিও ঘরের বাইরের লোকের কাছে অতিশ খুব নম্র ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত! মাথা নিচু করে পথ চলে। কারো সাথে কোন ঝামেলায় নেই ।স্ত্রী ছাড়া কোন মহিলার দিকে চোখ তুলে চায় না।

তা প্রথম দিকে পারমিতাও স্বামীর চাকরি, স্বভাব নিয়ে খুব অহংকার করতো। বিশেষ করে নিজের স্ত্রী ছাড়া কোন মহিলার দিকে চোখ তুলে চায় না, বাড়িতে ফিরেই স্ত্রীকে নিয়ে আদরে মেতে ওঠে। সে স্বামীর ঘরণী মানে স্বামী সোহাগিনী! আর কোন মেয়েই বা স্বামী সোহাগিনী হতে চায় না! কিন্তু ধীরে ধীরে অতিশের দিনের বেলার নম্র ভদ্র রুপটা সরেগিয়ে রাতের অন্ধকারে বন্ধ ঘরের ভেতর একটা জানোয়ারের রুপ নিতে শুরু করলো! অতিশেরভালোবাসা ভয়ঙ্কর রকমের বিকৃত যৌন অত্যাচারে পরিণত হল। স্ত্রীর ইচ্ছে থাকুক বা না থাকুক,শরীর ভাল আছে কি না আছে, কোন কিছুকেই আমল না দিয়ে যখন তখন জোর-জবরদস্তিচলতো। বিভিন্ন ধরনের বিকৃত উত্তেজক ছবি দেখা আর স্ত্রীর ওপর তা প্রয়োগ করাটা এক নেশায়পরিণত হল! অতিশের বিকৃত ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনরকম আপত্তি করলেই ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতো।একে তো স্বেচ্ছায় বাবার বাড়ি ছেড়ে এসেছে অতিশের কাছে, তায় আবার লেখাপড়া ও উচ্চমাধ্যমিকে ইতি টেনেছে। কি যে করবে পারমিতা বুঝে উঠত না!  ভোর হলেই অতিশ ভালমানুষ হয়ে যায়! তখন পারমিতা কান্নাকাটি করে, বোঝায় অতিশকে, কিন্তু কোন পরিবর্তন নেই!রাত হলে আবার সেই হিংস্র জানোয়ারের রূপ নেয়।

বাবাকে তো আর এসব কথা বলা যায় না! তবুও একদিন আভাষে ইঙ্গিতে মানসিক অশান্তির কথা জানালে বাবা বলেছিলেন “একদম যদি মানিয়ে নিতে না পারিসতবে চলে আয় না আমার কাছে । পড়াশুনাটা আবার শুরু কর,আমি বেঁচে থাকতেই দেখ যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস”। কিন্তু চলে আসতে পারে নি পারমিতা।বাবার কাছে পাকাপাকি ভাবে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই আচমকা একদিন স্ট্রোক হয়ে বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান!উচ্চমাধ্যমিক পাশ পারমিতার তিন কূলে আর আপন বলতে কেউ রইল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই স্বামীর ঘরে মুখ গুঁজে থাকা। কিন্তু পারমিতা অতিশকে ত্যাগ করে বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ারসিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই কারণে অতিশ দিনে দিনে অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে পারমিতার ওপর বিকৃত অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়!

মুখচোরা অন্তর্মুখী চরিত্রের পারমিতা কাকে বলবে এসব কথা?মাঝে মাঝে ভাবতো, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে! কিন্তু কোথায়, কার কাছে যাবে? কাকেই বা বলবে এসব কথা? যদি অতিশের কানে ওঠে তবে হয় অত্যাচার করে মেরে ফেলবে, নয় বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে! তখন কি করবে সে? তবুও একদিন সাহস সঞ্চয় করে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বয়সীবড় ননদকে অতিশের বিকৃত যৌন অত্যাচারের কথা জানায়। শুনে বড় ননদ অবাক হয়ে বলেছিল,
 “আমার হীরের টুকরো ভাইয়ের সম্পর্কে এসব কি বলছ তুমি? ওকত ভাল ছেলে তা তুমি জানো? ছেলেদের একটু আধটু অমন শারীরিক চাহিদা থাকে! স্ত্রীদের কর্তব্য তা পূরণ করা! তোমার জামাইবাবুরও আছে! আমি নিঃশব্দে তা পূরণ করি। আমি কি ঘরেরবাইরে সে সব কথা পাঁচ কান করতে গেছি? শুনেছো কোনোদিন? আর তুমি কিনা এসেছো তোমাদের চার দেওয়ালের ভেতরের কথা আমাকে জানাতে? ভাইয়ের কথামত চললেই তো পারো!কি গুণ আছে তোমার শুনি? ওই তো একটু রূপ! তাও তো আমার ভাই বউঅন্তঃপ্রাণ! অন্যমহিলার দিকে চোখ তুলেও চায় না! ভাই যদি তোমাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের কাছে রাত কাটাতো তোমার ভাল লাগতো?”

পারমিতা ভয়ে আর কথা বাড়ায় না! যদি অতিশের কানে ওঠে!নইলে ননদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, “সঙ্গমের সময় জামাইবাবুও কি বড়দির স্তন দুটোশক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে? সিরিঞ্জ দিয়ে গরম জল জোর করে যৌনাঙ্গে প্রবেশ করায়? শরীরের গোপন জায়গায় সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়? স্ত্রীর মুখে রেতঃপাত করে? বাবার মৃত্যুর পর চারদিনের কালাশৌচের মধ্যেও একজন পিতৃহারা কন্যাকে শোক করার সময়টুকু দেয় না যে স্বামী, তাঁকে কিভাবে মানুষ বলবে পারমিতা? চোখের জল মুছে ফিরে এসেছিল ননদের বাড়ি থেকে। তাই আজখুব মনে পড়ছে বাবার কথা! বাবার ইচ্ছেমত যদি লেখাপড়া মন দিয়ে করতো, তবে এদিন আজদেখতে হত না!

তাও যদি একটা সন্তান হত ওদের, তাহলে হয়তো কিছুটা পাল্টাতো অতিশ! কিন্তু ভগবানের কি যে মহিমা কে জানে! আট বছর হল বিয়ে হয়েছে, একটি সন্তানও আসেনি পারমিতার গর্ভে। অথচ দিন দিন অতিশের অত্যাচার বেড়েছে। আজকাল বাইরেরকারো সাথে সেভাবে মিশতে দেয় না। অফিস যাওয়ার সময় পারমিতাকে ঘরে তালা বন্ধ করে যায়।পারমিতাও ভয়ে কাউকে কিছু বলে না। স্বল্প শিক্ষিতা পারমিতা মহিলা কমিশনের নাম শোনেনি কখনো!

আজ সন্ধ্যেবেলা, হ্যাঁ, যে অতিশ বাইরের কারো সাথে পারমিতাকে মিশতে দেয় না, সে অতিশ সন্ধ্যেবেলা সাথে করে একজন অপরিচিতকে নিয়েএসেছিল। লোকটার চোখ দুটো যেন কেমন! বাইরে থেকে অনেক রকম খাবার কিনে এনেছিলঅতিশ। সেসব খাবার পারমিতাকে পরিবেশন করতে বলে। পারমিতা খাবার পরিবেশন করে দিয়েবেডরুমে চলে আসে। কিছুক্ষণ পর অতিশ এসে পারমিতাকে ড্রইং রুমে যেতে নির্দেশ দেয়। আরসঙ্গে এও বলে, “ইনি নাকি অফিসের বস। এনাকে একটু খুশি করতে হবে। বেশি কিছু না, একটুহেসে কথা বলা, অথবা উনি হাত টাত ধরলেও ধরতে পারেন। যদি শুতে চায়, পারমিতা যেন হেসেরাজি হয়! তাহলেই নাকি নতুন ফ্ল্যাটের জন্য অফিস থেকে অতিশ একটা বড় মাপের লোন পাবে”।

অতিশের কথাটা শুনে পারমিতা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল! দিনের পর দিন নিজে শারীরিক মানসিক অত্যাচার করেও ক্ষান্ত হয় নি! আজ আবার বাইরের লোকের কাছে নিজের স্ত্রীকে পাঠাতে চাইছে!! আজ এই লোকটিকে মেনে নিলে কাল আবার যে অন্যকাউকে বাড়ি আনবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই! আর তাই এই প্রথম আজ তীব্র প্রতিবাদকরেছিল পারমিতা! কিন্তু সে প্রতিবাদের মাসুল দিতে হয়েছিল চরম ভাবে। অপরিচিত সেই লোকটা অধস্তন কর্মচারীর সুন্দরী বৌকে হাতে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে অতিশকে গালাগাল দিয়ে চলেগিয়েছিল। আর তারপর ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে, অবাধ্য স্ত্রীর মুখ বেঁধে, বেল্ট দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মেরেছিল অতিশ। সারা শরীরে চাকা চাকা কালশিটে করে দিয়েছে! তারপর নিজে ক্লান্ত হয়ে হাঁপাতে শুরু করে। প্রবল শ্বাসের সমস্যা শুরু হয় অতিশের!

কিছুদিন ধরেই অতিশ শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছে। সকালসন্ধ্যায় নিয়ম করে ইনহেলার নিতে হচ্ছে। আজ সন্ধ্যের ইনহেলার সময় মত নেওয়া হয়ে ওঠেনি।অতিশ হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানায় বসে পড়ে। টেনে টেনে শ্বাস নিতে নিতে পারমিতাকে আদেশ করেইনহেলারটা পাশের ঘর থেকে এনে দেওয়ার জন্য। পারমিতা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটাকেকোনোরকমে টেনে নিয়ে গিয়েছিল পাশের ঘরে, যেখানে টেবিলের ওপর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে ইনহেলার রাখা ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি যে বুদ্ধি হল পারমিতার! প্রচণ্ড আক্রোশে অতীশকে একটু শাস্তি দিতে চট করে ইনহেলারটা লুকিয়ে ফেলল। আর পুরনো খালি একটা ইনহেলার এনে এগিয়ে দিল অতীশের দিকে। অতীশ কোন প্রশ্ন না করেই সেটা নিয়ে প্রাণপণে পাফ নিতে লাগল। কিন্তু ফাঁকা ইনহেলারে কিছুই হল না। শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলল। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে লাগল! মুখের শিরা উপশিরা ফুলে উঠলো অতিশের!

এখন বিছানায় শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে অতিশ। ভোরের আলো এসে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে পূবের খোলা জানালা দিয়ে। অনেক দিন বাদে আজ এই ভোরেরআলোটা খুব সুন্দর আর মিষ্টি লাগছে! পারমিতা জানালার কাছ থেকে সরে এলো। বিছানার একপাশ থেকে অতিশের মোবাইলটা তুলে নিল। একটা নম্বর ডায়াল করে বলল, “হ্যালো, কালিপুকুর থানা? আমি ৬৪/বি কালিচরণ লেন থেকে বলছি। এখুনি চলে আসুন। কাল রাতে এখানে একটা খুনহয়েছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুনই হয়েছে! আমি ওনার বাড়ি থেকেই বলছি। আমি কে? মৃতর স্ত্রী পারমিতা বলছি!”

নিজস্বী (Selfie) ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ২৮.০২.২০১৮ /




                  নিজস্বী (Selfie)
        ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ২৮.০২.২০১৮ /
পার্কে গিয়ে দেখি অবাক কাণ্ড । একটি মেয়ে আর ছেলে দুজনে বাঁশের মত এক লাঠি নিয়েছে তার সামনে মোবাইল ! কি হল ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হল। দেখি বটন টিপলেই ছবি উঠছে। সত্যি চায়নার প্রযুক্তিবিদ রা এ দেশের ছেলে মেয়েদের মাথা কি করে খেতে হয় তার নিত্য নতুন  উপায় বার করছেন । আমরা গাড়ল ওদের প্রযুক্তি নিজেদের দেশের জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে বড় গলায় বলি “আচ্ছে দিন” । 
 মানষী  , মানস  দুই অন্তরঙ্গ প্রেমী যুগল । ওদের নিজস্বী তোলার  স্বাদ বড় বিচিত্র । কখন নদীর বাঁধের ধারে , কখন শক্ত পাথরের ওপর । কখন বা চলন্ত মেট্রো তে। এক এক ছবি তোলে আর আপলোড করে মোবাইলে।  মানস বড়লোকের বকাটে ছেলে কিন্তু মানষী  ত তা নয় । মানষী  এই সহরে নতুন । দ্বিতীয় বর্ষ ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্রী । সাধারণ ঘরের মেয়ে। বাবা মা , মেয়েকে হস্টেলে রেখে নিশ্চিন্ত । মাস-গেলে মোটা টাকা মানষীর  এখানকার ব্যাঙ্ক একাউন্টে ক্রেডিট হয়ে যাচ্ছে । প্রতিদিন মা রাতে একবার মেয়েকে ফোন না করলেই নয় । নানা প্রশ্ন ।
... হ্যাঁরে কি খাচ্ছিস ? পড়াশুনো করছিস ত ! ভালো রেজাল্ট করতে হবে মা । বাবার চাকরি আর বেশি দিন নেই।
...এক সঙ্গে এতগুলো প্রশ্নের জবাবে মানষী   হাঁপিয়ে ওঠে ..... ওঃ মা , আমি কি বাচ্চা ? সব ঠিক আছে । তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। 
মায়ের মন কি বোঝে রে ! জীও সিমের জন্য ভিডিও কল করেন মা। মেয়েকে একবার চাক্ষুষ দেখা। মনে শান্তি যাইহোক মেয়ে আমার ভালোই আছে ।  
মানস কলেজে তয়াতা ইনোভা নিয়ে আসে । রোজ নতুন নতুন সাজ । প্রচুর বন্ধু । মানষী  ওর ফাঁদে পা দিয়ে নিজের সর্বনাশ যে ডেকে আনছে তা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলোনা । প্রত্যেক দিন ঘোরা , বেড়ান , দামী হটেলে খাওয়া আর গিফট পাওয়া। মানষীর  রুম মেট অরুণা , ওকে অনেক বারুণ করে মানস এর  সঙ্গে মেলা মেশা করতে । কিন্তু কোন ফল হয়না। 

উলটে মানষী  বলে , তুই বড় জেলাস । আসলে তুই সহ্য করতে পারিস না আমাকে আর মনিষ কে এক সঙ্গে । তাই বলে বিনাশ কালে বিপরীত বুদ্ধি । অরুণা চুপ থাকতে বাধ্য হয়।

এরমধ্যে মানস  বাবার ফার্ম হাউসে মানষীকে  নিয়ে এক সন্ধ্যা বেলায় ওঠে। মানস  ড্রিংক  করে । ফার্ম হাউসের দারোয়ান কে বলে বাইরে পাহারা দিতে।

দারোয়ান গরীব হলেও তার নৈতিকতা বোধ আছে। সে মানষীর  মধ্যে তার গ্রামের মেয়ের ছবি দেখতে পায়। সে বলে , বাবু আপনার বাবা জানলে আমায় আস্ত রাখবেন না । আপনি বিটিয়াকে তার বাসায় নিয়ে জান । আপনি আমার ছেলের মতন বাবু । এই বুড়ো বাপের কথাটা শুনুন।

কথাগুলো শুনে মানষীর  চৈতন্য উদ্রেক হয় । সে বুঝতে পারে সে এক ফাঁদে পা দিয়েছে ।        তাই হটাত ফার্ম হাউস থেকে দৌড়তে থাকে রাস্তার দিকে। রাস্তায় ছুটতে ছুটতে এক ভ্যান রিক্সা পায় । মানষী  তাতেই উঠে পড়ে । গ্রামের রাস্তায় একা মেয়েকে সন্ধ্যা বেলায় ভ্যান রিক্সা বালা দেখে আশ্চর্য হয়।

মানষী  হাত জোড় করে ভ্যান চালক কে বলে তার বড় বিপদ তাকে যেন নিয়ে যায় । একটা দশ টাকার নোট ও তার হাতে বাড়িয়ে দেয়। 

ভ্যান রিক্সা-বালা বোঝে কিছু একটা ঘটেছে । বাক্যব্যয় না করে জোরে প্যাডেল চালায়। 
মানস ছাড়ার পাত্র নয় । সে তার ইনোভা ছোটাল মানষীর  পেছনে।
দারোয়ান তার পুরন সাইকেল নিয়ে ছুটল ওদের পেছনে কে জানে আজ কিছু অঘটন ঘটতে চলেছে কিনা ।
ইতিমধ্যে মানস , মানষীকে  প্রায় ধরতে চলেছে । ঠিক সেই সময় প্রচণ্ড জোরে ইনো-ভা গাড়ীটা ধাক্কা লাগে রাস্তার ধারের এক গাছে। আসলে মানস প্রচুর ড্রিঙ্ক করেছিল তাই গাড়ী সামলাতে পারেনি। পাওয়ার স্টিয়ারিং একটু বেসামাল হলেই এক্সিডেন্ট অব্যর্থ । সেই হল ।
চক্ষের নিমিষে এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। গাড়িটা প্রচণ্ড আওয়াজ করে থেমে গেল। ড্রাইভারের সিটের পাসের জানালা দিয়ে দেখা-গেল মানসের মাথা-থেকে প্রচণ্ড রক্ত স্রাব হচ্ছে ।
এরমধ্যে দারোয়ান এসে পৌঁছে যায়। ভ্যান রিক্সা চালক গাড়ি থামিয়ে ঘটনা দেখার জন্য নেবে পড়ে । মানষী  নির্জীব মানুষের মতন বোবা হয়ে  দাঁড়িয়ে থাকে। সে বিশ্বাস করতে পারেনা তার নিজের চোখ কে । সে বুঝতে পারে এখন পুলিশের ঝামেলা হবে । বাবা মা’র কানে সব উঠবে। তার হয়ত পড়া বন্দ হতে পারে......।
নিজস্বী ছবিগুলো তার নিজের মোবাইল থেকে সব ডিলিট করে দেয়। কিন্তু মানসের  মোবাইল ? সেটার কি করবে........... ? 
      ৬১১ শব্দ ।

Thursday, December 14, 2017

আকাঙ্ক্ষা ,পারোমিতা দুই বোন । দুজনের বয়েসের ব্যবধান মাত্র এক বছর। দুই বোনই এক ইংলিশ মিডিয়াম কোএড্ স্কুলে পড়ে । স্কুল
বাস আসে সকাল ৭.৩০ টার সময় । শীতে কুঁকড়ে দুজনে বিছানা থেকে ওঠে সকাল ৬.৩০ টার সময়। সটান বাথরুমে ঢুকে নিত্যকর্ম সেরে বেরুনোর
সময় ৭.০০ টা বেজে পাঁচ কি দশ মিনিট । তার পর খাওয়া সেরে বাসের জন্য অপেক্ষা । আরম্ভ হয় সারা দিনের জমে থাকা কিছু গল্প আর
বয় ফ্রেন্ডদের নিয়ে কিছু ছুঁক ছুঁকুনির কথা পারোমিতার । যাকে বলে চুলবুলি লেড়কি হিন্দিতে । উপায় নেই যুগের টানে এরকমটা হবেই । মানুষের কিছু জেনে-টিক আর একুয়ার্ড ক্যারেক্টার থাকে । কোন কোন সময় একুয়ার্ড ক্যারেক্টারটা বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয় । সেগুল ভাল হতে পারে আবার খারাপ ও হতে পারে । যদি খারাপের দিকে যায় তবে সর্বনাশ। সামাজিক দিক থেকে ভয়ঙ্কর ও হতে পারে। যা বাবা মা ভাই বোনের মাথা ব্যথার
কারন হয়। ধরাজাগ সেইরকম ই ক্যারেক্টারের মেয়ে পারোমিতা ।
আকাঙ্ক্ষা একটু আলাদা ও পড়াশুনোর গল্প বেশি করে বন্ধুদের সঙ্গে। কিছু প্রব্লেমের কথা যা হয়তো সল্ভ হচ্ছেনা বা অন্য কিছু । ও পড়াশুনোতে ভাল । ক্লাসে বরা বর ফার্স্ট হয় পারোমিতা ঠিক তার উল্টো। টিভি প্রোগ্রাম , সারুখ্ সলমন হৃত্তিক ইরফান  আর বাংলার দেব ছাড়া  ভাবতেই পারেনা ।ও বলে মাস ক্লাস বাঙ্ক করে সিনেমা যাওয়া র এক্সাইটমেন্ট ই আলাদা । । টিচারকে এফ বি তে জন্মদিনে গিফট পাঠানো । লিটিল হনি বলে বয় ফ্রেন্ড কে চুমু খাওয়া । এসবে থৃল আছে বল । কথা-গুল বলে দম নেয় ।ওর দিদি এসব শুনেও শোনেনা ।এরমধ্যে আকাঙ্ক্ষা সি বি এস সি র ১০ম শ্রেনিতে ৯৮.৮% নাম্বার রেখে পাস করেছে । কলেজে সাইন্স নিয়ে পড়ছে ।সেদিন আকাঙ্ক্ষা খবরের কাগজে খবরটা পড়ে  আতঙ্কিত হয় কারন ও
প্রত্যেক দিন বাসে কলেজ যায় ফেরে প্রায় রাত ৭ টার পর । খবরটা এইরকম ঃ-:-“সকাল দশটায় ওদের কলেজের কাছা কাছি এক এলাকায় চলন্ত বাসের ভিতরেই এক তরুণীর হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিল জনা চারেক মদ্যপ যুবক ।উপায় না দেখে চলন্ত বাস থেকেই লাফ দিয়ে নেমে ছুটতে ছুটতে কলেজে পৌঁছলেন ওই তরুণী। জনা কয়েক সহপাঠীকে কোনও মতে ঘটনাটা জানিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারালেন তিনি।রক্তাক্ত অবস্থায় হাঁসপাতালে ভর্তি করা হয় কলেজের ছেলেদের প্রচেষ্টায় ।
এই শহরের বুকে দিনের বেলায় আরও এক বার এই ঘটনা , শহরের রাস্তায় মহিলাদের নিরাপত্তার অভাবটাকেই ফের বেআবরু করে দিল। দিল্লির
বাসে তরুণীকে গণ-ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল , সে প্রতিবাদে গলা মিলিয়েছে আমাদের শহরেও । কিন্তু তার পাশাপাশি এই শহরের বাস এবং রাস্তাই বা আলাদা কিসের , এ প্রশ্নটাও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে”। ঘটনাটা  অনেক দিন আগের কথা ।
কাকে বলবে ? বোন তো পাত্তা দেয়না। বলে তোর বয় ফ্রেন্ড থাকলে ওই তোকে প্রটেক্ট করবে । দিদি তুই ভারি আন-স্মার্ট আর ভীতু । মা’কে
বললে বলবেন আর পাঁচটা মেয়েদের মতন তুমি হতে চেষ্টা কর । এসব কথা মনের ভেতর রেখে গুমরচ্ছিল আকাঙ্ক্ষা । ও কি সত্যি আর পাঁচটা মেয়ের মতন নয় ? তবে ওর পড়াশুনো কি বৃথা ! মনের মধ্যে তোল্পাড করে সব প্রশ্ন । আয়নার সামনে নিজেকে দেখে । ভরা যৌবনে মেয়েদের যা
সৌন্দর্যের বিকাশ হওয়া উচিৎ  ওর ক্ষেত্রে তা ব্যাতিক্রম । অসব  কিছু্র ই  পরি-প্রকাশ পায়নি।খুব সাধা মাটা মেয়ে । সাজতে জানেনা বললেই চলে । এতো সাধারণ মেয়ে আজকাল খুব একটা চোখে পড়েনা।
পরোমিতা ঠিক উল্টো। প্রসাধনের সামগ্রী কেনার চেয়ে গিফট বেশি পায়। বয়ফ্রেন্ডের অভাব নেই । পারমিতা কে দেখতে সুন্দর এবং চোখ
ধাঁদানো চেহার । কস্মেটিক্স এর বাহারে ভুরু ভুরু গন্ধ । ছেলেদের মন ভোলানো চেহারা । এখন থেকেই ডেঁপো । পডাশুনোয় অষ্টরম্ভা ।কোনমতে পাস করে । টুকলি করতে ওস্তাদ্ বোধহয় । কিন্তু বুদ্ধি প্রখর । ছেলেদের মাথায় টুপি পরাতে ওস্তাদ ।
আগেই বলেছি আকাংক্ষা ক্লাসে ফার্স্ট হয় । রিপোর্ট কার্ডে সই করার সময় বাপি আকাংক্ষা কে খুব উৎসাহ দিয়ে বলেন ১২ ক্লাসে সাইন্সে র‍্যাঙ্ক
রাখতেই হবে । এখন থেকে আই. আই . টির এন্ট্রান্সের জন্য তৈরি হও। তোমাকে খড়গপুর আই আই টি তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াবো । ভাল রেসাল্ট
করলে জি. আর . ই দিয়ে আমেরিকা পাঠাবো। বি .টেক্ এর পর হয় গেট্ দাও নয় ক্যাট্ দাও । যদি এগুলো না দাও তবে ভাল রেসাল্ট করলে জি.
আর . ই টা দেবে । এখন থেকে তৈরি হও আমেরিকা কিম্বা ব্রিটেন যাওয়ার জন্য ।
পারোমিতা ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে যায় । বাপী জানেন ওর রেসাল্টের ব্যাপার ।বাপী বলেন , মেয়েদের পড়াশুন যে কত প্রয়োজন তা এখন থেকে না বুঝলে পরে আর সময় থাকবেনা মা । পড়াশুনোতে মন দাও । মেয়েদের রূপ যৌবন গুন তিনটে দিয়ে বিচার করার সময় রূপ যৌবন দুটোই কিন্তু বয়স আধিক্যে ফুরিয়ে যায় মা;থাকে শুধু গুনটা । ওটাই শেষ জীবনের ভরসা । তোমার বন্ধুদের জিজ্ঞাসা কর ; ওরা কি ক্লাসে লাস্ট্ বেঞ্চে বসা মেয়েকে ভাল বলবে !বাপীর টাকা মধু দাদার ভাঁড় নয় যে অফুরন্ত থাকবে । চিরদিন তো আমি আর তোমার মা থাকবেন না । যাও মাকে দিয়ে সই করাও । ওঁচা মেয়েদের আমি পছন্দ করিনা । তোমার ত সব বায়না শুনি তবুও তোমার এতো অধঃপতন কেন? লজ্জা করেনা ? দিদিকে দেখে সেখ ।
বাপীর কথা শুনে ওর চোখে জল আসে । চোখে জল নিয়ে বলে পরের বার ভাল করব ।গড প্রমিস্ বাপি । এবারের মত সই করে দাও !
থাক আর গড্ কে টেনোনা ! তিনি তোমাকে অহোরাত্র দেখছেন। তাঁর ,তোমার মত উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়েকে দয়া করার সময় নেই। গড খুব ব্যাস্ত মা ।
তোমার প্রাইভেট ট্যুটার এর প্রয়োজন হলে রাখ । কিন্তু রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই।
মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আঁচল ঠিক করতে করতে বলেন , “রাম রাম , প্রাইভেট টিউটর ? রক্ষে কর ! আরেক ফ্যাসাদ বাঁধাবে । ও যা পড়ছে পড়ুক । না পড়লে হেঁসেল ঠেলবে !” আমার সময় কোথায় ওকে দেখার ?”এটাত ঠিক কথা নয় । তুমি না দেখলে কে দেখবে ?”  বাপী বলেন।
কেন ওর দিদির কাছে বসে পড়তে পারেনা ?
দেখ সুমি (মায়ের নাম সুমিতা , বাপী ‘সুমি’ বলেই ডাকেন) তোমার মেয়েদের  প্রতি দায়িত্ব বোধ না থাকলে ওরা কি করবে ভবিষ্যতে? মা’র নজর
মেয়েদের দিকে বেশি থাকা উচিৎ । নাহলে পরে পস্তাবে । আমার ত ওদের দেখা সম্ভব নয় । কেন? আমার একার দায়িত্ব কেন? তোমার মেয়ে নয় ওরা ? তোমার কোন দায়িত্ব নেই !‘দায়িত্ব’ শব্দটা খুব জোরদিয়ে বিদ্রূপের সঙ্গে উচ্চারণ করলেন সুমিতা দেবী ।
আহ্ ! আমি কি তাই বলছি ! বোঝ না কেন? আর সেরকম বুঝলে চাকরি ছেড়েদাও । তুমি ত সখের জন্য চাকরি কর ! ওটার কি কিছু প্রয়োজন আছে? যদি মেয়েরা মানুষ না হইয় তবে ওই চাকরি থাকার চেয়ে না থাকা ভাল !
কি ? আমি সেক্রিফাইস্ করবো আর উনি প্রাইভেট সেক্রেটারি কে নিয়ে টুরে যাবেন ; আজ মুম্বাই কাল দিল্লী পরশু সিঙ্গাপুর । অফিস ছাড়া বাড়ির হাল কি হচ্ছে বুঝেছ কখন ! বাহ ! সুন্দর !! চমৎকার সল্যুশন । পারবোনা চাকরি ছাড়তে !! ও মেয়ের এমনিতেই বারোটা বেজে গিয়েছে । আমি কি করব ?
দ্যাখো যা জাননা সে বিষয় নিয়ে কথা বোলনা। আমার চাকরিটা খাটুনির আর দায়িত্ব সম্পন্ন কাজ । তুমি ভাল করে জান সেটা । ওটা ঊল বোনার
চাকরি নয় যে মেয়েরা পাস করলো কি না করলো মাস গেলে জমা খাতায় মাইনে ঢুকে যাবে গুঁতো মেরে । চাকরি ? আর চাকরি দেখিওনা !! মেয়েদের সামনে স্বামির সঙ্গে কি করে কথা বলতে হয় সেটাই তো শিখলে না? যত্তো সব । বাবা গাড়ীর চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন গজ্ গজ্ করতে করতে ।
মা বাপির কথা কাটা কাটির মধ্যে পারোমিতা মা’কে দিয়ে টুক করে সই করিয়ে নেয় । মা অজান্তে সই করে দেন । কিছুটা নিশ্চিন্ত এবারের মতন।
এবার পড়াশুন টা করতে হবে মন দিয়ে। মোবাইলে কল আসে সুমিতের । সুইচ  অফ করে দেয় । না আর সুমিতের সঙ্গে যাবেনা সে । শেষে কিনা
হেঁসেল ঠেলতে হবে ! ম্যা গো !! মাথাটা টন টন করছে । দিদিকে দেখ ? খুব খুশী , আমাকে বাপী বকেছেন বলে । ভালো পড়ে বলে খুব অহংকার দিদির।
ঈশ্বর প্রেমিক প্রেমিকাকে একি ছাঁচে বানান না । কিছু তার তম্য থাকে ।আদর্শ শব্দটি অভিধান থেকে মুছে গিয়েছে আজকাল। সিটি সেন্টারে ওরকম অনেক যুগল ই ঘুরে বেড়ান । আমি একটা ঘটনার কথা বলি । সেদিন রাজার হাট্ দিয়ে ফিরছিলাম আমার কারে । তখন বাজে রাত ১১ টা । হঠাৎ আমাদের কারটাকে দুটো বাইক্ সম্ভবতঃ হিরো মোটর্সের লেটেস্ট মডেল নামটা বলতে পাচ্ছিনা , যাইহোগ বাইকে দুই প্রেমি জুগল যাচ্ছেন । পিলিওনে যে মেয়েটি ছিলো সে বোসে নয় ফুট রেস্টে দাঁড়িয়ে । বিদ্যুৎ গতিতে বাইক্ দুটি আমাদের ক্রস করে বেরিয়ে যায় । যদি এতোটুকু অসাবধান
হয় মৃত্যু সুনিস্চিৎ । এটা কি স্টান্ট্ না কি আমি বুঝলাম না । এদের মা বাবা এদের কি শিক্ষা দিয়েছে? অবিশ্যি মা বাবা কে দোস দিয়ে কাজ নেই
ওনারা কি জানেন? আমি ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম ও বোলল , সাহাব  আপ নেয়া হ্যায় । এ তো হামেশা দেখনেকো মিল্তা হ্যায় । মনে মনে ভাব
লাম আমরা কতো গ্রাম্য, এরা কতো সভ্য । এই যদি সভ্যতা হয় তবে হে ঈশ্বর আমাকে গেঁয়ো করেই রাখো! সে দিন থেকে আমি আর কাউকে
কিছু জিজ্ঞাসা করিনা । কান মুলছি নাক মুলছি আর না ।নিজের মেয়েদের কথা ভাবছি ! পারোমিতার  কি হবে ? ওর কি ভবিষ্যৎ ? আমার সময় নেই
এনার্জি ও নেই । সুমি তার স্কুল আর বান্ধবীদের নিয়ে ব্যাস্ত । পার্টীর জন্য আজ ধারনা তো কাল বন্ধ ।ছারখার হয়ে গেল এই দেশটা এসবের জন্য ।
সর্ব শিক্ষা অভিজানের লেকচার দেয় সুমি আর নিজের মেয়ে গোল্লায় যাচ্ছে ।
কি মারে বাবা । কিছু বলার উপায় নেই আমার । মেয়েটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে । দেখেও কিছু বলার উপায় নেই ।আমি নিরুপায়। কোম্পানির সার্ভিস ।
একটু এদিক ওদিক হলে সর্বনাশ । কাকে বোঝাব ? কথাটা উল্লেখ করলাম এইজন্য যে হামেশা নাকি এরকম হয় । আমরা ত দেখতে অভ্যস্ত নই তাই বোধ হয় আমার দৃষ্টিকটু লাগলো । মানুষ সহজ ভাবে নিচ্ছে। আমি বোধহয় গেঁয়ো হয়ে গেলাম বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে। আমার বন্ধুরা বলে তুই এইসব নিয়ে ভাবিস না। ও সব মডার্ন ছেলে মেয়ে। মনে মনে ভাবি আমার ত দুটো মেয়ে আছে ! তাদের মধ্যে ছোটটাই মাথা ব্যাথার কারন হচ্ছে । ওকে নিয়ে আমার চিন্তা ।
আমিত দেখছি আকাংক্ষার মতন মেয়েরাই বিপদে পড়ে  কারন ওরা নিজেদের নিরাপত্তার দিকে নজর দেয়না। পড়াশুনোতে এত ব্যস্ত থাকে
যে ওদের অন্য দিকে মন যায় না তার সুযোগ নেয় অসামাজিক ব্যাক্তি। তাই বলি জুডো ক্যারাটে টা মেয়েদের যানা নিতান্ত জরুরি । ওদের বন্ধু
হাতে গোনা হয় আর ছেলে বন্ধু থাকলেও তারা পাত্তা পায় না এদের কাছে। কিন্তু পারোমিতা ! তার বন্ধু শয়ে শয়ে । বাপী লেটেস্ট এপেলের আই ফোন্ সিঙ্গাপুর থেকে কিনে এনেছেন একটা মা আরেকটা পারোমিতার জন্যে ।বাপি কি জানেন মেয়ের কীর্তি ! মেয়েদের হাতে মোবাইল দেওয়া কি উচিৎ ?
বলেন রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই কিন্তু । আইফোন দিতে আপত্তি নেই। আকাঙ্খ্যার ওসবে কোন আগ্রহ দেখি না।
‘কচু’ রেসাল্ট না ছাই । মা বলেন । ওই মেয়ে গোল্লায় গেছে ।
হয়াটস এপ এ  এ ছবি পাঠান , মেসেজ বক্স এ জোক , লাভ এস .এম .এস সব ভর্তি । কে দেখবে? দেখার সময় কার আছে ? বাপি সকাল থেকে
বেরিয়ে যান ফেরেন রাতে। মা স্কুল টিচার অন্যকে জ্ঞান বিতরণে ব্যস্তনিজের মেয়েকে দেখার সময় নেই ? সোসিয়াল সার্ভিস করে ক্লান্ত । নারী জাগরন , নারী শিক্ষা এইসব নিয়ে ব্যাস্ত ।
স্কুলথেকে এসে এতোই ক্লান্ত যে মেয়ে কি পড়লো কি খেলো দেখার সময় নেই । টিভি, সিনেমার ম্যাগাজিন,তারপর খাওয়া ,ঘুম । ঘরে রান্না বান্না করতে হয়্না কারন রাঁধুনী আছেন ।২৪ ঘণ্টার কাজের লোক আছেন। মঞ্জু মাসি ।
ঘরে গার্জেন বলতে ঠাকুমা তাঁর তো বয়েস ৭৯+ অতএব তিনি কি করবেন? ঠাকুরপুজো তেই তাঁর সময় কাটে । ছেলে,বৌ,নাত্নীদের জন্য সব পুজো । ওনার ঘরে কেউ যায়না । কখনো কখনো বাবা জান আর মঞ্জু মাসী খাবার দিতে যায় । পারোমিতা কে একদম দেখতে পারেন না ঠাকুমা । বলেন শুভ( শুভজিত বাবার নাম) গোল্লায় যাচ্ছে তোর মেয়ে । মেয়ের ডানা গজিয়েছে । এখন থেকে দ্যাখ নাহলে ওই মেয়ে ভোগাবে তোকে । আমি বলে রাখলাম শুভ ।
আমি কতোক্ষণ থাকি মা ? আপনি বলুন ? আমার সময় কোথায় ?তবুও তোর শাসন প্রয়োজন । ওকে মোবাইল কেন দিলি ? ওই অলক্ষুণে মোবাইল ই ওর উচ্ছৃঙ্খলতার  কারন । আমাকে ত হুটা হুট্ করে দেয় ।আপনি শাসন করুন মা । আমি কতক্ষণ ই বা থাকি ? একটু শান্তি না হলে আমার কি ভাল লাগে ? ওইসব শুনতে ভাল লাগে না। সমত্ত মেয়েদের মা শাসন করবেন না !  বাবা কি পারে? না মানায় ! আপনি বলুন! শুভ এক নিশ্বাসে কথাগুল বলে হাঁফ্ ছাডলো ।সব ই অদৃষ্ট বাবা । হ্যাঁরে মঙ্গল বার দিন একটু সময় করে দক্ষিণেশ্বর নিয়ে চল না বাবা। কতদিন মায়ের মুখটা দেখিনি। আহা মা সদয় হলে তোর কোন দুঃখ থাকবেনা।মঙ্গলবার ! আচ্ছা দেখছি ! টেবলেট পিসিটা তে কি দেখে বললো, মা একদম ভোরে আপনাকে নিয়ে যাব ।
আমিত সেই ভোর ৪ টেতে উঠি তুই উঠতে পারবিত ?
হ্যাঁ মা পারবো ।
আজ কিছু অঘটন হল রাস্তায় । কাউকে বলা যাবেনা। বাপীকে কিছুই বলা যায়না এ বিষয় । মা’ ! তিনি তো ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। ঠাকুমা ! তিনি ই বা কি করবেন? তবে কাকে বলবে সে ? বোন ! ও শুনলে হাঁসবে । মজা পাবে ।বাড়িতে ফিরে একটা ডাইরিতে আজকের ঘটনা সম্পর্কে লিখে রাখল।
বাপীর কথাগুল মনে রেখে খুব মন দিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি করতে লাগলো । ম্যাথ্, ফিজিক্স্, কেমিস্ট্রি সব বিষয় গুল ভাল করে রিভিশন দিয়ে রাখলো। গত দশ বছরের সমস্ত প্রশ্ন র উত্তর শেষ করে ফেলেছে। খাতা ভর্তি অঙ্ক আর ফিসিক্স্ এর প্রব্লেম সলভ্ করে রেখেছে ।ইংলিস্ টা আরেকটু রিভিসন করতে হবে । এইরকম ভাবছিল …।মা বললেন হ্যাঁরে পারু কোই ? ৭ টা বেজে গেল মেয়টা কোথায় যায়?তোর সঙ্গে আসেনি?এতোগুল প্রশ্নের উত্তর কি দেবে ভেবে পেলনা । আমি জানিনা …
জানিসনা মানে ?
বারে আমি স্কুল সেরে বাড়ি ফিরে এলাম । এমনিতেই আমাদের এক্সট্রা ক্লাস হচ্ছে । আমি কি করে জানবো ওর কথা ?তুমি তোমাকে ছাড়া  আর কি কর মা ! বাপের আহ্লাদি মেয়ে ! বোনটা কোথায় গেল খোঁজ নিবিনা একটু ! জানি তুমি দিগ্গজ্ মেয়ে , তা বলে বোনটার কোন খোঁজ খবর নেবে না?
সরি মা ভুল হয়ে গিয়েছে । আমাকে ভুল বুঝ না।সুমিতা মোবাইলে নম্বর ডায়াল করতে লাগলেন … এই অর্পিতা শোন ভাই তোর বর কে একটু বলনারে … আমার ছোট মেয়ে পারোমিতা যে তোর ছেলের বার্থ ডে পার্টি তে নেচেছিল মনে আছে … হ্যাঁ !… ও এখন পর্য্যন্ত
আসেনিরে । কি করি বল তো?… ইনি দিল্লী গেছেন ফিরবেন কালকে ।এলেই ত আমার ওপর হম্বি তম্বি করবেন। আমার হয়েছে যত জ্বালা…।
দাঁড়া চিন্তা করিসনা …। আমি একটু পরে তোকে খবর দিচ্ছি।রাত ৯ টার সময় পুলিসের জিপ্ এল । এটাকি সুভজিৎ ব্যানার্জীর বাড়ি  ?
ভয়ে তটস্থ সব্বাই । হ্যাঁ …। কি হয়েছে ?
দেখুন চিনতে পারেন কিনা ?
আমার বুক টা দুরু দুরু করতে লাগলো । মা গিয়ে যা দ্যাখেন । হতভম্ব হয়ে যান । পুলিসের জীপের পেছনে দুটি ছেলে মেয়ে । তার মধ্যে একটি চেনা
। সে আমাদের পরমযা