Thursday, March 19, 2015

ঘটগাঁ মা তারিণী পিঠ ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ১১.০৩.২০১৫ বুধবার /



 ঘটগাঁ মা তারিণী পিঠ
  ত্রিভুবন জিৎ  মুখার্জী / ১১.০৩.২০১৫ বুধবার /
  তারিণীর ইতিহাস ঃ- ১৪৮০ খৃস্টাব্দে পুরীর গজপতি রাজা শ্রী পুরুষোত্তম দেব , ‘কাঞ্চী যুধ্যের’ সময় তৎকালীন কেঞ্জোর রাজ্যের রাজা শ্রী গোবিন্দ ভঞ্জ দেও মহাশয়কে তাঁর সেনাপতি রূপে আহ্বান করেন । শ্রী গোবিন্দ ভঞ্জ দেব যুধ্যে পারদর্শী ছিলেন তাই শ্রী পুরুষোত্তম দেবের আহ্বানে তাঁর  সঙ্গে  কাঞ্চি অভিযানে যাত্রা করেন। গজপতি রাজা পুরুষোত্তম দেব  কাঞ্চী জয় করে কাঞ্চী রাজার রাজ কন্যা ‘পদ্মাবতী দেবীকে’ সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং পাট রানি করেন । এই ইতিহাস অতি প্রাচীন ।   
ছোট করে বলতে হলে ঃ পুরীর জগন্নাথের রথ দেখতে কাঞ্চীর রাজা এসেছিলেন । রথের প্রারম্ভে পুরীর গজপতি মহারাজা , শ্রী জগন্নাথ ,বলভদ্র এবং মা সুভদ্রার রথে ‘ছেরা পঁহরা’ করে থাকেন। এটাই রীতি । ছেরা পঁহরা অর্থাৎ সোনার ঝাঁটা দিয়ে চন্দন এবং বেল ফুল দিয়ে সারা রথ পরিক্রমা করে নিজে রাজা ঝঁট দেন । সেই ঝাঁটা হাতে রাজাকে দেখে কাঞ্চীর রাজা পুরীর গজপতি রাজাকে ম্যাথোর ভাবেন এবং উপহাস করেন । এতে গজপতি রাজা অপমানিত হন এবং শপথ করেন কাঞ্চী রাজ্য জয় করে রাজকন্যা পদ্মাবতী দেবীকে মহারানী করবেন । যা ভাবা তাই হল । সেই যুধ্যে শ্রী গোবিন্দ ভঞ্জ দেব সেনাপতির ভূমিকা পালন করে কাঞ্চী যুধ্যে জয়ী হয়ে ফেরেন ।  
 
কাঞ্চী যুধ্যের জয়ের খুশীতে গজপতি রাজা পুরুষোত্তম দেব শ্রী গোবিন্দ ভঞ্জ দেবেকে জিজ্ঞাসা করেন তাঁর কি অভিলাষ ! শ্রী গোবিন্দ ভঞ্জ দেব মা তারিণীকে তাঁর রাজ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজো করতে চান এবং কেঞ্জোরে মায়ের মন্দির বানানোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু গজপতি রাজা বলেন এই আশা পূরণের উদ্দেশ্যে ‘মা তারিণীকে’ নিয়ে যাওয়ার অনুমতির জন্য মাকে প্রার্থনা করতে ; কারন মায়ের অনুমতি বিনা তাঁকে নেওয়া সম্ভব নয় । এর পর গোবিন্দ দেব মায়ের পূজোয় বসেন । মা তারিণী তাঁর পূজোয় সন্তুষ্ট হন বটে কিন্তু একটা সর্ত রাখেন। মা  বলেন মা’কে নিয়ে যাওয়ার সময় রাজা গোবিন্দ দেব যেন পেছন ঘুরে না তাকান মা আসছেন কিনা দেখতে । রাজা রাজি হন মা’য়ের ওই সর্তে । রাজার সঙ্গে  মা তারিণী ঘোড়ায় চড়ে রাজার পেছন পেছন যাচ্ছিলেন । কিন্তু ঘটগাঁর কাছে গভীর জঙ্গলে মায়ের ঘোড়ার আওয়াজ রাজা শুনতে পেলেন না । এতে রাজা বিব্রত হয়ে পেছনে তাকান । সেই সময় মা তারিণী প্রস্তরে পরিণত হয়ে এক বট গাছের তলায় অধিষ্ঠান করেন। রাজা যত মনঃ কষ্ট করে পূজার্চনা করলেও আর মা তাঁর রূপ ধারণ করেন না।  সেই থেকে ‘মা তারিণী’ ঘটগাঁতে পূজো পেয়ে আসছেন ।
তারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা:-
১৯৭০ সালে উড়িষ্যা  সরকার এর মন্দির প্রতিষ্ঠান তারিণীর মন্দির তৈরি করে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে ওখানে যাত্রী দের সুবিধের জন্য হোটেল , লজ , গেস্ট হাউস ইত্যাদি আছে । যারা থাকতে চান স্বচ্ছন্দে ওখানে কম খর্চায় থাকতে পারেন। ওখান থেকে অনেক দর্শনিয় স্থান যেমন জলপ্রপাত ১. সান ঘাগরা , ২. বড় ঘাগরা , ৩. ভীম কুন্ড ইত্যাদি ঘুরে  দেখে যেতে পারেন। কিছু বিদেশী পর্যটক এইসব দর্শনিয় স্থান এসে ঘুরে ভিডিও করে তাঁদের দেশে নিয়ে যান ।    
কি করে যাবেন:-
ভুবনেশ্বর থেকে ঘটগাঁতে যাওয়ার দুটো রাস্তা আছে । প্রথম রাস্তা ভুবনেশ্বর থেকে NH 5 ধরে কটক , চন্ডিখোল  হয়ে NH5A(Express High way) ধরে বাঁ দিকে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে “ব্রাহ্মণী নদীর ব্রিজ”  পার হয়ে  ‘ডুবুরী’ ।  এই ডুবুরী তে টাটা স্টিল প্ল্যান্ট , নীলাচল ইস্পাত স্টিল প্ল্যান্ট ইত্যাদি আছে তাই এটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব । ডুবুরি থেকে দৈত্যারি মাইনসের রাস্তায় ‘ব্রাহ্মনিপাল’ অবধি গিয়ে ওখান থেকে ডানদিকে ঘটগাঁ (রাস্তার ওপর এক্সপ্রেস হাই ওয়ের ওপর ফিকে সবুজ বোর্ডে সুস্পষ্ট লেখা) । ভুবনেশ্বর থেকে রাস্তায় চন্ডিখোল ৭০ কিলোমিটার , চন্ডিখোল থেকে ডুবুরী ৩৮ কিলোমিটার , ডুবুরী থেকে ব্রাহ্মণীপাল ১২ কিলোমিটার , ব্রাহ্মণীপাল থেকে ঘটগাঁ ৫৮ কিলোমিটার । সমুদায় ১৭৮ কিলোমিটার  এই রাস্তার একটা বিশেষত্ব আছে। এই রাস্তা দিয়ে গেলে অনেক ছোট ছোট  পাহাড় পর্বত  এবং জঙ্গল আছে যার সিনিক ভ্যালু অনেক। আমি সারা রাস্তা ক্যামেরা ধরে ফটো তুলেছি। দ্বিতীয় রাস্তা সোজা NH5 ধরে ‘চন্ডিখোল ছক’ পেরিয়ে সোজা ‘পাণিকোইলি’ অবধি গিয়ে ওখান থেকে আবার বাঁ দিকে ‘যাজপুর রোড’ । যারা হাওড়া থেকে আসবেন তারা যাজপুর রোড়ে নেমে ট্যাক্সি কিম্বা কেঞ্জোরের বাসে ঘটগাঁ নেবে মা তারিণী র দর্শন করতে পারেন। যা বলছিলাম.. ওই যাজপুর থেকে আবার আনন্দপুর হয়ে সোজা ঘটগাঁ মা তারিণী পীঠ । 
     
এখন এটি উড়িষ্যার একটি পর্যটন এবং শক্তি পীঠের স্থান যেখানে মা পূজো পান। মা তারিণী খুব জাগ্রত দেবী তাঁর কাছথেকে কেউ খালি হাতে ফেরেনা । ভক্তিভরে ডাকলে মা সাড়া দেন ভক্তকে ।
 
তারিণীর পর্ব পর্বানিঃ-
তিনটে বড় সংক্রান্তি তে তারিণীর বিশেষ পূজার্চনা হয় এবং ওই সময় এখানে উৎসব মুখরিত পরিবেশ জা এখানকার আদিবাসীদের পর্ব বলে ধরা হয়।  ১. মকর সংক্রান্তি (জানুয়ারি ১৪-১৬) , ২. মহা বিষুব সংক্রান্তি (এপ্রিল ১৪-১৬) , ৩. রজ সংক্রান্তি ( জুন ১৪-১৬) । এই সময় যাত্রীদের খুব ভীড় হয় । ছত্রিশ গড় , ঝাড়খণ্ড থেকে এখানে অনেকে আসেন মায়ের যাত্রা দেখতে । এ ছাড়া দুর্গা পূজো ও কালি পূজোতে মায়ের বিশেষ পূজার্চনা হয় । এখানকার মুগের ডালের খিচুড়ি মায়ের প্রসাদ । আমিষ ভোগ হয় না। উড়িষ্যার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মায়ের পূজোর জন্য লোকে মানসিক করেন নারকোল ভোগ দিয়ে। তাই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারকোল আসে মায়ের কাছে ভোগের জন্য। এখানকার পুরোহিত কে দেহুরী বলে। এরা ব্রাহ্মণ নয় । 
ভোগের সময় নির্ঘন্টঃ-
ক্র.সংখ্যা
 পূজার নাম
                                    সময়
 ১.
 বাল্যভোগ
সকাল ৬ টা
 ২.
 খিচুড়ি
সকাল ১০.৩০
৩.
পহড় (মন্দিরের দ্বার বন্দ করা হয়)
                                         বেলা ১.০০
 ৪.
 বাল্যভোগ
বেলা ৩.৩০
 ৫.
 সন্ধ্যা ভোগ (সরু চকুলি পিঠে ভোগ)
বিকেল ০৫.০০
6.
  সন্ধ্যা আরতি
সন্ধ্যা ০৭.৪৫
7.
 পহড় (মন্দিরের দ্বার বন্দ করা হয়)
সন্ধ্যা ০৮.০০

পুরীর সাহিযাত্রা উৎসব ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ০৭.০২.২০১৫ /


 পুরীর  সাহিযাত্রা উৎসব  
ত্রিভুবন জিৎ  মুখার্জী / ০৭.০২.২০১৫ / 
পুরী , উড়িষ্যার এক তীর্থস্থানই শুধু নয় এই সহরের সঙ্গে যুগ যুগ ধরে জগন্নাথ সংস্কৃতি অঙ্গে  অঙ্গে জড়িত ।  বিভিন্ন  পর্ব পর্বানির মধ্যে পুরী সদা সর্বদা উৎসব  মুখরিত তীর্থস্থান  । তাই কথায় আছে  এখানে বারো মাসে তের পার্বণ বা যাত্রা । বসন্তর আগমনে এখানে এক অদ্ভুত যাত্রা শুরু হয় নাম সাহি যাত্রা’ বাপথ প্রান্ত যাত্রা উৎসব’  । প্রায় ১২৩০ খৃষ্টাব্দ থেকে তখনকার গজপতি রাজা  চোড়্গঙ্গদেব’  বিভিন্ন আখড়া ঘরে মল্ল যোদ্ধাদের  নিয়ে জাগাঘর (ব্যায়াম ঘর) তৈরি  করেন । তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁর রাজধানী পুরী যাতে সুরক্ষিত থাকে  । কোন বাহ্যিক শত্রুদ্বারা  আক্রমণকে  প্রতিরোধ করার শক্তি থাকে এই  মল্ল যোদ্ধাদের ।  তখন জগন্নাথ মন্দিরের চতুঃপার্শ্বে সুউচ্চ  মেঘনাদ প্রাচীর ছিলনা ।  এই মল্ল যোদ্ধাদের,   রাজা জগন্নাথ মন্দির সুরক্ষ্যার দায়িত্ব দেন।  তারা মন্দিরকে বাহ্য শত্রুর হাত থেকে রক্ষ্যা করার জন্য বিভিন্ন অস্ত্র চালনা যথা তরওয়াল লাঠি চালনা প্রভৃতি যুদ্ধাস্ত্র  চালনাতে রপ্ত ছিল। জাগাঘর ছিল এইসব মল্ল যোদ্ধাদের  তালিম এবং শিক্ষা কেন্দ্র। 
সাহি’  মানে পাড়া’ । জাগা ঘর” মানে ব্যাম কেন্দ্র। পুরী মন্দির চতুঃপার্শ্বে সুউচ্চ প্রস্তর নির্মিত  মেঘনাদ প্রাচীর তৈরি হয় মন্দির সুরক্ষার জন্য ।
পুরীতে ৭ টা পুরন সাহি আছে যথাঃ- ১)হরচন্ডী সাহি ২)মার্কন্ডেস্বর সাহি ,৩) দোল মণ্ডপ সাহি ৪)বাসেলি সাহি ৫)মাটিমন্ডপ সাহি ৬)বালি সাহি ও ৭)গৌড় বাট সাহি  জগন্নাথ মন্দির এর চতুঃপার্শ্বে এদের অবস্থিতি  ।  এই সাহির অধিবাসীদের প্রধান দায়িত্ব ছিল মন্দিরকে বাহ্য শত্রু থেকে রক্ষা করা এবং তার জন্য তারা প্রত্যেক দিন জাগা ঘরে ব্যাম কুস্তি মল্ল যুদ্ধ  এবং লাঠি ও তরবারি  চালনা ইত্যাদি  অভ্যাস করত । সাধারণ জনতা এইখানে তালিম-প্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছথেকে বিভিন্ন কলা কুশলী শিক্ষা প্রাপ্তি করার সুযোগ পেত ।  প্রত্যেক সাহির একটা জাগা ঘর আছে  । উধাহরনতঃ ১। সুন্দরা জাগা ২। মল্লিগড় জাগা ইত্যাদি । 
এই জাগা ঘরের যোদ্ধারাই বাহ্য শত্রু থেকে একসময় জগন্নাথ মন্দির রক্ষা করেছিলতাই পুরীর গজপতি  রাজা জাগা-ঘরের মল্ল  যোদ্ধাদের  বিশেষ তালিম এর আয়োজন করেন তাঁর রাজধানী এবং মন্দির সুরক্ষ্যার জন্য । 
রাম নবমীর দিন থেকে প্রত্যেক জাগা ঘরের মল্ল যোদ্ধারা  তাদের যুদ্ধ কলা কুশলী পুরীর পথ প্রান্তে প্রদর্শন করে । ১৫ দিন ধরে এই যাত্রা চলে এই সময় এক বিশেষ সাজে নাগা নাচ’ হয় এবং  মল্ল যুদ্ধ কুস্তি ইত্যাদি প্রদর্শিত হয় । সাহি যাত্রার সময় ছোট ছোট পথ প্রান্ত নাটক প্রদর্শিত হয় । পুরীর সাধারণ জনতা এই পথ প্রান্ত নাটকের মাধ্যমে বিভিন্ন জাগা ঘরের কলা কুশলীদের রণ কৌশল নাগা নাচের মাধ্যমে উপভোগ করেন।
ওই সময় মল্ল যুদ্ধ ছাড়াও ছোট ছোট পৌরাণিক কাহিনী প্রদর্শিত হয় । সব সাহিথেকে এই যাত্রা আরম্ভ হয়ে পুরীর বাড় দান্ড তে এক হয় । হরচন্ডী সাহি মার্কন্ডেস্বর সাহি দোল মণ্ডপ সাহি ,বাসেলি সাহি মাটিমন্ডপ সাহি বালি সাহিগৌড় বাট সাহি এই সাতটি সাহিথেকে সাহি যাত্রা বেরয় । প্রত্যেক সাহির একটি স্বতন্ত্র চিহ্ন স্বরূপ পতাকা থাকে ।  প্রত্যেক সাহির আলাদা আলাদা ছোট নাটকের বিষয় বস্তু থাকে যেমন রাম জন্মদুর্গা ঠাকুরের দ্বারা মহিষাসুর নিধন রাবণের দ্বারা  সিতা হরণ রাম রাবণের যুদ্ধপঞ্চ মুখি গণেশ ,নৃসিংহ অবতার ইত্যাদি ।
 ব্যাঘ্র চর্ম  পরি-ধারিত এক বিরল সাজে নাগা নর্তক সুসজ্জিত হয়ে দর্শক কে তার রণ নৃত্য কৌশল প্রদর্শন করে। সেটাই এই যাত্রার মুখ্য আকর্ষণ নাগা নর্তক অস্ত্র সুসজ্জিত কটিদেশ  কুঞ্চিত গুম্ফ জোড়া তীক্ষ্ণ নাসিকা অট্ট হাস্য পূর্ণ  রক্ত চক্ষু দ্বয়ের রণ হুঙ্কার দর্শকের মনোরঞ্জনের এক মাধ্যম। নাগা নাচ পুরী ছাড়া অন্য কোথাও প্রদর্শিত হয়না । উড়িষ্যার এই মার্সল আর্ট অনেক দর্শক কে আকৃষ্ট করে।   
এই সময় বিদেশি পর্যটকেরা অনেকেই  নাগা নাচ এবং সাহি যাত্রার আনন্দ নিতে পুরী আসেন।  তাই এই সময় পুরী উৎসব মুখরিত এক পর্যটন কেন্দ্রতে পরিণত হয় ।

অনুগল্প লং বেঞ্চ ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ১৯.০৩.২০১৫ / বেলা ১.১৫ ।



   অনুগল্প লং বেঞ্চ  
ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ১৯.০৩.২০১৫ / বেলা ১.১৫ ।

পার্কের এই কংক্রিটের লং বেঞ্চটা বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য উদ্দিষ্ট । একটু নিরিবিলি পরিবেশ । সামনেই ছোট্ট একটা ফুলের বাগান আছে তাতে নানান রঙের গোলাপ , রজনীগন্ধা , ডালিয়া জারবেরা ইত্যাদি  ফুলের শোভায় এক মনোরম পরিবেশ । বেঞ্চের ওপর ছায়ার জন্য বেশ পেছনে একটা কদম গাছ বলে কদম গাছে নাকি কেষ্ট নাচে গোপীদের জন্য , তাই এই -  বরিষ্ঠ নাগরিকের বসার জায়গায় কদম গাছটাই বেশ বেমানান। এই অঞ্চলের কাউন্সিলার ঠিক যায়গাতেই বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য বসার যায়গাটা ঠিক করেছেন পার্কের মধ্যে । সামনেই মাঠের মধ্যে আরেকটা গোলাকার ঘর যার চালাটা এসবেস্টস এর তৈরি । চূড়াটা কোনিকাল আকৃতির এবং গোলাকার বেঞ্চ , বসার জন্য । মধ্যেখানে সুন্দর অর্কিডপাসের দেওয়ালটা খোলা তাই আলো বাতাস আসার অসুবিধা নেই। মোটামুটি বলতে গেলে এরকম একটা পার্ক সাধারণত সল্ট লেকেই দেখতে পাওয়াযায়  
প্রসঙ্গে আসি । এই বেঞ্চটাতে আমরা ৫ জন অবসরপ্রাপ্ত বরিষ্ঠ নাগরিক এসে বিকেল বেলায় আড্ডা দি। আমরা বলতে ১. পঞ্চুদা , ২.  নিহারদা , ৩. রণজিৎ-দা , ৪. সমরেশ দা এবং আমি । এনাদের মধ্যে আমি সর্ব কনিষ্ঠ । পঞ্চুদা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ তাই সকলে ওনাকে সম্মান করেন।  আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গ সাম্প্রতিক রাজনীতি , খেলা , কিছু ধর্মালোচনা আবার তার মধ্যে কখন কার্ল মার্ক্স ত কখন শ্যামা প্রসাদ মুখুজ্জে র আবির্ভাব হয়। নিহারদা এর আগে পার্টি করতেন । ৭১ এ জেলে ছিলেন শুনি। রণজিৎ দা একটু গেরুয়ার ভক্ত। পঞ্চুদা , আমাকে নিজের দলে টানেন । উনি কোন পার্টির আলোচনায় থাকেন না । আমার তাই ওনাকেই পছন্দ। সমরেশ দা কে বোঝা মুশকিল । উনি সব শোনেন কোন মন্তব্য দেন না। বলতে-গেলে আমরা তিনজন রাজনীতির প্রসঙ্গে আসীনা। নিহারদা আর রণজিৎ দার মধ্যে কথা কাটা কাটি হলে পঞ্চুদা সামাল দেন। আমি ওই সময় চট করে দুটো রাউন্ড মেরে আসি পার্কের চারিদিকে। আজকে পঞ্চুদা আসেন নি । নিহারদা খবর দিলেন উনি এপোলোতে আই.সি.ইউ.তে । কাল নাকি স্ট্রোক হয়েছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বড় দেখতে যাওয়ার সাধ হল । এইতো গতকাল বিকেলে  কি সুন্দর ছিলেন । রাতে কি এমন হল ?  সকলকে বললাম চলুন না দেখে আসি ‘পঞ্চুদাকে’ । 
 পরের দিন সকালে সবাই এপোলোতে হাজির হলাম । ভিজিটিং আওয়ার শেষ হতে আরও বেশ কিছু সময় বাকি । পাস নিয়ে ওপরে গিয়ে দেখি আই.সি.ইউ. থেকে ডেড বডি বেরুচ্ছে । সামনেই পঞ্চুদার ছেলে মেয়ে ! সকলে হতভম্ব । কারুর মুখ থেকে কিচ্ছু কথা বেরুলো-না । মেয়েটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে । পঞ্চুদার ছেলে নিথর । রণজিৎ দা , নিহার দা , সমরেশ দা সকলেই চোখ পুঁছছে ।  আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো । নিজেকে সামলাতে পারলাম না । রণজিৎ দাকে জড়িয়ে বললাম একি হোল ? রণজিৎ দা শুধু মাথায় হাত রাখলেন। উনিও চোখ পুঁছছেন রুমাল দিয়ে । নিহারদা সমরেশ দা নিথর । সব শেষ ! এইতো মানুষের জীবন !! এই নিয়ে এতো গর্ব ।    


পারাদ্বীপ বন্দর সহর ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ০৬.০৩.২০১৫ /বেলা ১.০৩








    পারাদ্বীপ বন্দর সহর
ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ০৬.০৩.২০১৫  /বেলা  ১.০৩

পারাদ্বীপ বন্দর সহর উড়িষ্যার এক গর্ব বললে অত্যুক্তি হবেনা ।  উড়িষ্যার জগৎসিংপুর জেলার পারাদ্বীপ এর  বিশেষত্ব পর্যটনের চেয়ে বাণিজ্যিক দিক দিয়ে বেশি কারন এই পারাদ্বীপ উড়িষ্যার প্রধান বন্দর সহর ।  কটক সহর থেকে ৯৪ কিলোমিটার পূর্ব দিকে এবং ভুবনেশ্বর থেকে ১২৫ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের কূলে এই সহরটা ছোট্ট অথচ এর ঐতিহ্য অতি পুরাতন।
পারাদ্বীপ যাওয়ার সোজা রাস্তা কটকের ও.এম.পি ছক থেকে ডানদিক বেঁকে তির্তোল হয়ে সোজা পারাদ্বীপ । এ ছাড়া কেন্দ্রাপড়া হয়ে দুহুরিয়া ছক থেকে এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে পারাদ্বীপ যাওয়া যায়। যারা কেন্দ্রাপড়া সহর বলদেব জীউ  মন্দির দর্শন করতে চান তারা এই রাস্তায় যান । আরেকটা রাস্তা এক্সপ্রেস হাই ওয়ে(NH-5A) র চন্ডিখোল ছকথেকে ডানদিকে বেঁকে   অনতিদূরে  বালি-চন্দ্রপুর থেকে ললিত-গিরি , রত্নগিরি , উদয়গিরি এই তিনটে বৌদ্ধ কীর্তি দেখে আবার এক্সপ্রেস হাই ওয়েতে ফিরে বাঁ দিকে পারাদ্বীপ যাওয়ার সোজা পাকা  রাস্তা আছে । এই দুর্লভ বৌদ্ধ কীর্তি  দেখার জন্য জাপান থেকে অনেক বৌদ্ধ ধর্মালম্বী  আসেন তা ছাড়াও অন্য বৌদ্ধ পর্যটক আসেন এই পর্যটন শৈলীর ঐতিহাসিক মূল্যবোধের জন্য । এখানে ভারত সরকারের পর্যটন বিভাগ এবং প্রত্নতত্ত্ব   বিভাগের আনুকূল্যে পর্যটকদের বিশেষ সুবিধে আছে ।  পারাদ্বীপ তিন  দিক দিয়েই যাওয়া যায়  ১.) কটকের ও.এম.পি.ছক ধরে তির্ত্তোল দিয়ে ,২.) মহানদীর ব্রিজ পেরিয়ে জগৎপুর থেকে ডান দিকে ঘুরে  সালেপুর , কেন্দ্রাপড়া হয়ে , ৩.) N.H.5 ধরে চন্ডিখোল হয়ে আবার  N.H.5A ধরে ললিতগিরি , রত্নগিরি , উদয়গিরি এই তিনটে বৌদ্ধ কীর্তি দেখে আবার এক্সপ্রেস হাই ওয়েতে ফিরে বাঁ দিকে পারাদীপ যাওয়ার সোজা পাকা  রাস্তা   । তিনটে  রাস্তাই সুন্দর । তবে প্রথমটা বেশি সুবিধের কারন পুরোটাই কংক্রিটের রাস্তা (জয়পুর ছক থেকে তৈরি হয়েছে )।
   উড়িষ্যার পূর্বতন মুখ্য মন্ত্রী বিজু পট্টনায়ক দৈত্যারি মাইনস থেকে পারাদ্বীপ অব্ধি এক্সপ্রেস হাই ওয়ে NH5-Aকেন্দ্র সরকারের সাহায্যে ১৯৬২ সালে  তৈরি করান । এই রাস্তা সোজা দৈত্যারি মাইনস থেকে পারাদ্বীপে লৌহ  প্রস্তর বহনের কাজে আসে । হাজার হাজার ট্রাকে প্রতিদিন এই পথে দুর্মূল্য ক্রোমাইট পরিবহন হয়। 
 উড়িষ্যার ইতিহাস বলে পারাদ্বীপ থেকে বালি দ্বীপ,জাভা,সুমাত্রা,বর্ণীও,মালয়েশিয়া প্রভৃতি জায়গায় উড়িষ্যার পণ্য    যেমন তসর এর চাদর , শাড়ী এবং সিল্কের শাড়ী, রুপোর তারকষি গহনা ইত্যাদি এখানকার ব্যবসায়ীরা পাল তোলা নৌকায় পরিবহন করে নিয়ে যেতেন । এই ব্যবসায়ীদের এনারা সাধব পুওবলেন এবং তাদের বৌদের সাধব বহুবলে । কার্তিক পূর্ণিমার দিন সাধব বৌরা বিশেষ পূজার্চনা করে সাধব পুওদেরবিদেশে বাণিজ্য করার জন্য  বিদায় দিত ; তাই ওই বিশেষ দিনটিকে কার্তিক পূর্ণিমার বৈত বন্ধানউৎসব বলাহয় এবং  এই উৎসব প্রত্যেক বছর মহা ধুম ধাম করে পালন করা হয়। কটকের মহানদীর ধারে বালি যাত্রা মাঠে  বালি যাত্রাসুরু হয় ঐ বিশেষ দিন থেকে। কটকের বালি যাত্রায় নানা জিনিষ বিক্রি হয়। ইতিহাস বলে  বালি দ্বীপে উড়িষ্যার পণ্য রপ্তানি সুরু হত কার্ত্তিক পূর্ণিমার দিন থেকে তাই নাম বালি যাত্রা।      
১৯৫০ সালে কেন্দ্র সরকারের জল এবং শক্তি কমিশন (Central water and power commission)মহানদীর মোহানায় অবস্থিত প্রাকৃতিক বন্দর উপযোগী সমুদ্র তটে পারাদ্বীপ বন্দর স্থাপনের সিধ্যান্ত নেন । তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রধান মন্ত্রী পণ্ডিত জবাহারলাল নেহেরু এবং উড়িষ্যার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ানন্দ পট্টনায়ক   (বিজু পট্টনায়ক)  ৩ রা জানুয়ারি ১৯৬২ সালে পারাদ্বীপ বন্দরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন ভূমি পূজা করে । এই বন্দর প্রতিষ্ঠার সময় একটি কালো গ্রানাইট পাথরের ফলকের ওপর পণ্ডিত নেহেরুর স্বাক্ষরে ইংরাজিতে লেখা আছে “Willed by the people, I commend you, to this another National Adventure” যার বাংলা অর্থ কিছুটা এই রকম ইহাই মহাজাতির নির্দেশে আবার এক বিরাট অভিযানের পথে আমার আহ্বান।  পণ্ডিত নেহেরু থাকার জন্য যে গেস্ট হাউস তৈরি হয় তার নাম নেহেরু গেস্ট হাউস।  এখানে বলা বাহুল্য আমি সপরিবারে ওই গেস্ট হাউসে দু রাত তিন দিন থাকি পুরো পারাদ্বীপ সহর,বন্দর এবং সমুদ্র সৈকত দেখার জন্য । খুব বিচিত্র এই অনন্ত গভীর সমুদ্র সৈকত । একে গোল্ডেন সি বিচ ও বলে এবং সামুদ্রিক জীবে ভরপুর যথা কাঁকড়া , চিংড়ী , সামুদ্রিক মৎস্য ইত্যাদি। সুন্দর ঝাউ এর জঙ্গল , বড় বড় পাথরের বোল্ডর দিয়ে সমুদ্র তট সুরক্ষিত ।  সুন্দর একুরিয়াম , জগন্নাথ মন্দির , হনুমান মন্দির , তট রক্ষ্যা বাহিনী , সুরক্ষিত পারাদ্বীপ বন্দর যা না দেখলে বোঝান যায়না । 
পারাদ্বীপ বন্দর  ২ রা  মার্চ ১৯৬৬ সালে পিটার  স্টেম্বোলিক উদ্বোধন করেন আনুষ্ঠানিক ভাবে । একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশন্ধী থেকে প্রায় ৫০ মিলিওন টন লৌহ প্রস্তর রপ্তানি করা আরম্ভ হয়। এর পর থেকে এটা Paradip Port Trust নামে নামিত হয় । 
বড় জাহাজের জন্য এই বন্দর উৎকৃষ্ট । বিভিন্ন বিদেশী জাহাজ পারাদ্বীপ বন্দরে এসে মাল বোঝাই করে। এখান-থেকে বিদেশে যথা জাপান, চায়না,ইটালি, সাউথ কোরিয়া ইত্যাদি দেশে প্রধানত এখানকার দুর্লভ  ক্রোমাইট রপ্তানি করা হয় । অস্ট্রেলিয়া থেকে উৎকৃষ্ট আন্থ্রাসাইট কয়লা উড়িষ্যার তালচের  থার্মাল প্ল্যান্টের জন্য   আমদানি করা হয়।
  দক্ষিণ কোরিয়ার পোস্ক কোম্পানি১২০০ মেট্রিক টনের ষ্টীল প্ল্যান্ট এর প্রকল্প করে  পারাদ্বীপ এর কাছে । এর জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ এখন সম্পূর্ণ  হয়নি । এই স্টিল প্ল্যান্ট এখন কেন্দ্র সরকারের দ্বারা ত্বরান্বিত হতে চলেছে । কল কারখানার জন্য  জমি অধিগ্রহণ আইনে পরিণত  হলে হয়ত হতে পারে। বলা বাহুল্য এর জন্য অনেক কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি হবে । সময় বলবে কি হবে।  
পারাদ্বীপ থেকে কেবল ক্রোমাইট নয়  বক্সাইট , ডোলোমাইট লাইম স্টোন , ক্যালসাইট  ইত্যাদিও রপ্তানি করা হয়।  উড়িষ্যার ক্রোমাইট খনি দৈত্যারি ,সুকিন্দা , কেনঝোর , বড়বিল ইত্যাদি থেকে দুর্লভ ক্রোমাইট রপ্তানির জন্য পারাদ্বীপ বন্দরের প্রতিষ্ঠার বিশেষ আবশ্যকতা উপলব্ধি করা হয় । এখানে  যা খনিজ পদার্থ গচ্ছিত ছিল এবং আছে তা অন্তত ৫টা ষ্টীল প্ল্যান্ট অনায়াসে  চালাতে পারতো । উড়িষ্যার  খনিজ পদার্থ উচ্চ কোটির কিন্তু কেন যে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার এই দুর্মূল্য পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে দিলেন তার কোন রাজনৈতিক যুক্তি পাইনা ।    কিন্তু বেশ কিছু যুগ রাউরকেল্লা ছাড়া অন্য  ইস্পাত কারখানা হয় নি । এখন সুকিন্দার কাছে ডুবুরিতে তিনটে ইস্পাত কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং উৎপাদন ও হচ্ছে যেমন নীলাচল ইস্পাত কারখানা , টাটা স্টিল প্ল্যান্ট , ভূষণ স্টিল প্ল্যান্ট , এ ছাড়া অনুগুল ও ঝারসুগূড়ার ভূষণ স্টিল প্ল্যান্ট ।  
পারাদ্বীপ লিখতে গেলেই উড়িষ্যার খনিজ পদার্থ , স্টিল প্ল্যান্ট ইত্যাদির প্রেক্ষাপট লেখা প্রয়োজন তাই এ সব লেখা লিখতে বাধ্য হলাম।
পারাদ্বীপ যেহেতু বন্দর সহর এখানে অনেক কল কারখানা আছে ১.) পারাদ্বীপ ফসফেট রাসায়নিক সার কারখানা , ২.) ইফকো রাসায়নিক সার কারখানা, ৩.) এশার ষ্টীল পেলেট প্লান্ট , ৪.) ভারত পেট্রোলিয়াম এর মার্কেটিং টার্মিনাল , ৫.) হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়ামের এর মার্কেটিং টার্মিনাল , ৬.) কার্গিল এডিবিল অয়েল প্ল্যান্ট , ৭.) ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন , ৮.) স্কল ব্রেওরিস লিমিটেড ।    

Sunday, March 8, 2015

ছোটগল্প পারমিতা ... ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

 



ছোটগল্প



পারমিতা ... 
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী 




আকাঙ্ক্ষা,পারমিতা দুই বোন । দুজনের বয়েসের ব্যবধান মাত্র এক বছর। দুই বোনই এক ইংলিশ মিডিয়াম কোএড্ স্কুলে পড়ে । স্কুলবাস আসে সকাল ৭.৩০ টার সময় । শীতে কুঁকড়ে দুজনে বিছানা থেকে ওঠে সকাল ৬.৩০ টার সময়। সটান বাথরুমে ঢুকে নিত্যকর্ম সেরে বেরুনোর সময় ৭.০০ টা বেজে পাঁচ কি দশ মিনিট । তারপর খাওয়া সেরে বাসের জন্য অপেক্ষা । আরম্ভ হয় সারা দিনের জমে থাকা কিছু গল্প আর বয় ফ্রেন্ডদের নিয়ে কিছু ছুঁক ছুঁকুনির কথা । যাকে বলে চুলবুলি লেড়কি, হিন্দিতে । উপায় নেই যুগের টানে এরকমটা হবেই । মানুষের কিছু জেনেটিক আর একুয়ার্ড ক্যারেক্টার থাকে । কোন কোন সময় একুয়ার্ড ক্যারেক্টারটা বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয় । সেগুলো ভাল হতে পারে, আবার খারাপ ও হতে পারে । যদি খারাপের দিকে যায় তবে সর্বনাশ। সামাজিক দিক থেকে ভয়ঙ্কর ও হতে পারে। যা বাবা মা ভাই বোনের মাথা ব্যথার কারণ হয়। ধরা যাক, সেইরকম ক্যারেক্টারেরই মেয়ে পারমিতা । আকাঙ্ক্ষা একটু আলাদা ও পড়াশুনোর গল্প বেশি করে বন্ধুদের সঙ্গে । কিছু প্রবলেমের কথা যা হয়তো সলভ হচ্ছেনা, বা অন্য কিছু । ও পড়াশুনোতে ভাল । ক্লাসে বরাবর ফার্স্ট হয়। পারমিতা ঠিক তার উল্টো। ও বলে, টিভি প্রোগ্রাম, শাহরুখ্ সলমন হৃত্তিক আর বাংলার দেব ছাড়া ভাবতেই পারিনা । ক্লাস বাঙ্ক করে সিনেমা যাওয়ার এক্সাইটমেন্টই আলাদা । । টিচারকে এফ বি তে জন্মদিনে গিফট পাঠানো । ‘লিটিল হনি’ বলে বয় ফ্রেন্ড কে চুমু খাওয়া । এসবে থ্রীল আছে, বল! -কথাগুলো বলে দম নেয় । ওর দিদি এসব শুনেও শোনেনা ।

এরমধ্যে আকাঙ্ক্ষা সি বি এস সি তে ৯৮% নাম্বার রেখে পাস করেছে । কলেজে সাইন্স নিয়ে পড়ছে । সেদিন আকাঙ্ক্ষা খবরের কাগজে খবরটা পড়ে আতঙ্কিত হয়, কারণ ও প্রত্যেক দিন বাসে কলেজ যায় ফেরে, প্রায় রাত ৭ টার পর । খবরটা এই রকম :-“সকাল দশটায় ওদের কলেজের কাছাকাছি এক এলাকায় চলন্ত বাসের ভিতরেই এক তরুণীর হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিল জনা চারেক মদ্যপ যুবক । উপায় না দেখে চলন্ত বাস থেকেই লাফ দিয়ে নেমে ছুটতে ছুটতে কলেজে পৌঁছলেন ওই তরুণী। জনা কয়েক সহপাঠীকে কোনও মতে ঘটনাটা জানিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারালেন তিনি। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কলেজের ছেলেদের প্রচেষ্টায় ।

এই শহরের বুকে দিনের বেলায় আরও এক বার এই ঘটনা, শহরের রাস্তায়
মহিলাদের নিরাপত্তার অভাবটাকেই ফের বেআবরু করে দিল। দিল্লির বাসে তরুণীকে গণ-ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে, সে প্রতিবাদে গলা মিলিয়েছে আমাদের শহরও । কিন্তু তার পাশাপাশি এই শহরের বাস এবং রাস্তাই বা আলাদা কিসের, এ প্রশ্নটাও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে ।

কাকে বলবে? বোন তো পাত্তা দেয়না। বলে, তোর বয় ফ্রেন্ড থাকলে ওই তোকে প্রটেক্ট করবে । দিদি তুই ভারি আন-স্মার্ট আর ভীতু । মা'কে বললে বলবেন আর পাঁচটা মেয়েদের মতন তুমি হতে চেষ্টা কর । এসব কথা মনের ভেতর রেখে গুমরচ্ছিল আকাঙ্ক্ষা । ও কি সত্যি আর পাঁচটা মেয়ের মতন নয় ? তবে ওর পড়াশুনো কি বৃথা ! মনের মধ্যে তোলপাড় করে সব প্রশ্ন । আয়নার সামনে নিজেকে দেখে । ভরা যৌবনে মেয়েদের যা সৌন্দর্যের বিকাশ হয় ওর ক্ষেত্রে সেরকম কিছু পরিপ্রকাশ পায়নি। খুব সাদা মাটা মেয়ে । সাজতে জানেনা বললেই চলে । এতো সাধারণ মেয়ে আজকাল খুব একটা চোখে পড়েনা।

পরমিতা ঠিক উল্টো। প্রসাধণের সামগ্রী কেনার চেয়ে গিফট বেশি পায়। বয়ফ্রেন্ডের অভাব নেই । পারমিতা কে দেখতে সুন্দর এবং চোখ ধাঁধাঁনো চেহার । কস্মেটিক্স এর বাহারে ভুরু ভুরে গন্ধ । ছেলেদের মন ভোলানো চেহারা । এখন থেকেই ডেঁপো । পডাশুনোয় অষ্টরম্ভা । কোনমতে পাস করে । টুকলি করতে ওস্তাদ্ বোধহয় । কিন্তু বুদ্ধি প্রখর । ছেলেদের মাথায় টুপি পরাতে ওস্তাদ । আগেই বলেছি আকাংক্ষা ক্লাসে ফার্স্ট হয় । রিপোর্ট কার্ডে সই করার সময় বাপি আকাংক্ষাকে খুব উৎসাহ দিয়ে বলেন, ১২ ক্লাসে সাইন্সে র‍্যাঙ্ক রাখতেই হবে । এখন থেকে আই.আই.টির এন্ট্রান্সের জন্য তৈরি হও । তোমাকে খড়গপুর আই.আই.টিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পডাবো । ভাল রেসাল্ট করলে জি.আর.ই দিয়ে আমেরিকা পাঠাবো। বি.টেক্ এর পর হয় গেট্ দাও, নয় ক্যাট্ দাও । যদি এগুলো না দাও তবে ভাল রেসাল্ট করলে জি.আর. ইটা দেবে । এখন থেকে তৈরি হও আমেরিকা যাওয়ার জন্য ।

পারমিতা ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে যায় । বাপী জানেন ওর রেসাল্টের ব্যাপার ।
বাপী বলেন, মেয়েদের পড়াশুনা যে কত প্রয়োজন, তা এখন থেকে না বুঝলে
পরে আর সময় থাকবেনা, মা । পড়াশুনোতে মন দাও । মেয়েদের রূপ যৌবন
গুণ তিনটে দিয়ে বিচার করার সময় রূপ যৌবন দুটোই কিন্তু বয়স আধিক্যে ফুরিয়ে যায় মা; থাকে শুধু গুণটা । ওটাই শেষ জীবনের ভরসা । তোমার বন্ধুদের জিজ্ঞাসা কর ; ওরা কি ক্লাসে লাস্ট বেঞ্চে বসা মেয়েকে ভাল বলবে ! বাপীর টাকা মধু দাদার ভাঁড় নয়, যে অফুরন্ত থাকবে । চিরদিন তো আমি আর তোমার মা থাকবেন না । যাও মাকে দিয়ে সই করাও । ওঁচা মেয়েদের আমি পছন্দ করিনা । তোমার তো সব বায়না শুনি, তবুও তোমার এতো অধঃপতন কেন? লজ্জা করেনা ? দিদিকে দেখে শেখো । বাপীর কথা শুনে ওর চোখে জল আসে । চোখে জল নিয়ে বলে, পরের বার ভাল করব । গড প্রমিস, বাপি । এবারের মত সই করে দাও ! থাক, আর গড্ কে টেনো না ! তিনি তোমাকে অহোরাত্র দেখছেন। তোমার প্রাইভেট ট্যুটার এর প্রয়োজন হলে রাখো । কিন্তু রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই।

মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আঁচল ঠিক করতে করতে বলেন, রাম রাম, প্রাইভেট টিউটর ? রক্ষে করো ! আরেক ফ্যাসাদ বাঁধাবে । ও যা পড়ছে পড়ুক । না পড়লে হেঁসেল ঠেলবে! আমার সময় কোথায় ওকে দেখার ?

এটাতো কথা নয় । তুমি না দেখলে কে দেখবে ? বাপী বলেন।

কেন ওর দিদির কাছে বসে পড়তে পারেনা ?

দেখ সুমি (মায়ের নাম সুমিতা, বাপী ‘সুমি’ বলে ডাকেন) তোমার মেয়েদের
প্রতি দায়িত্ব বোধ না থাকলে ওরা কি করবে ভবিষ্যতে? মা’র নজর মেয়েদের দিকে বেশি থাকা উচিৎ । নাহলে পরে পস্তাবে ।

কেন? আমার একার দায়িত্ব কেন? তোমার মেয়ে নয় ওরা ? তোমার কোন দায়িত্ব নেই !
‘দায়িত্ব’ শব্দটা খুব জোর দিয়ে বিদ্রূপের সঙ্গে উচ্চারণ করলেন সুমিতা দেবী ।

আহ্ ! আমি কি তাই বলছি ! বোঝ না কেন? আর সেরকম বুঝলে চাকরি ছেড়ে দাও । তুমি তো সখের জন্য চাকরী কর ! ওটার কি কিছু প্রয়োজন আছে? মেয়েরা মানুষ না হলে, ওই চাকরী থাকার চেয়ে না থাকা ভাল !

কি ? আমি স্যাক্রিফাইস্ করবো আর উনি প্রাইভেট সেক্রেটারি কে নিয়ে ট্যুরে যাবেন ; আজ মুম্বাই, কাল দিল্লী, পরশু সিঙ্গাপুর । অফিস ছাড়া বাড়ির হাল কি হচ্ছে, বুঝেছ কখন ! বাহ ! সুন্দর !! চমৎকার সল্যুশন । পারবো না চাকরী ছাড়তে !! ও মেয়ের এমনিতেই বারোটা বেজে গিয়েছে ।

দ্যাখো যা জানোনা, সে বিষয় নিয়ে কথা বোলোনা। আমার চাকরীটা খাটুনির আর দায়িত্ব সম্পন্ন কাজ । তুমি ভাল করে যান সেটা । ওটা ঊল বোনার চাকরী নয় যে মেয়েরা পাস করলো কি না করলো মাস গেলে জমা খাতায় মাইনে ঢুকে যাবে গুঁতো মেরে । চাকরী ? আর চাকরী দেখিওনা !! মেয়েদের সামনে কি করে কথা বলতে হয়, সেটাই তো শিখলে না? যত্তো সব । বাবা গাড়ীর চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন গজ্ গজ্ করতে করতে । মা বাপির কথা কাটা কাটির মধ্যে পারোমিতা মাকে দিয়ে টুক করে সই করিয়ে নেয় । মা অজান্তে সই করে দেন । কিছুটা নিশ্চিন্ত এবারের মতন।

এবার পড়াশুনাটা করতে হবে মন দিয়ে। মোবাইলে কল আসে সুমিতের । সুইচ্ অফ করে দেয় । না আর সুমিতের সঙ্গে যাবেনা সে । শেষে কিনা হেঁসেল ঠেলতে হবে ! ম্যা গো !! মাথাটা টন টন করছে । দিদিকে দেখ ? খুব খুশী আমাকে বাপী বকেছেন বলে । 

#
ঈশ্বর প্রেমিক প্রেমিকাকে একি ছাঁচে বানান না । কিছু তারতম্য থাকে ।আদর্শ শব্দটি অভিধান থেকে মুছে গিয়েছে । সিটি সেন্টারে ওরকম অনেক যুগলই ঘুরে বেড়ান । আমি একটা ঘটনার কথা বলি । সেদিন রাজার হাট দিয়ে ফিরছিলাম আমার কারে । তখন বাজে রাত ১১ টা । হঠাৎ আমাদের কারটাকে দুটো বাইক, সম্ভবতঃ হিরো মোটর্সের লেটেস্ট মডেল, নামটা বলতে পারছিনা , যাইহোগ বাইকে দুই প্রেমী জুগল যাচ্ছেন । পিলিওনে যে মেয়েটি ছিলো সে বসে নেই, ফুট রেস্টে দাঁড়িয়ে । বিদ্যুৎ গতিতে বাইক দুটি আমাদের ক্রস করে বেরিয়ে যায় । যদি এতোটুকু অসাবধান হয়, মৃত্যু সুনিস্চিৎ । এটা কি স্টান্ট, না কি আমি বুঝলাম না । এদের মা বাবা এদের কি শিক্ষা দিয়েছে? অবিশ্যি মা বাবা কে দোষ দিয়ে কাজ নেই ওনারা কি যানেন? আমি ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম ও বোলল, আপ নয়া হ্যায়, সাব । এ তো হামেশা দেখনেকো মিলতা হ্যায় । মনে মনে ভাবলাম আমরা কতো গ্রাম্য, এরা কতো সভ্য । এই যদি সভ্যতা হয়, তবে হে ঈশ্বর, আমাকে গেঁয়ো করেই রাখো! সে দিন থেকে আমি আর কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করিনা । কান মুলছি নাক মুলছি আর না । নিজের মেয়েদের কথা ভাবছি ! পরোমার কি হবে ? ওর কি ভবিষ্যৎ ? আমার সময় নেই এনার্জি ও নেই । সুমি তার স্কুল আর বান্ধবীদের নিয়ে ব্যাস্ত । পার্টীর জন্য আজ ধারনা, তো কাল বন্ধ । ছারখার হয়ে গেল এই দেশটা এসবের জন্য । সর্ব শিক্ষা অভিজানের লেকচার দেয় সুমি আর নিজের মেয়ে গোল্লায় যাচ্ছে । কি মা'রে বাবা । কিছু বলার উপায় নেই আমার । মেয়েটা উচ্ছ্বন্নে যাচ্ছে ।

দেখেও কিছু বলার উপায় নেই । আমি নিরুপায়। আমার কোম্পানির সার্ভিস । একটু এদিক ওদিক হলে সর্বনাশ । কাকে বোঝাব ? কথাটা উল্লেখ করলাম এইজন্য যে হামেশা নাকি এরকম হয় । আমরা তো দেখতে অভ্যস্ত নই, তাই বোধ হয় আমার দৃষ্টিকটু লাগলো । মানুষ সহজ ভাবে নিচ্ছে। আমি বোধহয় গেঁয়ো হয়ে গেলাম বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে। আমার বন্ধুরা বলে তুই এইসব নিয়ে ভাবিস না। ও সব মডার্ন ছেলেমেয়ে। মনে মনে ভাবি আমার তো দুটো মেয়ে আছে ! তাদের মধ্যে ছোটটাই মাথা ব্যাথার কারণ হচ্ছে ।

আমি তো দেখছি আকাঙ্খার মতন মেয়েরাই বিপদে পড়ে, কারণ ওরা নিজেদের নিরাপত্তার দিকে নজর দেয়না। পড়াশুনাতে এত ব্যস্ত থাকে যে, ওদের অন্য দিকে মন যায় না। তার সুযোগ নেয় অসামাজিক ব্যক্তি। তাই বলি জুডো ক্যারাটেটা মেয়েদের জানা নিতান্ত জরুরি । ওদের বন্ধু হাতে গোনা হয় আর ছেলে বন্ধু থাকলেও তারা পাত্তা পায় না এদের কাছে। কিন্তু পারোমিতা ! তার বন্ধু ’শয়ে ’শয়ে । বাপী লেটেস্ট এপেলের আই ফোন সিঙ্গাপুর থেকে কিনে এনেছেন, একটা মা আরেকটা পারোমিতার জন্যে । বাপি কি জানেন মেয়ের কীর্তি ! বলেন রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই কিন্তু । আইফোন দিতে আপত্তি নেই।

‘কচু’ রেসাল্ট না ছাই । মা বলেন । ওই মেয়ে গোল্লায় গেছে ।

এম.এম .এস এ ছবি পাঠান মেসেজ বক্স এ জোক লাভ এস .এম। .এস সব ভর্তি । কে দেখবে? দেখার সময় কার আছে । বাপি সকাল থেকে বেরিয়ে যান ফেরেন রাতে। মা স্কুল টিচার অন্যকে জ্ঞান বিতরণে ব্যস্ত নিজের মেয়েকে দেখার সময় কোই ? সোসিয়াল সার্ভিস করে ক্লান্ত । স্কুল থেকে এসে এতোই ক্লান্ত যে মেয়ে কি পোডলো কি খেলো দেখার সময় নেই । টিভি, সিনেমার ম্যাগাজিন,তারপর খাওয়া ,ঘুম । ঘরে রান্না বান্না করতে হয়্না কারন রাঁধুনী আছেন । ২৪ ঘণ্টার কাজের লোক আছেন। মঞ্জু মাসি ।

ঘরে গার্জেন বলতে ঠাকুমা তাঁর তো বয়েস ৭৯+ অতএব তিনি কি করবেন? ঠাকুরপুজো তেই তাঁর সময় কাটে । ছেলে,বৌ,নাত্নীদের জন্য সব পুজো । ওনার ঘরে কেউ যায়না । কখনো কখনো বাবা যান আর মঞ্জু মাসী খাবার দিতে যায় । পারোমিতা কে একদম দেখতে পারেন না ঠাকুমা । বলেন শুভ( শুভজিত বাবার নাম) গোল্লায় যাচ্ছে তোর মেয়ে । মেয়ের ডানা গজিয়েছে । এখন থেকে দ্যাখ নাহলে ওই মেয়ে ভোগাবে তোকে । আমি বলে রাখলাম শুভ ।

আমি কতোক্ষণ থাকি মা ? আপনি বলুন ? আমার সময় কোথায় ?

তবুও তোর শাসন প্রয়োজন । ওকে মোবাইল কেন দিলি ? ওই অলক্ষুণে মোবাইল ই ওর উচ্ছৃঙ্খলতার কারন । আমাকে ত হুটা হুট্ করে দেয় ।

আপনি শাসন করুন মা । আমি কতক্ষণ ই বা থাকি ? একটু শান্তি না হলে আমার কি ভাল লাগে ? ওইসব শুনতে ভাল লাগে না। সমত্ত মেয়েদের মা শাসন করবেন না বাবা কি পারে? না মানায় ! আপনি বলুন! শুভ এক নিশ্বাসে কথাগুল বলে হাঁফ্ ছাডলো ।

সব ই অদৃষ্ট বাবা । হ্যাঁরে মঙ্গল বার দিন একটু সময় করে দক্ষিণেশ্বর নিয়ে চল না বাবা। কতদিন মায়ের মুখটা দেখিনি। আহা মা সদয় হলে তোর কোন দুঃখ থাকবেনা।

মঙ্গলবার ! আচ্ছা দেখছি ! টেবলেট পিসিটা তে কি দেখে বললো, মা একদম ভোরে আপনাকে নিয়ে যাব ।

আমিতো  সেই ভোর ৪ টেতে উঠি তুই উঠতে পারবিতো  ?

হ্যাঁ মা পারবো ।


##
আকাংক্ষা স্কুল থেকে বাসে ফিরছিল বেলা তখন ৪ টে । রাস্তাতে হট্টগোল আর জ্যাম্ দেখে আঁতকে ওঠে । ৪.৩০ এর সময় রাস্তা ফাঁকা হয় ।

ছাত্র ছাত্রী এবং অধ্যাপকদের নিরাপত্তার দাবিতে দুপুর দেড়টা থেকে ঘণ্টা তিনেক রাস্তা অবরোধ করেন কলেজের শতাধিক ছাত্রছাত্রী। তাতে হাজির ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। সকলেরই অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরোনোর পর প্রায় রোজ দুষ্কৃতীদের অসভ্যতা ও কটূক্তির মুখে পড়তে হয় তাঁদের। সন্ধ্যার পর রাস্তায় বেরোলে রীতিমতো ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। ‘আর মোমবাতি নয়, এবার কিছু করে দেখানোর সময়’, অবরোধে দাবি তোলেন ছাত্রীরা।

কোমল হৃদয়ের শান্ত মেয়ে ‘আকাংক্ষা’ তার মনে এই সব গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে । অনেক প্রশ্ন আলোডন করে বুকের মধ্যে । কেন এই অসভ্য মানুষগুলো  প্রশ্রয় পায় ! আর কেনইবা মেয়েদের নিরাপত্তা থাকবেনা এই শহরে ? প্রশাসন কি নীরব? এরকম অনেক প্রশ্ন ।

বাপীকে কিছুই বলা যায়না এ বিষয় । মা’ ! তিনি তো ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। ঠাকুমা ! তিনি ই বা কি করবেন? তবে কাকে বলবে সে ? বোন ! ও শুনলে হাসবে । মজা পাবে ।

বাডীতে ফিরে একটা ডাইরিতে আজকের ঘটনা সম্পর্কে লিখে রাখল। বাপীর কথাগুল মনে রেখে খুব মন দিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি করতে লাগলো । ম্যাথ্, ফিজিক্স্, কেমিস্ট্রি সব বিষয় গুল ভাল করে রিভিশন দিয়ে রাখলো। গত দশ বছরের সমস্ত প্রশ্ন র উত্তর শেষ করে ফেলেছে ।খাতা ভর্তি অঙ্ক আর ফিসিক্স্ এর প্রব্লেম সলভ্ করে রেখেছে । ইংলিস্ টা আরেকটু রিভিসন করতে হবে । এইরকম ভাবছিল ...।

মা বললেন, হ্যাঁরে পারু কোই ? ৭ টা বেজে গেল মেয়েটা কোথায় যায়? তোর সঙ্গে আসেনি?
এতোগুল প্রশ্নের উত্তর কি দেবে ভেবে পেলনা । আমি জানিনা ...
জানিসনা মানে ?
বারে আমি স্কুল সেরে বাড়ি  ফিরে এলাম । এমনিতেই আমাদের এক্সট্রা ক্লাস হচ্ছে । আমি কি করে জানবো ওর কথা ?
তুমি তোমাকে ছাড়া  আর কোন কিচ্ছু জানোনা মা ! বাপের আহ্লাদি মেয়ে ! বোনটা কোথায় গেল খোঁজ নিবিনা একটু ! জানি তুমি দিগ্গজ মেয়ে , তা বলে বোনটার কোন খোঁজ খবর নেবে না?
সরি মা ভুল হয়ে গিয়েছে । আমাকে ভুল বুঝ না।
সুমিতা মোবাইলে নম্বর ডায়াল করতে লাগলেন ... এই অর্পিতা শোন ভাই তোর বর কে একটু বলনারে ... আমার ছোট মেয়ে পারমিতা যে তোর ছেলের বার্থ ডে পার্টি তে নেচেছিল মনে আছে ... হ্যাঁ !... ও এখন পর্য্যন্ত আসেনি রে । কি করি বল তো?... ইনি দিল্লী গেছেন ফিরবেন কালকে । এলেই ত আমার ওপর হম্বি তম্বি করবেন। আমার হয়েছে যত জ্বালা...।
দাঁড়া চিন্তা করিসনা ...। আমি একটু পরে তোকে খবর দিচ্ছি।
রাত ৯ টার সময় পুলিসের জিপ্ এল । এটাকি সুভজিৎ ব্যানার্জীর বাড়ি  ?
ভয়ে তটস্থ সব্বাই । হ্যাঁ ...। কি হয়েছে ?
দেখুন চিনতে পারেন কিনা ?
আমার বুক টা দুরু দুরু করতে লাগলো । মা গিয়ে যা দ্যাখেন । হতভম্ব হয়ে যান । পুলিসের জীপের পেছনে দুটি ছেলে মেয়ে । তার মধ্যে একটি চেনা। সে আমাদের পরমা ...পারমিতা.... । অন্যটিকে চিনিনা ।...

Thursday, March 5, 2015

অনু গল্প 'মঞ্জু' / ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ০৪.০৩.২০১৫ /



  মঞ্জু

ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ০৪.০৩.২০১৫ /

আমার বাড়ীর কাজের মহিলা ‘মঞ্জু’ বয়েস বেশি না ৩০-৩২ হবে ,  কিন্তু তিন মেয়ের মা ।
বর অটো চালায় । মেয়েগুলোকে স্কুলে পড়ায় । আজকাল রোজ দেরি করে আসে নয় তাড়া
তাড়ি কাজ সেরে পালায় অন্য বাড়ীর কাজ করতে । মহা মুস্কিল এরকম ত ছিলনা ।
মঞ্জু আমাদের দুজনের রান্না , আমার জন্য সকালে  তরিবাতের জলখাবার এই সব
রান্না করতে করতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নিত। আগে আসত সকাল  ৭ টায় যেত
প্রায় সকাল  ৮.৩০ । এখন আসে ৮ টায় এক ঘণ্টায় সব কাজ সেরে চলে যায় । কিছু
বললে হেঁসে বলে,“মেসো খাওয়াটা কমাও । ওত খেলে শরীর খারাপ করবে ।” আমি এক
ঘণ্টায় তোমাদের রান্না বান্না সব করে দিচ্ছি । আরেকজন দাদার বাড়ীর বৌদি ,
তারাও আমাকে রেখেছে রান্না করার জন্য আধ ঘণ্টায় সব করে দি । সকালের
জলখাবার ওট আর দুধ । ডিম সিদ্ধ ডাল ভাত একটা ভাজা , নয় সবজি , নয় মাছের
ঝাল আর ভাত খেয়ে দুজনে অফিস চলে জায় , ফিরে রাতে দুখানি রুটি আর সকালের
তরকারি, এক কাপ দুধ খেয়ে ঘুমোয় ।

আমি বলি - তুই কি করে জানলি ওরা কি খায় আর না খায় ! ওরা হয়ত বাইরে কিছু
খেয়ে আসে । তোর যা রান্না, নেহাত তোর মাসির অসুখ বলে আমি তোর হাতের
রান্না খাচ্ছি নাহলে কে খাবে তোর হাতের রান্না ! নুনের মাপ জানলিনা , তুই
কি রান্না করিস রে । সর্বদা আমার খাওয়ার দিকে তোর নজর । আমরা খান দানি
ঘরের ছেলে ।  বাপ দাদার আমলে খাওয়াটা পরিপাটি ছিল ...আছে... থাকবে ।

দাদা আমেরিকা থেকে আমার জন্য নেল কাটার ,  আমার মেয়ের জন্য টকিং ডল ,
গায়ে মাখার সাবান , পারফিউম সব এনে দিয়েছে । তোমরা মাস মাহিনা ছাড়া কি
দাও আমাকে ।

আমি বলি , আমি কি তোর জন্য আমেরিকা যাব । যত সব ,  চা’ দে ! শারদায় যে
টাকা রেখেছিলি পেলি ?

না পাবনা আর । ও সুদীপ্ত হারামজাদা সব গিলেছে লোকেদের টাকা । গরীবের
টাকাগুলো কেমন করে সহ্য হয় কে যানে । ও মরার সময় দেখবে কি অবস্থা হবে ?

ওকি একা খেয়েছেরে । একে একে সব বেরুচ্ছে বেরুবে । দাঁড়া কি হয় দেখ ।

কি আর হবে ? কিচ্ছু হবে না । যে যেমন আছে সেইরকম ই থাকবে ।  কি লাভ
আমাদের টাকা ত পাবনা আর ... হতাশ হয়ে বলে !

তা তোদের মতন লোকেরা আবার আরেকটা সুদীপ্তর মত লোকের পাল্লায় পড়বে।
আহ্লাদে আটখানা দেখিস ? সেটা আবার কি গো মেসো ?

মিরাক্কেল= মির+আক্কেল ! আক্কেল দাঁত না ওঠা অবধি ভাল লাগবে তার পর ওই
মীর(মীর অফসর আলী)র ছ্যাবলামি ,  শ্রী-লেখা দত্তর ন্যাকামি , রজতাভের
“আপনি থাকছেন সার” , বুড়ো ভাম , পরানের এক ঘেয়ে কমেন্ট, “ভালো ! আরও ভালো
করতে হবে পরেরটায়”। তারচেয়ে সা রে গা মা দেখ ভালো লাগবে । আমরা ওটাই দেখি
। কি সুন্দর গান গায় ছেলে মেয়েগুলো । এক কমলিকা ছাড়া । ও গর্বে ফেটে পড়ে
। বলে কিনা , “আমার গান লোকে বড় স্ক্রিন লাগিয়ে ভিডিওতে দ্যাখে।” খুব
গর্ব মেয়েটার । দেখবি ও থাকবেনা শেষ অবধি ।

তুমি এতসব দ্যাখ মেসো ?

হ্যাঁ দেখি।  আর কি করব বল ? তোদের বয়েসে খাওয়ার সময় পেতাম না ।  এখন বসে
শুয়ে দিন কাটে না । সকাল বিকেল হাঁটি , বাজার করি , মাঝে মধ্যে ব্যাঙ্কে
যাই , বিকেলে কারে ঘুরি কখন সখন তাও ড্রাইভার থাকলে । ড্রাইভার না এলে
নিজের গাড়ী নিজেই পুঁছি ।

মেসো দাদা কবে আসবে ? অনেক দিন আসে না ।

ও আমেরিকা গিয়েছে আসবে কি করে ? ওকে আরও বছর খানেক থাকতে হবে । বৌমা
নাতনী সব ওখানে । ফিরবে কিনা কে জানে ?

তা তুমি কি আমার হাতের রান্না খেয়ে দিন কাটাবে ? তোমার বৌমা এলে তোমায়
রান্না করে দেবে না ?

আকাশ থেকে পড়লি নাকি ! তোর এতো প্রশ্নের কি দরকার । যা মাসির ঘরে যা ।
বৌমা রান্না করবে ? কি সব বলে ! খুব আস্পর্ধা হয়েছে তোর । আমার ঘরে আর
আসবিনা । তুই জানিস ওর বিষয় ?

যাইগো বেলা হল । ও মাসী যাই ।

হ্যাঁ আয় । কি ফুটুর ফুটুর করছিলি শুনি ?

নাগো মেসোক বৌদির রান্না করার  কথা বলাতে রেগে গিয়ে আমাকে যেতে বলছে ।

ও হরি । ও রান্না করবে কিরে ? ওরা কি আমাদের আমলের মেয়ে ? ওখানে ছেলেটা
কি খায় কি করে কে জানে ? তুই আয় এবার । কেন ফটর ফটর করিস মেসোর সঙ্গে ?
জানিস তো ও বৌমার নিন্দে একদম শুনতে ভালো বাসেনা । আমাকেই হাটিয়ে দেয় ।
নিজে দেখে এনেছে না ! খুব ভালো বাসে তাই । আমাদের মেয়ে নেইত । ওকেই মেয়ের
স্নেহ দেয় । বৌমাও তোর মেসোকে খুব যত্ন করে এলে । চা নিজের হাতে বানিয়ে
দেয় । ও থাকলে আমার হাতের চা খায়না । বৌমাকে বলে লেমন টি বানাতে , নয়
হার্বাল টি ।

সেত দেখেছি আমি । মেসোর মন রাখতে খুব জানে তোমার বৌমা ।

এই মঞ্জু তুই গেলি ............. । আমার গলার আওয়াজ শুনে মঞ্জু পালায় ।

মঞ্জু জাওয়ার পর আমি গিন্নীকে বলি ... ওকে ছাড়িয়ে অন্য লোক রাখবো । খুব
বাড় বেড়েছে ওর।

অন্য লোক ওই মাইনেতে আর এখন পাবে না ।

দু হাজার টাকা কি কম ? মাস-গেলে আমার নতুন চাকরীতে ওই মাইনে পেতাম না ।

তখন দিন কাল আলাদা ছিল। লোকে শান্তিতে ছিল। এখনকার কালে দু হাজার টাকার কি দাম বল।

তা অবশ্য ছিল ।

তবে ?

মঞ্জুর মতন কাজের লোক আর পাবে না । তোমার অনেক ফাই ফরমাজ খাটে । তোমার
গেঞ্জি , জামা প্যান্ট সব মুখ বুজে কাচে । ও নিজেই বলে ওয়াশিং মেশিনের
দরকার নেই মাসি , ওইটুকু আমি নিজেই পারবো।  ওকে তাড়ান চলবেনা ।

মঞ্জু আমাদের বিশ্বাসী মেয়ে ওর ওপর ভরসা করে সব ছেড়ে যাওয়া যায় ।  এখনকার
কাজের লোক কে কোথায় চুরি করে নিয়ে যাবে ! না বাবা মঞ্জুই ভালো ।  আমরা
দুজন থাকি এত বড় ঘরে । ঘর ভর্তি জিনিস । কিছু হাত সাফাই করলে কিছুই বোঝার
উপায় নেই । ও তাও চেয়ে নেয় । এইতো সেদিন দুটো  সিলিং ফ্যান দিলাম । বলে
গরমে মেয়েরা পড়া শুন করতে পারে না মাসি । তোমাদের ত এসি আছে , আমরা গরমে
সিদ্ধ হয়ে জাই ।  নতুন ফ্যান গুল  তাও দিয়ে দিলাম ।  মেয়েটার ওপর মায়া হয়
। ওর বরটা কিছুই করেনা । তার ওপর শাশুড়ি আছে । সব শুষে খাবার লোক কেউ কোন
উপকারে আসেনা । ওর বাড়িতে ওই একমাত্র রোজগার করে বাকি সবাই ওর ওপর
নির্ভরশীল ।

এই ভারতবর্ষে এরকম অনেক মঞ্জু নিজের গতর খাটিয়ে পয়সা রোজগার করে স্বামী
,পুত্র, কন্যার  ভরন পোষণের দায়িত্ব নিয়েছে । নিজেকে নিংড়ে টাকা রোজগার
করে মুখে কোন প্রতিবাদ থাকে না থাকে শুধু ফেকাশে হাঁসি ।