Thursday, December 4, 2014

বর্ধমান রাজঅন্তঃপুর (৩য় পর্ব) ঝর্না চ্যাট্টার্জী


বর্ধমান রাজঅন্তঃপুর (৩য় পর্ব)
ঝর্না চ্যাট্টার্জী 
নানকী দেবী ও পুত্র প্রতাপের মৃত্যুর পর(যদিও সেই মৃত্যু ঘিরে অনেক সন্দেহ, অনেক প্রচার ও অপপ্রচার) পরিণত বয়সে মহারাজা আবার সন্তানের আশায় বিবাহ করেন উজ্জ্বলকুমারীকে। তাঁর একটি সন্তানও হয় কিন্তু সেই সন্তানের মৃত্যু হয় এবং পরে মহারাজার মহিষী উজ্জ্বলকুমারীরও মৃত্যু হয়। ইনি ছিলেন মহারাজ তেজচাঁদের সপ্তম মহিষী। মহারাজ তেজচাঁদের পঞ্চম মহিষী কমলকুমারী ব্যতীত অন্যান্য মহিষীদের নাম বা পরিচয় রাজপরিবারের ইতিহাসে তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। উজ্জ্বলকুমারীর মৃত্যুর পর মহারাজা তেজচাঁদ দত্তক নেন কমলকুমারীর ভ্রাতা পরানচাঁদ কাপুরের পুত্র চুনিলালকে। দত্তক নেবার পরে যাঁর নাম হয় মহতাব চাঁদ। এরপরেও মহারাজ বৃদ্ধ বয়সে আবার বিবাহ করেন রাণী বসন্তকুমারীকে। বালিকা বসন্তকুমারীকে বৃদ্ধ বয়সে বিবাহ মনে প্রশ্ন জাগায়। কিন্তু তেজচাঁদের অষ্টম মহিষীর পরিচয় জানার আগে জানা প্রয়োজন রাণী কমলকুমারীকে।
বিষেণকুমারীর পর বর্ধমান রাজপরিবারে যে নারীর নাম উল্লেখযোগ্য তিনি হলেন মহারাজা তেজচাঁদের পঞ্চম পত্নী মহারাণী কমলকুমারী। রাণী কমলকুমারীর মহারাণী বিষেণকুমারীর মত রাজকার্য্য, রাজ্য পরিচালনার দক্ষতা তাঁর ছিল না, কিন্তু রাজপুরনারীদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী, প্রখর বুদ্ধিশালিনী এবং সুচতুরা মহিলা ছিলেন এই নারী। ছল, কপটও তাঁর কম ছিল না। পূর্বেই বলা হয়েছে, প্রতাপচাঁদের গৃহত্যাগের পিছনে এই নারীর হাত আছে বলে অনেকের অনুমান। সুরায় আসক্ত প্রতাপের সঙ্গে প্রতাপের স্ত্রীর ছদ্মবেশে মিলিত হ’লে মাতৃগমনের পাপবোধে প্রতাপ গৃহত্যাগ করেন এইরকম একটি জনশ্রুতি আছে। কমলকুমারীর ছলনায় প্রতাপ পরাজিত হন। মহারাজার প্রিয় পত্নী হবার সুবাদে কমলকুমারী যে কিছু সুযোগ কাজে লাগাতেন, সেকথা বলাই বাহুল্য। একরকম তাঁর চতুরতার জন্যই পরাণচাঁদ কাপুরের ভগিনী কমলকুমারী নিজ ভ্রাতার পুত্র (পরানচাঁদের পুত্র) চুনিলালকে রাজার দত্তক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য করেন। কিন্তু প্রতাপচাঁদের মৃত্যুর পর( এখানে বলা ভালো যে মহারাজকুমার প্রণয়চাঁদও প্রতাপচাঁদের মৃত্যুকেই সমর্থন করেন এবং জাল প্রতাপচাঁদকে স্বীকার করেন না, সম্ভবতঃ বর্ধমান রাজপরিবারের কেউই তা স্বীকার করেন না) পরাণচাঁদ কাপুরের পুত্র চুনিলাল ওরফে মহতাব চাঁদকে দত্তক নেবার পরেও পরিণত বয়সে পরানচাঁদ কাপুরের কনিষ্ঠা কন্যা বসন্তকুমারীকে মহারাজ তেজচাঁদ আবার বিবাহ মনে ঔৎসুক্য জাগায়।
বসন্তকুমারীর বয়স তখন ছিল মাত্র এগারো বৎসর। শ্রী প্রণয়চাঁদের মতে এই বিবাহ ছিল কেবলমাত্র মহারাজা জনিত খেয়াল। আবার এই বিবাহ রাণী কমলকুমারীর অতিশয় চতুরতার ফল হতে পারে। পরানচাঁদ ছিলেন বর্ধমান রাজকার্যে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত। কমলকুমারী ছিলেন তাঁর ভগিনী। দুজনেই ছিলেন অর্থলোলুপ, অতিশয় চতুর। একই পরিবারের দুই কন্যা(পিসি কমলকুমারী এবং ভাইঝি বসন্তকুমারী)এবং এক পুত্র(মহতাব চাঁদ) রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত হলে রাজ-ঐশ্বর্য্যের যে অনেকখানি কাপুর পরিবারের করায়ত্ত হবে, তা পরানচাঁদ কাপুরের অজানা ছিল না। সুচতুরা কমলকুমারী ভ্রাতার সঙ্গে সহমত ছিলেন। পরানচাঁদের কনিষ্ঠা কন্যা বসন্তকুমারীর সঙ্গে মহারাজার বিবাহ হ’লে রাজ্য-রাজত্বের প্রায় সমস্ত কিছুর উপরেই কায়েম হবে দেওয়ান পরানচাঁদের একরকম একছত্র অধিকার। ভগিনী, কন্যা আবার পুত্রের পরবর্তীকালে মহারাজা হ’বার আকাঙ্খায় (কারণ পরবর্তী সময়ে মহারাজ তেজচাঁদ যাঁকে দত্তক নিয়েছিলেন তিনিই হন মহারাজাধিরাজ মহতাবচাঁদ) এই ধরণের একটি কাজ করা তাঁদের উভয়ের পক্ষেই সম্ভব ছিল। মহারাজা তেজচাঁদ এই বিবাহ করেন দত্তক পুত্র গ্রহণ করার পর, সুতরাং পুনরায় পুত্র আশায় যে তিনি এই বিবাহ করেননি তা বোঝাই যায়। তাছাড়া মহারাজ তেজচাঁদ তখন বৃদ্ধ, তাঁর বয়স তখন ছিল ৬৭ বৎসর। সুতরাং এই বিবাহ পরানচাঁদ কাপুর ও কমলকুমারীর ষড়যন্ত্র, মহারাজার উপর চাপসৃষ্টি এবং রাজপরিবারে প্রাধান্য স্থাপন এমন একটি সম্ভাবনার কথা ভাবা যেতেই পারে। এছাড়া এই বিবাহের অন্য কোন অর্থ হতে পারে না কারণ বসন্তকুমারী রাণী কমলকুমারীর মত পূর্ণযোবনা এবং সুন্দরী ছিলেন না যে, মহারাজ তার রূপে-গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিবাহ করতে পারেন। তাছাড়া বিবাহের সময় বসন্তকুমারী ছিলেন এগারো বৎসরের প্রায় বালিকা মাত্র। পাঁচ বৎসর পরেই মহারাজার জীবনাবসান হয়। রাণী বসন্তকুমারীর বয়স তখন মাত্র ষোল।

মহারাজ তেজচাঁদের জীবনাবসানের সময় তাঁর অষ্টম মহিষী রাণী বসন্তকুমারীর বয়স ছিল মাত্র ষোল বৎসর। কিন্তু মহারাজ তেজচাঁদের মৃত্যুর পর এই অল্পবয়স্কা রাণীর জীবন কাটে অত্যন্ত কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে। তাঁকে প্রায় একবৎসর ঘরবন্দী করে রাখা হয়। যুক্তি ছিল, অল্পবয়স্কা নারীর নানান প্রলোভনে চরিত্র নষ্ট হতে পারে এবং কুসংসর্গে পড়তে পারেন। রাণীর রাজপরিবারের অপর পুরুষমানুষের প্রতি প্রণয়াসক্তিও জন্মাতে পারে। তাই ঘরবন্দী করে রাখাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, প্রধানতঃ এই যুক্তি ছিল রাণী কমলকুমারী এবং পরানচাঁদ কাপুরের। কারণ রানী বসন্তকুমারীকে বিষয় আশয় থেকে বাইরে রাখলে তাঁদের লাভই ছিল সকলের চেয়ে বেশি। রাণী বসন্তকুমারী নিজ অধিকারের জন্য মামলা করেন এবং এই মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য নিতে হত কার এন্ড ট্যাগোর কোম্পানীর ব্যারিষ্টার তখনকার বিখ্যাত ডিরোজিও সাহেবের শিষ্য ইয়ং বেঙ্গলের দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের। একটা কথা হয়ত বলা যেতে পারে কার এন্ড ট্যাগোর কোম্পানী ছিল বর্ধমান মহারাজাদের আইনী পরামর্শদাতা। এই কার এন্ড ট্যাগোর কোম্পানীর একজন ছিলেন আমাদের অতি পরিচিত প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরমহাশয়ও। জাল প্রতাপচাঁদের মামলার সময় বর্ধমান রাজপরিবারের পক্ষে ইনি ছিলেন একজন প্রধান সাক্ষী ও সহায়। সে প্রসঙ্গ আগেই আলোচিত হয়েছে।
দক্ষিনারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ছিলেন রাণী বসন্তকুমারীর পক্ষের উকিল। এই সময়েই দুজনের মধ্যে প্রণয় জন্মায় এবং রাণী বসন্তকুমারী এক দুঃসাহসিক যাত্রা করেন দক্ষিণারঞ্জনের সঙ্গে যা বর্ধমান রাজপরিবার তো বটেই, সে যুগের পক্ষেও এক অতি দুঃসাহসের পরিচয়। দুজনে পলায়নের পর রাজার লোকলস্কর দিয়ে তাঁদের ধরে আনলেও আবার দুজনে পলায়নে সক্ষম হন এবং তাঁরা কোর্টে সিভিল আইন অনুযায়ী বিবাহ করেন। বিবাহের পর তাঁরা অযোধ্যার নবাবের অন্তর্গত লক্ষ্মনৌ শহরে বাকি জীবন কাটান এবং তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যা জন্মে। রাণী বসন্তকুমারীকে নিয়েও অনেক গবেষক, লেখক নানা আলোচনা ও চিন্তাভাবনা তাঁদের লেখনীতে প্রকাশ করেছেন। এখানে তার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেকালের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করলে বলা যেতে পারে তিনি একজন অসমসাহসী মহিলা। রাণী বসন্তকুমারী যে তাঁর নিজের ইচ্ছামত জীবনকে বেছে নিতে পেরেছিলেন, একজন রাজ অন্তঃপুরবাসিনী হয়েও এতে তাঁর অসম সাহসিকতার পরিচয় মেলে, যদিও সেই জীবনকে বেছে নেবার পথ ছিল অত্যন্ত দুরূহ এবং কঠিন। তবু, একথা বলা যেতে পারে যে বর্ধমান রাজপরিবারে বসন্তকুমারী অবশ্যই এক অন্যরকম চরিত্র।
শ্রী প্রণয়চাঁদ মহতাবের মতেও রাণী বসন্তকুমারী যা করেছিলেন তা সঠিক কাজ। অল্পবয়স্কা এক মহিলা যিনি রাণীর জীবন কাটাতে অভ্যস্ত, তাঁর বন্দী জীবন কাটানোর চেয়ে নিজের খুশিমত জীবন কাটানো অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়েছে তাঁর। সকল মানুষেরই অধিকার আছে তার নিজের জীবনকে বেছে নেবার। মাত্র এগারো বৎসরের বালিকার পক্ষে বৃদ্ধ রাজাকে স্বামী হিসাবে মেনে নেওয়া এবং সেই স্বামীর অবর্তমানে বন্দী জীবন কাটানো এক নারীর পক্ষে যে কি ভয়ানক সেটা যে কোন মানুষই চিন্তা করলে বুঝতে সক্ষম হবেন। কিন্তু তৎকালীন রাজপরিবারের মান-মর্যাদা এবং সামাজিক বাধা কাটিয়ে সে যুগে এই নারী যে একজন প্রেমিকের হাত ধরে গৃহত্যাগের মত(তাও আবার রাজপরিবারের বধূ এবং বিধবা মহারাণী) সাহস দেখাতে পেরেছিলেন, এজন্য তাকে বাহবা দেওয়া উচিত। সেদিক থেকে দেখতে গেলে রাণী বসন্তকুমারী বর্ধমান রাজ অন্তঃপুরবাসিনী রমণীগণের মধ্যে অবশ্যই এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র। যদিও রাণী বসন্তকুমারী বর্ধমান রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে বর্ধমান রাজপরিবারও তাঁদের পারিবারিক ক্রিয়াকরণ ইত্যাদি থেকে রাণী বসন্তকুমারী এবং তাঁর পরবর্তী পরিবার-পরিজনদের নাম রাজবাড়ির বংশলতিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন এবং এককথায় বলতে গেলে বর্ধমান রাজপরিবারে তাঁদের আর কোন স্থান নেই।
তেজচাঁদের পর বর্ধমান রাজপরিবারের রাজা হন দেওয়ান পরানচাঁদ কাপুরের পুত্র চুনিলাল, যাঁকে মহারাজ তেজচাঁদ দত্তক পুত্ররূপে গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী কালে যাঁর নাম হয় মহতাবচাঁদ। ইনি ব্রিটিশবিরোধী ছিলেন না, সেকথা আগেই বলা হয়েছে। বলতে গেলে একরকম তাঁর আমল থেকেই ব্রিটিশ ভক্তি শুরু হয় এবং পরিবারেও ব্রিটিশ নিয়ম-কানুন লাগু হয়। মহতাবচাঁদের দুই বিবাহ। প্রথমা পত্নী নয়নকুমারী। তাঁর মৃতুর পর তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন নারায়ণকুমারীকে। রাজপরিবারে নারায়ণকুমারীর বেশি কিছু অবদানের কথা শোনা যায় না। কিন্তু মহারাজকুমার প্রণয়চাঁদের মতে নারায়ণকুমারী ছিলেন একজন জবরদস্ত মহিলা। রাজকার্য বা অন্যান্য ব্যাপারে নারায়ণকুমারীর বিশেষ কোন অবদান না থাকলেও তিনি মহারাজের সবরকম কাজের সহায়ক ছিলেন এবং অনুমোদন করতেন, বাধা দিতেন না। নারায়ণকুমারী এবং মহতাব চাঁদেরও কোন সন্তানাদি না থাকায় মহারাণীর ভ্রাতা বংশেগোপাল নন্দের পুত্রকে দত্তক নেওয়া হয়। তাঁর নাম হয় আফতাব চাঁদ। পরে আফতাব চাঁদেরও সন্তান না থাকায় দত্তক পুত্র গ্রহণের সময় আফতাব চাঁদের মহিষী বেনোদেবীর সঙ্গে নারায়ণ কুমারীর মকদ্দমা বাধে, কিন্তু নারায়ণকুমারী মিতাক্ষরা আইন অনুসারে পরাজিত হন। সেই সময় দত্তক পুত্র নেবারও একটা নিয়ম ছিল। যাকে বিবাহ করা যায় না সেই রকম কোন সম্পর্কের কারো সন্তানকে দত্তক নেওয়া যেত না। তাই শেষ পর্য্যন্ত বেনোদেবীর মতানুসারেই বনবিহারী কাপুরের পুত্র বিজনবিহারী কাপুরকে দত্তক পুত্র গ্রহণ করা হয়, যাঁর পরবর্তী নাম হয় বিজয়চাঁদ মহতাব।
বিজয়চাঁদই প্রথম ‘মহতাব’ উপাধি কে পদবী হিসাবে গ্রহণ করেন। নারায়ণ কুমারী মামলায় হেরে গেলেও বেশ কিছু বিষয় সম্পত্তির অধিকারিণী হন। শ্রী প্রণয়চাঁদের মতে, নারায়ণকুমারী ছিলেন তন্ন্ত্রসাধিকা। রাজবাড়ির ভিতরে এইরকম মড়ার মাথা, খুলি এইসব নিয়ে তন্ত্রসাধনা রাজ পরিবারের অন্যান্য লোকজন সুনজরে না দেখার জন্য আফতাব চাঁদ রাজমাতা মহারাণী নারায়ণ কুমারীর জন্য একটি মন্দির নির্মাণ করেন। সেই মন্দিরটি রাজবাড়ির কাছাকাছি অবস্থিত ভুবনেশ্বরী কালিমন্দির, বর্ধমানের বুকে যা আজও ‘সোনার কালিবাড়ী’ নামে খ্যাত এবং নারায়ণ কুমারী সেইখানেই তাঁর জপতপ, সাধনা নিয়েই বাকী জীবন কাটান। নারায়ণ কুমারীর কথা চিন্তা করলে একটা কথা অতি বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবা যেতে পারে যে সেই কালেও একজন মহিলা (যদিও তিনি রাণী) স্বাধীনভাবে একা তন্ত্রসাধনার মত কঠিন পথকে বেছে নিতে পেরেছিলেন, রাজপরিবারের লোকেরা তা অনুমোদন করেছিলেন এবং তাঁর থাকা ও সাধনার জন্য অন্যত্র মন্দির ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেদিক থেকে এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা অবশ্যই। তবে তেজচাঁদের আমল থেকেই সাধক কমলাকান্তের তন্ত্রসাধনার সঙ্গে রাজপরিবার পরিচিত ছিলেন। যার কিছু আধ্যাত্মিক প্রভাব পড়েছিল প্রতাপচাঁদ এবং পরবর্তী কালে মহারাজ বিজয়চাঁদের উপরেও, যদিও তা তন্ত্রসাধনা ছিল না।
বর্ধমান রাজঅন্তঃপুরের মহিলাদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সেইযুগের একজন মহিলা, যিনি রাজরাণী, রাজমাতা আবার তিনিই যে তন্ত্রসাধিকা---একথা ভেবে অবাক না হয়ে পারা যায় না। কতরকমের যে বিস্ময় লুকিয়েছিল এই অন্তঃপুরে, ভাবলেও অবাক হতে হয়! সাধারণভাবে যে সকল অন্তঃপুরবাসিনীরা ছিলেন ঘেরাটোপের মধ্যে, বাইরে বেরোতে পারতেন না, ছিলেন পর্দানশীন তাঁরাও কিন্তু সকলের অলক্ষ্যে রচনা করে গেছেন নিজ নিজ ইতিবৃত্ত। তাই কখনও পাই রাণী ব্রজকিশোরীর মত দান-ধ্যান রতা রাণী, কখনও পাই রাণী বিষ্ণুকুমারীর মত জমিদারি রক্ষাকর্ত্রী, আবার কখনো পাই নারায়ণকুমারীর মত তন্ত্রসাধিকা, ছিলেন বসন্তকুমারীর মত দুঃসাহসিকা। কিন্তু বর্ধমান রাজঅন্তঃপুরে ছিলেন আরো অনেকে। তাঁদের কথাও জানা যাক......
( সাদা-কালো ছবিটি ইয়ং বেঙ্গলের সভ্য, ডিরোজিও শিষ্য দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের, যিনি পরে মহারাজা তেজচাঁদের অষ্টম মহিষী বিধবা বসন্তকুমারীকে বিবাহ করেন।
অন্য ছবিটি মহারাজিধিরাজ মহতাব চাঁদের যিনি প্রথম His Highness Maharajadhiraj উপাধি পান। )

Jharna Chatterjee's photo.

বর্ধমান রাজঅন্তঃপুর (৪র্থ পর্ব) ঝর্না চ্যট্টার্জী


বর্ধমান রাজঅন্তঃপুর (৪র্থ পর্ব)
ঝর্না চ্যট্টার্জী 
মহতাবচাঁদ ছিলেন ব্রিটিশভক্ত। ব্রিটিশভক্তি থেকেই তাঁর মহারাজাধিরাজ উপাধি লাভ। তাঁর সময় থেকেই বর্ধমান রাজপরিবারের অন্দরমহলেও চালু হয় ব্রিটিশ নিয়মশৃঙ্খল্লা, শিক্ষাদীক্ষা, নানান আদব-কায়দা ইত্যাদি। সেই সময় থেকেই রাজপরিবারের অন্দরমহলে সন্তানদের শিক্ষা দেবার জন্য একজন করে Nanny রাখার রেওয়াজ হয়। রাজপরিবারের নিয়মানুযায়ী রাজপরিবারে রাজকুমার বা রাজকুমারী জন্মগ্রহণ করলে এক একজন শিশুর প্রতি ছয় জন করে সাহায্যিকা বা সাহায্যকারিণী রাখার রেওয়াজ ছিল । এই সময় থেকেই এই ছয়জন সাহায্যকারিণীর উপরে আরো একজন করে ইংরেজ nanny রাখা শুরু হয়। এরা সাহায্যকারিণীদের শিক্ষা দিতেন কিভাবে বাচ্চাদের মানুষ করতে হবে, রাজপরিবারের নানান আদব-কায়দা শেখাতে সাহায্য করতেন। রাজপরিবারের নিয়মকানুন ছিল খুব কড়া। খাবার সময় ছিল এক নিয়ম, সারাদিনের জন্য ছিল আর এক নিয়ম, কে কিভাবে হাঁটাচলা করবে তাও শিখতে হত রাজকুমার-রাজকুমারীদের।
দুপুরের খাওয়া হত ভারতীয় তথা বাঙ্গালীদের মত মাটিতে আসন পেতে। রাত্রে হত ইংরাজি কায়দায় ডিনার, তখন খাওয়া হত চেয়ার-টেবিলে। একসঙ্গে খেতে বসতেন রাজা, রাণী, রাজকুমার, রাজকুমারীরা এবং অন্যান্য বয়োজ্যোষ্ঠরা। রাজা এবং রাণীর খাওয়া হয়ে গেলে উঠে দাঁড়াতে হত সকলকেই। একটা কথা বলে রাখা ভাল, এসব আচরণই শিখতে হত সেই বিদেশিনী nanny র কাছে এবং তা যে ইংরাজি আদব-কায়দা, সে কথা বলাই বাহুল্য। খাওয়া হয়ে গেলে অন্যত্র এসে সকলে মিলে বসতে হত মিনিট পনেরো। সামান্য কিছু কথাবার্তা, তারপর রাজা-রাণী ছেলেমেয়েদের অর্থাৎ রাজকুমার-রাজকুমারীদের একটি করে ‘চুমো’ দিতেন, তাঁরা শুতে চলে যেতেন nanny র সঙ্গে নিজের নিজের জায়গায়। সারাদিনে পিতা-মাতার কাছ থেকে এই একটিমাত্র চুমো খাওয়া ছাড়া আর কোনরকম সম্পর্ক শিশুদের ছিল না। কঠিন জীবন যাপন করতে হত। কোনোরকম emotion প্রকাশ করার উপায় ছিল না, করলে কঠিন শাস্তি পেতে হত। ভবিষ্যতের রাজা ও রাণীদের মনে পাছে কোনরকম দুর্বলতা মনের মধ্যে জন্মায়, তাই আচার, আচরণ, ব্যবহারে কোনরকম দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হত না। শিশুবয়স থেকেই তাঁদের এই শিক্ষা দেওয়া হত।
রাণীদেরও তাঁর নিজের সন্তানকে কাছে ডাকা, খেলা করা, কাছে থাকা এসবের নিয়ম ছিল না। এমন কি সন্তানদের অসুখ করলেও আগে রাজার অনুমতি, তারপর ডাক্তারের জন্য ফরমান বা আদেশপত্রে সাক্ষর এবং শেষে ডাক্তার ডাকার অনুমতি মিললে তবেই সন্তানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হত। রাজকুমার-রাজকুমারীদের সারাজীবন কেটে যেত রাজবাড়ির চার-দেওয়ালের ভিতরেই। সেখানেও ছিল পদে পদে নিয়মের প্রহরা। যাতায়াতের পথে বড় এবং ছোট রাজকুমারদের নিয়ম মেনে চলতে হত, সেখানে কোনমতেই ছোট রাজকুমার বড় রাজকুমারের আগে পথ চলতে পারতেন না। এই নিয়মের জন্য এখনও ছোটো মহারাজকুমার বড় মহারাজকুমারদের আগে যেতে পারেন না, রাজপরিবারের নিয়ম তাঁকে মেনে চলতে হয় কিংবা বলা ভাল, সেই শিশু বয়স থেকে শেখা নিয়ম এখনও মেনে চলেন তাঁরা। আরো একটি বিষয় এখানে লক্ষ্য করার, তা হল ইংরাজি শিক্ষার প্রভাবে মহতাবচাঁদের সময় থেকেই বহুবিবাহ প্রথা রাজপরিবারে বন্ধ হয়ে যায়। মহারাজা মহতাব চাঁদ নিজেও দ্বিতীয় বিবাহ করেন প্রথমা পত্নী মারা যাবার পর। তার পর থেকে সকলেই একপত্নী গ্রহণ করেছেন। রাজপরিবারের মহিলা বিশেষতঃ রাজবধূদের আরো একটি শিক্ষণীয় ব্যাপার ছিল। তখন বর্ধমান রাজপরিবারে বধূ হয়ে যাঁরা আসতেন এত অল্প বয়সে তাঁরা এখানে আসতেন যে তাঁদের একরকম এখানেই মানুষ হতে হত। কিন্তু রাজপরিবারে তাঁরা একবার এলে আর নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারতেন না। কিন্তু অত বালিকা বয়সে তাঁরা আসতেন বলে তাঁদের বাবা, মা এবং পরিবারের অন্যান্য লোকদেরও সেখান থেকে বর্ধমানে নিয়ে আসা হত। কোন উপলক্ষ্যে নিজের মা, বাবার সঙ্গে দেখা হলেও রাণীরা পিত্রালয়ে ফিরে যেতে পারতেন না।
একটি কথা অনিবার্য ভাবেই মনে হয়, যাঁরা এখানে আসতেন অতি অল্প বয়সে রাণীর মর্যাদা নিয়ে, তাঁরা হয়ত আর তেমন ভাবে পিত্রালয়ে যাবার প্রয়োজনও বোধ করতেন না। কারণ, অতি অল্প বয়স থেকে এই রাজপরিবাবের ঐশ্বর্য্যের মধ্যে থেকে সেখানে ফিরে যাবার প্রয়োজন হত না, গেলেও মানিয়ে নিতে পারতেন না। কিন্তু পিতা-মাতারাও কি তাঁদের কন্যাদের অভাব বোধ করতেন না? কন্যারাও কি বিবাহকেই শৃঙ্খলিত জীবন এর মুক্তি বলে মনে করতেন? কারণ বেশির ভাগ নারীই তো আসতেন রাজা-রাজড়ার পরিবার থেকে, হয়তো এই শৃঙ্খলিত জীবন তাঁদেরও কাটাতে হত শিশু বয়সে। তাই তাঁরা বিবাহকেই মুক্তি বলে মনে করতেন। এসব কথা সবই অনুমান, নিশ্চয় করে কিছু বলা যায় না। আরো একটি কথা জানানো দরকার, তা হল এই যে, বর্ধমান রাজপরিবার দীর্ঘদিন এদেশে বসবাস করার জন্য একরকম বাঙ্গালীই হয়ে গিয়েছিলেন বলা যায়। কাজেই সুদূর পঞ্জাব বা অন্যত্র থেকে আগত এই সব রমণীরা যারা রাজপরিবারে বধু হয়ে আসতেন, একেবারে প্রথম থেকেই চলত তাঁর বাংলা শেখা ও বাঙ্গালীর আচরণ, আদব-কায়দা কে জানা। বর্ধমান রাজপরিবারের একেবারে নিজস্ব কিছু নিয়মকানুন, যেমন বিবাহ, চূড়াকরণ, নামকরণ বা কোন পূজা-পাঠ ইত্যাদি ছাড়া বাকি সব কিছুতেই ছিল বাঙ্গালীয়ানা। রাজকুমার, রাজকুমারী বা রাণীদের তা শেখা আবশ্যক ছিল।
মহারাজ আফতাব চাঁদের পর বর্ধমানের রাজপরিবারে সিংহাসনে বসেন মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাব। ‘মহতাব’ শব্দটি হল চন্দ্র কথার ফারসী রূপ। আবার চন্দ্র কথাটি হল সংষ্কৃত শব্দ। যেহেতু তিনি মহারাজা এবং হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই তাঁর প্রজা, সেকারণেই এইরকম একটি উপাধিকেই তিনি পদবী হিসাবে গ্রহণ করেন। মহারাজা বিজয়চাঁদের পত্নীর নাম ছিল রাধারাণী দেবী। বিজয়চাঁদের বিবাহ হয় দিল্লীতে, কিন্তু বিবাহের পর রাধারাণী দেবীর পুরো পরিবার চলে আসেন বর্ধমানে। রাজপরিবারে যে করকোষ্ঠীর মিল দেখে বিবাহ হত সেকথা আগেই বলেছি। সেইমতই রাধারাণী দেবীর সঙ্গে বিবাহ হয় মহারাজা বিজয়চাঁদেরও। রাধারাণী দেবী ছিলেন দরিদ্র পরিবারের কন্য। রাজরাজড়ার পরিবারের আদব-কায়দা, নিয়ম-কানুন তাঁর জানা ছিল না, তিনি কোনদিন তা পছন্দও করেন নি। মহারাজকুমারের মতে এই অসম বিবাহের জন্য মহারাজা বিজয়চাঁদ এবং মহারাণী রাধারাণী দেবীর বনিবনা হয়নি কোনওদিনও। রাজা-রাণীদের জীবনে অতুল ঐশ্বর্য্য-বিলাসিতার মাঝেও যে সাধারণ নরনারীর জীবনের মত তাঁদের জীবনেও নেমে এসেছিল দুর্ভাগ্যের ছায়া, তার প্রকৃত ইতিহাস আমরা জানি কতজন!
বিজয়চাঁদ কিশোর অবস্থা থেকেই আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন ছিলেন। ‘বিজয়ানন্দ বিহার স্থলে’ তিনি প্রায়ই ধ্যানে রত থাকতেন। এমন কি একটানা সাতদিন ধরেও তিনি ধ্যানে রত থাকতেন এমন কথাও জানা যায়। সেই সময় রাজকার্য, রাজ্যশাসন কিছুই প্রায় সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। আধ্যাত্মিক ভাবের ঘোরেই তিনি ডুবে থাকতেন। পত্নী রাধারাণী দেবীর সঙ্গে এই নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়, ক্রমে, মহারাজা বিজয়চাঁদ লর্ড কার্জনের সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর মদত,পরামর্শ ও সাহায্যে ধীরে ধীরে আবার রাজ্য পরিচালনা ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন। কিন্তু মহারাণী রাধারাণী যে আধ্যাত্মিক চেতনার ঘোরে থাকার জন্য মহারাজার সঙ্গে বিরোধ বাধে, নিজে ধীরে ধীরে সেই জগতে ডুবে যান। আগেই বলেছি, মহতাব চাঁদের আমল থেকেই বহুবিবাহ প্রথা বন্ধ হয়ে যায় এবং রাজারা এক পত্নীতেই সন্তুষ্ট থাকনে। কিন্তু রাধারাণী দেবীর সংগে মহারাজা বিজয়চাঁদের কোনদিনই সদ্ভাব বা বনিবনা হয় নি। এমনকি রাজকুমার, রাজকুমারীগণের ইংরাজি শিক্ষা ও পঠন-পাঠনের জন্য বিদেশ গমনও রাধারাণী দেবী মেনে নিতে পারেননি। রাজবাড়িতে একত্রে টেবিলে বসে ইংরাজি কায়দায় মাছ, মাংস, মদ ইত্যাদি গ্রহণেও তীব্র আপত্তি জানান। প্রথম যৌবনে মহারাজার আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য যে মহারাণী এত প্রতিবাদ করেন সেই জীবন থেকে মহারাজা বিজয়চাঁদ লর্ড কার্জনের প্রভাবে একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে দাঁড়ালেও রাধারাণী দেবীর আর কোন পরিবর্তন হয় না। বরঞ্চ তিনি রাজবাড়ির মায়া-মোহ ত্যাগ করে চিরজীবনের মত সন্ন্যাসিনী হয়ে যান ও রাজবাড়ি পরিত্যাগ করে বারাণসী ধামে চলে যান তাঁর গুরুর আশ্রমে। রাজ ঐশ্বর্য্য, রাজকীয় বিত্ত, বৈভব, রাজ রাণীর জীবন এক কথায় ঠেলে ফেলে দিয়ে তিনি আজীবন সন্ন্যাসিনীর জীবন যাপন করেন।
সেদিক দিয়ে বর্ধমান রাজপরিবারে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা বলা যায়। এই জীবনের প্রতি তাঁর বিরাগ, বিতৃষ্ণা তিনি প্রকাশ করেছেন কবিতায়, যা তিনি রচনা করেছিলেন রাজঐশ্বর্য্য ছেড়ে চলে যাবার সময়। রাজমহিষী রাধারাণীর জীবনের এও এক আশ্চর্য্য সুকুমার মনোবৃত্তি যা হল তাঁর কবি প্রতিভা, যা প্রকাশিত হয়েছে দেবতার কাছে কবিতার বয়ানে। এটাই ছিল তাঁর শেষ আকুল প্রার্থনা। এই কবিতা এখনও লিখিত আছে মহারাজা কীর্তি চাঁদ কর্তৃক স্থাপিত নবরত্ন মন্দির বর্ধমানের দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দিরের নাটমন্দিরের দেওয়ালে। আজও দেবীর ভক্তকুল মন্দিরে এলে দেখতে পান এক নারীর বেদনা, হাহাকার ও রাজঐশ্বর্য্যের প্রতি বিপুল অনীহা কবিতাগুলির ছত্রে ছত্রে,যা খোদাই করা আছে নাটমন্দিরের গাত্রে। মহারাণী রাধারাণী লিখিত তিনটি কবিতা---
(১)--কবিতা-১
তোমারে,ডাকি মা , তাই।
এ তিনি ভুবনে,জননী আমার,আপন কেহই নাই।।
ত্রিলোকতারিণী,তুমিনারায়ণী,তুমিত সহায় সার।
তোমার মহিমা,অনন্ত অসীম,শুনিয়াছি বারে বার।।
তাইসচন্দনে,জোড়া বিল্বদলে,পরশি জাহ্নবী জল।
তোমার চরণে সঁপিনু জীবন তুলনা করিয়া ছল।।
ধর্ম,অর্থ,কাম,মোক্ষ নাহি চাই তোমার চরণ তলে।
জনমে জনমে, তনয়া হইয়া, বসিব জজনী বলে...।
মা, বলে ডাকি গো, নিকটে থাকিও,দেখিব মা তব মুখ।
জননী বলিয়া করতালি দিয়া ভুলিবে রাধিকা দুখ।।
অসয়ায় তনয়া
কবিতা—২
করুণা রুপিনী, শোন।
এবারে মরিলে এ রাজ মহলে,মোরে না আনিও পুনঃ।।
যেখানে, মা হয় সাধুর পীড়ন,অসাধু জিনিয়া যায়।
ভক্তের মহিমা উড়িয়া যায় মা,বঞ্চনা আদর পায়।।
গুণের সম্মান, হয় অবসান,ধনের সম্মান বাড়ে।
দেবতা হয় মা ভুতের অধীন,ভয়িয়া বেড়ায় ঘাড়ে।।
প্রভুত থাকে মা, পাষন্ডের হাতে,বিনাশে ধর্মের প্রাণ।
সাধুর লাঞ্ছনা, উঠিতে বসিতে দুর্জনের বাড়ে মান।।
সতীর না থাকে, অন্নের সংস্থান,অসতী কাঞ্চন পরে
কপটতা হয়, সভ্যতা যথা, কলঙ্ক প্রেমের ঘরে।।
এ মহলে মোরে আর না আনিও, এ মিনতি তব পায়।
রাধিকার দিন যেভাবে যাইল,বলিয়া বোঝান দায়।
নিরুপায় তনয়া
কবিতা—৩
মা, মা, মা, বলে ডাকিলে, জননী।
এই, ফল তার, ফলিল সঙ্করী।।
এই অপমান, নহে আমার তারিণী।
এই অপযশ, তব রবে জগভরি।।
রক্ষ, রক্ষ, সতী রক্ষ মা আমারে।
এই শত্রু কর হতে, ওগো কৃপা করে।।
তোরই, নামের জোরেতে জননী।
ত্যাজিয়া যাইব এই রাজধানী।।
ফিরিয়া হেথায় আসিব না আর।
এই প্রতিজ্ঞা মোর, পুর নারায়ণী।।
তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।
তব, কাতরা তনয়া
অদ্য ২৯ বৎসর পর বঙ্গদেশ ছাড়িয়া চলিলাম। ইতি সন ১৩৩৭ সাল ১৩ই আশ্বিন মঙ্গলবার
বন্দেমাতরম্‌ ।
১)মহারাজা বিজয়চাঁদ (বিবাহের সময়)
২)মহারাণী রাধারাণি দেবী (বিবাহের সময়)
৩)মহারাণী রাধারাণী দেবী(পরিণত বয়সে)
৪)সর্বঙ্গলা দেবীর মন্দির, বর্ধমান
ছবিগুলি নেট থেকে প্রাপ্ত...

Monday, December 1, 2014

অনু গল্প “মরীচিকা” ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী / ২৭.১২.২০১৪ / বেলা ১.৩০ টা


       
        অনু গল্প মরীচিকা” 
      ত্রিভুবন জিৎ  মুখার্জী / ২৭.১২.২০১৪ / বেলা ১.৩০ টা

রাত দশটা । রাতের ডিনার শেষ । আজ শনিবার তাই কাল ঘুম থেকে দেরিতে উঠলেও কিছু যায় আশে না । এক কাপ কফি বানালে মন্দ হত না । কফি মেকারটা আমার পি.সি. র  পাশেই থাকে । প্লাগ অন করে দুধ এক কাপ সঙ্গে একটু জল ঢ়েলে এফ বিতে চ্যাটে বসলাম । আজ বেশ শীত আছে । রাতে ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস ।
দীপান্বিতা’ আমার ক্লাস মেট । গার্ল ফ্রেন্ড বললেও অত্যুক্তি হবে না ! এক ই সঙ্গে এম.টেক করেছি আমরা । এই শনিবারটা মনের কথা বলে থাকি ।
আমি:-     কিরে ঘুমিয়ে পড়লি 
দীপান্বিতা:- দূর এখন কি শোব ! তুই কি করছিস ?
            ভেরান্ডা ভাজছি !
            ইয়ার্কি  করিস না সত্যি বল !
            তোর কথা ভাবছি । দঁড়া কফিটা .......
            বাজে কথা  বলিসনা । আমি কি তোর বৌ যে আমার কথা ভাববি !
            বৌ হলেই বুঝি সুধু ভাবে কেন তোর কথা কি আমি ভাবতে পারিনা ?
            ওরে আমার কেষ্ট !
            এক কাপ কফি খেয়ে নি তারপর না হয় শুনবি !
            Chat discontinued . See your net connection .
    দীপান্বিতা:-কিরে কি হল কিছু বললি না যে !
    আমি:-    কফি টা ক্লাস বানিয়েছি বুঝলি । তোর বানানোর দরকার হবে না আমি নিজেই বানিয়ে খেয়ে নেব
               তাই করিস না হলে বৌ ...........
           Chat discontinued . ……….
  কাল ই একটা Wi Fi আনবো । খুব জ্বালাচ্ছে নেট টা ।
   আমি:-  নেট টা ভোগাচ্ছে বুঝলি । তুই স্কাই পি তে আয়না ?
দীপান্বিতা:- না আমার স্কাই পি একাউন্ট নেই । তা ছাড়া তোর সঙ্গে আমি স্কাই পি তে কেন কথা বলব রে ?  তুই কি আমার .........
 আমি:-   কি আমি তোর কি ........ 
 দীপান্বিতা:- বাজে বকিস না । যা ঘুমবি যা । (একটু আস্কারা পেলে মাথায় চড়ে !!) 
 দীপান্বিতার নামের পাশে সবুজ আলোটা নিভে গেল সঙ্গে সঙ্গে । শনিবারটা ও মাঠে মারা গেল । ভেবেছিলাম কাল সাউথ সিটি মলে ওকে দেখা করব । ও একটু রিসার্ভ মেয়ে অন্যদের মত নয় । ওই একটু চ্যাট করে ব্যাস ! ওই অব্ধি !!  তার চেয়ে বেশি না । আমার কিন্তু ওকে পছন্দ ।  মনে মনে ভাবি প্রপোজ করবো হয়ে ওঠে না । ওকে দেখলেই চুপসে যাই । কি যে হয় নিজেও জানিনা ! সেল ফোনে ফোন করলাম । বেজেই গেল । শুয়ে পড়লো নাকি কি জানি আমিও ঘুমতে গেলাম  ।
******
পরের দিন উইন্ডোজ সেল ফোনের মেসেজ বক্সে দেখিঃ-“ কাল এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লি যে ?”  
মনে মনে ভাবি ফ্লির্ট’ কোথাকার ! কোন রিপ্লাই দিলাম না । গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রবিবার  বিকেলে ৩ টে নাগাদ ডায়মন্ড হারবার । ঘণ্টা খানেকের পথ বেহালা থেকে । রাস্তার যা অবস্থা কলকাতার খুব বাজে রাস্তা । রাস্তায় ফোন বেজে উঠলো ব্লু টুথ কানে গোঁজা । দীপান্বিতার  ফোন দেখলাম স্ক্রিনে । 
আমি:-     হ্যালো !  
দীপান্বিতা:  রাগ করেছিস 
          না !
         তবে উত্তর দিলি না যে ?
         না না রাগের কি আছে ?
কোথায় যাচ্ছিস একা একা ! জোরে চালাচ্ছিস মনে হচ্ছে !!   
কি করবো এক একা ভাল লাগেনা । তাই ঘুরতে বেরলাম ।
কোথায় শুনি আমায় ডাকলি না কেন আমিও যেতাম !
যেখানে যাচ্ছি সেখানে তোকে নিয়ে যাওয়া যায়না । ক্রিমিনাল এরিয়া ।
তবে তুই যাচ্ছিস কেন ?
আমি পুরুষ মানুষ আমার কথা আলাদা ।  তুই বললেও তোকে নিয়ে যাবনা ।
এই আমায় বিয়ে করবি ?
কবে থেকে এত স্মার্ট হলি শুনি ?
তুই করবি কিনা বল ?
ভেবে দেখবো !
তবে আঙ্গুল চোষ । আমার বিয়ের ঠিক করেছেন বাবা । রাখি। বাই !!
ঘুমটা ভেঙ্গে গেল মায়ের গলার আওয়াজে , “শুভ উঠে পড় । বেলা হল । চা ঠাণ্ডা হয়েগেল
ভোরের  স্বপ্ন নাকি সত্যি হয় !!!!!  *******   

Thursday, November 20, 2014

অনুগল্প জয়েন্ট এন্ট্রান্স ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী

 

       

      অনুগল্প 




জয়েন্ট এন্ট্রান্স
ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী 



মেডিক্যাল / ইঞ্জিনিয়ারিঙের জন্য জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফর্ম বিক্রি হচ্ছে । তখন অন লাইনে ফর্ম ডাউন-লোড এর ব্যবস্থা ছিলনা । ছেলে মেয়েরা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম কিনছে । হঠাৎ একটি মেয়ে এসে লাইনে দাঁড়ালো । মেয়েটিকে দেখতে সত্যি খুব খারাপ । মিস কালো, রোগা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে সালোয়ার কিন্তু বেমানান । মোট কথা, ওই বয়েসে এতো হতকুৎসিৎ চেহারা খুব কম চোখে পড়ে । মেয়েটি লাইনে দাঁড়িয়ে রইলো । প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে ও ফর্ম পেল। অনেকের ই চেহারা টা মনে রইলো । কারণ ওকে নিয়ে কিছু মৃদু আলোচনা শুনলাম দুজন মাঝ বয়েসি মহিলার মধ্যে । বোধ হয় এখানে এসেছেন ছেলে কিম্বা মেয়ের সঙ্গে ঃ

- কিরকম দেখতে বল ! ওই মেয়ের বিয়ে দিতে মা বাবা হিম সিম খাবে !

- হ্যাঁ, কিরম যেন ! ও বিয়ে না করতেও পারে ! কে বিয়ে করবে ওকে ? 

- তোর মেয়ে তো ভালোই নাম্বার রেখেছে । জয়েন্টেও ভালো করবে ।

- ভগবান জানেন! তোর মেয়ের রেজাল্ট কেমন ?

- ওই মোটা মুটি । দেখি কি হয় !

- কিচ্ছু বলা যায়না, রে ! ওখানে অনেক গ্যাঁড়াকল হয়। তুই আমি কি বুঝবো ?


আজ জয়েন্টের রেজাল্ট বেরিয়েছে । ওই কালো মেয়েটির ফটো সমেত ওর র‍্যাঙ্ক বেরিয়েছে । মেডিক্যাল এন্ট্রান্সে প্রথম হয়েছে । টিভি তে ইন্টারভ্যু নিচ্ছে প্রায় সব টিভি চ্যানেল। পরের দিন কাগজে ওর নাম সমেত ফটো দেখে আমি হতবাক ।

- সত্যি একেই বলে মেয়ে !

- আমার মেয়ে যদি কালো হত ক্ষতি নেই কিন্তু কি মেধা বলুন ?

- বাঃ খুব ভালো মেয়ে । 

সকলে এক বাক্যে বলছে, খুব পরিশ্রম করেছে নিশ্চয় !

- এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার ছেলে মেয়ের মধ্যে ও প্রথম হয়েছে । কম কথা ! 

- আসলে রূপের চেয়ে গুনটাই বড় । কারণ রূপ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গুন .......? 

ওটা চিরস্থায়ী ।


আমার ওই মহিলা দুটির কথা আজও মনে আছে । আসলে পি এন পি সি করাই মানুষের স্বভাব।

কলকাতার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা : গোরুর গাড়ি থেকে জেট যুগ ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

  

    কলকাতার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা : গোরুর গাড়ি থেকে জেট যুগ
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



আমাদের স্কুল-কলেজের পাঠ্য ইতিহাসের পাতা ভর্তি হয়েছে রাজা-রাজড়াদের উত্থান-পতন আর যুদ্ধ, খুন ও ষড়যন্ত্রের কাহিনী দিয়ে । সেখানে সামাজিক ইতিহাসের উপাদান খুঁজে পাওয়া যায় না । বেশি দিন আগের কথা বলছি না । তিনশ’ বছর আগেও মানুষ দূর পথে যাতায়াত করতো কি ভাবে ? জানতে কৌতুহল হয় । সর্বকালে, সর্বদেশেই মানুষের দুটি পা ভিন্ন তার যাতায়াতের আদিমতম উপায় ছিল নদীপথ । দুশ’ বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর আট বছর বয়সে পিতার সঙ্গে বীরসিংহ গ্রাম থেকে কলকাতা এসেছিলেন হাঁটাপথে । আরো পনেরো বছর পরে ১৮৪৩এ জর্জ এভারেস্ট, যার নামে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম, দেরাদুন থেকে বরাবর নদীপথে কলকাতা এসেছিলেন । সময় লেগেছিল ৩৫ দিন । তারও পনেরো বছর পরে ১৮৫৬তে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা থেকে কাশী গিয়েছিলেন নদীপথে নৌকায় । যদিও তখন অল্প-বিস্তর রেল লাইন পাতা শুরু হয়েছিল । সময় লেগেছিল দেড় মাস আর নৌকা ভাড়া লেগেছিল একশ’ টাকা । কিন্তু হাঁটাপথ বা নদীপথ নয়, আমি বলবো কলকাতার সড়কপথে যাতায়াতের কথা, সড়ক পরিবহন বন্দোবস্তের বেড়ে ওঠার কথা ।

আমরা চলতি কথাবার্তায় একটা যমজ শব্দ প্রায়ই বলি ‘গাড়ি-ঘোড়া’ । যেমন, হরতালের দিন রাস্তাঘাট শুনসান, ‘গাড়ি-ঘোড়া’র দেখা নেই – এই রকম । কথায় ঘোড়ার আগে গাড়ি থাকলেও আসলে কিন্তু গাড়ির অনেক আগে ঘোড়া এসেছে । মানুষ বা মালপত্র বইবার জন্য পশুশক্তির ব্যবহার হয়ে আসছে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই । এখনো প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মাল পরিবহনতো বটেই মানুষ পরিবহনের জন্য গরুর গাড়ির ব্যবহার হয় । এখন এই আধুনিক জেট-গতির যুগে বিস্ময়কর লাগে, প্রায় দেড়শ বছর আগে ১৮৭৮এর সেপ্টেম্বর মাসে স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনমোহিনী বালক নরেন্দ্রনাথকে নিয়ে বাগবাজার থেকে মধ্যপ্রদেশের (এখন ছত্তিশগড়) রায়পুরে গিয়েছিলেন গোরুর গাড়িতে চেপে । রায়পুরের দূরত্ব প্রায় সাড়ে আটশ’ কিলোমিটার । বিবেকানন্দের পিতা ভুপেন্দ্রনাথ রায়পুরে এটর্নি ছিলেন । স্থলপথে দূর-দূরান্তে যাওয়ার গোরুর গাড়ি ছাড়া আর উপায়ই বা কি ছিল ? সেকথা থাক । গোরুর গাড়ির কথা পরে বলা যাবে । ঘোড়ার কথা বলি ।

আধুনিক কোন শহরে যানবাহন বা পরিবহন ব্যবস্থার বিবর্তন বড় বিচিত্র। কলকাতার কথাই ধরা যাক । বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গতিময় জনবহুল শহর, কি ভাবে আজকের আধুনিক গতি পেল তা জানতে ইচ্ছে করে । কলকাতা প্রাচীন শহর নয় মোটেই । বয়স মাত্র তিনশ’বছর এবং কলকাতার বিকাশও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি । এদেশে বানিজ্য করতে আসা ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের বানিজ্যকুঠী বানানোর জন্য বেহালার সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছ থেকে সুতানূটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর নামে তিনটি গ্রামের জমিদারি সত্ব কিনেছিল । সেই তিনটি গ্রাম মিলেই কলকাতা । এসব কথা স্কুল-কলেজের পাঠ্য ইতিহাসে লেখা আছে, সেটা আমার বলার কথা নয় । একটা শহরের বিকাশ ও আধুনিকতার মাপকাঠি তার জনবিন্যাস, শিক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবসা-বানিজ্য । ইংরেজ কোম্পানী তিনটি গ্রামের জমিদারি সত্ব কিনেছিল ১৬৯৮এর ১০ই নভেম্বর । ঐ দিনই সাবর্ণচৌধুরী ও কোম্পানীর মধ্যে বিক্রয় দলিল সই হয়েছিল । 

কলকাতার নগরায়ন শুরু হয়েছিল আরো পঞ্চাশ বছর পর থেকে, ১৭৫৭র পলাশীর যুদ্ধের পর, কেননা এরপরই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এদেশে তাদের দখলদারি পাকা করেছিল সিরাজদৌল্লাকে পরাজিত ও হত্যা করে । তো এই নতুন ‘নগর কলকাতা’র পত্তনের সময়কার চেহারাটা একবার দেখে নেওয়া যাক । ১৭০৬ খৃষ্টাব্দে মুঘল আমলে কলকাতা, গোবিন্দপুর ও সুতানূটি গ্রামের জরীপের তথ্য অনুযায়ী এই তিনটি গ্রা্ম- যা নিয়ে ‘নগর কলকাতা’, তার মোট জমির পরিমান ছিল ৫০৭৬ বিঘা । যার মধ্যে ১৫২৫ বিঘা ছিল ধানক্ষেত, ৪৮৬ বিঘায় বাগান, ২৫০ বিঘায় কলাগাছ, ১৮৭ বিঘাতে তামাক চাষ ও ১৫০ বিঘায় শাক-সজির চাষ । ১১৬ বিঘাতে ছিল রাস্তা, খাল, পাতকূয়া ও পুকুর আর ১১৪৪ বিঘা ছিল পতিত । এই ছিল পত্তনের সময়কার ‘নগর কলকাতার’ চেহারা । তখন নগর কলকাতায় মাত্র দুটি ‘স্ট্রিট’ আর দুটি ‘লেন’, রোড বা চওড়া রাস্তা একটাও ছিলনা । রাস্তা নেই তো গাড়ি গড়াবে কি করে ? অগত্যা এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে বা এক পাড়া থেকে আর এক পাড়ায় যাতায়াত করার উপায় ছিল শরু কাঁচা রাস্তা দিয়ে পায়ে হাঁটা, কিংবা গোরুর গাড়ি নয়তো পালকি । এই দুটি যানই স্থলপথে যাতায়াতের জন্য আমাদের আদি গ্রামীণ বন্দোবস্ত । পালকি স্বচ্ছল লোকেদের পক্ষের ব্যবহার করা সম্ভব হ’ত । কলকাতার নগরায়ন শুরু হওয়ার পরও ‘পালকি’ সম্ভ্রান্ত ও অর্থবান বাঙ্গালিদের ও সাহেবদের কাছে ছিল খুব আদরের । এ ছিল আদি ‘নগর কলকাতা’র বাবু কালচারের অন্যতম প্রধান চিহ্ন । সওয়ারি হত দুজন, বইতো ৬জন বেহারা, মালপত্র বওয়ার জন্য কুলি আর রাতের পথে একজন মশালচি ।

সাহেবরা কলকাতা নগরীর পত্তন করলো মানে দ্রুত গতিতে সে এগিয়ে চললো এমন নয় মোটেই । পত্তনের পর আরো একশ বছর কলকাতার চেহারাটা প্রায় একই রকম ছিল । যাতায়াতের জন্য কয়েকটা শরু কাঁচা রাস্তায় গোরুর গাড়ি আর পালকি ভরসা । প্রথম বড় চওড়া খোয়া বাঁধান রাস্তা সার্কুলার রোড তৈরী হয়েছিল ১৭৯৮/৯৯ নাগাদ, ফলে তখন থেকেই ছুটতে লাগল দ্রুত গতির ঘোড়ায় টানা গাড়ি । আর ঘোড়া মানেই গতি, দ্রুত গতির প্রতীক । এরপর, আরো এখশ’ বছর ঘোড়ায় টানা গাড়িই ছিল নগর কলকাতার একমাত্র দ্রুতগতির যানবাহন । যাত্রীবাহী মোটর বাস কলকাতায় চলতে শুরু করেছিল ১৯২২ থেকে । তার আগে অবশ্য ট্যাক্সি চলা শুরু হয়েছে ১৯০৬ থেকে ।

ঘোড়ার গাড়ির চল হওয়া শুরু হতেই কলকাতার জনজীবনে গতি এলো । অনেক রাস্তা তৈরী হল । কলকাতার রাস্তা-ঘাট তৈরী করার জন্য ইংরেজরা একটা ‘লটারি কমিটি’ করেছিল, লটারির টাকায় শহরের নানান উন্নয়ন করা হ’ত । ওয়েলসলি সাহেব তখন গভর্ণর জেনারেল । ১৮৩৬ সালের মধ্যে কলকাতায় অনেক প্রধান রাস্তার নির্মাণ হয়ে গেল । স্ট্রান্ড রোড, কলেজ স্ট্রিট,আমহার্স্ট স্ট্রিট,মির্জাপুর স্ট্রিট, হেয়ার স্ট্রিট প্রভৃতি । ১৮৮৮ পর্যন্ত কলকাতার মোট রাস্তার পরিমান ছিল ১৮২ মাইল । ঐ বছরেই ‘নগর কলকাতা’র আয়তন বাড়লো । এন্টালি, বেনেপুকুর, ট্যাংরা, তপসিয়া, বালিগঞ্জ, ভবানীপুর, কালিঘাট, চেতলা, আলিপুর ও খিদিরপুর । নগর কলকাতার সেইসব রাস্তা এখনকার মত মসৃণ এসফল্ট বা পিচ বাঁধান ছিল না । ছিল খোয়া বাঁধান । কারণ ১৯১০এর আগে এসফল্ট বা বিটুমিন’এর ব্যবহার জানা ছিল না । ঐসব রাস্তা দিয়ে ছুটতো ঘোড়ার গাড়ি । 

গাড়ি টানার কাজে ঘোড়াকে নানান উপায়ে ব্যবহার করা হত। উদ্দেশ্য দ্রুতগতিতে যাতায়াত । ব্রাউনলো নামে এক সাহেব বের করলেন ‘ব্রাউন বেরি’ নামে গাড়ি । সাবেকি পালকিতেই চারটি চাকা বসিয়ে সামনে ঘোড়া জুতে দিয়ে বানিয়ে ফেললো এক ঘোড়ায় টানা ‘ব্রাউনবেরি’ গাড়ি, ১৮২৭এ । ব্রাউন বেরির ভাড়া ছিল প্রথম একঘন্টায় চোদ্দ আনা, পরের প্রতি ঘন্টায় আট আনা আর সারা দিনের জন্য নিলে চার টাকা । নানান ধরনের ঘোড়ার গাড়ি ছিল । সাহেবদের জন্য দামি গাড়ি , সাধারণ কর্মচারিদের জন্য আলাদা গাড়ি । নানান নামের এইসব ঘোড়ার গাড়ি । চেরট, ফিটন, ল্যান্ডো, টমটম, ছ্যাকরা গাড়ি এইরকম । অনেক বড় বড় কোম্পানী হয়েছিল ঘোড়ার গাড়ি তৈরী করার জন্য । এক্কা গাড়ি, টমটম, ছ্যাকরা গাড়ি এসব নামগুলো প্রবাদের মত হয়ে গেছে । বহু যুগ ধরে বাংলা বর্ণমালায় পড়া “এক্কা গাড়ি ঐ ছুটেছে, ঐ দেখো ভাই চাঁদ উঠেছে”, বহুদিন অতীত হয়ে গেছে কলকাতার রাস্তা থেকে । তবু গোড়ার গাড়িই বোধয় কলকাতার সবচেয়ে ‘নস্টালজিক হেরিটেজ’ । এককালে কলকাতার ‘বাবু’রা ফিটনে চেপে ময়দানে হাওয়া খেতেন । আর সেই ঐতিহ্যের পথ বেয়ে এই সেদিনও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে সারি দেওয়া ফিটন গাড়ি দেখা যেত ময়দানে শখের হাওয়া-ভ্রমণের জন্য । ২৬শে মার্চ ২০১২ থেকে তাদেরও বিদায় করা হয়ে গেছে । 

ইতিমধ্যে ১৮৫৪ সালের অগষ্ট মাস থেকে হাওড়া স্টেশন থেকে হুগলী পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়ে গেছে । কিন্তু কলকাতার ভেতরে একসঙ্গে বেশি পরিমান মালপত্র বইবার বা একসঙ্গে অনেক মানুষের যাতায়াতের কোন ব্যবস্থা ছিলনা । সেই অসুবিধা দূর হল, ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু করে । মার্চ ১৮৭০ থেকে তোড়জোড় শুরু করে, শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বউবাজার, ডালহৌসি স্কোয়ার, স্ট্রান্ড রোড হয়ে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত পাতা হল ট্রাম লাইন আর ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩ থেকে ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি চলা শুরু করলো । দুটো বলিষ্ঠ ঘোড়া দিয়ে চালানো হত ট্রাম । এরপর অনেক রাস্তায় ট্রাম লাইন পাতা হল, কলকাতা ট্রামওয়েস কোম্পানী গঠন হল । ঘোড়ায় টানা ট্রামই হয়ে উঠলো কলকাতার প্রথম গণপরিবহন ব্যবস্থা । ১৮৯০-৯১ সনে কলকাতায় ট্রাম টানবার জন্য ঘোড়ার সংখ্যা ছিল একহাজার, সবই শীতপ্রধান দেশ থেকে নিয়ে আসা বেশ বলবান ঘোড়া । প্রায় ত্রিশ বছর চালু ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রামের ব্যবস্থা । ঘোড়ায় টানা ট্রামের যুগ শেষ হল ১৯০২এ পৌঁছে । ২৭শে মার্চ ১৯০২ এ প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চলতে শুরু করলো ধর্মতলা – খিদিরপুর পথে । তার আগে কিছুদিন পরীক্ষামূলক ভাবে কয়েকটি পথে বাষ্পীয় ইঞ্জিন দিয়ে ট্রাম চালানো হয়েছিল । এখন তো কলকাতার কয়েকটা মাত্র পথে ট্রাম চলে । 

১৮৮৬ সনে জার্মানীতে মোটরগাড়ি আবিষ্কার হওয়ার পর দশ বছরের মধ্যেই কলকাতার রাস্তায় মোটর গাড়ি দেখা দিল, আর তার দশবছর পরে ১৮৯৬এ কলকাতায় চলে এলো ট্যাক্সি । ১৯৪০/৪৫ সাল নাগাদ কলকাতায় ট্যাক্সির ভাড়া ছিল কমপক্ষে আট আনা, তারপর প্রত্যেক ১/৪ মাইলের জন্য দু’আনা । তখন যাতায়াতের জন্য কলকাতায় প্রধান উপায় ছিল ট্রাম । কিন্তু শহরের বাইরে, দূরে যাওয়ার সমস্যা ছিল, কারণ ট্যাক্সিতে খরচ বেশি । অবশেষে ১৯২২ সনে কলকাতায় চালু হয়ে গেল যাত্রীবাহী মোটর বাস । এর অনেক আগে - মোটর গাড়ি আবিষ্কারই হয়নি, তখন কিছু দিনের জন্য ঘোড়ায় টানা বাস চলার কথা জানা যায় । ধর্মতলা থেকে বারাকপুর পর্যন্ত ঘোড়ায় টানা বাস চলেছিল ১৮৩০ সনে । কতদিন চলেছিল – এসব তথ্য জানা যায় না । ১৯২২ থেকে মোটর বাসই হয়ে গেল কলকাতার প্রধান গণ পরিবহন ব্যবস্থা । চালু হওয়ার সময় ১৯২৪এ কলকাতায় বাসের সংখ্যা ছিল ৫৫টি । সেই সংখ্যাটা ১৯২৫ সনে হয় ২৮০ । ১৯২৬এ চালু হয় দোতলা বাস । প্রথম দোতলা বাস চলেছিল শ্যামবাজার থেকে কালিঘাট । প্রথম চালু হওয়া দোতলা বাসগুলি বছর কুড়ি আগে দেখা বা ছবিতে দেখা বাসের মত ছিল না । বাসগুলির ওপরে ছাদ বা ছাউনি থাকতোনা । বর্ষায় যাত্রীরা ছাতা মাথায় বসে থাকতেন । ৮০রদশক পর্যন্তও বেশ কিছু প্রধান রাস্তায় দোতলা বাস চলতো । তারপর ১৯৯০ থেকে সেই সময়ের সরকার দোতলা বাস চালান বন্ধ করে দেয় । এখনও অনেকেই দোতলা বাসে চড়ার স্মৃতি রোমন্থন করে তৃপ্তি লাভ করেন । এখন নানা চেহারায় এই যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা – বাস, মিনিবাস, অটো ইত্যাদি । ১৯৪৮ থেকে সরকারী বাস চলাচল ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, গঠিত হয় স্টেট ট্রানসপোর্ট কর্পোরেশন । এখন অবশ্য সরকারি বাস সামান্যই চলে । ১৯৭৫এ চালু হয় ‘মিনিবাস’ । সেই সময় যারা মিনিবাসে চড়তেন তাদের মনে পড়বে, সেগুলির উচ্চতা বেশ কম ছিল, যার জন্য সাধারণ উচ্চতার যাত্রিকেও দাঁড়িয়ে যেতে হলে সারাক্ষণ ব্যথা সহ্য করেও বাসের মধ্যে ঘাড় নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো । অতয়েব এই গণ পরিবহন ব্যবস্থার বয়স আপাতত একশ’ বছরেরও কম । 

কলকাতা বড় বিচিত্র শহর । এই জেটগতির যুগে দ্রুতগতির আধুনিক পরিবহন বন্দোবস্তের পাশাপাশিই মানুষ টানা রিকশর সহাবস্থান । ২০০৬এ পশ্চিমবঙ্গ সরকার টানা রিকশর চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল । তারপর ধীরে ধীরে কলকাতা থেকে এই ঔপনিবেশিক চিহ্নটি বিদায় নেয় । রিকশ'র জন্ম জাপানে, ১৮৬৯ খৃষ্টাব্দে । জাপানী ভাষায় এ গাড়িকে বলা হত জিন-রি-কি-শ , মানে 'মানুষ টানা গাড়ি' । ভারতে প্রথম বলা হত 'জিন রিকশ' । সেটা ছোট হয়ে 'রিকশ' হয়েছে । সিমলা তে এই গাড়ি প্রথম দেখা যায় ১৮৮০তে। লেডি ডাফরিনের আত্মকথায় আছে । কলকাতায় চিনারা প্রথম নিজেদের ব্যবহারের জন্য রিকশ'র প্রচলন করে ১৯০০/১৯০১ সন নাগাদ । তারপর চিনারা, ভাড়ায় রিকশ' চালানো শুরু করে ১৯১৩/১৪ থেকে । ভারতীয়রা রিকশর ব্যবসা শুরু করে ১৯২০ থেকে । ইংরেজ আমলে টানা রিকশ'র ভাড়া ছিল এক মাইল পর্যন্ত - তিন আনা । তার পরের প্রতি মাইলের জন্য তিন আনা। সময়ের হিসাবে একঘন্টার জন্য ছ আনা । এটা দুজনের বসার হিসাব। একজন হলে দেড় আনা প্রতি মাইল , একঘন্টার জন্য তিন আনা । 

স্বল্প দূরত্বের পথে যাতায়াতের জন্য তিন চাকার সাইকেল রিকশ এখনও মানুষের পরিহার্য বাহন । কলকাতার রাস্তায় সাইকেল রিকশ চালু হয়েছিল ১৯৪০ নাগাদ । তার পঞ্চাশ বছর আগেই অবশ্য দুই চাকার ব্যক্তিগত বাহন বাই-সাইকেল প্রচলিত হয়েছিল ১৮৮৯ সালে ।

মানুষ ও মালপত্রের বহন ছাড়াও চিঠিপত্র বা ডাক দূর দূরান্তে পৌঁছে দেবার কিরকম বন্দোবস্ত ছিল এবার সেটাও দেখি । পাঠ্য ইতিহাসে পড়েছি শের শাহ ঘোড়ার মাধ্যমে ডাক চলাচলের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন । তখন মানুষ ব্যক্তিগত চিঠিপত্র বা ডাকের ব্যবহারই জানতো না । ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকালে ডাকব্যবস্থা গড়ে ওঠে । দূর-দূরান্তে, অন্য প্রদেশে ডাক নিয়ে যাবার জন্য মানুষ বওয়ার মত একই রকম ব্যবস্থা ছিল অর্থাৎ পালকি, গোরুর গাড়ি ও ঘোড়ায় টানা পালকি গাড়ি । 

এখন, এই একুশ শতকে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কোন উচ্চ শিখরে পৌঁছে গিয়েছে তা আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় দেখছি । সে প্রসঙ্গ আমার বিষয় নয় । আমি শুধু কলকাতার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার আদিপর্বের কিছু তথ্য তুলে এনেছি আর তার বিবর্তনটা বুঝতে চেয়েছি । সর্ব দেশেই সভ্যতার অগ্রগতির ধাপগুলো একই – পেশী শক্তি, পশুশক্তি এবং তারপর যন্ত্রশক্তি । আর এই সবের নিয়ন্ত্রক অবশ্যই মানুষের মস্তিষ্ক । সুতরাং সেই একই ধারায় নগর কলকাতার সড়ক পরিবন ব্যবস্থা নানান ধাপ পেরিয়ে আজকের জেট-গতি যুগে এসেছে । আমি সেই ধাপগুলি ছুঁয়ে যেতে চেয়েছি ।




তথ্যসূত্র -

(১) কলিকাতা দর্পণ / রথীন্দ্রনাথ মিত্র, (২) কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত / বিনয় ঘোষ (৩) সংবাদপত্রে সেকালের কথা / ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

Wednesday, October 29, 2014

অনুগল্প ইন্দ্রধনু ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী



      




অনুগল্প 



ইন্দ্রধনু 
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী



পারুল সবে +২ সাইন্স এ এ্যাডমিসন নিয়েছে । প্রথম দিন কলেজে সিনিয়র মেয়েরা র‍্যাগিং আরম্ভ করাতে খুব অস্বস্তি লাগছিল। মেয়েরা আবার র‍্যাগিং করে ! খুব শ্রুতিকটূ, তবুও মানতে বাধ্য, উপায় নেই । খুব ভাল পড়াশুনোয় না হলেও পারুল ফেলে দেওয়ার মত মেয়ে নয় । ৯২ শতাংশ নম্বর পেয়েছে সি বি এস সি তে । 
সকালে প্রাক্টিকাল ক্লাসে যাওয়ার সময় ওদের পাডার ছেলে অনির্বাণের সঙ্গে দেখা । 
- এই অনির্বাণ দা শোন , বলে হাঁপাচ্ছিল পারুল । 
- কি বল ? 
- আমার সঙ্গে কলেজ অবধি যাবে ? 
- না যাওয়ার কি আছে ? আমিতো কলেজেই যাচ্ছি । 
- হ্যাঁ, জানি । তুমি কি সাইন্স নিয়েই পডছো অনির্বাণ দা ? 
- হ্যাঁ, পিওর সাইন্স । আমার ‘কম্প্যুটার’ ফোর্থ অপশনাল । 
- ও, তবে ত ভালোই, বল ! 
- কেন ? 
- আমিও ‘কম্প্যুটার’ ফোর্থ অপশনাল নিয়েছি । 
- হুঁ। ভালো করেছ। খাটুনি আছে। প্রোজেক্ট করতে হবে। পারবে তো ? একটু গুরু গম্ভীর ভাবে বলে। 
- পারতে হবে । না পারার কি আছে ! একটা কথা বলবো অনির্বাণ দা ! 
- বল । 
- আমার না ভয় করে সিনিয়রদের । 
- কিছু ভেবোনা আমি বলে দেব ওদের। ফাজিল ছেলে সব । 
- না না - শুধু ছেলেরা নয় মেয়েরাও আছে ওই মহৎ কাজে । কি করে সময় পায় ওরা ? আমার ভয় করে । তুমি যদি ওদের একটু বলে দিতে “তোমার বোন বলে”! 

অনির্বাণের ভুরু কুঁচকানো সহজেই অনুমেয় ! পারুলের চোখ এড়ালোনা । 
- ঠিক আছে । বলে দেব । 

এরমধ্যে কলেজ ক্যাম্পাস এসে যায় । পারুল দ্রুত বেগে এগোয় ক্লাসের দিকে ।
অনির্বাণ ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে পারুলের হাঁটার পথের দিকে । এটাই কি হয় সবার ! নিজেকে ছোট মনে হয় । ও হাঁটতে শুরু করে ক্লাসের দিকে !

ইন্দ্রধনুর সাত রঙ্গের কোন রংটা মনে লেগেছে বুঝতে পারে না অনির্বাণ । তবে কিছু একটা ঘটেছে । তাও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে । তবে রংটা টিকবে কিনা জানেনা !



Sunday, October 12, 2014

সার্কিট হাউস / ত্রিভুবন জিত মুখার্জী /


 
    

সার্কিট হাউস
ত্রিভুবন জিত  মুখার্জী

আজ থেকে বহু বছর আগের কথা । তা প্রায় ৪০ বছর তো হবেই। আমার বয়েস ৯ - ১০ হবে তখন আমরা কোরাপুট জেলার মাছকুন্ড’ বলে উডিশ্যার এক জায়গা তে কিছুদিন ছিলাম উডিশ্যার জয়পুর’ থেকে প্রায় ৪০ কি মি দক্ষিণে । টানা পাহাড়ের ওপর ঘাট রাস্তা তখন দিনে একটা বাস চলত । বাবার সঙ্গে আমরা জিপে যেতাম মাছকুন্ড । খুব ভয় করতো যখন  জিপটা পাহাড়ের গা ঘেঁসে চলত ।

অন্ধ্র প্রদেশের গোদাবরি নদীর এক শাখা নদী মাছকুন্ড নদী । এই নদী হঠাৎ দিগ পরিবর্তন করে জল প্রপাতে পরিনত হয় নাম ডুমডুমা জলপ্রপাত” চারিদিকে পাহাড ঘেরা এক মনরম জায়গা । শান্ত পরিবেশ । জলপ্রপাতের গুরু গম্ভির গর্জনে কম্পিত পরিবেশ ।

এখানে ১৯৫৫ সালে তৈরি হয় জলাপুট ড্যাম । জলা’ মানে জল পুটমানে ঘর অর্থাৎ জলের ভাণ্ডার । এইখানে তৈরি হয় মাছকুন্ড হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট আন্ধ্র এবং উডিশ্যার মিলিত উদ্যমে । ৩৪.২৭৩ টি এম সি জলকে জলপ্রপাত থেকে ১৫ কিমি টানেল দিয়ে ১২০ মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ১৯৫৫ সালে। এখন অবশ্য এই প্রজেক্ট পুরন হয়ে গিয়েছে যার নব-কলেবরের প্রয়োজন । সেটা থাক ।  ১৯৫৮ র কথা, তখন ওই জায়গা  ছিল  গভীর জঙ্গলে ভরা, নির্জন  । সভ্যতার কোন চিহ্ন  ছিলোনা । কিছু আদিবাসী এবং কিছু সরকারি বাবু । কেউ তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকতেন কেউ একা। কিছু তেলেগু উড়িয়া এবং আমরা একমাত্র বাঙ্গালী পরিবার । অবশ্য আমরা ছুটি কাটাতে যেতাম ওখানে কারণ আমার পিতৃদেব ওখানকার একজন অফিসার ছিলেন । আমাদের পড়াশুনোর জন্য তিনি একাকীত্ব বেছে নেন সে প্রসঙ্গে আসি । সেই ১৯৫৫ সালের আগে ওই জলাপুটে আসেন কিছু জার্মান ইঞ্জিনিয়ার । তাদের জন্য সার্কিট হাউস তৈরি হয়েছিল যাতে কোন অসুবিধে না হয় ।
আজ সেই সার্কিট হাউসের কথা বলি । জার্মান সাহেবরা ঘর দোর ছেডে এই বিদেশ ভুঁইতে এসে আমাদের দেশের ঘরে ঘরে আলো জ্বালাতে আসেন কিন্তু তারই মধ্যে ঘটে কিছু অঘটন ।

ওই নির্জন বনানীতে এক সুন্দরি তেলেগু মহিলা ছিলেন নাম
 জি.পূর্ণিমা । তিনি কোন এক কর্মচারীর কন্যা । যেমন দেখতে ঠিক সেরকম গান গাইতেন মহিলা । আর জার্মান সাহেবের নাম আলেকজান্ডার পল । সুধু পল সাহেব বলেই ওনাকে ডাকতেন সবাই। বয়েসটা অল্প । পল সাহেব যেমন সুন্দর দেখতে ছিলেন সেইরকম অমায়িক ব্যাবহার ছিল ওনার। সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে ভালোবাসতেন। খুব ভালো টেনিস খেলতেন এবং পিয়ানো বাজাতেন। প্রসঙ্গত পল সাহেব ওই পূর্ণিমাদের বাডী যেতেন গান শুনতে । অভিভূত হয়ে গান শুনতেন পল সাহেব আর সেই গান পিয়ানোতে বাজাতেন সার্কিট হাউসে । সেই সঙ্গীতের মূর্ছনায় দু জনের মধ্যে কোথায় কখন প্রেম সৃষ্টি হয় কেউ বুঝে উঠতে পারেনি কখন। এটাই মুল সুত্র । এর পর চলে চুপি চুপি দেখা আর প্রেমের আদান প্রদান । বোধ হয় ওই একটাই চিত্ত বিনোদনের উপায় । তখন ওখানে না ছিল বায়স্কোপ না ছিল এখনকার মতন টিভি ভিডিও,ক্রিকেট ফুট বল খেলা ইত্যাদি। তাই দুই হৃদয়ের মিলন ঘটে অজান্তে । ক্রমে পূর্ণিমা অন্তঃসত্ত্বা হন । এর মধ্যে পল সাহেব পূর্ণিমাকে প্রায় স্ত্রীর দরজা দেওয়ার জন্য প্রস্তাব রাখেন তার বাবার কাছে । কিন্তু সমাজের ভয়ে তার বাবা গর রাজি হন ফিরিঙ্গীর হাথে কন্যা সম্প্রদান করতে । রক্ষণশীল সমাজে তা গ্রহণিয় নয় । বিশেষ করে সে যুগে । পল সাহেব ব্যথিত হন । এর মধ্যে কিছু দিন কেটে যায় । ওদের দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ । 

সে দিন ছিল পৌষ পূর্ণিমা । পূর্ণিমা চুপি চুপি সার্কিট হাউসে যায় কিন্তু দেখে পল সাহেব নেই । তাকে না জানিয়ে পল সাহেব চলে জান । সে কান্নায় ভেঙ্গে পডে । ওখানেই আত্মহত্যা করে গলায় দডি দিয়ে। সকালে সবাই দেখে হতচকিত হন। এ হেন জায়গায় এরকমটি কেউ আশা করে নি । পুলিশ আসে । ময়নাতদন্ত হয় । পল সাহেব এই ঘটনার বেশ কিছুদিন আগে ফিরে জান ভিজয়নাগরম হয়ে মান্দ্রাজ । ওখানথেকে দেশে পাডি দেন। সেই সার্কিট হাউসে এর পর আর কোন সাহেব থাকেননি কারন পূর্ণিমা ঠিক পূর্ণিমার দিন রাতে বেরুত খোলা চুলে । ওই নির্জন পরিবেশে কার বাবা সার্কিট হাউসে থাকবে আজও পূর্ণিমার অতৃপ্ত আত্মা পল সাহেবের অপেক্ষায় । মৃদু সঙ্গীতের ঝংকার শোনা যায় আর শোনা যায় পুর্নিমার হাসি কান্নার শব্দ । পল সাহেব কি জানেন পূর্ণিমার কি হল ? আজ ও ওই সার্কিট হাউসে কেউ একলা থাকেনা ।

আর পুর্নিমার দিন বন্ধ থাকে সার্কিট হাউসের দরজা।