Sunday, March 8, 2015

ছোটগল্প পারমিতা ... ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

 



ছোটগল্প



পারমিতা ... 
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী 




আকাঙ্ক্ষা,পারমিতা দুই বোন । দুজনের বয়েসের ব্যবধান মাত্র এক বছর। দুই বোনই এক ইংলিশ মিডিয়াম কোএড্ স্কুলে পড়ে । স্কুলবাস আসে সকাল ৭.৩০ টার সময় । শীতে কুঁকড়ে দুজনে বিছানা থেকে ওঠে সকাল ৬.৩০ টার সময়। সটান বাথরুমে ঢুকে নিত্যকর্ম সেরে বেরুনোর সময় ৭.০০ টা বেজে পাঁচ কি দশ মিনিট । তারপর খাওয়া সেরে বাসের জন্য অপেক্ষা । আরম্ভ হয় সারা দিনের জমে থাকা কিছু গল্প আর বয় ফ্রেন্ডদের নিয়ে কিছু ছুঁক ছুঁকুনির কথা । যাকে বলে চুলবুলি লেড়কি, হিন্দিতে । উপায় নেই যুগের টানে এরকমটা হবেই । মানুষের কিছু জেনেটিক আর একুয়ার্ড ক্যারেক্টার থাকে । কোন কোন সময় একুয়ার্ড ক্যারেক্টারটা বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয় । সেগুলো ভাল হতে পারে, আবার খারাপ ও হতে পারে । যদি খারাপের দিকে যায় তবে সর্বনাশ। সামাজিক দিক থেকে ভয়ঙ্কর ও হতে পারে। যা বাবা মা ভাই বোনের মাথা ব্যথার কারণ হয়। ধরা যাক, সেইরকম ক্যারেক্টারেরই মেয়ে পারমিতা । আকাঙ্ক্ষা একটু আলাদা ও পড়াশুনোর গল্প বেশি করে বন্ধুদের সঙ্গে । কিছু প্রবলেমের কথা যা হয়তো সলভ হচ্ছেনা, বা অন্য কিছু । ও পড়াশুনোতে ভাল । ক্লাসে বরাবর ফার্স্ট হয়। পারমিতা ঠিক তার উল্টো। ও বলে, টিভি প্রোগ্রাম, শাহরুখ্ সলমন হৃত্তিক আর বাংলার দেব ছাড়া ভাবতেই পারিনা । ক্লাস বাঙ্ক করে সিনেমা যাওয়ার এক্সাইটমেন্টই আলাদা । । টিচারকে এফ বি তে জন্মদিনে গিফট পাঠানো । ‘লিটিল হনি’ বলে বয় ফ্রেন্ড কে চুমু খাওয়া । এসবে থ্রীল আছে, বল! -কথাগুলো বলে দম নেয় । ওর দিদি এসব শুনেও শোনেনা ।

এরমধ্যে আকাঙ্ক্ষা সি বি এস সি তে ৯৮% নাম্বার রেখে পাস করেছে । কলেজে সাইন্স নিয়ে পড়ছে । সেদিন আকাঙ্ক্ষা খবরের কাগজে খবরটা পড়ে আতঙ্কিত হয়, কারণ ও প্রত্যেক দিন বাসে কলেজ যায় ফেরে, প্রায় রাত ৭ টার পর । খবরটা এই রকম :-“সকাল দশটায় ওদের কলেজের কাছাকাছি এক এলাকায় চলন্ত বাসের ভিতরেই এক তরুণীর হাত ধরে টানাটানি শুরু করে দিল জনা চারেক মদ্যপ যুবক । উপায় না দেখে চলন্ত বাস থেকেই লাফ দিয়ে নেমে ছুটতে ছুটতে কলেজে পৌঁছলেন ওই তরুণী। জনা কয়েক সহপাঠীকে কোনও মতে ঘটনাটা জানিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারালেন তিনি। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কলেজের ছেলেদের প্রচেষ্টায় ।

এই শহরের বুকে দিনের বেলায় আরও এক বার এই ঘটনা, শহরের রাস্তায়
মহিলাদের নিরাপত্তার অভাবটাকেই ফের বেআবরু করে দিল। দিল্লির বাসে তরুণীকে গণ-ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে, সে প্রতিবাদে গলা মিলিয়েছে আমাদের শহরও । কিন্তু তার পাশাপাশি এই শহরের বাস এবং রাস্তাই বা আলাদা কিসের, এ প্রশ্নটাও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে ।

কাকে বলবে? বোন তো পাত্তা দেয়না। বলে, তোর বয় ফ্রেন্ড থাকলে ওই তোকে প্রটেক্ট করবে । দিদি তুই ভারি আন-স্মার্ট আর ভীতু । মা'কে বললে বলবেন আর পাঁচটা মেয়েদের মতন তুমি হতে চেষ্টা কর । এসব কথা মনের ভেতর রেখে গুমরচ্ছিল আকাঙ্ক্ষা । ও কি সত্যি আর পাঁচটা মেয়ের মতন নয় ? তবে ওর পড়াশুনো কি বৃথা ! মনের মধ্যে তোলপাড় করে সব প্রশ্ন । আয়নার সামনে নিজেকে দেখে । ভরা যৌবনে মেয়েদের যা সৌন্দর্যের বিকাশ হয় ওর ক্ষেত্রে সেরকম কিছু পরিপ্রকাশ পায়নি। খুব সাদা মাটা মেয়ে । সাজতে জানেনা বললেই চলে । এতো সাধারণ মেয়ে আজকাল খুব একটা চোখে পড়েনা।

পরমিতা ঠিক উল্টো। প্রসাধণের সামগ্রী কেনার চেয়ে গিফট বেশি পায়। বয়ফ্রেন্ডের অভাব নেই । পারমিতা কে দেখতে সুন্দর এবং চোখ ধাঁধাঁনো চেহার । কস্মেটিক্স এর বাহারে ভুরু ভুরে গন্ধ । ছেলেদের মন ভোলানো চেহারা । এখন থেকেই ডেঁপো । পডাশুনোয় অষ্টরম্ভা । কোনমতে পাস করে । টুকলি করতে ওস্তাদ্ বোধহয় । কিন্তু বুদ্ধি প্রখর । ছেলেদের মাথায় টুপি পরাতে ওস্তাদ । আগেই বলেছি আকাংক্ষা ক্লাসে ফার্স্ট হয় । রিপোর্ট কার্ডে সই করার সময় বাপি আকাংক্ষাকে খুব উৎসাহ দিয়ে বলেন, ১২ ক্লাসে সাইন্সে র‍্যাঙ্ক রাখতেই হবে । এখন থেকে আই.আই.টির এন্ট্রান্সের জন্য তৈরি হও । তোমাকে খড়গপুর আই.আই.টিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পডাবো । ভাল রেসাল্ট করলে জি.আর.ই দিয়ে আমেরিকা পাঠাবো। বি.টেক্ এর পর হয় গেট্ দাও, নয় ক্যাট্ দাও । যদি এগুলো না দাও তবে ভাল রেসাল্ট করলে জি.আর. ইটা দেবে । এখন থেকে তৈরি হও আমেরিকা যাওয়ার জন্য ।

পারমিতা ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে যায় । বাপী জানেন ওর রেসাল্টের ব্যাপার ।
বাপী বলেন, মেয়েদের পড়াশুনা যে কত প্রয়োজন, তা এখন থেকে না বুঝলে
পরে আর সময় থাকবেনা, মা । পড়াশুনোতে মন দাও । মেয়েদের রূপ যৌবন
গুণ তিনটে দিয়ে বিচার করার সময় রূপ যৌবন দুটোই কিন্তু বয়স আধিক্যে ফুরিয়ে যায় মা; থাকে শুধু গুণটা । ওটাই শেষ জীবনের ভরসা । তোমার বন্ধুদের জিজ্ঞাসা কর ; ওরা কি ক্লাসে লাস্ট বেঞ্চে বসা মেয়েকে ভাল বলবে ! বাপীর টাকা মধু দাদার ভাঁড় নয়, যে অফুরন্ত থাকবে । চিরদিন তো আমি আর তোমার মা থাকবেন না । যাও মাকে দিয়ে সই করাও । ওঁচা মেয়েদের আমি পছন্দ করিনা । তোমার তো সব বায়না শুনি, তবুও তোমার এতো অধঃপতন কেন? লজ্জা করেনা ? দিদিকে দেখে শেখো । বাপীর কথা শুনে ওর চোখে জল আসে । চোখে জল নিয়ে বলে, পরের বার ভাল করব । গড প্রমিস, বাপি । এবারের মত সই করে দাও ! থাক, আর গড্ কে টেনো না ! তিনি তোমাকে অহোরাত্র দেখছেন। তোমার প্রাইভেট ট্যুটার এর প্রয়োজন হলে রাখো । কিন্তু রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই।

মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আঁচল ঠিক করতে করতে বলেন, রাম রাম, প্রাইভেট টিউটর ? রক্ষে করো ! আরেক ফ্যাসাদ বাঁধাবে । ও যা পড়ছে পড়ুক । না পড়লে হেঁসেল ঠেলবে! আমার সময় কোথায় ওকে দেখার ?

এটাতো কথা নয় । তুমি না দেখলে কে দেখবে ? বাপী বলেন।

কেন ওর দিদির কাছে বসে পড়তে পারেনা ?

দেখ সুমি (মায়ের নাম সুমিতা, বাপী ‘সুমি’ বলে ডাকেন) তোমার মেয়েদের
প্রতি দায়িত্ব বোধ না থাকলে ওরা কি করবে ভবিষ্যতে? মা’র নজর মেয়েদের দিকে বেশি থাকা উচিৎ । নাহলে পরে পস্তাবে ।

কেন? আমার একার দায়িত্ব কেন? তোমার মেয়ে নয় ওরা ? তোমার কোন দায়িত্ব নেই !
‘দায়িত্ব’ শব্দটা খুব জোর দিয়ে বিদ্রূপের সঙ্গে উচ্চারণ করলেন সুমিতা দেবী ।

আহ্ ! আমি কি তাই বলছি ! বোঝ না কেন? আর সেরকম বুঝলে চাকরি ছেড়ে দাও । তুমি তো সখের জন্য চাকরী কর ! ওটার কি কিছু প্রয়োজন আছে? মেয়েরা মানুষ না হলে, ওই চাকরী থাকার চেয়ে না থাকা ভাল !

কি ? আমি স্যাক্রিফাইস্ করবো আর উনি প্রাইভেট সেক্রেটারি কে নিয়ে ট্যুরে যাবেন ; আজ মুম্বাই, কাল দিল্লী, পরশু সিঙ্গাপুর । অফিস ছাড়া বাড়ির হাল কি হচ্ছে, বুঝেছ কখন ! বাহ ! সুন্দর !! চমৎকার সল্যুশন । পারবো না চাকরী ছাড়তে !! ও মেয়ের এমনিতেই বারোটা বেজে গিয়েছে ।

দ্যাখো যা জানোনা, সে বিষয় নিয়ে কথা বোলোনা। আমার চাকরীটা খাটুনির আর দায়িত্ব সম্পন্ন কাজ । তুমি ভাল করে যান সেটা । ওটা ঊল বোনার চাকরী নয় যে মেয়েরা পাস করলো কি না করলো মাস গেলে জমা খাতায় মাইনে ঢুকে যাবে গুঁতো মেরে । চাকরী ? আর চাকরী দেখিওনা !! মেয়েদের সামনে কি করে কথা বলতে হয়, সেটাই তো শিখলে না? যত্তো সব । বাবা গাড়ীর চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন গজ্ গজ্ করতে করতে । মা বাপির কথা কাটা কাটির মধ্যে পারোমিতা মাকে দিয়ে টুক করে সই করিয়ে নেয় । মা অজান্তে সই করে দেন । কিছুটা নিশ্চিন্ত এবারের মতন।

এবার পড়াশুনাটা করতে হবে মন দিয়ে। মোবাইলে কল আসে সুমিতের । সুইচ্ অফ করে দেয় । না আর সুমিতের সঙ্গে যাবেনা সে । শেষে কিনা হেঁসেল ঠেলতে হবে ! ম্যা গো !! মাথাটা টন টন করছে । দিদিকে দেখ ? খুব খুশী আমাকে বাপী বকেছেন বলে । 

#
ঈশ্বর প্রেমিক প্রেমিকাকে একি ছাঁচে বানান না । কিছু তারতম্য থাকে ।আদর্শ শব্দটি অভিধান থেকে মুছে গিয়েছে । সিটি সেন্টারে ওরকম অনেক যুগলই ঘুরে বেড়ান । আমি একটা ঘটনার কথা বলি । সেদিন রাজার হাট দিয়ে ফিরছিলাম আমার কারে । তখন বাজে রাত ১১ টা । হঠাৎ আমাদের কারটাকে দুটো বাইক, সম্ভবতঃ হিরো মোটর্সের লেটেস্ট মডেল, নামটা বলতে পারছিনা , যাইহোগ বাইকে দুই প্রেমী জুগল যাচ্ছেন । পিলিওনে যে মেয়েটি ছিলো সে বসে নেই, ফুট রেস্টে দাঁড়িয়ে । বিদ্যুৎ গতিতে বাইক দুটি আমাদের ক্রস করে বেরিয়ে যায় । যদি এতোটুকু অসাবধান হয়, মৃত্যু সুনিস্চিৎ । এটা কি স্টান্ট, না কি আমি বুঝলাম না । এদের মা বাবা এদের কি শিক্ষা দিয়েছে? অবিশ্যি মা বাবা কে দোষ দিয়ে কাজ নেই ওনারা কি যানেন? আমি ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম ও বোলল, আপ নয়া হ্যায়, সাব । এ তো হামেশা দেখনেকো মিলতা হ্যায় । মনে মনে ভাবলাম আমরা কতো গ্রাম্য, এরা কতো সভ্য । এই যদি সভ্যতা হয়, তবে হে ঈশ্বর, আমাকে গেঁয়ো করেই রাখো! সে দিন থেকে আমি আর কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করিনা । কান মুলছি নাক মুলছি আর না । নিজের মেয়েদের কথা ভাবছি ! পরোমার কি হবে ? ওর কি ভবিষ্যৎ ? আমার সময় নেই এনার্জি ও নেই । সুমি তার স্কুল আর বান্ধবীদের নিয়ে ব্যাস্ত । পার্টীর জন্য আজ ধারনা, তো কাল বন্ধ । ছারখার হয়ে গেল এই দেশটা এসবের জন্য । সর্ব শিক্ষা অভিজানের লেকচার দেয় সুমি আর নিজের মেয়ে গোল্লায় যাচ্ছে । কি মা'রে বাবা । কিছু বলার উপায় নেই আমার । মেয়েটা উচ্ছ্বন্নে যাচ্ছে ।

দেখেও কিছু বলার উপায় নেই । আমি নিরুপায়। আমার কোম্পানির সার্ভিস । একটু এদিক ওদিক হলে সর্বনাশ । কাকে বোঝাব ? কথাটা উল্লেখ করলাম এইজন্য যে হামেশা নাকি এরকম হয় । আমরা তো দেখতে অভ্যস্ত নই, তাই বোধ হয় আমার দৃষ্টিকটু লাগলো । মানুষ সহজ ভাবে নিচ্ছে। আমি বোধহয় গেঁয়ো হয়ে গেলাম বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে। আমার বন্ধুরা বলে তুই এইসব নিয়ে ভাবিস না। ও সব মডার্ন ছেলেমেয়ে। মনে মনে ভাবি আমার তো দুটো মেয়ে আছে ! তাদের মধ্যে ছোটটাই মাথা ব্যাথার কারণ হচ্ছে ।

আমি তো দেখছি আকাঙ্খার মতন মেয়েরাই বিপদে পড়ে, কারণ ওরা নিজেদের নিরাপত্তার দিকে নজর দেয়না। পড়াশুনাতে এত ব্যস্ত থাকে যে, ওদের অন্য দিকে মন যায় না। তার সুযোগ নেয় অসামাজিক ব্যক্তি। তাই বলি জুডো ক্যারাটেটা মেয়েদের জানা নিতান্ত জরুরি । ওদের বন্ধু হাতে গোনা হয় আর ছেলে বন্ধু থাকলেও তারা পাত্তা পায় না এদের কাছে। কিন্তু পারোমিতা ! তার বন্ধু ’শয়ে ’শয়ে । বাপী লেটেস্ট এপেলের আই ফোন সিঙ্গাপুর থেকে কিনে এনেছেন, একটা মা আরেকটা পারোমিতার জন্যে । বাপি কি জানেন মেয়ের কীর্তি ! বলেন রেসাল্ট ভাল হওয়া চাই কিন্তু । আইফোন দিতে আপত্তি নেই।

‘কচু’ রেসাল্ট না ছাই । মা বলেন । ওই মেয়ে গোল্লায় গেছে ।

এম.এম .এস এ ছবি পাঠান মেসেজ বক্স এ জোক লাভ এস .এম। .এস সব ভর্তি । কে দেখবে? দেখার সময় কার আছে । বাপি সকাল থেকে বেরিয়ে যান ফেরেন রাতে। মা স্কুল টিচার অন্যকে জ্ঞান বিতরণে ব্যস্ত নিজের মেয়েকে দেখার সময় কোই ? সোসিয়াল সার্ভিস করে ক্লান্ত । স্কুল থেকে এসে এতোই ক্লান্ত যে মেয়ে কি পোডলো কি খেলো দেখার সময় নেই । টিভি, সিনেমার ম্যাগাজিন,তারপর খাওয়া ,ঘুম । ঘরে রান্না বান্না করতে হয়্না কারন রাঁধুনী আছেন । ২৪ ঘণ্টার কাজের লোক আছেন। মঞ্জু মাসি ।

ঘরে গার্জেন বলতে ঠাকুমা তাঁর তো বয়েস ৭৯+ অতএব তিনি কি করবেন? ঠাকুরপুজো তেই তাঁর সময় কাটে । ছেলে,বৌ,নাত্নীদের জন্য সব পুজো । ওনার ঘরে কেউ যায়না । কখনো কখনো বাবা যান আর মঞ্জু মাসী খাবার দিতে যায় । পারোমিতা কে একদম দেখতে পারেন না ঠাকুমা । বলেন শুভ( শুভজিত বাবার নাম) গোল্লায় যাচ্ছে তোর মেয়ে । মেয়ের ডানা গজিয়েছে । এখন থেকে দ্যাখ নাহলে ওই মেয়ে ভোগাবে তোকে । আমি বলে রাখলাম শুভ ।

আমি কতোক্ষণ থাকি মা ? আপনি বলুন ? আমার সময় কোথায় ?

তবুও তোর শাসন প্রয়োজন । ওকে মোবাইল কেন দিলি ? ওই অলক্ষুণে মোবাইল ই ওর উচ্ছৃঙ্খলতার কারন । আমাকে ত হুটা হুট্ করে দেয় ।

আপনি শাসন করুন মা । আমি কতক্ষণ ই বা থাকি ? একটু শান্তি না হলে আমার কি ভাল লাগে ? ওইসব শুনতে ভাল লাগে না। সমত্ত মেয়েদের মা শাসন করবেন না বাবা কি পারে? না মানায় ! আপনি বলুন! শুভ এক নিশ্বাসে কথাগুল বলে হাঁফ্ ছাডলো ।

সব ই অদৃষ্ট বাবা । হ্যাঁরে মঙ্গল বার দিন একটু সময় করে দক্ষিণেশ্বর নিয়ে চল না বাবা। কতদিন মায়ের মুখটা দেখিনি। আহা মা সদয় হলে তোর কোন দুঃখ থাকবেনা।

মঙ্গলবার ! আচ্ছা দেখছি ! টেবলেট পিসিটা তে কি দেখে বললো, মা একদম ভোরে আপনাকে নিয়ে যাব ।

আমিতো  সেই ভোর ৪ টেতে উঠি তুই উঠতে পারবিতো  ?

হ্যাঁ মা পারবো ।


##
আকাংক্ষা স্কুল থেকে বাসে ফিরছিল বেলা তখন ৪ টে । রাস্তাতে হট্টগোল আর জ্যাম্ দেখে আঁতকে ওঠে । ৪.৩০ এর সময় রাস্তা ফাঁকা হয় ।

ছাত্র ছাত্রী এবং অধ্যাপকদের নিরাপত্তার দাবিতে দুপুর দেড়টা থেকে ঘণ্টা তিনেক রাস্তা অবরোধ করেন কলেজের শতাধিক ছাত্রছাত্রী। তাতে হাজির ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। সকলেরই অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরোনোর পর প্রায় রোজ দুষ্কৃতীদের অসভ্যতা ও কটূক্তির মুখে পড়তে হয় তাঁদের। সন্ধ্যার পর রাস্তায় বেরোলে রীতিমতো ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। ‘আর মোমবাতি নয়, এবার কিছু করে দেখানোর সময়’, অবরোধে দাবি তোলেন ছাত্রীরা।

কোমল হৃদয়ের শান্ত মেয়ে ‘আকাংক্ষা’ তার মনে এই সব গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে । অনেক প্রশ্ন আলোডন করে বুকের মধ্যে । কেন এই অসভ্য মানুষগুলো  প্রশ্রয় পায় ! আর কেনইবা মেয়েদের নিরাপত্তা থাকবেনা এই শহরে ? প্রশাসন কি নীরব? এরকম অনেক প্রশ্ন ।

বাপীকে কিছুই বলা যায়না এ বিষয় । মা’ ! তিনি তো ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। ঠাকুমা ! তিনি ই বা কি করবেন? তবে কাকে বলবে সে ? বোন ! ও শুনলে হাসবে । মজা পাবে ।

বাডীতে ফিরে একটা ডাইরিতে আজকের ঘটনা সম্পর্কে লিখে রাখল। বাপীর কথাগুল মনে রেখে খুব মন দিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি করতে লাগলো । ম্যাথ্, ফিজিক্স্, কেমিস্ট্রি সব বিষয় গুল ভাল করে রিভিশন দিয়ে রাখলো। গত দশ বছরের সমস্ত প্রশ্ন র উত্তর শেষ করে ফেলেছে ।খাতা ভর্তি অঙ্ক আর ফিসিক্স্ এর প্রব্লেম সলভ্ করে রেখেছে । ইংলিস্ টা আরেকটু রিভিসন করতে হবে । এইরকম ভাবছিল ...।

মা বললেন, হ্যাঁরে পারু কোই ? ৭ টা বেজে গেল মেয়েটা কোথায় যায়? তোর সঙ্গে আসেনি?
এতোগুল প্রশ্নের উত্তর কি দেবে ভেবে পেলনা । আমি জানিনা ...
জানিসনা মানে ?
বারে আমি স্কুল সেরে বাড়ি  ফিরে এলাম । এমনিতেই আমাদের এক্সট্রা ক্লাস হচ্ছে । আমি কি করে জানবো ওর কথা ?
তুমি তোমাকে ছাড়া  আর কোন কিচ্ছু জানোনা মা ! বাপের আহ্লাদি মেয়ে ! বোনটা কোথায় গেল খোঁজ নিবিনা একটু ! জানি তুমি দিগ্গজ মেয়ে , তা বলে বোনটার কোন খোঁজ খবর নেবে না?
সরি মা ভুল হয়ে গিয়েছে । আমাকে ভুল বুঝ না।
সুমিতা মোবাইলে নম্বর ডায়াল করতে লাগলেন ... এই অর্পিতা শোন ভাই তোর বর কে একটু বলনারে ... আমার ছোট মেয়ে পারমিতা যে তোর ছেলের বার্থ ডে পার্টি তে নেচেছিল মনে আছে ... হ্যাঁ !... ও এখন পর্য্যন্ত আসেনি রে । কি করি বল তো?... ইনি দিল্লী গেছেন ফিরবেন কালকে । এলেই ত আমার ওপর হম্বি তম্বি করবেন। আমার হয়েছে যত জ্বালা...।
দাঁড়া চিন্তা করিসনা ...। আমি একটু পরে তোকে খবর দিচ্ছি।
রাত ৯ টার সময় পুলিসের জিপ্ এল । এটাকি সুভজিৎ ব্যানার্জীর বাড়ি  ?
ভয়ে তটস্থ সব্বাই । হ্যাঁ ...। কি হয়েছে ?
দেখুন চিনতে পারেন কিনা ?
আমার বুক টা দুরু দুরু করতে লাগলো । মা গিয়ে যা দ্যাখেন । হতভম্ব হয়ে যান । পুলিসের জীপের পেছনে দুটি ছেলে মেয়ে । তার মধ্যে একটি চেনা। সে আমাদের পরমা ...পারমিতা.... । অন্যটিকে চিনিনা ।...

Thursday, March 5, 2015

অনু গল্প 'মঞ্জু' / ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ০৪.০৩.২০১৫ /



  মঞ্জু

ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ০৪.০৩.২০১৫ /

আমার বাড়ীর কাজের মহিলা ‘মঞ্জু’ বয়েস বেশি না ৩০-৩২ হবে ,  কিন্তু তিন মেয়ের মা ।
বর অটো চালায় । মেয়েগুলোকে স্কুলে পড়ায় । আজকাল রোজ দেরি করে আসে নয় তাড়া
তাড়ি কাজ সেরে পালায় অন্য বাড়ীর কাজ করতে । মহা মুস্কিল এরকম ত ছিলনা ।
মঞ্জু আমাদের দুজনের রান্না , আমার জন্য সকালে  তরিবাতের জলখাবার এই সব
রান্না করতে করতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নিত। আগে আসত সকাল  ৭ টায় যেত
প্রায় সকাল  ৮.৩০ । এখন আসে ৮ টায় এক ঘণ্টায় সব কাজ সেরে চলে যায় । কিছু
বললে হেঁসে বলে,“মেসো খাওয়াটা কমাও । ওত খেলে শরীর খারাপ করবে ।” আমি এক
ঘণ্টায় তোমাদের রান্না বান্না সব করে দিচ্ছি । আরেকজন দাদার বাড়ীর বৌদি ,
তারাও আমাকে রেখেছে রান্না করার জন্য আধ ঘণ্টায় সব করে দি । সকালের
জলখাবার ওট আর দুধ । ডিম সিদ্ধ ডাল ভাত একটা ভাজা , নয় সবজি , নয় মাছের
ঝাল আর ভাত খেয়ে দুজনে অফিস চলে জায় , ফিরে রাতে দুখানি রুটি আর সকালের
তরকারি, এক কাপ দুধ খেয়ে ঘুমোয় ।

আমি বলি - তুই কি করে জানলি ওরা কি খায় আর না খায় ! ওরা হয়ত বাইরে কিছু
খেয়ে আসে । তোর যা রান্না, নেহাত তোর মাসির অসুখ বলে আমি তোর হাতের
রান্না খাচ্ছি নাহলে কে খাবে তোর হাতের রান্না ! নুনের মাপ জানলিনা , তুই
কি রান্না করিস রে । সর্বদা আমার খাওয়ার দিকে তোর নজর । আমরা খান দানি
ঘরের ছেলে ।  বাপ দাদার আমলে খাওয়াটা পরিপাটি ছিল ...আছে... থাকবে ।

দাদা আমেরিকা থেকে আমার জন্য নেল কাটার ,  আমার মেয়ের জন্য টকিং ডল ,
গায়ে মাখার সাবান , পারফিউম সব এনে দিয়েছে । তোমরা মাস মাহিনা ছাড়া কি
দাও আমাকে ।

আমি বলি , আমি কি তোর জন্য আমেরিকা যাব । যত সব ,  চা’ দে ! শারদায় যে
টাকা রেখেছিলি পেলি ?

না পাবনা আর । ও সুদীপ্ত হারামজাদা সব গিলেছে লোকেদের টাকা । গরীবের
টাকাগুলো কেমন করে সহ্য হয় কে যানে । ও মরার সময় দেখবে কি অবস্থা হবে ?

ওকি একা খেয়েছেরে । একে একে সব বেরুচ্ছে বেরুবে । দাঁড়া কি হয় দেখ ।

কি আর হবে ? কিচ্ছু হবে না । যে যেমন আছে সেইরকম ই থাকবে ।  কি লাভ
আমাদের টাকা ত পাবনা আর ... হতাশ হয়ে বলে !

তা তোদের মতন লোকেরা আবার আরেকটা সুদীপ্তর মত লোকের পাল্লায় পড়বে।
আহ্লাদে আটখানা দেখিস ? সেটা আবার কি গো মেসো ?

মিরাক্কেল= মির+আক্কেল ! আক্কেল দাঁত না ওঠা অবধি ভাল লাগবে তার পর ওই
মীর(মীর অফসর আলী)র ছ্যাবলামি ,  শ্রী-লেখা দত্তর ন্যাকামি , রজতাভের
“আপনি থাকছেন সার” , বুড়ো ভাম , পরানের এক ঘেয়ে কমেন্ট, “ভালো ! আরও ভালো
করতে হবে পরেরটায়”। তারচেয়ে সা রে গা মা দেখ ভালো লাগবে । আমরা ওটাই দেখি
। কি সুন্দর গান গায় ছেলে মেয়েগুলো । এক কমলিকা ছাড়া । ও গর্বে ফেটে পড়ে
। বলে কিনা , “আমার গান লোকে বড় স্ক্রিন লাগিয়ে ভিডিওতে দ্যাখে।” খুব
গর্ব মেয়েটার । দেখবি ও থাকবেনা শেষ অবধি ।

তুমি এতসব দ্যাখ মেসো ?

হ্যাঁ দেখি।  আর কি করব বল ? তোদের বয়েসে খাওয়ার সময় পেতাম না ।  এখন বসে
শুয়ে দিন কাটে না । সকাল বিকেল হাঁটি , বাজার করি , মাঝে মধ্যে ব্যাঙ্কে
যাই , বিকেলে কারে ঘুরি কখন সখন তাও ড্রাইভার থাকলে । ড্রাইভার না এলে
নিজের গাড়ী নিজেই পুঁছি ।

মেসো দাদা কবে আসবে ? অনেক দিন আসে না ।

ও আমেরিকা গিয়েছে আসবে কি করে ? ওকে আরও বছর খানেক থাকতে হবে । বৌমা
নাতনী সব ওখানে । ফিরবে কিনা কে জানে ?

তা তুমি কি আমার হাতের রান্না খেয়ে দিন কাটাবে ? তোমার বৌমা এলে তোমায়
রান্না করে দেবে না ?

আকাশ থেকে পড়লি নাকি ! তোর এতো প্রশ্নের কি দরকার । যা মাসির ঘরে যা ।
বৌমা রান্না করবে ? কি সব বলে ! খুব আস্পর্ধা হয়েছে তোর । আমার ঘরে আর
আসবিনা । তুই জানিস ওর বিষয় ?

যাইগো বেলা হল । ও মাসী যাই ।

হ্যাঁ আয় । কি ফুটুর ফুটুর করছিলি শুনি ?

নাগো মেসোক বৌদির রান্না করার  কথা বলাতে রেগে গিয়ে আমাকে যেতে বলছে ।

ও হরি । ও রান্না করবে কিরে ? ওরা কি আমাদের আমলের মেয়ে ? ওখানে ছেলেটা
কি খায় কি করে কে জানে ? তুই আয় এবার । কেন ফটর ফটর করিস মেসোর সঙ্গে ?
জানিস তো ও বৌমার নিন্দে একদম শুনতে ভালো বাসেনা । আমাকেই হাটিয়ে দেয় ।
নিজে দেখে এনেছে না ! খুব ভালো বাসে তাই । আমাদের মেয়ে নেইত । ওকেই মেয়ের
স্নেহ দেয় । বৌমাও তোর মেসোকে খুব যত্ন করে এলে । চা নিজের হাতে বানিয়ে
দেয় । ও থাকলে আমার হাতের চা খায়না । বৌমাকে বলে লেমন টি বানাতে , নয়
হার্বাল টি ।

সেত দেখেছি আমি । মেসোর মন রাখতে খুব জানে তোমার বৌমা ।

এই মঞ্জু তুই গেলি ............. । আমার গলার আওয়াজ শুনে মঞ্জু পালায় ।

মঞ্জু জাওয়ার পর আমি গিন্নীকে বলি ... ওকে ছাড়িয়ে অন্য লোক রাখবো । খুব
বাড় বেড়েছে ওর।

অন্য লোক ওই মাইনেতে আর এখন পাবে না ।

দু হাজার টাকা কি কম ? মাস-গেলে আমার নতুন চাকরীতে ওই মাইনে পেতাম না ।

তখন দিন কাল আলাদা ছিল। লোকে শান্তিতে ছিল। এখনকার কালে দু হাজার টাকার কি দাম বল।

তা অবশ্য ছিল ।

তবে ?

মঞ্জুর মতন কাজের লোক আর পাবে না । তোমার অনেক ফাই ফরমাজ খাটে । তোমার
গেঞ্জি , জামা প্যান্ট সব মুখ বুজে কাচে । ও নিজেই বলে ওয়াশিং মেশিনের
দরকার নেই মাসি , ওইটুকু আমি নিজেই পারবো।  ওকে তাড়ান চলবেনা ।

মঞ্জু আমাদের বিশ্বাসী মেয়ে ওর ওপর ভরসা করে সব ছেড়ে যাওয়া যায় ।  এখনকার
কাজের লোক কে কোথায় চুরি করে নিয়ে যাবে ! না বাবা মঞ্জুই ভালো ।  আমরা
দুজন থাকি এত বড় ঘরে । ঘর ভর্তি জিনিস । কিছু হাত সাফাই করলে কিছুই বোঝার
উপায় নেই । ও তাও চেয়ে নেয় । এইতো সেদিন দুটো  সিলিং ফ্যান দিলাম । বলে
গরমে মেয়েরা পড়া শুন করতে পারে না মাসি । তোমাদের ত এসি আছে , আমরা গরমে
সিদ্ধ হয়ে জাই ।  নতুন ফ্যান গুল  তাও দিয়ে দিলাম ।  মেয়েটার ওপর মায়া হয়
। ওর বরটা কিছুই করেনা । তার ওপর শাশুড়ি আছে । সব শুষে খাবার লোক কেউ কোন
উপকারে আসেনা । ওর বাড়িতে ওই একমাত্র রোজগার করে বাকি সবাই ওর ওপর
নির্ভরশীল ।

এই ভারতবর্ষে এরকম অনেক মঞ্জু নিজের গতর খাটিয়ে পয়সা রোজগার করে স্বামী
,পুত্র, কন্যার  ভরন পোষণের দায়িত্ব নিয়েছে । নিজেকে নিংড়ে টাকা রোজগার
করে মুখে কোন প্রতিবাদ থাকে না থাকে শুধু ফেকাশে হাঁসি ।

Sunday, February 22, 2015

একুশের চেতনা : কাঁটাতারের এপারে / শ্রী শুভ্র /



 

একুশের চেতনা : কাঁটাতারের এপারে

আমরা জানি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা বাংলা! ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী,বাংলায় ৯ই ফাল্গুন যেখানে মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে প্রাণ দিয়ে ভাষা শহীদ হয়েছিলেন পাঁচ বাঙালি! বিশ্বে নিজ মাতৃভাষার জন্য শহীদ হওয়ার ঘটনা সম্ভবত সেই প্রথম! ভাষার জন্য এরপর ১৯৬১ সালে শিলচরে প্রাণ দেন ১১ জন তরতাজা বাঙালি! বাহান্নর সেই ভাষা আন্দোলনের সুদূর প্রসারী ফলে একাত্তরে পাকিস্তানের অধীনতা থেকে মুক্তি পায় স্বাধীন বাংলাদেশ! তাই সেখানে আজ আ মরি বাংলা ভাষা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জাতীয় ভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত, এবং আবিশ্ব স্বীকৃত।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমানা ঘেরা কাঁটাতারের এপারে বাংলাভাষার স্বীকৃতি রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে তো নয়, বাংলা এখানে একটি প্রাদেশিক ভাষা মাত্র। ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের মতোই বাংলার স্বীকৃতি তাই আঞ্চলিক ভাষারূপেই। সেটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনাও। সত্যিই তো বিশাল ভারতবর্ষের এক প্রান্তে  পড়ে থাকা খণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ত্রিপুরার ভাষার, আঞ্চলিক ভাষারূপেই তো স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। হয়েওছে তাই। ঠিক যেমন তামিল তেলেগু মালায়লাম কর্ণাটকি ভাষা কিংবা অসমীয়া উড়িয়া গুজরাটী পাঞ্জাবি মারাঠী ভাষা! রাষ্ট্রভাষা আর আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে হয়তো কোন বিরোধ নাই, কিন্তু দেখতে হবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাদেশে বাংলাভাষার যে গুরূত্ব,  এই বঙ্গে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে বাংলার গুরুত্ব তার তুলনায় কতটুকু। কিংবা ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলার প্রকৃত অবস্থা ঠিক কিরূপ!

এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে অবাঙালিদের সংখ্যাধিক্যের কথাটিও। বিগত দশকগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের পার্শ্ববর্তী বিহার ও নবগঠিত ঝাড়খণ্ডের অধিবাসীরা সহ উত্তরপ্রদেশ গুজরাট রাজস্থান পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্যের মানুষজন ব্যাপক ভাবে এই বঙ্গে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেছেন। সে তো তারা করতেই পারেন। আর এই প্রবণতা তো ঠিক একেবারেই নতুন কোন ঘটনা নয়, বৃটিশ আমল থেকেই শুরু হয়েছিল এই প্রবণতা। আর ভারতবর্ষের নাগরিক মাত্রেই সারা দেশের যে কোনো প্রান্তেই পাকাপাকি ভাবে যে কেউ বসবাস করতেই পারেন। সকল ভারতবসীরই সেটি সাংবিধানিক অধিকারও বটে।  প্রশ্ন সেখানে নয়। দেখতে হবে এই প্রবনতা প্রতিটি রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির উপর কি প্রভাব ফেলছে ও কি ভাবে, এবং তাতে সেই সেই আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নতি  না অবনতি- কোনটা ঘটছে।

আমরা জানি স্বাধীনতার পর বিশেষত দক্ষিণ ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের স্ব স্ব রাজ্যে অতি সম্মানের স্থান ‌অর্জন করতে পেরেছে! যাঁদেরই দক্ষিণ ভারতে কিছুদিনের জন্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা ঘটেছে, তারাই জানেন সেখানে প্রতিটি রাজ্যে, সেই সেই রাজ্যের ভূমিপুত্ররা তাঁদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কতটা গর্ব অনুভব করেন।  এবং তাঁদের আপন ভাষা ও সংস্কৃতিকে কি ভাবে বুক দিয়ে আগলিয়ে রাখেন ও সারা দেশে নিজ ভাষা সংস্কৃতির প্রসারে তাঁরা কতটা আবেগ প্রবণ। শুধু তাই নয়, প্রতিটি রাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার পরিসরেও সেই সেই আঞ্চলিক ভাষাগুলির গুরুত্ত কী অপরিসীম। পরাধীন মানসিকতার নাগপাশ কাটিয়ে উঠে তারা নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রচলন ও প্রসারে কতটা আপোষহীন ভাবে যত্নবান, সেটা কিছুদিন তাদের মাঝে বসবাস করলেই বোঝা সম্ভব কিন্তু! এমনটাই তো হওয়ার কথা। আবিশ্ব ইংরাজীর দাপট ও উত্তর ভারতের হিন্দিবলয়ের দাপটকে প্রতিহত করে কি ভাবে বিদেশী ভাষাকে সঙ্গে নিয়েও নিজের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে সদর্থক ভাবে লালন করে সমগ্র অঞ্চলের স্বজাতির উন্নতি ঘটানো যায়, সেই বিষয়ে তাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে আমাদের।

শেখার আছে হিন্দী বলয়ের রাজ্যগুলির থেকেও। তারাও স্বধীনতা উত্তর বিগত দশকগুলিতে নিজেদের মাতৃভাষাকে জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে বহুল পরিমাণেই প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যার সুফল পড়েছে তাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। কিন্তু আমাদের এই বঙ্গের চিত্রটি ঠিক কিরকম? আসুন বরং একবার ভালো করে দেখে নেওয়া যাক সেটা।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ শব্দটি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বিশেষ একটি জায়গা করে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমানা দিয়ে নিরন্তর অনুপ্রবশ ঘটে চলেছে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে। রাজ্য রাজনীতিতে সেই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে অসরোষও নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দুটুকরো হওয়া বাংলার এক পাড় থেকে আন্তর্জাতিক সীমানা পেড়োলেই অনুপ্রবেশ। অনুপ্রবেশ বিদেশী নাগরিক হিসেবে সেই একই বাঙালির, যার ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদেরই ভাষা ও সংস্কৃতি! রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যা ভয়ানক অপরাধ! কিন্তু এরই পাশাপাশি স্বাধীন ভারতবর্ষের নানা রাজ্যের নানান ভাষাভাষী নাগরিক,যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের থেকে একেবারেই পৃথক ও ভিন্ন ;তারা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিন জায়গা জমি কিনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করলেও সেটা কোনোভাবেই অনুপ্রবেশ নয় । তারা আমাদের স্বজাতি না হলেও, কারণ তারও আমাদের মতো একই ভারতবর্ষের নাগরিক!

আর সেই অবাঙালি ভারতীয় নাগরিকরা সাংবিধানিক ভাবেই নিরন্তর এই বাংলায় স্থায়ী ভাবে প্রবেশ করছেন প্রতিদিন- ঝাঁকে ঝাঁকে। প্রশ্ন সেখানেও নয়। তারা তো অন্যায় কিছু করছেন না! পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকারের সীমাতেই তারা এরাজ্যে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করছেন। প্রশ্ন অন্যখানে। প্রশ্ন হল এই অবস্থার প্রেক্ষিতে এই রাজ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর ঠিক কিরকম প্রভাব পড়ছে। সেই প্রভাবে আমাদের ভাষা সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থাটি ঠিক কিরকম? এরাজ্যে ভীড় করা অবাঙালিদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দীবলয় ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলের অধিবাসী। স্বভাবতঃই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ প্রাপ্ত হিন্দী তাদের মাতৃভাষা হওয়াতে তারা এই রাজ্যে এসেও সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করতে পারছেন অতি সহজেই। কর্ম জগতে পেশার ক্ষেত্রে সরকারী ভাষা হিন্দী ও ইংরেজী হওয়াতে, তারা তাদের মাতৃভাষা হিন্দীতে যত সহজে জীবন জীবিকায় অংশগ্রহন করতে পারেন, আমাদের বাঙালিদের অনেক পরিশ্রম করেই ঐ দুইটি ভাষার কোন একটিতে, বা ক্ষেত্র বিশেষে দুটিতেই আগে পারদর্শী হয়ে উঠতে হয়, যা যথেষ্ঠ সময় ও অধ্যাবষয় সাপেক্ষ সন্দেহ নাই। যে কাজ সকলের পক্ষে সহজ নাও হতে পারে। আর সেই সুযোগেই অবাঙালিরা ব্যাপক ভাবে যত সহজে কর্ম জগতে প্রবেশ করতে পারেন ও সাফল্য অর্জন করতে পারেন বাঙালিরা আজ আর তা পারে না বলেই, পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যার মধ্যে বাঙালি ও অবাঙালির অনুপাতটি ভয়াবহভাবেই ভারসাম্যহীন। বিষয়টি পরিস্কার বোঝা যেতে পারে যদি আমরা রাজ্যবাসীর মোট বাঙালির মধ্যে কতজন বেকার এবং মোট অবাঙালির মধ্যে কতজন বেকার; সেই অনুপাতটি সঠিক ভাবে খুঁজে বের করি। পরিতাপের কথা, এই ভাবে ভাবলেই সকলের অভিধানে সংকীর্ণ প্রাদেশিকতা দোষে দুষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় কেউই আজ অব্দি এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি মনযোগ দেননি। স্বভাবতঃই দেবেনও না। কিন্তু বাস্তব অতি কঠিন সত্যকেই প্রতিফলিত করে, আমরা সেই সত্যের দিক থেকে মনযোগ সরিয়ে রাখলেও।

বাস্তব এইটিই যে কি সরকারী কি বেসরকারী, দুই ক্ষেত্রেই কর্ম জগতে প্রবেশ ও উন্নতির ক্ষেত্রে হিন্দী ও ইংরাজীর গুরুত্ব অপরিসীম। ঠিক যেখানে আ মরি বাংলা ভাষার কোনো রকমের প্রাসঙ্গিকতাই স্বাধীনতার সাতদশকেও গড়ে ওঠে নি। সকল রকম গুরুত্বপূর্ণ সরকারী চাকুরীর পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র হিন্দী ও ইংরেজীতে হওয়ায় হিন্দীভাষী রাজ্যবাসী তাদের মাতৃভাষায় যত সহজে উৎরে যেতে পারে, এরাজ্যের বঙ্গসন্তানের পক্ষে কাজটি তত সহজে হয় না। সেই উৎরানোর কাজটি সম্পন্ন করতে গিয়ে তাদেরকে অনেকটা সময় ও পরিশ্রম করেই মোটামুটি ভালোভাবে বিদেশীভাষা ইংরেজীতে দখল অর্জন করতে হয়। যে কাজটি আপামর বাঙালির সন্তানের পক্ষে মোটেই সহজ সাধ্য নয়। ফলে দিনে দিনে সাধারণ মেধার বাঙালি ছাত্রছাত্রীরা সরকারী ও বেসরকারী ক্ষেত্রে পেশাগত ভাবে সাধারণ মেধার অবাঙালিদের থেকে পিছিয়ে পড়ছেই। আমরা অধিকাংশ বাঙালিরাই এই বাস্তব সত্যকে প্রতিরোধ করা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করি বা সাচ্ছন্দ বোধ করি। বরং এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই আমরা আমাদের সন্তানদেরকে বেশী করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্ত্তি করতে রাত জেগে লাইনে দাঁড়াই। আমরা জানি ইংলিশে চৌখস না হলে জীবনে উন্নতি নাই। শুধু তাই নয়, ইংরেজীর সাথে হিন্দীতেও যে ছেলেমেয়েদের চোস্ত হওয়ার দরকার, আমাদের সেদিকেও খেয়াল থাকে এইযুগে। আর এর অবশ্যম্ভাবী পরিণামেই মাতৃভাষা বাংলাকে আমরাই আরও বেশী করে কোণঠাসা করছি দিনে দিনে অবহেলার চূরান্ত চর্চায়!

এই প্রসঙ্গেই স্মরণে রাখা দরকার, বাংলাদেশে বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের মূল প্রেক্ষিতটা। সেই সময় বাংলা ভাষার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আবেগেই কিন্তু এই আন্দোলনের ব্যাপকতা গড়ে উঠেছিল না। সেই আন্দোলন গড়ে ওঠার মূল কারণ ছিল, তৎকালীন পাকিস্তানী প্রশাসনের, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দ্দুকে ঘোষণা করা। যে ঘোষণার নেপথ্যে ছিল পাকিস্তানী প্রশাসনের গভীরতর ষড়যন্ত্রমূলক দূরভিসন্ধি। সেদিনের বাংলাদেশের যুবসমাজ বুঝতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষা উর্দ্দু হলে সমস্ত সরকারী বেসরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে উর্দ্দু না জানলে কর্মজগতে প্রবেশ ও উন্নতি করা যাবে না। বরং পাকিস্তানের ছেলেমেয়েরাই মাতৃভাষা উর্দ্দুর সুযোগ নিয়ে একতরফা ভাবে অধিকাংশ কর্মস্থলে অভিষিক্ত হবে। বাঙালি পর্যবসিত হবে মূলত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। তাই সেদিন বাংলাদেশের যুবসমাজ বাংলার ইতিহাসে সেই  প্রথম, মাতৃভাষার মূল গুরুত্বটি অনুধাবন করতে পেরেছিল। তারা বুঝেছিল জীবন জীবিকায় মাতৃভাষার স্থান না থাকলে সার্বিক ভাবে সমগ্র জাতির উন্নয়ন অসম্ভব। তাই প্রথমত পেটের তাগিদেই যে উর্দ্দুর বিরোধীতা শুরু হয়েছিল, অচিরেই তা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে বৃহত্তর আন্দোলন হয়ে দেখা দিল। এইখানেই বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

আর আমাদের এই পাড়ে, পাকিস্তান প্রশাসন ঐ পাড়ে যে ভুলটি করেছিল, ভারতবর্ষের প্রশাসন সেই ভুলটি কোনোদিনও করেনি। তারা বুঝতে পেরেছিলেন হিন্দীকে জবরদোস্তি রাষ্ট্রভাষা ঘেষণা করে সারা ভারতের উপর চাপিয়ে দিতে গেলে দেশ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদেশী ভাষা ইংরেজীর পাশাপাশি হিন্দীকে রেখে দিনে দিনে সুকৌশলে হিন্দীকে নানান ভাবে পোষকতা দিয়ে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলেই একদিন কালক্রমে হিন্দীই রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর গত সাতদশকে ঠিক সেইটিই হয়েছে। এই বিষয়ে প্রথমাবধি বোম্বাইমার্কা হিন্দী বায়োস্কোপের জনপ্রিয়তা তাদের পরিকল্পনার পক্ষে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। পরবর্তীতে টিভির পর্দায় হিন্দী সিরিয়াল যে কাজটিকে আজ ব্যপক ভাবে সফল করে তুলেছে। আর এই ভাবেই হিন্দীবলয়ের বাইরেও ভারতবাসীকে হিন্দীনুখি করে তুলতে সক্ষম হয়েছে ভারতীয় প্রশাসন। তাই এই বঙ্গে হিন্দী আজ আর বিদেশী ভাষা নয়। অধিকাংশ বাঙালিরই মুখেরও ভাষা হয়ে উঠছে দ্রুত।

ফলত, রাজ্যের শহর ও গ্রাম সর্বত্রই হিন্দীবলয়ের মানুষের সাথে পাশাপাশি বসবাস করে একদিকে যেমন হিন্দীর প্রতি বাঙালি মাত্রেই একটি স্বাভাবিক আবেগ গড়ে উঠেছে, ঠিক তেমনই সিনেমা টিভির দৌলতে হিন্দী আজ এই রাজ্যের বাঙালির কাছে অন্যতম জনপ্রিয় ভাষা। আর কর্ম জগতে প্রবেশের জন্যে হিন্দীর প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধির সাথে সথেই একই সঙ্গে সর্বত্র বাংলাভাষার কদর কমে চলেছে অতি দ্রুত থেকে দ্রুততর গতিতে। স্বভাবতঃই এই যে সার্বিক পরিস্থিতি, এরই প্রক্ষিতে আজ আপামর বাঙালি তার মাতৃভাষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আদৌ আর ভাবিত নয়। সে জানে কর্মজীবনে জীবিকার ক্ষেত্রে বাংলাভাষা পুরোপুরি অপ্রসঙ্গিক ও অচল। বরং ইংরেজীতে সরগর হওয়ার সামাজিক সুবিধে অনেক। কিংবা বিকল্প হিসেবে হাতের কাছে অতি পরিচিত হিন্দী তো রয়েইছে! তাই এই রাজ্যের বাঙালির কাছে বাংলাভাষা ও একুশের চেতনা আজ শুধু অপ্রসঙ্গিকই নয়, সম্পূর্ণ অচল আবেগ মাত্র!
বুস্তুত দীর্ঘকাল ধরেই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের উদাসীনতা ও সমাজের প্রাগ্রসর শ্রেণীর এই ভাষাটি সম্বন্ধে  উন্নাসিকতা বাংলা ভাষার প্রসার ও প্রচলনে ধারাবাহিক ভাবেই বাধার সৃষ্টি করে এসেছে। এখন দেখা যাক বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে এই উদাসীনতা ও উন্নসিকতার সুদীর্ঘকালের প্রভাবটি কিভাবে ক্রিয়াশীল। সার্বিক ভাবে একদিকে ইংরেজী ভাষার প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও অন্যদিকে হিন্দীকে ভারতের প্রধান ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদান, আমাদের বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের বাংলা ভাষা সম্বন্ধে একটি হীনমন্যতা গড়ে তুলেছে। যার সরাসরি প্রভাবে আমরা যার যত বেশি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী, সেই নিক্তিতে নিজেদের শিক্ষিত প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ অপ্রয়জনীয় ভাবে হলেও নিজেদের স্বজাতির মধ্যেও পরস্পরে ইংরাজীতে বাক্যলাপে অধিকতর স্বচ্ছন্দ বোধ করে থাকি। সারা পৃথিবীতে এই মানসিকতার দৃষ্টান্তে আমরা বাঙালিরা সত্যিই অনন্য! অন্যদিকে এরাজ্য বসবাসকারী বিপুল পরিমাণ হিন্দীভাষী ও হিন্দী জানা অবাঙালিদের সাথে আমরা স্বতঃপ্রোণদিত হয়েই হিন্দীতেই যোগাযোগ রাখতে ভালোবাসি, কারণ ভারতীয় নাগরিক হিসাবে আমরা নিজেদেরকে আগে ভারতীয় তারপর দৈবাত বাঙালি বলে মনে করি বলে আমরা হিন্দীকেই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে দেখি। অনেকেই বলবেন তাতে কি হয়েছে। সারা ভারতের একটি সাধারণ ভাষা থাকলে তো ভালোই। ঠিক কথা। কিন্তু সেই জায়গায় হিন্দীকে তুলে ধরতে গিয়ে নিজের মাতৃভাষাকে কোণঠাসা করে বলি দেওয়ার কথা সারা ভারতে একমাত্র বাঙালি ছারা আর কেউই কিন্তু ভাবে না। ভাববেও না কোনদিন। অনন্য বাঙালি আর অনন্য তার মানসিকতা। ভূভারতে যার তুলনা নেই।

আমাদের এই মানসিকতার হাত ধরেই সারা রাজ্যে দিনে দিনে বাংলা ভাষায় পঠন পাঠনের রেওয়াজ কমে আসছে। খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, নতুন নতুন যত স্কুল চালু হচ্ছে, তার অধিকাংশই কিন্তু হয় ইংরাজী মাধ্যম নয় হিন্দী! বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির উৎকর্ষতাও ক্রমহ্রাসমান, ভালো মেধার ছাত্র ও উপযুক্ত শিক্ষক উভয়েরই প্রবণতা ইংরাজী মাধ্যম স্কুল গুলির সাথে যুক্ত হওয়া! আর এই প্রবণতার সুদূরপ্রসারী ফল কিন্তু মারাত্মক! রাজ্য রাজধানী কলিকাতা সহ শিলিগুরি দূর্গাপুর আসানসোল শিল্পাঞ্চলের শহর ও শহরতলিগুলিতে এমন বহু হিন্দী মাধ্যম স্কুল রয়েছে যেখানে পঠন পাঠনের বিষয়ের মধ্যে বাংলার কোনোই স্থান নেই। ফলত এই স্কুলগুলি থেকে শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা এই রাজ্যের বাসিন্দা হয়েও রাজ্যের ভাষাটির সাথে পরিচিত হচ্ছে না! আমাদের জানা নেই ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলিতেও এইরকম অস্বাভাবিক কাণ্ডকারখানা প্রচলিত আছে কিনা! থাকলেও সেখানে সেই বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে চালানো হয় কিনা!

আর ঠিক এইটিই এই বাংলায় নিরন্তর ঘটে চলেছে, যা কিছু অস্বাভাবিক, তাকেই স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া। বস্তুত পশ্চিমবঙ্গ আজকে ভারতেরই যেন একটি ক্ষুদ্র সংস্করন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু:খের বিষয়, অনেক বাঙালিই তাতে শ্লাঘা বোধ করেণ। তারা ভেবে দেখেন না,এই ভাবে একটি রাজ্যে তার ভাষা ও কৃষ্টি প্রতিনিয়ত সঙ্কুচিত হতে থাকলে, সেদিন আসতে আর বেশি দেরি নাই, যেদিন বাঙালি তার রাজ্যেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। সে বড়ো সুখের সময় হবে না বঙ্গবাসীর জীবনে। আর এই প্রবণতার লক্ষ্মণ ইতিমধ্যেই অল্পস্বল্প ধরা পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদে অবাঙালিদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধির পথে। এরই সুত্র ধরে রাজ্যরাজনীতিতে তারাই অদূর ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা গ্রহণ করলেও আশ্চর্য্যের কিছু নাই। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা ও উন্নাসিকতার হাত ধরে ইংরাজী ভাষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং হিন্দীভাষা হিন্দুস্তানী সংস্কৃতি আয়ত্ব করার প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার এই বিস্তৃত পরিসরে ২১শে ফেব্রুয়ারী কিংবা একুশের চেতনা নেহাৎই পড়শী রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক বিষয় মাত্র। যার সাথে এই বাংলার বাঙালির মন ও মননের কোনো আত্মীয়তা কোনোদিনই গড়ে ওঠেনি, আর ওঠার কথাও নয়। কারণ ভারতীয় বাঙালি আগে ভারতীয় ও নেহাৎই দৈবাৎ বাঙালি! কোনো ভাবেই প্রাদেশিকতা দোষে দুষ্ট

Saturday, February 21, 2015

গোপালপুর , উড়িষ্যা / ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী /



     

পথে প্রান্তরেঃ ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী

Posted in 


পথে প্রান্তরে


গোপালপুর, উড়িষ্যা 
ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী 



‘সমুদ্র’ বাঙ্গালীর এক প্রধান আকর্ষণ । শুধু বাঙ্গালী কেন, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক আমাদের দেশের সমুদ্রের টানে দেশ বিদেশ থেকে আসেন । ভারতবর্ষের পর্যটন মানচিত্রে গোপালপুর সমুদ্র সৈকতের ততটা প্রাধান্য নেই বললেই চলে । সমুদ্র বলতে প্রথমেই ছাপোষা সাধারণ বাঙ্গালীর মাথায় নাড়া চাড়া দেয় হয় ‘পুরী’ নয় ‘দীঘা’ । “গোপালপুরের” সমুদ্র সৈকতের চিত্রপট পুরী দীঘার চেয়ে অনেকটা আলাদা । খুব সুন্দর অথচ শান্ত এই গোপালপুরের সমুদ্র সৈকত । যে দেখেছে তাকে বার বার ঐ সমুদ্রের সৌন্দর্য টেনে আনে এবং আনবে। তাই বোধ হয় এবারে রাস পূর্ণিমার দিন (৬ নভেম্বর ২০১৪) গোপালপুরে প্রচুর বাঙ্গালী টুরিস্ট দেখলাম । 

এবারে গোপালপুর যাওয়ার প্রোগ্রামটা করি আমার এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর পরামর্শে । ৫ নভেম্বরে, ২০১৪, বুধবার আমরা সকলে মিলে রওনা 'দি গোপালপুর ভায়া চিলকা । আমার গাড়ী নিয়েই যাই । ড্রাইভার আমার বন্ধু স্বয়ং । আমাদের ৪-৫ দিনের প্রোগ্রাম তাই ড্রাইভার নিতে আমার বন্ধু বারণ করেন। 

ভুবনেশ্বর থেকে ৫ নম্বর জাতীয় রাজপথ ধরে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক ছোট্ট শহর ‘বালুগাঁ’ পৌঁছে গেলাম । এই বালুগাঁ চিলকার কাঁকড়া ও চিংড়ীর জন্য প্রসিদ্ধ । এখান থেকে দেশ বিদেশে চিংড়ী ও কাঁকড়া রপ্তানি হয়। বালুগাঁ থেকে বরকুল মাত্র ৩ কিলোমিটার । বরকুল , চিলকা হ্রদের সংলগ্ন একটি ছোট্ট যায়গা । ওখানে উড়িষ্যা সরকারের পর্যটন বিভাগের সুন্দর কটেজ , পান্থনিবাস আছে । বরকুল থেকে প্রায় পর্যটক মটর বোটে চিলকা হ্রদের ওপর বোটিং করে কালিজাই মন্দির, ‘নলবন’ বিদেশী পক্ষী আশ্রয়স্থল , তা ছাড়া চিলকা হ্রদের মধ্যে অবস্থিত অনেক ছোট বড় যায়গা যেমন পারিকুদ , নুয়াপড়া , কৃষ্ণ প্রসাদ , তিতিপ, মালুদ ইত্যাদি । আবার যারা সাতপড়া থেকে যান চিলকা তে,  তারা ডলফিন দেখতে যান  চিলকার মোহানা সমুদ্র সন্নিকটে । সরকারি মোটর বোট নেওয়াই ভালো, কারণ  ওতে রিস্ক কম থাকে । 

চিলকার কথা আগেই লিখেছি তাই আর না বাড়িয়ে সোজা গোপালপুরের কথায় যাই । বরকুল থেকে গোপালপুর ছক ৭০ কিলোমিটার। ওখান-থেকে SH 30 ধরে আরও ১০ কিলোমিটার ভঞ্জবিহার ইউনিভার্সিটি , (গঞ্জাম) বহরমপুরের রাস্তা ধরে যেতে হয় । আরেকটা রাস্তা আছে সেটা বহরমপুর(উড়িষ্যা) থেকে গোপালপুর । ওটা প্রায় ১৬ কিলোমিটার রাস্তা । গোপালপুর পৌঁছে গেলাম বিকেল ৪ টে নাগাদ । আগে থেকেই হোটেল বুক করা ছিল, তাই গোপালপুর পৌঁছেই হোটেলে চেক ইন করে যে যার রুমে ঢ়ুকে পড়ি। আমরা সব্বাই ফ্রেশ হয়ে চলে যাই সি বিচে । 

গোপালপুর একটা ছোট্ট শহর। বঙ্গোপসাগরের ধারে এই শহর উড়িষ্যার দক্ষিণে গঞ্জাম জেলার অতি পুরাতন কিছু স্মৃতি নিয়ে অবস্থিত। 

২০১১-র  জনগণনা অনুযাই এখানকার লোক সংখ্যা ৬৬৬৩ । এখানে প্রায় সকলে জেলে সম্প্রদায়ের। তেলুগু আর উড়িয়া এখানকার প্রধান অধিবাসী । আছেন কিছু সাহেব তাঁরা ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় থেকে আছেন । এনাদের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে । দু চারটে ঘর অবশিষ্ট আছে । প্রায় সকলে গোয়া নয়, কোলকাতাতে চলে গিয়েছেন। ব্রিটিশ আমল থেকে এখানে এখানে একটা ছোট বন্দর ছিল । কাছেই একটা লাইট হাউস আছে । বার্মা এবং রেঙ্গুন থেকে চাল আমদানি করা হত এই পথে । তখন এখানে অনেক বাঙ্গালী ব্যবসায়ীরা প্রধানত চালের ব্যবসা করতেন । এখন কিছু বাঙ্গালী গঞ্জাম, বহরমপুরে আছেন তবে তাঁদের সংখ্যা নগণ্য । এখান থেকে উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলার বহরমপুর শহর মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । অন্ধ্র রাজ্যের সীমান্তবর্তী  অঞ্চল, তাই মূলত তেলুগু এবং উড়িয়া প্রচলিত ভাষা । 

এখানকার সমুদ্র তট শান্ত এবং সুন্দর । ঝাউ বনের ধারে প্রশস্ত ৪ কিলোমিটার ঊর্ধ্ব সমুদ্র সৈকত প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি । মাঝে মাঝে স্তূপাকার বালুকা রাশি । গোপালপুরের সমুদ্র কিন্তু খুব গভীর এবং এখানকার আন্ডার কারেন্ট অনেক সময় মৃত্যুর কারণ  হতে পারে । তাই একে রিপ কারেন্ট বলা হয় । 

সমুদ্রের ধারে ধারে ছোট ছোট গ্রাম- বক্সিপালি , গোলাবন্ধ , কস্তুপেটা , হাতিপাদ , কির্তিপুর , মার্কন্ডি, ইত্যাদি প্রায় ১৫ কিলোমিটার লম্বায় । ঝাউ , কাজু বাদাম এবং নারকোল গাছে ভর্তি এলাকা । কাছেই ধবলেশ্বরের মন্দির । খুব জাগ্রত শিবের মন্দির । শিব রাত্রিতে খুব ভীড় হয় ভক্তদের ।

গোপালপুরের সবচেয়ে বড় ৫ তারকা হোটেল “মে ফেয়ার” । এই হোটেল আগে “পাম বিচ রিসোর্ট” নামে পরিচিত ছিল । এখন তার মালিকানা পরিবর্তন হওয়াতে শিল্প পতি এবং পূর্বতন কেন্দ্র মন্ত্রী শ্রী দিলিপ রায়ের “মে ফেয়ার” ব্যানারে পরিচালিত । ১৫০০০ টাকা এক দিনে শুধু থাকা আর কমপ্লিমেন্টারি ব্রেক ফাস্ট । ব্যাস !

গোপালপুরে দু রাত তিন দিন কাটিয়ে ফিরে আসি । ফেরার সময় গঞ্জামের বিখ্যাত শক্তি পীঠস্থান তারা তারিণী দর্শন করে ফিরি।



** পরের কোনো আলোচনায় তারা তারিণী র বিষয়ে  লিখবো ।







Friday, February 6, 2015

পাকাদেখা ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী ০৭.০২.২০১৫



    
পাকাদেখা

আমাদের এপার্টমেন্টের থার্ড ফ্লোরে থাকেন এক ভদ্রলোক । নাম প্রতাপ সিংহ রায় । বেশ কিছুদিন আমাদের এপার্টমেন্টে এসেছেন । চেনা সোনা বলতে সোসাইটি মিটিং আর ক্লাবে তাস খেলা । আমার সঙ্গে বাজারে দেখা । দেখেই বলেন ,“অনেকদিন হল একটা কথা মাথায় চাড়া দিচ্ছে। কি করি ভেবে পাচ্ছিনা ! আমার একটাই ছেলে । ইনফোসিস বেঙ্গালুরুতে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার । বিয়ের বয়েস হয়নি তাও চিন্তা ! বিয়ে দেব কি, যা বিয়ের বাজার !! কি করি বলুন তো ! ”
কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে-গেলেন ভদ্রলোক।
অপ্রত্যাশিত কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম । আমার সঙ্গে ভদ্রলোকের সেরকম হৃদ্যতা নেই । হঠাৎ ছেলের বিয়ের ব্যাপারে আমাকে কেন এ সব বলা বুঝলাম না । তবুও ভদ্রতার খাতিরে বললাম, হ্যাঁ ছেলে মেয়েদের মানুষ করা তারপর যোগ্য পাত্র পাত্রী র সঙ্গে বিয়ে দেওয়া...। 

আমার কথা শেষ না হতেই ঝাঁজিয়ে উঠলেন, “রাখুন ত যোগ্য পাত্রী ! যা দুনিয়ার অবস্থা,
 পাত্রী ই পাওয়া যায়না তা যোগ্য পাত্রী !!
ভাল মেয়ে, ভদ্র ঘরের মেয়ে , দেখতে শুনতে ভালো, ভাল চাকরী করে সেরকম মেয়ে পাচ্ছি কই? যোগ্য পাত্রী বলতে আর কি বোঝায় বুঝলাম না ! তবুও বলি, দেখুন এ ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা একটু কম । আপনি বরং “বেঙ্গলী মেট্রিমনিতে”আপনার ছেলের একটা বায়োডেটা দিয়ে প্রোফাইল খুলুন , ওরাই যোগাড় করে-দেবে পাত্রী । এই বলে পাশ কাটিয়ে যাই । 
পরের সপ্তাহে আবার দেখা । আমি দূর থেকে ভদ্রলোককে দেখে মাছ কেনার ভান করি । ওমা ! ঠিক আমার কাছে এসে হাজির !! 
মাছ ওয়ালাকে জিগ্যেস করছি ইলিশ কত করে ? 
মাছওয়ালা বালা বলে বারোশ টাকা কিলো । সে কি,এত দাম ? পদ্মার ইলিশ বাবু । খেলে আবার আসবেন । বাজি রাখছি । সত্যি পদ্মার কিনা জানিনা তবে কানকোর কাছটা লাল আছে । হয়তো তাই !
পাশে দেখি প্রতাপ বাবু হাজির। আমায় দেখে বলেন, “দিয়ে দিয়েছি’ !
 কি ?কি দিয়ে দিয়েছেন ? 
ঐযে আপনি বলেছিলেন, “বেঙ্গলী মেট্রিমনি” ! ওটার সঙ্গে আনন্দবাজারে "পাত্র পাত্রী" কলমের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছি । মনেহয় এবারে আমার চিন্তা গেল। 
ও তাই ! তা ভাল । 

রবিবার অফিস নেই খোশ মেজাজে কাগজ পড়তে পড়তে চা খাচ্ছি, হটাত কলিং বেল বেজে ওঠে । দরজা খুলে দেখি স্বয়ং প্রতাপ বাবু ।
 গুড মর্নিং । কেমন আছেন দেখতে এলাম । বিরক্ত করছি না তো ? 
সুপ্রভাত । ওমা সেকি ?আসুন আসুন । আপনার পদ ধূলি আমার দ্বারে পড়লো আমার পরম সৌভাগ্য । আসুন আপনার দৌলতে আরেক কাপ চা খাওয়া যাবে । গিন্নীকে বলি চা বানাতে । চা আসে ।
 দুজনে চা খেতে খেতে প্রতাপ বাবু বলেন, আজকে প্রায় ১০০ টা ফোন কল পেয়েছি । আমার এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলে ভাল মনে হল । তাঁর মেয়ে দিল্লীতে পোষ্টেড । ভালো এক কোম্পানিতে ।
আপনার মতা মত নিতে এলাম । 
আমি ! আমি কি মতামত দেব বলুন ? আমি ওসব কিছুই বুঝিনা !! 
উহু তা বললে চলবে না । আপনার কথার দাম আছে মশাই । শুনুন ,মেয়েটি ভাল চাকরী করে , আমার ছেলের চেয়ে তিন বছরের ছোট । বাবা ভাল কোম্পানির ডাইরেক্টর, মা শিক্ষয়িত্রী । পাত্রী দেখতে যাব আগামী রবিবার আপনাকে যেতেই হবে আমার সঙ্গে । কথাগুলো গড় গড় করে বলে এক গ্লাস জল খেলেন ।
আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়লাম ! আপনি কেন বুঝছেন না আমি ওসব কিছুই বুঝি না। বিয়ের ব্যাপারে আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে যান আমি যেতে পারবোনা । মাফ করবেন এই জোড়হস্তে বলছি আপনাকে । আমিও আপনাকে জোড় হস্তে অনুরোধ করি আপনি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী আপনাকে আমি কিছুতেই না নিয়ে ছাড়বনা । আমি আপনার দাদার মতন । আমার কেউ নেই বলেই আপনাকে অনুরোধ করছি । না বলবেন না প্লিজ । এটা আমার বিনীত অনুরোধ । 
আমি বলি, পরে ভেবে বলব । আজ কথা দিতে পারছিনা । ক্ষমা করবেন হাত জোড় করে বলি । ভদ্রলোক বলেন , ঠিক আছে যা ভাল বোঝেন । আজ তবে উঠি । বলে দরজার দিকে পা বাড়ান । আমি বুঝি ভদ্রলোক মনক্ষুন্ন হলেন তবে আমার করার কিছুই নেই। 


মাস খানেক পর প্রতাপ বাবু সপত্নীক আমাদের ফ্ল্যাটে আসেন । হাতে একটা সুন্দর বিয়ের কার্ড । হাত জোড় করে বলেন : আপনি আমাদের সঙ্গে গেলে ভালো হত । মনে-হল ওইখানেই আমার ছেলের বিয়ে দিলে ভাল হবে । কোন দাবি দাওয়া রাখিনি । রাখবোই বা কেন ! বৌমা ত আমার সাক্ষাৎ লক্ষ্মী । পণ চেয়ে ছোট হব কেন বলুন ? "আমার বৌমা তো নিজেই এটিএম মেশিন, পণের কি হবে ?" বলে হ্যা হ্যা করে হাঁসেন । 
আমি ভদ্রলোকের মুখের পানে হাঁ করে তাকাই আর ভাবি ,"ভাগ্যিস ভদ্রলোকের সঙ্গে যাইনি" ।