Wednesday, February 28, 2018

         
        মৌসুমি দাস ঘোষ 
       ৬৪/বি কালিচরণ লেন                                
  

রাত একটা বাজে। নিঝুম নিস্তব্ধ ৬৪/বি কালিচরণ লেনের ভাড়া বাড়ির বড় খাটটার ওপর অতিশ গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু পারমিতার চোখে ঘুম নেই। ধীরে ধীরে পূবের বড় জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো পারমিতা। খোলা জানালা দিয়ে নির্নিমেষে চেয়ে রইলো বাইরের আকাশটার দিকে। সন্ধ্যেবেলার জমাট মেঘটা কেটে যাওয়াতে একটা দুটো করে বেশ কিছু তারা এসে ভিড় জমিয়েছে নিকষ কালো আকাশটার বুকে। কোনটা মিটমিট কোনটা বা স্থির হয়ে আলো দিচ্ছে। ৬৪/বি কালিচরণ লেনের এই বাড়িটাতে আসার পর থেকে কবে যে এভাবে আকাশের দিকে চেয়ে তারা দেখেছে মনে করতে পারলো না পারমিতা।

ছোটবেলায় ছাদে বসে বাবার সাথে প্রথম তারা দেখার শুরু। মনে আছে গরমকালে লোডশেডিং হলে বাবা ছোট্ট পারুকে নিয়ে ছাদে এসে বসতেন। আঙ্গুল দিয়ে দিয়ে তারা চেনাতেন, “ওই দেখ ধ্রুবতারা, ওই লালচে রঙের তারাটা হল মঙ্গলগ্রহ আর সাদা ঝকঝকে উজ্জ্বল যে তারাটা দেখছিস, ওটা হল বৃহস্পতি। আকাশের ওই তারাদের ভিড়ে মিশে আছেন তোর ঠাকুরমা, তোর মা। ওইখান থেকে ওঁনারা আমাদের দেখছেন, আমাদের কথা শুনছেন”।

চোখের কোনটা ভিজে উঠলো পারমিতার! অনেকদিন পর মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ছে! খোলা জানালা দিয়ে আকাশের বুকে তারাদের ভিড়ে কেবলি তাঁদের খুঁজে বেড়াচ্ছে! মা সেই কোন ছোটবেলায় আকাশে চলে গেছেন! বাবার কাছেই বেড়ে ওঠা। আর সব মেয়েদের মত মায়ের সঙ্গ পায়নি বলে ছোট থেকেই পারমিতা একটু ভীতু, মুখচোরা, প্রতিবাদ না করে মানিয়ে চলা গোছের মেয়ে। বাবা মেয়েকে যথেষ্ট আগলে রেখেছেন, তবুও মায়ের স্থান তো নিতে পারেন নি। মেয়েলী সমস্যার সমাধানে মায়ের সাহায্য থেকে বঞ্চিত পারমিতা একটু বেশিই নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

যদিও আজ বেশি করে বাবার কথাই মনে পড়ছে! এতদিনে সে বুঝে গেছে গুরুজনেরা যা বলেন বা করেন, সবটাই সন্তানের ভালোর জন্য। বাবা প্রথম যেদিন অতিশকে দেখেছিলেন সেদিনই প্রবল আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু পারমিতা তখন অতিশের প্রেমে এতটাই উন্মত্ত যে বাবার আপত্তির কথা ভাল তো লাগেইনি বরং যে বাবা পারমিতার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে না করে ছোট্ট মেয়েটাকে আঁকড়ে এতদিন বেঁচেছিলেন, সেই বাবাকে নিজের চরম শত্রু বলে মনে করেছিল। আর তারপর একদিন বাবাকে না জানিয়ে মাত্র চার মাসের প্রেমিক অতিশের চাপে কলেজ থেকে বাড়ি না ফিরে, নদীর ধারের কালী মন্দিরে কোনোরকমে বিয়েটা সেরে সোজা এসে উঠেছিল ৬৪/বি কালিচরণ লেনের অতিশের ছোট্ট এই ভাড়া বাড়িতে।

তখন অতিশ একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ছিল। পারমিতা সবে কলেজের প্রথম বর্ষ। পরবর্তীতে অতিশ বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মীতে প্রোমোশন পায়। কিন্তু পারমিতা আর পড়াশুনা করেনি। এদিকে এভাবে বিয়ে করার জন্য বাবার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না ওদের। তারপর অভিমান করে থাকতে না পেরে এক বিকেলে স্নেহ বৎসল বাবা নিজেই এসেছিলেন একমাত্র মেয়ের বাড়িতে। তারপর থেকে আসা যাওয়া শুরু হলেও অতিশ কোনোদিন পারমিতার বাবাকে ভাল চোখে দেখেনি। পারমিতাকেও বাবার বাড়ি যেতে দিত না। যদিও ঘরের বাইরের লোকের কাছে অতিশ খুব নম্র ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত! মাথা নিচু করে পথ চলে। কারো সাথে কোন ঝামেলায় নেই ।স্ত্রী ছাড়া কোন মহিলার দিকে চোখ তুলে চায় না।

তা প্রথম দিকে পারমিতাও স্বামীর চাকরি, স্বভাব নিয়ে খুব অহংকার করতো। বিশেষ করে নিজের স্ত্রী ছাড়া কোন মহিলার দিকে চোখ তুলে চায় না, বাড়িতে ফিরেই স্ত্রীকে নিয়ে আদরে মেতে ওঠে। সে স্বামীর ঘরণী মানে স্বামী সোহাগিনী! আর কোন মেয়েই বা স্বামী সোহাগিনী হতে চায় না! কিন্তু ধীরে ধীরে অতিশের দিনের বেলার নম্র ভদ্র রুপটা সরেগিয়ে রাতের অন্ধকারে বন্ধ ঘরের ভেতর একটা জানোয়ারের রুপ নিতে শুরু করলো! অতিশেরভালোবাসা ভয়ঙ্কর রকমের বিকৃত যৌন অত্যাচারে পরিণত হল। স্ত্রীর ইচ্ছে থাকুক বা না থাকুক,শরীর ভাল আছে কি না আছে, কোন কিছুকেই আমল না দিয়ে যখন তখন জোর-জবরদস্তিচলতো। বিভিন্ন ধরনের বিকৃত উত্তেজক ছবি দেখা আর স্ত্রীর ওপর তা প্রয়োগ করাটা এক নেশায়পরিণত হল! অতিশের বিকৃত ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনরকম আপত্তি করলেই ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতো।একে তো স্বেচ্ছায় বাবার বাড়ি ছেড়ে এসেছে অতিশের কাছে, তায় আবার লেখাপড়া ও উচ্চমাধ্যমিকে ইতি টেনেছে। কি যে করবে পারমিতা বুঝে উঠত না!  ভোর হলেই অতিশ ভালমানুষ হয়ে যায়! তখন পারমিতা কান্নাকাটি করে, বোঝায় অতিশকে, কিন্তু কোন পরিবর্তন নেই!রাত হলে আবার সেই হিংস্র জানোয়ারের রূপ নেয়।

বাবাকে তো আর এসব কথা বলা যায় না! তবুও একদিন আভাষে ইঙ্গিতে মানসিক অশান্তির কথা জানালে বাবা বলেছিলেন “একদম যদি মানিয়ে নিতে না পারিসতবে চলে আয় না আমার কাছে । পড়াশুনাটা আবার শুরু কর,আমি বেঁচে থাকতেই দেখ যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস”। কিন্তু চলে আসতে পারে নি পারমিতা।বাবার কাছে পাকাপাকি ভাবে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই আচমকা একদিন স্ট্রোক হয়ে বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান!উচ্চমাধ্যমিক পাশ পারমিতার তিন কূলে আর আপন বলতে কেউ রইল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই স্বামীর ঘরে মুখ গুঁজে থাকা। কিন্তু পারমিতা অতিশকে ত্যাগ করে বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ারসিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই কারণে অতিশ দিনে দিনে অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে পারমিতার ওপর বিকৃত অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়!

মুখচোরা অন্তর্মুখী চরিত্রের পারমিতা কাকে বলবে এসব কথা?মাঝে মাঝে ভাবতো, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে! কিন্তু কোথায়, কার কাছে যাবে? কাকেই বা বলবে এসব কথা? যদি অতিশের কানে ওঠে তবে হয় অত্যাচার করে মেরে ফেলবে, নয় বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে! তখন কি করবে সে? তবুও একদিন সাহস সঞ্চয় করে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বয়সীবড় ননদকে অতিশের বিকৃত যৌন অত্যাচারের কথা জানায়। শুনে বড় ননদ অবাক হয়ে বলেছিল,
 “আমার হীরের টুকরো ভাইয়ের সম্পর্কে এসব কি বলছ তুমি? ওকত ভাল ছেলে তা তুমি জানো? ছেলেদের একটু আধটু অমন শারীরিক চাহিদা থাকে! স্ত্রীদের কর্তব্য তা পূরণ করা! তোমার জামাইবাবুরও আছে! আমি নিঃশব্দে তা পূরণ করি। আমি কি ঘরেরবাইরে সে সব কথা পাঁচ কান করতে গেছি? শুনেছো কোনোদিন? আর তুমি কিনা এসেছো তোমাদের চার দেওয়ালের ভেতরের কথা আমাকে জানাতে? ভাইয়ের কথামত চললেই তো পারো!কি গুণ আছে তোমার শুনি? ওই তো একটু রূপ! তাও তো আমার ভাই বউঅন্তঃপ্রাণ! অন্যমহিলার দিকে চোখ তুলেও চায় না! ভাই যদি তোমাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের কাছে রাত কাটাতো তোমার ভাল লাগতো?”

পারমিতা ভয়ে আর কথা বাড়ায় না! যদি অতিশের কানে ওঠে!নইলে ননদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, “সঙ্গমের সময় জামাইবাবুও কি বড়দির স্তন দুটোশক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে? সিরিঞ্জ দিয়ে গরম জল জোর করে যৌনাঙ্গে প্রবেশ করায়? শরীরের গোপন জায়গায় সিগারেটের ছ্যাঁকা দেয়? স্ত্রীর মুখে রেতঃপাত করে? বাবার মৃত্যুর পর চারদিনের কালাশৌচের মধ্যেও একজন পিতৃহারা কন্যাকে শোক করার সময়টুকু দেয় না যে স্বামী, তাঁকে কিভাবে মানুষ বলবে পারমিতা? চোখের জল মুছে ফিরে এসেছিল ননদের বাড়ি থেকে। তাই আজখুব মনে পড়ছে বাবার কথা! বাবার ইচ্ছেমত যদি লেখাপড়া মন দিয়ে করতো, তবে এদিন আজদেখতে হত না!

তাও যদি একটা সন্তান হত ওদের, তাহলে হয়তো কিছুটা পাল্টাতো অতিশ! কিন্তু ভগবানের কি যে মহিমা কে জানে! আট বছর হল বিয়ে হয়েছে, একটি সন্তানও আসেনি পারমিতার গর্ভে। অথচ দিন দিন অতিশের অত্যাচার বেড়েছে। আজকাল বাইরেরকারো সাথে সেভাবে মিশতে দেয় না। অফিস যাওয়ার সময় পারমিতাকে ঘরে তালা বন্ধ করে যায়।পারমিতাও ভয়ে কাউকে কিছু বলে না। স্বল্প শিক্ষিতা পারমিতা মহিলা কমিশনের নাম শোনেনি কখনো!

আজ সন্ধ্যেবেলা, হ্যাঁ, যে অতিশ বাইরের কারো সাথে পারমিতাকে মিশতে দেয় না, সে অতিশ সন্ধ্যেবেলা সাথে করে একজন অপরিচিতকে নিয়েএসেছিল। লোকটার চোখ দুটো যেন কেমন! বাইরে থেকে অনেক রকম খাবার কিনে এনেছিলঅতিশ। সেসব খাবার পারমিতাকে পরিবেশন করতে বলে। পারমিতা খাবার পরিবেশন করে দিয়েবেডরুমে চলে আসে। কিছুক্ষণ পর অতিশ এসে পারমিতাকে ড্রইং রুমে যেতে নির্দেশ দেয়। আরসঙ্গে এও বলে, “ইনি নাকি অফিসের বস। এনাকে একটু খুশি করতে হবে। বেশি কিছু না, একটুহেসে কথা বলা, অথবা উনি হাত টাত ধরলেও ধরতে পারেন। যদি শুতে চায়, পারমিতা যেন হেসেরাজি হয়! তাহলেই নাকি নতুন ফ্ল্যাটের জন্য অফিস থেকে অতিশ একটা বড় মাপের লো পাবে”।

অতিশের কথাটা শুনে পারমিতা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল! দিনের পর দিন নিজে শারীরিক মানসিক অত্যাচার করেও ক্ষান্ত হয় নি! আজ আবার বাইরের লোকের কাছে নিজের স্ত্রীকে পাঠাতে চাইছে!! আজ এই লোকটিকে মেনে নিলে কাল আবার যে অন্যকাউকে বাড়ি আনবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই! আর তাই এই প্রথম আজ তীব্র প্রতিবাদকরেছিল পারমিতা! কিন্তু সে প্রতিবাদের মাসুল দিতে হয়েছিল চরম ভাবে। অপরিচিত সেই লোকটা অধস্তন কর্মচারীর সুন্দরী বৌকে হাতে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে অতিশকে গালাগাল দিয়ে চলেগিয়েছিল। আর তারপর ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে, অবাধ্য স্ত্রীর মুখ বেঁধে, বেল্ট দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মেরেছিল অতিশ। সারা শরীরে চাকা চাকা কালশিটে করে দিয়েছে! তারপর নিজে ক্লান্ত হয়ে হাঁপাতে শুরু করে। প্রবল শ্বাসের সমস্যা শুরু হয় অতিশের!

কিছুদিন ধরেই অতিশ শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছে। সকালসন্ধ্যায় নিয়ম করে ইনহেলার নিতে হচ্ছে। আজ সন্ধ্যের ইনহেলার সময় মত নেওয়া হয়ে ওঠেনি।অতিশ হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানায় বসে পড়ে। টেনে টেনে শ্বাস নিতে নিতে পারমিতাকে আদেশ করেইনহেলারটা পাশের ঘর থেকে এনে দেওয়ার জন্য। পারমিতা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটাকেকোনোরকমে টেনে নিয়ে গিয়েছিল পাশের ঘরে, যেখানে টেবিলের ওপর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে ইনহেলার রাখা ছিল। কিন্তু হঠাৎ কি যে বুদ্ধি হল পারমিতার! প্রচণ্ড আক্রোশে অতীশকে একটু শাস্তি দিতে চট করে ইনহেলারটা লুকিয়ে ফেলল। আর পুরনো খালি একটা ইনহেলার এনে এগিয়ে দিল অতীশের দিকে। অতীশ কোন প্রশ্ন না করেই সেটা নিয়ে প্রাণপণে পাফ নিতে লাগল। কিন্তু ফাঁকা ইনহেলারে কিছুই হল না। শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলল। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে লাগল! মুখের শিরা উপশিরা ফুলে উঠলো অতিশের!

এখন বিছানায় শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে অতিশ। ভোরের আলো এসে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে পূবের খোলা জানালা দিয়ে। অনেক দিন বাদে আজ এই ভোরেরআলোটা খুব সুন্দর আর মিষ্টি লাগছে! পারমিতা জানালার কাছ থেকে সরে এলো। বিছানার একপাশ থেকে অতিশের মোবাইলটা তুলে নিল। একটা নম্বর ডায়াল করে বলল, “হ্যালো, কালিপুকুর থানা? আমি ৬৪/বি কালিচরণ লেন থেকে বলছি। এখুনি চলে আসুন। কাল রাতে এখানে একটা খুনহয়েছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুনই হয়েছে! আমি ওনার বাড়ি থেকেই বলছি। আমি কে? মৃতর স্ত্রী পারমিতা বলছি!”

নিজস্বী (Selfie) ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ২৮.০২.২০১৮ /




                  নিজস্বী (Selfie)
        ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ২৮.০২.২০১৮ /
পার্কে গিয়ে দেখি অবাক কাণ্ড । একটি মেয়ে আর ছেলে দুজনে বাঁশের মত এক লাঠি নিয়েছে তার সামনে মোবাইল ! কি হল ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হল। দেখি বটন টিপলেই ছবি উঠছে। সত্যি চায়নার প্রযুক্তিবিদ রা এ দেশের ছেলে মেয়েদের মাথা কি করে খেতে হয় তার নিত্য নতুন  উপায় বার করছেন । আমরা গাড়ল ওদের প্রযুক্তি নিজেদের দেশের জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে বড় গলায় বলি আচ্ছে দিন  
 মানষী  , মানস  দুই অন্তরঙ্গ প্রেমী যুগল । ওদের নিজস্বী তোলার  স্বাদ বড় বিচিত্র । কখন নদীর বাঁধের ধারে , কখন শক্ত পাথরের ওপর । কখন বা চলন্ত মেট্রো তে। এক এক ছবি তোলে আর আপলোড করে মোবাইলে।  মানস বড়লোকের বকাটে ছেলে কিন্তু মানষী  ত তা নয় । মানষী  এই সহরে নতুন । দ্বিতীয় বর্ষ ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্রী । সাধারণ ঘরের মেয়ে। বাবা মা , মেয়েকে হস্টেলে রেখে নিশ্চিন্ত । মাস-গেলে মোটা টাকা মানষীর  এখানকার ব্যাঙ্ক একাউন্টে ক্রেডিট হয়ে যাচ্ছে । প্রতিদিন মা রাতে একবার মেয়েকে ফোন না করলেই নয় । নানা প্রশ্ন ।
... হ্যাঁরে কি খাচ্ছিস ? পড়াশুনো করছিস ত ! ভালো রেজাল্ট করতে হবে মা । বাবার চাকরি আর বেশি দিন নেই।
...এক সঙ্গে এতগুলো প্রশ্নের জবাবে মানষী   হাঁপিয়ে ওঠে ..... ওঃ মা , আমি কি বাচ্চা ? সব ঠিক আছে । তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। 
মায়ের মন কি বোঝে রে ! জীও সিমের জন্য ভিডিও কল করেন মা। মেয়েকে একবার চাক্ষুষ দেখা। মনে শান্তি যাইহোক মেয়ে আমার ভালোই আছে ।  
মানস কলেজে তয়াতা ইনোভা নিয়ে আসে । রোজ নতুন নতুন সাজ । প্রচুর বন্ধু । মানষী  ওর ফাঁদে পা দিয়ে নিজের সর্বনাশ যে ডেকে আনছে তা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলোনা । প্রত্যেক দিন ঘোরা , বেড়ান , দামী হটেলে খাওয়া আর গিফট পাওয়া। মানষীর  রুম মেট অরুণা , ওকে অনেক বারুণ করে মানস এর  সঙ্গে মেলা মেশা করতে । কিন্তু কোন ফল হয়না। 

উলটে মানষী  বলে , তুই বড় জেলাস । আসলে তুই সহ্য করতে পারিস না আমাকে আর মনিষ কে এক সঙ্গে । তাই বলে বিনাশ কালে বিপরীত বুদ্ধি । অরুণা চুপ থাকতে বাধ্য হয়।

এরমধ্যে মানস  বাবার ফার্ম হাউসে মানষীকে  নিয়ে এক সন্ধ্যা বেলায় ওঠে। মানস  ড্রিংক  করে । ফার্ম হাউসের দারোয়ান কে বলে বাইরে পাহারা দিতে।

দারোয়ান গরীব হলেও তার নৈতিকতা বোধ আছে। সে মানষীর  মধ্যে তার গ্রামের মেয়ের ছবি দেখতে পায়। সে বলে , বাবু আপনার বাবা জানলে আমায় আস্ত রাখবেন না । আপনি বিটিয়াকে তার বাসায় নিয়ে জান । আপনি আমার ছেলের মতন বাবু । এই বুড়ো বাপের কথাটা শুনুন।

কথাগুলো শুনে মানষীর  চৈতন্য উদ্রেক হয় । সে বুঝতে পারে সে এক ফাঁদে পা দিয়েছে ।        তাই হটাত ফার্ম হাউস থেকে দৌড়তে থাকে রাস্তার দিকে। রাস্তায় ছুটতে ছুটতে এক ভ্যান রিক্সা পায় । মানষী  তাতেই উঠে পড়ে । গ্রামের রাস্তায় একা মেয়েকে সন্ধ্যা বেলায় ভ্যান রিক্সা বালা দেখে আশ্চর্য হয়।

মানষী  হাত জোড় করে ভ্যান চালক কে বলে তার বড় বিপদ তাকে যেন নিয়ে যায় । একটা দশ টাকার নোট ও তার হাতে বাড়িয়ে দেয়। 

ভ্যান রিক্সা-বালা বোঝে কিছু একটা ঘটেছে । বাক্যব্যয় না করে জোরে প্যাডেল চালায়। 
মানস ছাড়ার পাত্র নয় । সে তার ইনোভা ছোটাল মানষীর  পেছনে।
দারোয়ান তার পুরন সাইকেল নিয়ে ছুটল ওদের পেছনে কে জানে আজ কিছু অঘটন ঘটতে চলেছে কিনা ।
ইতিমধ্যে মানস , মানষীকে  প্রায় ধরতে চলেছে । ঠিক সেই সময় প্রচণ্ড জোরে ইনো-ভা গাড়ীটা ধাক্কা লাগে রাস্তার ধারের এক গাছে। আসলে মানস প্রচুর ড্রিঙ্ক করেছিল তাই গাড়ী সামলাতে পারেনি। পাওয়ার স্টিয়ারিং একটু বেসামাল হলেই এক্সিডেন্ট অব্যর্থ । সেই হল ।
চক্ষের নিমিষে এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। গাড়িটা প্রচণ্ড আওয়াজ করে থেমে গেল। ড্রাইভারের সিটের পাসের জানালা দিয়ে দেখা-গেল মানসের মাথা-থেকে প্রচণ্ড রক্ত স্রাব হচ্ছে ।
এরমধ্যে দারোয়ান এসে পৌঁছে যায়। ভ্যান রিক্সা চালক গাড়ি থামিয়ে ঘটনা দেখার জন্য নেবে পড়ে । মানষী  নির্জীব মানুষের মতন বোবা হয়ে  দাঁড়িয়ে থাকে। সে বিশ্বাস করতে পারেনা তার নিজের চোখ কে । সে বুঝতে পারে এখন পুলিশের ঝামেলা হবে । বাবা মার কানে সব উঠবে। তার হয়ত পড়া বন্দ হতে পারে......।
নিজস্বী ছবিগুলো তার নিজের মোবাইল থেকে সব ডিলিট করে দেয়। কিন্তু মানসের  মোবাইল ? সেটার কি করবে........... ? 
      ৬১১ শব্দ ।

Thursday, December 14, 2017

আকাঙ্ক্ষা ,পারোমিতা দুই বোন । দুজনের বয়েসের ব্যবধান মাত্র এক বছর। দুই বোনই এক ইংলিশ মিডিয়াম কোএড্ স্কুলে পড়ে । স্কুল
বাস আসে সকাল ৭.৩০ টার সময় । শীতে কুঁকড়ে দুজনে বিছানা থেকে ওঠে সকাল ৬.৩০ টার সময়। সটান বাথরুমে ঢুকে নিত্যকর্ম সেরে বেরুনোর
সময় ৭.০০ টা বেজে পাঁচ কি দশ মিনিট । তার পর খাওয়া সেরে বাসের জন্য অপেক্ষা । আরম্ভ হয় সারা দিনের জমে থাকা কিছু গল্প আর
বয় ফ্রেন্ডদের নিয়ে কিছু ছুঁক ছুঁকুনির কথা পারোমিতার । যাকে বলে চুলবুলি লেড়কি হিন্দিতে । উপায় নেই যুগের টানে এরকমটা হবেই । মানুষের কিছু জেনে-টিক আর একুয়ার্ড ক্যারেক্টার থাকে । কোন কোন সময় একুয়ার্ড ক্যারেক্টারটা বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয় । সেগুল ভাল হতে পারে আবার খারাপ ও হতে পারে । যদি খারাপের দিকে যায় তবে সর্বনাশ। সামাজিক দিক থেকে ভয়ঙ্কর ও হতে পারে। যা বাবা মা ভাই বোনের মাথা ব্যথার
কারন হয়। ধরাজাগ সেইরকম ই ক্যারেক্টারের মেয়ে পারোমিতা ।
আকাঙ্ক্ষা একটু আলাদা ও পড়াশুনোর গল্প বেশি করে বন্ধুদের সঙ্গে। কিছু প্রব্লেমের কথা যা হয়তো সল্ভ হচ্ছেনা বা অন্য কিছু । ও পড়াশুনোতে ভাল । ক্লাসে বরা বর ফার্স্ট হয় পারোমিতা ঠিক তার উল্টো। টিভি প্রোগ্রাম , সারুখ্ সলমন হৃত্তিক ইরফান  আর বাংলার দেব ছাড়া  ভাবতেই পারেনা ।ও বলে মাস ক্লাস বাঙ্ক করে সিনেমা যাওয়া র এক্সাইটমেন্ট ই আলাদা । । টিচারকে এফ বি তে জন্মদিনে গিফট পাঠানো । লিটিল হনি বলে বয় ফ্রেন্ড কে চুমু খাওয়া । এসবে থৃল আছে বল । কথা-গুল বলে দম নেয় ।ওর দিদি এসব শুনেও শোনেনা ।এরমধ্যে আকাঙ্ক্ষা সি বি এস সি র ১০ম শ্রেনিতে ৯৮.৮% নাম্বার রেখে পাস করেছে । কলেজে সাইন্স নিয়ে পড়ছে ।সেদিন আকাঙ্ক্ষা খবরের কাগজে খবরটা পড়ে  আতঙ্কিত হয় কারন ও
প্রত্যেক দিন বাসে কলেজ যায় ফেরে প্রায় রাত ৭ টার পর । খবরটা এইরকম ঃ-:-“সকাল দশটায় ওদের কলেজের কাছা কাছি এক এলাকায় চলন্ত বাসের ভিতরেই এক তরুণীর হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিল জনা চারেক মদ্যপ যুবক ।উপায় না দেখে চলন্ত বাস থেকেই লাফ দিয়ে নেমে ছুটতে ছুটতে কলেজে পৌঁছলেন ওই তরুণী। জনা কয়েক সহপাঠীকে কোনও মতে ঘটনাটা জানিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারালেন তিনি।রক্তাক্ত অবস্থায় হাঁসপাতালে ভর্তি করা হয় কলেজের ছেলেদের প্রচেষ্টায় ।
এই শহরের বুকে দিনের বেলায় আরও এক বার এই ঘটনা , শহরের রাস্তায় মহিলাদের নিরাপত্তার অভাবটাকেই ফের বেআবরু করে দিল। দিল্লির
বাসে তরুণীকে গণ-ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল , সে প্রতিবাদে গলা মিলিয়েছে আমাদের শহরেও । কিন্তু তার পাশাপাশি এই শহরের বাস এবং রাস্তাই বা আলাদা কিসের , এ প্রশ্নটাও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে”। ঘটনাটা  অনেক দিন আগের কথা ।
কাকে বলবে ? বোন তো পাত্তা দেয়না। বলে তোর বয় ফ্রেন্ড থাকলে ওই তোকে প্রটেক্ট করবে । দিদি তুই ভারি আন-স্মার্ট আর ভীতু । মা’কে
বললে বলবেন আর পাঁচটা মেয়েদের মতন তুমি হতে চেষ্টা কর । এসব কথা মনের ভেতর রেখে গুমরচ্ছিল আকাঙ্ক্ষা । ও কি সত্যি আর পাঁচটা মেয়ের মতন নয় ? তবে ওর পড়াশুনো কি বৃথা ! মনের মধ্যে তোল্পাড করে সব প্রশ্ন । আয়নার সামনে নিজেকে দেখে । ভরা যৌবনে মেয়েদের যা
সৌন্দর্যের বিকাশ হওয়া উচিৎ  ওর ক্ষেত্রে তা ব্যাতিক্রম । অসব  কিছু্র ই  পরি-প্রকাশ পায়নি।খুব সাধা মাটা মেয়ে । সাজতে জানেনা বললেই চলে । এতো সাধারণ মেয়ে আজকাল খুব একটা চোখে পড়েনা।
পরোমিতা ঠিক উল্টো। প্রসাধনের সামগ্রী কেনার চেয়ে গিফট বেশি পায়। বয়ফ্রেন্ডের অভাব নেই । পারমিতা কে দেখতে সুন্দর এবং চোখ
ধাঁদানো চেহার । কস্মেটিক্স এর বাহারে ভুরু ভুরু গন্ধ । ছেলেদের মন ভোলানো চেহারা । এখন থেকেই ডেঁপো । পডাশুনোয় অষ্টরম্ভা ।কোনমতে পাস করে । টুকলি করতে ওস্তাদ্ বোধহয় । কিন্তু বুদ্ধি প্রখর । ছেলেদের মাথায় টুপি পরাতে ওস্তাদ ।
আগেই বলেছি আকাংক্ষা ক্লাসে ফার্স্ট হয় । রিপোর্ট কার্ডে সই করার সময় বাপি আকাংক্ষা কে খুব উৎসাহ দিয়ে বলেন ১২ ক্লাসে সাইন্সে র‍্যাঙ্ক
রাখতেই হবে । এখন থেকে আই. আই . টির এন্ট্রান্সের জন্য তৈরি হও। তোমাকে খড়গপুর আই আই টি তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াবো । ভাল রেসাল্ট
করলে জি. আর . ই দিয়ে আমেরিকা পাঠাবো। বি .টেক্ এর পর হয় গেট্ দাও নয় ক্যাট্ দাও । যদি এগুলো না দাও তবে ভাল রেসাল্ট করলে জি.
আর . ই টা দেবে । এখন থেকে তৈরি হও আমেরিকা কিম্বা ব্রিটেন যাওয়ার জন্য ।
পারোমিতা ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে যায় । বাপী জানেন ওর রেসাল্টের ব্যাপার ।বাপী বলেন , মেয়েদের পড়াশুন যে কত প্রয়োজন তা এখন থেকে না বুঝলে পরে আর সময় থাকবেনা মা । পড়াশুনোতে মন দাও । মেয়েদের রূপ যৌবন গুন তিনটে দিয়ে বিচার করার সময় রূপ যৌবন দুটোই কিন্তু বয়স আধিক্যে ফুরিয়ে যায় মা;থাকে শুধু গুনটা । ওটাই শেষ জীবনের ভরসা । তোমার বন্ধুদের জিজ্ঞাসা কর ; ওরা কি ক্লাসে লাস্ট্ বেঞ্চে বসা মেয়েকে ভাল বলবে !বাপীর টাকা মধু দাদার ভাঁড় নয় যে অফুরন্ত থাকবে । চিরদিন তো আমি আর তোমার মা থাকবেন না । যাও মাকে দিয়ে সই করাও । ওঁচা মেয়েদের আমি পছন্দ করিনা । তোমার ত সব বায়না শুনি তবুও তোমার এতো অধঃপতন কেন? লজ্জা করেনা ? দিদিকে দেখে সেখ ।
বাপীর কথা শুনে ওর চোখে জল আসে । চোখে জল নিয়ে বলে পরের বার ভাল করব ।গড প্রমিস্ বাপি । এবারের মত সই করে দাও !
থাক আর গড্ কে টেনোনা ! তিনি তোমাকে অহোরাত্র দেখছেন। তাঁর ,তোমার মত উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়েকে দয়া করার সময় নেই। গড খুব ব্যাস্ত মা ।
তোমার প্রাইভেট ট্যুটার এর প্রয়োজন হলে রাখ । কিন্তু রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই।
মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আঁচল ঠিক করতে করতে বলেন , “রাম রাম , প্রাইভেট টিউটর ? রক্ষে কর ! আরেক ফ্যাসাদ বাঁধাবে । ও যা পড়ছে পড়ুক । না পড়লে হেঁসেল ঠেলবে !” আমার সময় কোথায় ওকে দেখার ?”এটাত ঠিক কথা নয় । তুমি না দেখলে কে দেখবে ?”  বাপী বলেন।
কেন ওর দিদির কাছে বসে পড়তে পারেনা ?
দেখ সুমি (মায়ের নাম সুমিতা , বাপী ‘সুমি’ বলেই ডাকেন) তোমার মেয়েদের  প্রতি দায়িত্ব বোধ না থাকলে ওরা কি করবে ভবিষ্যতে? মা’র নজর
মেয়েদের দিকে বেশি থাকা উচিৎ । নাহলে পরে পস্তাবে । আমার ত ওদের দেখা সম্ভব নয় । কেন? আমার একার দায়িত্ব কেন? তোমার মেয়ে নয় ওরা ? তোমার কোন দায়িত্ব নেই !‘দায়িত্ব’ শব্দটা খুব জোরদিয়ে বিদ্রূপের সঙ্গে উচ্চারণ করলেন সুমিতা দেবী ।
আহ্ ! আমি কি তাই বলছি ! বোঝ না কেন? আর সেরকম বুঝলে চাকরি ছেড়েদাও । তুমি ত সখের জন্য চাকরি কর ! ওটার কি কিছু প্রয়োজন আছে? যদি মেয়েরা মানুষ না হইয় তবে ওই চাকরি থাকার চেয়ে না থাকা ভাল !
কি ? আমি সেক্রিফাইস্ করবো আর উনি প্রাইভেট সেক্রেটারি কে নিয়ে টুরে যাবেন ; আজ মুম্বাই কাল দিল্লী পরশু সিঙ্গাপুর । অফিস ছাড়া বাড়ির হাল কি হচ্ছে বুঝেছ কখন ! বাহ ! সুন্দর !! চমৎকার সল্যুশন । পারবোনা চাকরি ছাড়তে !! ও মেয়ের এমনিতেই বারোটা বেজে গিয়েছে । আমি কি করব ?
দ্যাখো যা জাননা সে বিষয় নিয়ে কথা বোলনা। আমার চাকরিটা খাটুনির আর দায়িত্ব সম্পন্ন কাজ । তুমি ভাল করে জান সেটা । ওটা ঊল বোনার
চাকরি নয় যে মেয়েরা পাস করলো কি না করলো মাস গেলে জমা খাতায় মাইনে ঢুকে যাবে গুঁতো মেরে । চাকরি ? আর চাকরি দেখিওনা !! মেয়েদের সামনে স্বামির সঙ্গে কি করে কথা বলতে হয় সেটাই তো শিখলে না? যত্তো সব । বাবা গাড়ীর চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন গজ্ গজ্ করতে করতে ।
মা বাপির কথা কাটা কাটির মধ্যে পারোমিতা মা’কে দিয়ে টুক করে সই করিয়ে নেয় । মা অজান্তে সই করে দেন । কিছুটা নিশ্চিন্ত এবারের মতন।
এবার পড়াশুন টা করতে হবে মন দিয়ে। মোবাইলে কল আসে সুমিতের । সুইচ  অফ করে দেয় । না আর সুমিতের সঙ্গে যাবেনা সে । শেষে কিনা
হেঁসেল ঠেলতে হবে ! ম্যা গো !! মাথাটা টন টন করছে । দিদিকে দেখ ? খুব খুশী , আমাকে বাপী বকেছেন বলে । ভালো পড়ে বলে খুব অহংকার দিদির।
ঈশ্বর প্রেমিক প্রেমিকাকে একি ছাঁচে বানান না । কিছু তার তম্য থাকে ।আদর্শ শব্দটি অভিধান থেকে মুছে গিয়েছে আজকাল। সিটি সেন্টারে ওরকম অনেক যুগল ই ঘুরে বেড়ান । আমি একটা ঘটনার কথা বলি । সেদিন রাজার হাট্ দিয়ে ফিরছিলাম আমার কারে । তখন বাজে রাত ১১ টা । হঠাৎ আমাদের কারটাকে দুটো বাইক্ সম্ভবতঃ হিরো মোটর্সের লেটেস্ট মডেল নামটা বলতে পাচ্ছিনা , যাইহোগ বাইকে দুই প্রেমি জুগল যাচ্ছেন । পিলিওনে যে মেয়েটি ছিলো সে বোসে নয় ফুট রেস্টে দাঁড়িয়ে । বিদ্যুৎ গতিতে বাইক্ দুটি আমাদের ক্রস করে বেরিয়ে যায় । যদি এতোটুকু অসাবধান
হয় মৃত্যু সুনিস্চিৎ । এটা কি স্টান্ট্ না কি আমি বুঝলাম না । এদের মা বাবা এদের কি শিক্ষা দিয়েছে? অবিশ্যি মা বাবা কে দোস দিয়ে কাজ নেই
ওনারা কি জানেন? আমি ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম ও বোলল , সাহাব  আপ নেয়া হ্যায় । এ তো হামেশা দেখনেকো মিল্তা হ্যায় । মনে মনে ভাব
লাম আমরা কতো গ্রাম্য, এরা কতো সভ্য । এই যদি সভ্যতা হয় তবে হে ঈশ্বর আমাকে গেঁয়ো করেই রাখো! সে দিন থেকে আমি আর কাউকে
কিছু জিজ্ঞাসা করিনা । কান মুলছি নাক মুলছি আর না ।নিজের মেয়েদের কথা ভাবছি ! পারোমিতার  কি হবে ? ওর কি ভবিষ্যৎ ? আমার সময় নেই
এনার্জি ও নেই । সুমি তার স্কুল আর বান্ধবীদের নিয়ে ব্যাস্ত । পার্টীর জন্য আজ ধারনা তো কাল বন্ধ ।ছারখার হয়ে গেল এই দেশটা এসবের জন্য ।
সর্ব শিক্ষা অভিজানের লেকচার দেয় সুমি আর নিজের মেয়ে গোল্লায় যাচ্ছে ।
কি মারে বাবা । কিছু বলার উপায় নেই আমার । মেয়েটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে । দেখেও কিছু বলার উপায় নেই ।আমি নিরুপায়। কোম্পানির সার্ভিস ।
একটু এদিক ওদিক হলে সর্বনাশ । কাকে বোঝাব ? কথাটা উল্লেখ করলাম এইজন্য যে হামেশা নাকি এরকম হয় । আমরা ত দেখতে অভ্যস্ত নই তাই বোধ হয় আমার দৃষ্টিকটু লাগলো । মানুষ সহজ ভাবে নিচ্ছে। আমি বোধহয় গেঁয়ো হয়ে গেলাম বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে। আমার বন্ধুরা বলে তুই এইসব নিয়ে ভাবিস না। ও সব মডার্ন ছেলে মেয়ে। মনে মনে ভাবি আমার ত দুটো মেয়ে আছে ! তাদের মধ্যে ছোটটাই মাথা ব্যাথার কারন হচ্ছে । ওকে নিয়ে আমার চিন্তা ।
আমিত দেখছি আকাংক্ষার মতন মেয়েরাই বিপদে পড়ে  কারন ওরা নিজেদের নিরাপত্তার দিকে নজর দেয়না। পড়াশুনোতে এত ব্যস্ত থাকে
যে ওদের অন্য দিকে মন যায় না তার সুযোগ নেয় অসামাজিক ব্যাক্তি। তাই বলি জুডো ক্যারাটে টা মেয়েদের যানা নিতান্ত জরুরি । ওদের বন্ধু
হাতে গোনা হয় আর ছেলে বন্ধু থাকলেও তারা পাত্তা পায় না এদের কাছে। কিন্তু পারোমিতা ! তার বন্ধু শয়ে শয়ে । বাপী লেটেস্ট এপেলের আই ফোন্ সিঙ্গাপুর থেকে কিনে এনেছেন একটা মা আরেকটা পারোমিতার জন্যে ।বাপি কি জানেন মেয়ের কীর্তি ! মেয়েদের হাতে মোবাইল দেওয়া কি উচিৎ ?
বলেন রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই কিন্তু । আইফোন দিতে আপত্তি নেই। আকাঙ্খ্যার ওসবে কোন আগ্রহ দেখি না।
‘কচু’ রেসাল্ট না ছাই । মা বলেন । ওই মেয়ে গোল্লায় গেছে ।
হয়াটস এপ এ  এ ছবি পাঠান , মেসেজ বক্স এ জোক , লাভ এস .এম .এস সব ভর্তি । কে দেখবে? দেখার সময় কার আছে ? বাপি সকাল থেকে
বেরিয়ে যান ফেরেন রাতে। মা স্কুল টিচার অন্যকে জ্ঞান বিতরণে ব্যস্তনিজের মেয়েকে দেখার সময় নেই ? সোসিয়াল সার্ভিস করে ক্লান্ত । নারী জাগরন , নারী শিক্ষা এইসব নিয়ে ব্যাস্ত ।
স্কুলথেকে এসে এতোই ক্লান্ত যে মেয়ে কি পড়লো কি খেলো দেখার সময় নেই । টিভি, সিনেমার ম্যাগাজিন,তারপর খাওয়া ,ঘুম । ঘরে রান্না বান্না করতে হয়্না কারন রাঁধুনী আছেন ।২৪ ঘণ্টার কাজের লোক আছেন। মঞ্জু মাসি ।
ঘরে গার্জেন বলতে ঠাকুমা তাঁর তো বয়েস ৭৯+ অতএব তিনি কি করবেন? ঠাকুরপুজো তেই তাঁর সময় কাটে । ছেলে,বৌ,নাত্নীদের জন্য সব পুজো । ওনার ঘরে কেউ যায়না । কখনো কখনো বাবা জান আর মঞ্জু মাসী খাবার দিতে যায় । পারোমিতা কে একদম দেখতে পারেন না ঠাকুমা । বলেন শুভ( শুভজিত বাবার নাম) গোল্লায় যাচ্ছে তোর মেয়ে । মেয়ের ডানা গজিয়েছে । এখন থেকে দ্যাখ নাহলে ওই মেয়ে ভোগাবে তোকে । আমি বলে রাখলাম শুভ ।
আমি কতোক্ষণ থাকি মা ? আপনি বলুন ? আমার সময় কোথায় ?তবুও তোর শাসন প্রয়োজন । ওকে মোবাইল কেন দিলি ? ওই অলক্ষুণে মোবাইল ই ওর উচ্ছৃঙ্খলতার  কারন । আমাকে ত হুটা হুট্ করে দেয় ।আপনি শাসন করুন মা । আমি কতক্ষণ ই বা থাকি ? একটু শান্তি না হলে আমার কি ভাল লাগে ? ওইসব শুনতে ভাল লাগে না। সমত্ত মেয়েদের মা শাসন করবেন না !  বাবা কি পারে? না মানায় ! আপনি বলুন! শুভ এক নিশ্বাসে কথাগুল বলে হাঁফ্ ছাডলো ।সব ই অদৃষ্ট বাবা । হ্যাঁরে মঙ্গল বার দিন একটু সময় করে দক্ষিণেশ্বর নিয়ে চল না বাবা। কতদিন মায়ের মুখটা দেখিনি। আহা মা সদয় হলে তোর কোন দুঃখ থাকবেনা।মঙ্গলবার ! আচ্ছা দেখছি ! টেবলেট পিসিটা তে কি দেখে বললো, মা একদম ভোরে আপনাকে নিয়ে যাব ।
আমিত সেই ভোর ৪ টেতে উঠি তুই উঠতে পারবিত ?
হ্যাঁ মা পারবো ।
আজ কিছু অঘটন হল রাস্তায় । কাউকে বলা যাবেনা। বাপীকে কিছুই বলা যায়না এ বিষয় । মা’ ! তিনি তো ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। ঠাকুমা ! তিনি ই বা কি করবেন? তবে কাকে বলবে সে ? বোন ! ও শুনলে হাঁসবে । মজা পাবে ।বাড়িতে ফিরে একটা ডাইরিতে আজকের ঘটনা সম্পর্কে লিখে রাখল।
বাপীর কথাগুল মনে রেখে খুব মন দিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি করতে লাগলো । ম্যাথ্, ফিজিক্স্, কেমিস্ট্রি সব বিষয় গুল ভাল করে রিভিশন দিয়ে রাখলো। গত দশ বছরের সমস্ত প্রশ্ন র উত্তর শেষ করে ফেলেছে। খাতা ভর্তি অঙ্ক আর ফিসিক্স্ এর প্রব্লেম সলভ্ করে রেখেছে ।ইংলিস্ টা আরেকটু রিভিসন করতে হবে । এইরকম ভাবছিল …।মা বললেন হ্যাঁরে পারু কোই ? ৭ টা বেজে গেল মেয়টা কোথায় যায়?তোর সঙ্গে আসেনি?এতোগুল প্রশ্নের উত্তর কি দেবে ভেবে পেলনা । আমি জানিনা …
জানিসনা মানে ?
বারে আমি স্কুল সেরে বাড়ি ফিরে এলাম । এমনিতেই আমাদের এক্সট্রা ক্লাস হচ্ছে । আমি কি করে জানবো ওর কথা ?তুমি তোমাকে ছাড়া  আর কি কর মা ! বাপের আহ্লাদি মেয়ে ! বোনটা কোথায় গেল খোঁজ নিবিনা একটু ! জানি তুমি দিগ্গজ্ মেয়ে , তা বলে বোনটার কোন খোঁজ খবর নেবে না?
সরি মা ভুল হয়ে গিয়েছে । আমাকে ভুল বুঝ না।সুমিতা মোবাইলে নম্বর ডায়াল করতে লাগলেন … এই অর্পিতা শোন ভাই তোর বর কে একটু বলনারে … আমার ছোট মেয়ে পারোমিতা যে তোর ছেলের বার্থ ডে পার্টি তে নেচেছিল মনে আছে … হ্যাঁ !… ও এখন পর্য্যন্ত
আসেনিরে । কি করি বল তো?… ইনি দিল্লী গেছেন ফিরবেন কালকে ।এলেই ত আমার ওপর হম্বি তম্বি করবেন। আমার হয়েছে যত জ্বালা…।
দাঁড়া চিন্তা করিসনা …। আমি একটু পরে তোকে খবর দিচ্ছি।রাত ৯ টার সময় পুলিসের জিপ্ এল । এটাকি সুভজিৎ ব্যানার্জীর বাড়ি  ?
ভয়ে তটস্থ সব্বাই । হ্যাঁ …। কি হয়েছে ?
দেখুন চিনতে পারেন কিনা ?
আমার বুক টা দুরু দুরু করতে লাগলো । মা গিয়ে যা দ্যাখেন । হতভম্ব হয়ে যান । পুলিসের জীপের পেছনে দুটি ছেলে মেয়ে । তার মধ্যে একটি চেনা
। সে আমাদের পরমযা

Wednesday, November 29, 2017

ইন্দ্রজাল ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী ২৯.১১.২০১৭



 
 ইন্দ্রজাল
ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী


যখন এক অজানা চোখের সঙ্গে আরেকটি চোখের মিলন হলে বেড়ে যায় হৃদ স্পন্দন মন বলে, “হ্যাঁ এই সেই ছবি যাকে কল্পনায় বারে বারে আঁকি কিন্তু তবুও অস্পষ্ট থেকেযায় আবার পরক্ষণে তাকে সামনে দেখে মণ আকুল হয় তাকে পাওয়ার জন্যতবে কি সেটাই প্রেমের নিদর্শন নাকি  অবাস্তব এক কল্পনা মাত্র ! কিন্তু তাকেই যে আপনার করার জন্য মন হয় ব্যাকুল যে কিনা সহজে ধরা দেয় না ।  কিশোর মনের এক চঞ্চলতা আচ্ছন্ন করে তবুও ছোটে আলেয়ার পেছনে সেই কল্পনার প্রতিচ্ছবিকে ছুঁতে । সব অসাধ্য কে সাধ্য করার অদম্য ইচ্ছা ! কিন্তু সত্যি কি তাতে সে সফল হবে না হতে পারবে ? ................. এই গল্পটা সেইরকম এক নিরবচ্ছিন্ন প্রেমের গল্প । 
 অয়ন কলেজের সামনে লাইব্রেরীর দিকে যেতে যেতে এক স্বপ্নের ইন্দ্রজালে বশীভূত হওয়ার মত নানা রঙিন স্বপ্নে বিভোর । স্বভাবতই দেবযানী র প্রতি এক অজানা আকর্ষণে লাইব্রেরীর দিকে নিজের অজান্তেই চলে এসেছে … 
হ্যাঁ দেবযানী নতুন এসেছে এই কলেজে ।  সাইন্স ব্লকে তাকে প্রথম দ্যাখাতেই অয়নের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে তার অপরূপ চোখ ধাঁধানো রূপে । ওর রূপের এক আকর্ষণ আছে যা অন্য মেয়েদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । লম্বা ছিপ ছিপে , টানা টান চোখ , মেদ হীন চেহারা অথচ লাবণ্যে ভরা। দেবযানীর সুন্দর মুখশ্রী সত্যি যে কোন পুরুষ কে আকৃষ্ট করতে বাধ্য। অয়ন সত্যি এই প্রথম বার  কারু প্রেমে পড়লভেবে কূল কিনারা পায়না তার এই পরিবর্তনের জন্য  রবিঠাকুরের লেখা গান আপনা হতে গুন গুন করে গাইতে ইচ্ছে হবে দেবযানী কে দেখলে ঃ    একি  লাবণ্যে পূর্ণ  প্রাণ, প্রাণেশ হে, আনন্দবসন্তসমাগমে ॥ বিকশিত প্রীতি-কুসুম হে পুলকিত চিতকাননে ॥ জীবনলতা অবনতা তব চরণে। হরষগীত উচ্ছ্বসিত হে কিরণ-মগন গগনে।কবির সৃষ্টি বোধ হয় এইরকম ই কোন অপরূপার জন্য ।
অয়ন কলেজের ক্রিকেট টিমের  ক্যাপ্টেন।   
 অয়ন খেলা ধুলোয় ভালো বিশেষ করে ক্রিকেট তার স্বপ্ন ।  ইউনিভার্সিটি রিপ্রেজেন্ট করেছে এই বছরটপ স্কোরার হিসেবে তার নাম আছে এই কলেজে । তার লম্বাটে গড়ন এবং পুরুষালী ব্যক্তিত্ব অনেক মেয়ের হৃদয়ের স্পন্দন বাড়ায় । খেলার মাঠে ব্যাট হাতে নামলে অনেক ছেলে মেয়েকেই দেখা যায় করতালি দিতে এবং সঙ্গে আপ আপ অয়ন”  চিৎকার। অয়ন খেলার সময় বোলারের হাতের বলটা অর্জুনের লক্ষ ভেদের সেই মাছের চোখের মতদেখে পারফেক্ট টাইমে ব্যাট ঘোরায় । বল কানেক্ট হলেই হয় চৌকা নয় ছক্কা । হাত তালিতে গ্যালারি ফেটে পড়ে । অয়ন বিচলিত না হয়ে ফের পরের বল ফেস করে।
 কিন্তু দেবযানীকে দেখার পর থেকে ওকে বেশ অন্যমনস্ক  দেখায় । বন্ধুরা অয়নের পরিবর্তন  লক্ষ্য করে কিন্তু কিছুই বলেনা। সামনে ইন্টার কলেজ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি । এই কলেজের অয়ন ই  ভরসা । উইকেটে অয়ন টিকলেই রান গড় গড় করে বেড়ে চলে স্কোর বোর্ডে । অয়নের পার্টনার অমিতসেকেন্ড ডাউনে এলে ওদের জুড়ি বাজি মাত  করে। পনেরো দিন বাদ টুর্নামেন্ট । এই খেলা দেখতে খোদ মুখ্যমন্ত্রী আসবেন । কলেজের সুনাম বজায় রাখা অনেকটা অয়নের-অমিতের জুড়ীর ওপর নির্ভর করে । এই সময় ওকে অনেক  প্র্যাকটিস করতে হবে । কলেজের কোচ প্রত্যেক দিন নেট প্র্যাকটিস করাচ্ছেন । ফিজিক্যাল ফিটনেসের টিপস দিচ্ছেন আর ফিল্ডিং করাচ্ছেন। সব ছেলেদের মধ্যে আশা উদ্দীপনা এবারে তারা চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়ে কলেজে আসবেই।   কলেজের প্রিন্সিপাল ডঃ কমলেশ ভট্টাচার্য কলেজের সকল ক্রিকেটার দের এক টি পার্টিতে  আমন্ত্রণ করেন । ওই পার্টিতে দেবযানী , পুষ্প গুচ্ছ দিয়ে প্রত্যেক প্লেয়ার কে স্বাদর অভ্যর্থনা করে। অয়নের কাছে দেবযানী এলে দুজনে দুজনের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে। অয়নের , দেবযানী কে দেখে এক অজানা আকর্ষণে ওর চোখটা স্থির হয়ে যায় ওর মুখের দিকে  তাকিয়ে।
এটাই বোধহয় ওদের প্রথম শুভ দৃষ্টি”.... এটা অয়নের ভাবনা, দেবযানীর কিনা জানিনা!  
কলেজের লাইব্রেরীর দিকে নিজের অজান্তেই চলে এসেছে অয়ন। দেবযানী প্রত্যেক দিন আসে তাই ও চলে আসে এই সময় । লাইব্রেরী কার্ড টা এনেছ কিনা দেখেনিল অয়ন । হ্যাঁ সঙ্গে আছে তবে কোনদিন বই নেয়নি । কলেজ লাইব্রেরীতে ওকে দেখে কিছু ছেলে মেয়ে একে অপরের দিকে দ্যাখে কিন্তু নীরবতার জন্য মুখে কিছু প্রকাশ করে না। সকলের ই কৌতূহল অয়নের আগমের উদ্দেশ্য নিয়ে ।
অয়ন খুব স্থির পদক্ষেপে দেবযানীর দিকে এগোয় । ওর পাসে বসে বলে হায়কেমন আছ।
একটু ইতস্তত ভাবে দেবযানী অয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে তুমি ! এখানে!!
কেন আমায় কি আসতে নেই ! 
না তা নয় । তবে ..... !!
তবে কি ?
দেবযানী লক্ষ্য করল সকলের চোখ ওদের দিকে । খুব অপ্রস্তুত মনে হল নিজেকে।
অয়ন পরিস্থিতি বুঝে একটাই কথা বলে বাইরে লনে অপেক্ষা করছি । আশা করি না বলবে না।এই বলে উঠে পড়ে ।
খুব অপ্রস্তুতে পড়ে দেবযানী । সকলে কি ভাবছে কি জানি ! মনে মনে ভাবে সত্যি ই ছেলেটা হ্যান্ড-সাম কিন্তু তার মানে এই নয় সোজা লাইব্রেরীতে এসে আমার পাসে বসে পড়বে! এটা খুব খারাপ মনে হল । বন্ধুরা টিটকিরি না আরম্ভ করে ওকে নিয়ে। ওকে দ্যাখা করে করে বলবে ও  যেন আর এরকম না করে। কিছু বই আর নিজের নোট নিয়ে উঠে পড়ে । অয়নের কথাটা মনে  করে কলেজের লন এ এগুচ্ছিল হটাত অয়ন সামনে এসে একটা গোলাপ দিয়ে ওকে প্রপোজ করে বসে।

দেবযানী অয়নের এই ব্যাবহারে ক্ষুব্ধ হয় । গোলাপ টা ছুঁড়ে ফেলে বলে , “কি মনে কর নিজেকে ?” আমি এসব একদম পছন্দ করিনা। তুমি হয়ত ভাল ক্রিকেট খেল কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমার প্রেমে আমি পাগল হব।  আমাকে আর কখন বিরক্ত করবেনা। এই বলে দেবযানী গট গট করে সেখান থেকে চলে যায় অয়নের উত্তরের অপেক্ষা না করে। 
এইরকম অপ্রস্তুতে পড়তে হবে অয়ন কে ও ঘুণাক্ষরেও বোঝেনি । ওর নিজের কনফিডেন্স লেভেল টা অনেক বেশি তাই হটাত এই অপ্রত্যাশিত আচরণে চকিত হয়ে যায়।  কোন উত্তর দেওয়ার আগেই দেবযানী চলে যায়।  অয়ন ফ্যাল ফ্যাল করে দেবযানীর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এটা কি হচ্ছে তার ! সে না প্লেয়ার । প্লেয়ারদের শরীর চর্চা , জগিং , জিম এইসব নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা । নারী সংগ অবাঞ্ছনীয় ।  যদিও ভালো প্লেয়ারদের গার্ল ফ্রেন্ডের অভাব থাকে না। কিন্তু দেবযানী অন্য ধাতের মেয়ে। ওর প্রতি আকর্ষণ টা কেন যে হল ভেবে কুল কিনারা পায়না অয়ন। ওর ভাবনা তে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে অমিতের ডাকে।
কিরে কি ভাবছিস? চল ফিল্ডে যাই ।
নারে আজ বাড়ি যাব । এই বলে ওখান থেকে চলে যাচ্ছিল। 
কি হল গুরু ? কেস টা কি বলত ?
কিছু না ! কি আর হবে ?
কিছু ত আছে। আমি জানি সেই জন্যই এলাম ।
অয়ন অপ্রস্তুতে পড়ে .....  মানে ?
মানে আবার কি ! অয়ন - দেবযানীর প্রেমের উপাখ্যান এর শুভারম্ভ । চিন্তা করিস না । সব ঠিক হয়ে যাবে । আমার ওপর ছেড়ে দে । কিন্তু এখন চল গুরু প্র্যাকটিস করি । এটাই তোর আমার পরীক্ষা । এখানে কোন গোলমাল হলে প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন ....!
অগত্যা অয়ন বাধ্য ছেলের মতন ফিল্ডে যায় নেট প্র্যাকটিস করতে । অমিত বোলিং করে । অফ স্পিন বল । কখন আউট সুইঙ্গার কখন ইন সুইঙ্গার । স্পিন ভালোই করতে পারে অমিত । প্রথম বলটাই অয়ন মিস করে । 
এ কি হচ্ছে ? মেয়েটা ত আচ্ছা মাথা খেল তার পার্টনারের । কাছে এসে বলে গুরু এ কি হচ্ছে? এ্যাঁ ।
না আমি আজ খেলতে পারবোনা ।
এদিকে আর মাত্র ১৫ দিন বাকি টুর্নামেন্টের । কি হবে ? মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে খেলা সম্ভব নয় সে যত বড় প্লেয়ার ই হোক না কেন !
অয়ন আজ খুব অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল । অমিত বেশ বুঝতে পাচ্ছিল সেটা । কিছু একটা বুদ্ধি বার করতে হবে .... পার্টনার বলে কথা ! ও এখন কলেজের ভবিষ্যৎ । ফিল্ডে ও না থাকলে রান রেট বাড়বে না জেতার ও চান্স কম । ও থাকলে খেলোয়াড়দের মনে জৌলুশ থাকে । সেটা অন্য কেউ দিতে পারবে না। না না .. এ রিস্ক কিছুতেই নিতে পারে না অমিত।  
 ভাবনাতে পূর্ণচ্ছেদ পড়লো , অয়নের ডাকে। আমি আজ যাচ্ছিরে । আমার শরীর ভালো নেই । মাথাটা যন্ত্রণা করছে । বাড়ি যাই । এই বলে অমিতকে বাই বলে চলে যায় ফিল্ড থেকে।
অমিত অন্য প্লেয়ারদের সাথে খেলা নিয়ে আলোচনা করে। আজকের ঘটনার সাক্ষী এক মাত্র অমিত।  কিন্তু এ বিষয় কাউকে কিছু বলে না।
৭ দিন পর:-
ক্রিকেটার অয়নের প্রেমের প্রস্তাব কে ছক্কা মেরে বাউন্ডারি পার করে দিয়েছিল দেবযানী। কিন্তু  নাছোড়বান্দা জিদ-খোর অয়ন হাল ছাড়ে নি । সেদিনের অপমান কে শার্ট থেকে ধুলো ঝাড়ার মতন ঝেড়ে ফেলে  বন্ধুদের দিয়ে সুপারিশ করিয়েও যখন কাজ হল না, নিজেই দেবযানীকে  দিল আবার বন্ধুত্বের প্রস্তাব ফ্রেন্ডশিপ ডে”  তে । দেবযানীর কাছে প্রেম ট্রেমের  চেয়ে ফ্রেন্ডশিপ টা  অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হল। কিন্তু সে কি জানত, বন্ধুত্বের ইন্দ্রজালে আটকা পড়বে অয়নের  বাকি জীবনের গল্পর সঙ্গে  ! হ্যাঁ কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবে অয়নের বন্ধুত্বের ডাকে সাড়া দেয় দেবযানী । নিছক বন্ধুত্বের খাতিরে কলজের ক্যাপ্টেন এর প্রিয়তমা না হোক বন্ধু হতে আপত্তি ছিলোনা তার। তাই খেলা দেখার ছলে বন্ধুর ক্রিকেট পারদর্শিতা কে অগ্রাহ্য করতে পারলনা
সেই থেকে সুরু ............. 
এখন অয়ন কে আর পায় কে ! হাতে চাঁদ পেয়ে অয়ন বেশ খুশি খুশি মেজাজে অমিত কে বলে আজ আমি পার্টি দেব । চল সবাই বন্ধুরা মিলে যাই ক্যানটিনে । স্মিতা , রোজি , দেবযানী , মৌসুমি , অনুষ্কা , প্রিয়াঙ্কা , অম্লান , প্রিতম , দেবজিৎ, অমিত, অয়ন । মোট এগারোজনের পার্টি । সকলেই ঠিক সময় এল দেবযানী একটু দেরিতে পৌঁছল । দেবযানী কে দেখে অয়নের ধড়ে প্রাণ এল । কিন্তু মুখে কিছু না বলে দেবযানীর  দিকে মেনু কার্ড টা এগিয়ে দিয়ে বলে আজ তোমার অনারে আমি এই পার্টি দিচ্ছি । তোমাকেই মেনু ঠিক করতে হবে ।
ও মা সেকি ! আমি এসবের কিছু বুঝি না ।
তবুও তুমি ..... অয়ন বলে ।
 আরে দিয়েই ফেল না কিন্তু কিন্তু করছিস কেন ? প্রিয়াঙ্কা র কথায় সকলে সায় দিয়ে বলে হ্যাঁ হ্যাঁ , অয়ন যখন এত করে বলছে ........
ঠিক আছে । মেনু কার্ড দেখে বলে
starter : chicken tangri kabab . Main menu :  Chicken Malai Kabab , Gobi Manchurian , Vegetable Biryani , rayta , butter nun  .  Dessert Mango pudding , strawberry kulfi   .
সকলে হাত তালি দিয়ে বলে বাবা তুই ত কামাল করেছিস ।
 “কে বলে তুই কিছু জানিস না ?”  প্রিয়াঙ্কা বলে । 
 দেবযানী ঃ   মানে ?
 প্রিয়াঙ্কা ঃ মানে তুই সুন্দর মেনু চয়েস করেছিস । আমরা সকলে এনজয়  করব । কি বল অয়ন ?
 হ্যাঁ নিশ্চয় নিশ্চয় বলে অয়ন দেবযানীর দিকে তাকায় .....
দেবযানী বোঝে ওকে এইসব বলে ওর মন পাওয়ার চেষ্টা চলেছে। অয়নের হুক সর্টে দেবযানী কুপোকাত হওয়ার মেয়ে নয় । দেখা জাগ কোথাকার জল কোথায় জায়তবে ওরা সংখ্যায় বেশি এবং অয়নের নিকট বন্ধু তাই চুপ থাকাই শ্রেয় ।
আজ খুব ফুর্তি সকলের মনে । কেন জানিনা আজ দেবযানী ও খোস মেজাজে আছে। সারাদিন পড়াশুনো করতে তারও ভালো লাগে না । মাঝে মাঝে একটু ব্যতিক্রম হলে ক্ষতি কি ? এই বলে নিজেকে বোঝায় ।
দেবযানী: বেশ কাটল দিনটা । লাঞ্চ এর জন্য অশেষ ধন্যবাদ । পাওনা রইল টুর্নামেন্ট জিতলে । 
অয়ন: তোমাকেও ধন্যবাদ তুমি আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে কষ্ট করে এসেছ । তোমার জন্য আরও বেশি সুন্দর কাটল আমাদের সকলের দিনটা । হ্যাঁ টুর্নামেন্ট আমাকে জিততেই হবে। এটা কলেজের তথা আমাদের সকলের সম্মানের ব্যাপার । বড়দের আশীর্বাদ আর তোমাদের শুভেচ্ছা  থাকলে আমরা নিশ্চয় ট্রফি আনবো । 
হ্যাঁ সেতো নিশ্চয় । তোমার প্র্যাকটিস টার গুরুত্ব বেশি । সেটা কি হচ্ছে ? ট্রফি তোমাকে আনতেই হবে । এটা কলেজের এবং আমাদের সকলের সম্মানের ব্যাপার । কথাটা খেয়াল রেখ কিন্তু।
তুমি প্রার্থনা কর ভগবানের কাছে ।
তা করব বই কি ! চলি । সকলের দিকে হাত নাড়িয়ে বাই বলে উঠে পড়ে দেবযানী ।
বা..ই..ইইই সকলে এক স্বরে বলে ।    
সকলে একে একে যে যার গন্তব্য স্থলে চলে যায়। অয়ন দেবযানীর কথাগুলো মনে করে , “তোমার প্র্যাকটিস টার গুরুত্ব বেশি । সেটা কি হচ্ছে ? ট্রফি তোমাকে আনতেই হবে। এটা কলেজের এবং আমাদের সকলের সম্মানের ব্যাপার । কথাটা খেয়াল রেখ কিন্তু।
অয়ন ভোরে উঠেই মাঠে দৌড়োয়। নিজের ফিজিক্যাল ফিটনেস টা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন । সকাল ৮ টা অবধি নানা exercise    
1.Bench press. ...
2.Squats. ...
3.Chin-ups, overhand grip. ...
4.Deadlift/stiff leg deadlift. ...
5.Lunge (static or walking) with torso twist ...
6.Rotator cuff .
7.Internal and external rotations.

তার পর নেট প্র্যাকটিস , ফিল্ডিং ইত্যাদি। বিকেল চারটের থেকে আবার খেলা। অয়ন এবং তাদের টিম সারা দিন ফিল্ডে কাটায়। কলেজের ছেলে মেয়েরা উৎসাহ দেয় সকলকে । পরিশ্রমের ফল কখন বৃথা যায় না ।
ফাইনাল টুর্ণামেন্ট ঃ
আজ ফাইনাল ইন্টার কলেজ টুর্নামেন্ট । ফাইনালে দুটি কলেজটিম এ তে অয়নদের কলেজ টিম বি তে বর্ধমান কলেজ ।
খেলাটা মূলত টিম এ vs টিম বি  ।
টস জিতে  টিম ‘এ’ , টিম ‘বি’ কে ব্যাটিং এ আমন্ত্রণ করে । দর্শক মহলে জোর হাত তালি ।
প্রথম বল টিম ‘এ’  র  প্রিতম করে , আউট সুইঙ্গার ছিল । ব্যাটস ম্যান কানেক্ট করতে পারে নি। উইকেট কিপারের হাতে । এপিল এল বি ডবলু র। প্রত্যাখ্যান করেন আম্পায়ার ।
পরের বল প্রিতমের হাতে । দুর্দান্ত পেস ছিল বলটায় । ব্যাটসম্যান ব্যাট ঘোরান ।  মিড অফে ফিল্ডার ছোটে । ততক্ষনে বল বাউন্ডারি পার হয়ে যায়। ৪ রান সংগ্রহ করেন ব্যাটসম্যান । স্কোর বোর্ডে 04 দেখায় ।  স্কোর ঘুরতে ঘুরতে দু অঙ্কয় পৌঁছোয় বিনা উইকেটে ১২ রান । এর মধ্যে চার ওভার শেষ । প্রিতম ২-০-৮-০ , দেবজিৎ স্পিনার হিসেবে ভালো । মিডিয়াম পেস বোলার ২-১-৪-০ ।  এরপর অম্লান আসে বল হাতেমিডিয়াম পেস বোলার কিন্তু মাঝে মাঝে ইয়োর্কার দেয় । বল কোন দিকে টার্ন নেবে ব্যাটসম্যান বুঝে উঠতে পারেনা । অয়ন , অম্লানের কানে কিছু বলে। অম্লান ফিল্ডিং সাজায় । সিলি পএন্ট(১) , সর্ট লেগ(১) , সিলি মিড অফ(১) ,  মিড অফ(১) ,  মিড অন(১) , স্লিপে দুজন (২)  , উইকেট কিপার নিজে অয়ন ©  , ডিপ স্কয়ার লেগ (1)  , ডিপ এক্সট্রা কভার (1)
অম্লানের বল সম্ভবত ইয়র্কর ছিল , ব্যাটিং ক্রিসে ব্যাটসম্যান পায়ের কাছে পিচ খায়।  ব্যাটসম্যান ব্যাট  ঘোরাতেই মিড উইকেট পড়ে যায়। দর্শক মহলে জোর কর তালি । আম্পায়ারের নিশানা তর্জনী ওপরে করে আউটের ইংগিত বিনা দ্বিধায়। প্রথম উইকেট টিম বির   ১২ রানে । স্কোর  ১২ রান এক উইকেটের বিনিময়ে । দর্শক মহল উল্লাসে ফেটে পড়ে। অম্লানের প্রথম বলেই চরম সফলতা । পরের বল ফুল টস । ব্যাটসম্যান এর  লং অন এ ড্রাইভ করতে চেষ্টা কিন্তু বৃথা চেষ্টাতেই পরিণত । আবার উইকেট পড়ে যায় । টিম বির   প্লেয়ারদের  ওপর খুব  প্রেশার । বোঝাই যাচ্ছে। দর্শক মহল থেকে জোর কর তালি অম্লান হ্যাট ট্রিক , অম্লান হ্যাট ট্রিক !  উই ওয়ান্ট হ্যাট ট্রিক।টিম বির ১২ রান দু উইকেটের বিনিময়ে । থার্ড বল আবার   ইয়র্কর । সেকেণ্ড ডাউনে ওদের ক্যাপ্টেন চরম বিপর্জয়ের মুখে ১ রান করেন । স্কোর ১৩/২ ।
  দেবযানী বন্ধুদের সঙ্গে তাদের কলেজের টিম র খেলা দেখছিল । সকলের সঙ্গে ও খেলা দেখছিল । সম্ভবত উপভোগ ও করছিল । কিছুক্ষণের মধ্যে ২০ ওভার শেষ হয় । ২০ ওভারের শেষে টিম বির স্কোর দাঁড়ায় ৯৮ অল আউট । কিছুক্ষণ টাইম ব্রেক মানে লাঞ্চ । সব  খেলোয়াড় রা প্যাভিলিয়নে ফিরে যায় । তাদের লাঞ্চের ব্যবস্থা ডাইনিং হলে করা হয়ে ছিল। হোষ্ট হিসেবে টিম কলেজ সব আয়োজন করে।
লাঞ্চের পর অয়ন কে ব্যাট হাতে ফিল্ডে যেতে দেখে দেবযানীর কৌতূহল বেড়ে যায়। এই তার প্রথম কোন খেলোয়াড়ের স্বচক্ষে ক্রিকেট খেলা দেখার সুযোগ । এবারে অয়ন আর অমিত ওপনার হিসেবে যায় । দুজনেই তুখোড় ব্যাটসম্যান । অনেক প্র্যাকটিস করেছে । ক্রিকেট ওদের জান । সকলে কপালে করজোড়ে ঠাকুর কে প্রণাম করতে দ্যাখা গেল। দেবযানীর কৌতূহল অয়ন কে নিয়ে । ও মনে মনে ঠাকুর কে ডাকল প্রকাশ্যে নয়।
সচরাচর যা ফিল্ডিং সাজান হয় তাই । ফারাক দুটোর যায়গায় তিনটে স্লিপ । একি টেস্ট খেলা নাকি ? দেখা-জাগ কি হয়। উৎকণ্ঠা ভরা দর্শক .... প্রথম বল ... অয়ন ফেস করছে । সঠিক টাইমিং এ অয়ন ব্যাট ঘোরাতেই বল বাউন্ডারির বাইরে । প্রথমেই ৪ রান। পপিং ক্রিসে ব্যাটটা ঠুকে পরের বলের জন্য অপেক্ষা । সেকেন্ড বল বাউন্সার ছিল । অয়নের হেলমেটের ওপর দিয়ে চলে যায়। রানার অমিত আম্পায়ারকে কিছু বলতে দেখা যায়। আম্পায়ার বোলারকে হুঁশিয়ার দেন। ফার্স্ট ওভারেই বাউন্সার ! যাই হোক তৃতীয় বলে আবার ছক্কা । অয়নের স্ট্রোকটা পারফেক্ট টাইমিং এবং বেশ পাওয়ার-ফুল ছিল। বোলারের মনের বল এই রকম করে ভাঙ্গতে হয়। কলেজের কোচ এই ট্রেনিং দিয়েছিলেন। অয়নের স্ট্রোক গুলো কেতাবি চালে মারা । একেই বলে এক্সিবিশন  স্ট্রোক । এরপরের বলে সিঙ্গিলস ছিল। এবার অমিত ফেস করবে। দুই পার্টনার জমিয়ে দিয়েছে মাঠ । দর্শকের উত্তেজনার শেষ নেই । অমিত বল ফেস করে মিড অফের দিকে ব্যাট ঘোরায় । বল গড়িয়ে সোজা বাউণ্ডারি পার করে চার রান। প্রথম ওভারে ১৫ ফর নো লস। টিম বির দুটো  উইকেট পড়ে গিয়েছিল মানে ১৩/২ তার জবাবে টিম র ১৫ রান বিনা উইকেটে ।  
টিম ৩ উইকেটে ১০০ রান করে। অয়নের দ্রুত ৫০ টিম কে জেতানোর সাহায্য করে। অয়ন অপরাজিত ৫০ অমিত ৪০ করে আউট হয়ে যায় বাকি দশ রান অম্লান আর প্রিতমের যোগ করে। টিম ৭ উইকেটে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি যেতে।
সারা মাঠে কলেজের ছেলে মেয়েরা অয়ন, অমিত , অম্লান ও প্রিতম কে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানায় । খুশির ফোয়ারা বয়ে যায় Champagne এর বোতল খোলা মানা , তা নাহলে ছেলেরা সেটাও খুলে সেলিব্রেট করত ।
অয়ন কেবল একজনকেই মনে মনে খুঁজছিল সে আর কেউনা দেবযানী । কোথায় সে ? সে কি আসেনি ! তার প্রেরণা আজ সফল করেছে এই ট্রফি জিততে । সেকি যানে ?
ট্রফি নিয়ে পুরো টিম লাফালাফি করে সারা ফিল্ড চক্কর দেয়। ম্যান অফ দি ম্যাচ অয়নকে দেওয়া হয় দ্রুত রানের জন্য। টিম এবং টিম বির সব প্লেয়ারদের সঙ্গে করমর্দন । সবাই সেলিব্রেট করতে ব্যস্ত। অয়ন বড় ক্লান্ত । আজ সে ভগবানকে প্রাণ ভরে ডাকবে । এই সফলতার জন্য তাঁর আশীর্বাদ , দেবযানীর প্রেরণা এবং কলেজের সকলের প্রার্থণা ই দায়ী । কিন্তু একজন  কে কেন দেখল না ! সেটাই প্রশ্ন করে নিজেকে।  
ক্লান্ত অয়ন প্যাভিলিয়ন থেকে ফিরে যায় ড্রেসিং রুমের দিকে। সামনে দেবযানীকে দেখে আশ্চর্য হয়েযায়।
তুমি ? কোথায় ছিলে ? আমি কত খুঁজেছি তোমায় ! In fact……….
আমি তোমার পুরো খেলা দেখেছি । Congratulation. তুমি সত্যি চ্যাম্পিয়ন। “I admire you” এই বলে জড়িয়ে ধরেঅয়নের মুখ থেকে একটাই কথা স্বতস্ফুর্ত উচ্চারিত হয় , “I love you”
দুজনে দুজনের দিকে গভীর ভালোবাসায় তাকায় যেন হারান নিধি খুঁজে পেয়েছে দুজনে । এটাই কি তবে প্রেম নাকি সরল বন্ধুতা মাত্র ? প্রশ্ন আপনাদের কাছে রাখলাম  ??????? 
  
   

Thursday, September 7, 2017

টকিং বার্বি ডল ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী ০৭.০৯.২০১৭




 ছোট্ট মেয়েটা নাম তার ‘দীপান্বিতা’ । আমার নাতনীর বয়সী হবে।আমাদের আবাসনেই থাকে আমার বাড়ির পাসে । তার ৫ম জন্মদিন ১লা জানুয়ারি তে। আমাকে দু মাস আগেই বলে রেখেছে “দাদু , আমার জন্মদিন ১লা জানুয়ারিতে । তুমি কিন্তু আমাকে গিফট দেবে । আমি মা বাবাকে বলে তোমার পছন্দর খাবার আনাবো।”
আমি বলি নিশ্চয়ই মা। তুই তো আমার আহ্লাদী ঠাকুমা । তোকে গিফট না দিলে কাকে দেব বল !
হুম মনে থাকে যেন ।
ঠিক আছে মনে থাকবে দেখিস। তবে আমি যদি তার আগে মরে যাই ।
বালাই শাঠ ও কথা বলছ কেন । তুমি না থাকলে আমায় গল্প কে শোনাবে? পাকা বুড়ির মত বলে।
তবে তোকে গল্প শোনাবার জন্য আমায় বেঁচে থাকতে হবে !
তা কেন । তুমি শুনিও না কিন্তু তুমি থাক নাহলে আমিও তোমার সঙ্গে চলে যাব আকাশে।
দূর বোকা মেয়ে । তবে ওই পক্ষী রাজ ঘোড়া চড়ে তোর অস্ট্রেলিয়ান রাজকুমার যে মেলবোর্ন থেকে আসবে সে কাকে নিয়ে যাবে তার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া য়।
খুব রেগে যায় । তুমি খুব বাজে । ও আমার বন্ধু । আমাকে না রাগালে তোমার বুঝি ভাত হজম হয়না?
আমি হাঁসি । খুব মজা পাই ওকে রাগাতে আবার ও নাহলেও চলে না । ওই ত আমার প্রকৃত বন্ধু।
অস্ট্রেলিয়ান রাজকুমার এর সিক্রেট হচ্ছে …. ওর ই স্কুলের এক ছেলে তার জন্ম অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে । সে নাকি ওর বেষ্ট ফ্রেন্ড । তাই এই রসিকতা। ওই বলেছিল সে কথা । ছেলেটি দেখতে ভারি সুন্দর কিন্তু ও আসলে মহারাষ্ট্রিয়ান । নাম অমিত আকোল্কার ।
এই অমিতকে নিয়ে দীপান্বিতার যত গল্প । ও কি টিফিন আনে , স্কুলে টিচার ওকে কি বলে। কেমন ড্রইং করে ইত্যাদি।
আমি চুপ করে শুনি । মাঝে মাঝে ‘হুঁ’ বলি । তারপর বলি তোর বেষ্ট ফ্রেণ্ড দের ডাক-বিনা ?
ডাকব তো । চকলেট দেব, গিফট দেব । আরও কত কি ।
আজকাল বাবা মায়েরা , ছেলে মেয়েদের জন্মদিন ইউরোপিয়ান স্টাইলে ওদের ধারায় করে । আমাদের আমলে বাবা মা নতুন ড্রেস পরিয়ে মন্দিরে পূজো দিতেন । সেদিন একটা বিশেষ দিন বলে গণ্য হত । বাড়িতে পায়েস নিশ্চই হত । সেটা মুখে দিয়েই মা বাবা আশীর্বাদ করতেন । গড় হয়ে প্রণাম করে তাঁদের আশীর্বাদই সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল। সে রীতি প্রায় নেই । এখন কেবল কেক কাটা আর গিফট নেওয়া পরে গিফট দেওয়া । বেলুন দিয়ে সাজানো, লাইটের ডেকোরেশন ইত্যাদি।
……… দিপুরা (আমি ওকে এই নামি ডাকি) বেশ কদিন হল কোথায় গিয়েছে । আমি কোন খবর পাইনা ওদের। মনে মনে খুঁজি । আহা মেয়েটার ওপর মায়া পড়ে গিয়েছে । ওর টক টক কথা , চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচ আমার মন কেড়ে নিয়েছে। ওর মা বাবা কেও দেখিনা কদিন। মনে মনে ভাবি হয়ত স্কুলের পড়াশুনোর চাপ। তারপর নাচের ক্লাস ,গানের ক্লাস , ড্রইং ক্লাস , ক্যারাটের ক্লাস …… । সত্যি আজকাল মা বাবারা নিজেদের ছেলে মেয়ের ওপর এতো প্রেশার দেয় যে তাদের নিজের মতন বাঁচার অধিকারটুকু যেন ছিনিয়ে নেয় । সব এক একটা রোবটে পরিণত হচ্ছে আর সেই রোবটের রিমোট টা আছে মায়ের হাতে । যেমন বোতাম টিপবে ঠিক সেই রকম চলবে । খাও খাবে … নাচো নাচবে … গান কর গান করবে …!!!!! এ কি ?
আমার মনে আছে কিন্তু দিপুর কথা । ওর বার্থ ডে গিফটের ফরমাস“টকিং বার্বি ডল” সেটা নিয়েই যাই ১লা জানুয়ারির দিন সন্ধ্যায় । কিন্তু একি ফ্ল্যাট টা এত ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন ? কেউ কি নেই ! লোকজন ত থাকার কথা । মিউজিক ,লাইট সব কোথায় ? তা ছাড়া কোন লোক জন নেই । তবে কি ওর বার্থ ডে পার্টি হবেনা ! কিন্তু কেন? এই ভেবে মনটা এক অজানা আশংকায় গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপলাম। দরজা খুলে দিলেন ওর বাবা । আমাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন । উনি বললেন , “দিপুর ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে । ওরা মুম্বাই গিয়েছিল ওকে দেখাতে আশা ক্যানসার হসপিটাল এন্ড চিলড্রেন হসপিটাল এবং টাটা ক্যানসার হসপিটাল , মুম্বাইতে। কেমো দেওয়া হয়েছে। ওকে দেখলে চিনতে পারবেন না।”
আমি আর দুঃখ রাখতে পারলামনা। ও যে আমাকে বলেছিল “আমার সঙ্গে আকাশে চলে যাবে । তবে কি ও জানতো ওর রোগের কথা ! ওর সেদিনের কথাগুলো আমার ভিডিও রেকর্ডিং এর মত চোখের সামনে ভেশে উঠলো ; বালাই শাট ও কথা বলছ কেন । তুমি না থাকলে আমায় গল্প কে শোনাবে? তবে তোকে গল্প শোনাবার জন্য আমায় বেঁচে থাকতে হবে !” আমার চোখ ভারাক্রান্ত হল। আমি কেঁদে ফেললাম হাউ হাউ করে । ভগবান কেন এই কচি শিশুদের এই ভয়ংকর রোগ দেন ! কেন ? আর কিছুই আমার মাথায় এলোনা তখন কিছু না বলে দিপুর বাবার হাতে বার্বি টকিং ডলটা দিয়ে বলি এটা ওকে দিয়ে দেবেন । এটাই ও চেয়েছিল। মানা করবেন না । ওই আমার প্রাণের বন্ধু । এই বলে দ্রুত পায়ে ওখান থেকে ফিরে আসি আমার নিজের ফ্ল্যটে । সারাদিন আমি ঠাকুর ঘরে গিয়ে ওর আরোগ্যের জন্য ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি । আমি কি করতে পারি এ ছাড়া !