Saturday, March 29, 2014

আবিষ্কারের নেশা / ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী / মহা শিবরাত্রি / ২৭.০২.২০১৪ / রাত ০৮.২৯ মি ।


আবিষ্কারের নেশা

 ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী / মহা শিবরাত্রি / ২৭.০২.২০১৪ /রাত ০৮.২৯ মি ।

শালিনীর থিসিসটা  এপ্লিকেশন অফ  ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্লায়েড ইলেক্ট্রনিক্সযেটা ন্যানো  ফিজিক্সের বিষয়  । বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে যোগা যোগ করতে চায়। শালিনীর প্রফেসার ওকে দিয়ে এই রিসার্চ ওয়ার্ক করিয়ে ছিলেন । নতুন বিষয়ের নতুন দিগন্ত , তাই  ভুরি ভুরি প্রশংসা পায় শালিনী । আজ বাবা বেঁচে থাকলে কখনো শালিনীকে বিয়ের জন্য উৎব্যাস্ত করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন আরো রিসার্চের জন্য ।
কলেজ থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে । আজকে শুক্রবার । প্রায় এরকম হয় বিশেষ করে  শুক্রবার । বাসে লোকে  বাদুড় ঝোলার মতন অফিস ,স্কুল - কলেজ  থেকে বাড়ি ফেরে।  কি অবস্থা কোলকাতার ! লোকগুলো প্রাণ হাতে নিয়ে যাওয়া আসা করে ।
  শালিনী কি করে বাড়ি ফিরবে ? উল্টো-ডাঙ্গায় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। লোকের ভিড়ে ভিড় । বাসের চেয়ে লোকের সংখ্যা ক্রমশ বেশি হচ্ছে ।   ও  এরকম বাদুড় ঝোলার মতন বাসে  উঠতে পারবে না ।  খুব চিন্তায় ছিল। অটো এই রুটে বেশি জায় না আজকাল । তবুও অটোর ভরসায় দাঁড়িয়ে রইল । 
হঠাৎ অয়নএসে শালিনীরকাছে দাঁড়াল । 
অয়ন ঃ   কি ব্যাপার ? বাড়ি ফিরবে কি করে ? বাসের অবস্থা দেখছ !” 
শালিনী ঃ  তুমি কোন দিকে যাবে?”  
আমি বাঙ্গুর’ , তুমি ?
আমি তেঘোরিয়া!
বাসের আজ খুব বাজে অবস্থা । কেষ্টপুরে এতো রাস্তা জ্যাম থাকে , কি করে যাবে ?
যেতে ত হবেই ।
চল অটো আসছে উঠে  পড়ি । দেরি করনা ।
কিন্তু কিন্তু করে অটোতে উঠলো শালিনী ...। পার্সের অবস্থা খুব একটা ভালোনা ... দুটো কুড়ি  টাকার নোট আছে ।  তবুও অন্য উপায় নেই দেখে উঠে পডে । বাড়ি পৌঁছতে সেই  সাতটা সোয়া সাতটা  ত হবেই । গিয়ে স্নান সেরে কালকের ক্লাসের জন্য প্রিপারেসন হ্যাঁ , শালিনী ফিজিক্সপড়ায় স্কটিশে, পি.এচ.ডির পর ভাবা এটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) এবং ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্স , ভুবনেশ্বরে এক সঙ্গে দু জায়গায়  সাইন্টিস্টের জব পায় , কিন্তু কোলকাতা ছাডবেনা শালিনী ! তাই স্কটিশে অধ্যাপিকার অফারটা আপাততঃ একসেপ্ট করল। 
অয়ন , শালিনীর ক্লাস মেটও এম.টেকের পর আই আই এম , কোলকাতা (জোকা) থেকে  এম বি এ করে একটা মাল্টি ন্যাশনাল ফার্মে আছে ।  মাঝে মাঝে দ্যাখা হয় শালিনীর সঙ্গে  ব্যাস আর কিছু না ।
কোম্পানির থেকে এই জন্য বলে গাডী কিনতে । আমি গাড়ীর লোণ নিতে কুণ্ঠা বোধ করছি কারন এই জব ছেডে দেব শিগগিরি ।   নতুন চাকরী ..ওই লোণের ঝামেলায় পড়তে চাই না ..... কথাগুলো একসঙ্গে বলে অটোয় উঠে পডে অয়ন ।
শালিনী ও উঠে পডে ওর পেছনে । রাস্তা ঘাটে একটা পুরুষের প্রয়োজন সঙ্গে থাকা ...তাই বিনা দ্বিধায় উঠে পডে শালিনী ।
অয়ন বাঙ্গুরে নেবে জায় । বাগুইহাটির কাছে আবার জ্যাম ..... তখন ৭টা বেজে গিয়েছে । আর একটুখানি রাস্তা ... দুর নিজের গাডী থাকলে এসবের ঝামেলা থাকেনা । কিন্তু কোলকাতার রাস্তায় ড্রাইভিং ...! রক্ষে কর ! কথাটা ভাবতেই একটা  গোলমালের আওয়াজ পেল ।
রে রে করে এক অটো চালক এক ভদ্রলোক এর সঙ্গে বচসা  । রাস্তার লোকগুলো বোবার মতন হেঁটে পার হচ্ছে । জেন কিছুই হয় নি ! নির্বিকার !! আসলে কোলকাতায় থাকলে চোখ কান মুখ সব বন্ধ রাখা দরকার ।  কথাগুলো কানে এল ;   ৮ টাকা ভাডা  ১০০ টাকা দিলে আমি কি টাকার গাছ রেখেছি ? কত খুচরো নিয়ে ঘুরবো । শালা সকাল থেকে মাল পডে নি পেটে । 
লোকটিও ছাড়ার পাত্র নয় তিনিও  বলছেন , আমরাই  বা খুচরো পাই কোথা থেকে ? একশো টাকা বার করলেই শেষ  । ভদ্রলোক লোকাল বোধ হয় নাহলে এতো সাহস হবে না !সমানে বচসা চালিয়েছেন। 
আপনার কাছে ভাঙ্গানি আছে দাদা ?
কত ?
২০ টাকা !
হয়েযাবে দিদি। আপনি কোথায় নাববেন ?
লোকনাথ বাবার মন্দিরের কাছে ।
ওখান অবধি ২০ টাকাই ভাডা । 
শালিনী র যেন গা থেকে জ্বর নাবলো । প্রত্যেক দিন অটো আর প্যাসেঞ্জারের মারপিট রক্তা রক্তি কাগজে দেখে ওর রাস্তা ঘাটে ভয় করে । কাল খুচরো সঙ্গে রাখবে । বাসের ওপর ভরসা  নেই । বাস মালিকেরা স্ট্রাইক এর ডাক দিয়েছিল । ডিসেলের যা দাম বেড়েছে ! ওদের ই বা দোষ কি ? তবে ভাড়া বাড়েনি রক্ষা ।
ঘরে পৌঁছে একটু  ফ্রেশ হয়ে নেয় তারপর সোজা বাথরুমে  ঢুকে পডে । শাওয়ার খুলে স্নান । আঃ ! রোজ রোজ এই বিচ্ছিরি জার্নি যেন পোষায় না । এর একটা বিহিত করতে হবে । এ মাসে মাইনে পেলে একটা লোণ করবে ... কারের লোণ । বাজেটের পর কারের দাম কমেছে । দেখি ব্যাঙ্ক ম্যানেজার  কি বলেন ? শালিনীর জামাই বাবু সল্ট লেক স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার । উনি যদি কিছু আডভাইস করেন ত । ওর পে সার্টিফিকেট এর জন্য কাল এপ্লাই করবে প্রিন্সিপাল কে । হয়ে যাবে বোধ হয় । তবে ও তো ইউ জি সি স্কেল পায় নি এখন। এদিকে ৭ম পে কমিশন বসে গিয়েছে । সত্যি গরিব মানুষ গুলো কি খাবে এর পর ? হু হু করে যা দাম বাড়বে ইলেকশনের পর .. কি দেশের অবস্থা .. কেউ বোঝার নেই !  আশ্চর্য !!
মা চা নিয়ে হাজির ।
তুমি কেন আনলে মা ? আমি নিজে করে নিতাম ।
থাক মা । আর ও টুকু করতে হবে না । স্বশুর বাড়ী গিয়ে কর । এখন তোমার মা বেঁচে আছে । 
সন্ধ্যে বেলায় বাজে কথা বোলোনা মা ! তুমি কি করে জানলে আমি , তোমার ওই শ্বশুর বাড়িতে যাবো বলে?
আমার নয়.. তোমার মা , সবাই যায় । তুমিও যাবে ।   
আর  যদি আমি না যাই । আমি যদি তোমার কাছে থাকি । আপত্তি আছে ?
আদিখ্যেতা দেখো মেয়ের ! হ্যাঁ আছে মা । সব দিন তো আমি বেঁচে থাকবো না !

তোর সঙ্গে ওই অয়নবলে ছেলেটা পড়তো না ! কেমন দেখতেরে ওকে ? নিয়ে আয় না এক দিন । 
কেন বলত ? আমি ডাকলেই ও আসবে কি করে বুঝলে ? ওর সঙ্গে আর দেখা হয় না আমার । আমাকে ও সব বলবে না । আমার এখন কিছুই হলনা  ... তোমাদের মেয়েকে বাডী থেকে বিদেই না করলে ভাত হজম হয় না ?
ও মা সে কি কথা ? আমি তাই বলেছি নাকি ?   এই যে বললি অয়ন তোর সঙ্গে এক ই অটোতে এলো বলে !
তাতে কি হয়েছে ? অটোতে এলো বলে  ওমনি তাকে বাড়িতে ডাকতে হবে ? তুমি যে কি না মা ! আশ্চর্য ! তোমরা পারো বটে !!
ঠিক আছে , আমি তোর মামাকে বোলব একটা বিঙ্গাপন দিতে আনন্দ বাজার    পত্রিকাতে, “পাত্র পাত্রী কলমে”
কিসের
চা টা খেয়ে নে মা । জুড়িয়ে যাচ্ছে যে। 
তোর বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে কি এসব চিন্তা করতে হত রে মা ? সব ই গোবিন্দের ইচ্ছা ।
দেখ মা আমাকে ওই বিয়ে ফিয়ের ব্যাপারে বিরক্ত করলে আমি কিন্তু বাইরে চাকরি নিয়ে চলে যাবো ।
তবে কি সারা জীবন আইবুডো মেয়ে বসে থাকবে ?
ওই সব গেঁও কথা শুনতে আমার একদম ভাল লাগেনা । কলেজ থেকে ফিরেছি আমাকে একটু রেষ্ট নিতে দাও । তোমার ওই এক ঘেয়ে ঘ্যান ঘ্যান আমাকে এই ঘর ছাড়তে বাধ্য করবে। আমাকে পরে দোষ দিওনা ! কথাটা বলে গট গট করে চায়ের কাপ হাতে নিজের ঘরে চলে গেল শালিনী ।
শালিনীর মা হতবাক হয়ে মেয়ের কথা শুনছিলেন । মনে মনে ভাবলেন আজকালকার মেয়েরা দুটো লেখা পড়া শিখে নিজেদের কি মনে করে ? আমি হলাম গেঁও ! কথায় বলে,“সোমত্ত মেয়ে ঘরে থাকলে মায়ের গলায় মাছের কাঁটার মতন আটকে থাকে । না পারবে গিলতে না পারবে ফেলতে ।”  আমার হয়েছে যতো জ্বালা !! এইবলে রান্না ঘরে চলে জান ।
শালিনী র মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠলো ।
হ্যালো । কে বলছেন ?
অয়ন । একটা সুখবর আছে । আমি গাড়ী কিনছি ।
তাই ! কংগ্রাচুলেসন । কি গাড়ী ?
ভক্স ওয়াগন এর  এর ‘পোলো’ মডেলটা আমার প্রিয় ওটাই কিনছিকোম্পানী ৪% ইন্টারেস্টে লোন দিচ্ছে । বাবা বললেন ,“কিনে নাও । এখন যা কোলকাতার রাস্তার অবস্থা , রাস্তার ধুলো আর পলিউসন থেকে রক্ষ্যা পাবে পরে ফ্লাই ওভার হয়েগেলে গাড়ী চালাতে অসুবিধে হবে না”  ড্রাইভিং টা জানি তবে আরেকটু হাথ পাকাতে হবে ।   
হুম । ঠিক বলেছেন তোমার বাবাকবে খাওয়াচ্ছো ?
যদি বল কাল । 
কাল আমার একটা ক্লাস আছে । ঠিক আছে বোলব । বাই
শালিনী খুব একটা সায় দেয় না অয়ন কে । শালিনী অয়ন দুজনেই পড়া শুনয় ভাল ছিল। শালিনী র ফিজিক্স ভাল লাগতো তাই অনার্স নিয়ে পড়ে । পরে এম এস সি , পি এচ ডি । এখন ও ডক্টর শালিনী সান্যাল । 
অয়ন প্রথম থেকেই আই আই টি র জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। বি টেক এর পর ক্যাট দিয়ে জোকা তেই এম বি এ করে মার্কেটিং এ । ফেলোশিপ করতে পারতো কিন্তু ভালো চাকরির অফার পেয়ে কাজে জএন করে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি হিসেবে পরে মার্কেটিং ম্যানেজার হয়ে কোলকাতায় পোস্টিং পায় একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে । পে প্যাকেজ ভালো তা ছাডা কোম্পানির ফ্যাসিলিটি অনেক ।
শালিনী কোম্পানি জব একদম পছন্দ করে না । বলে গলায় লেংটি(টাই) বেঁধে কোম্পানির দালালি যা মার্কেটিং তাই । যতই মাইনে পাগ না টিচিং জব শ্রেষ্ঠ । ওতে নিজের সাবজেক্টের  সম্পর্কে ছাত্র/ছাত্রী দের আকৃষ্ট করা তাদের ভালো করে বিষয়টা বোঝান । রিসার্চ করা । এ সব সমাজ সেবার কাজ । ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ আছে মার্কেটিং এ আছে ? আয়ন খুব ভাল ছেলে জানি কিন্তু ও কি করল ? নিজের মাথাটা কোম্পানিকে বিক্রি করে দিল! ভাল সেলস দেখালে উন্নতি নাহলে  ...! এরা টাকা ছাডা জীবনে আর কিছুর মূল্য দেয়না । খুব মেটেরিয়ালিসটিক হয়ে যায় । খুব একটা শান্তিতে থাকে না। কাজের প্রেসারে খিট খিটে হয়ে যায় অকাল বৃধ্য হয়ে চুল উঠে টাক পড়ে জায় । ম্যাগো  টাকটা শালিনী একদম পছন্দ করে না।  নিজেই নিজের মনে কথাগুলো ভাবতে থাকে , কিন্তু একি তারতো এ সব ভাবার দরকার নেই । মাথাটা ঝাঁকিয়ে নোট টা প্রিপায়ার করছিল বি এস সি পার্ট ওয়ানের থার্মোডাইনামিক্সের ক্লাসের জন্য ।
শালিনীর ক্লাস শেষ না হতেই অয়নের ফোন অনিচ্ছা সত্যে কল রিসিভ করে “হ্যালো” বলল ।
আসছ ত !
কোথায় ?
পার্ক হোটেলে ।
ও বাবা আমি ওসব জায়গায় জাইনা । আমি ফুচকা খেতে ভালো বাসি গল্প করতে করতে ।
কি ফুচকা ? তুমি কি বাচ্চা ?
হ্যাঁ । তুমি চলে এস আজ আমি খাওয়াচ্ছি তোমায় দেখবে কিরকম টেস্ট ।
সরি ম্যাডাম আমি রাস্তার জিনিষ খাই না । ওতে হেপাটাইটিস হয় ।  তোমার টেস্ট টা সেই স্কুল পডুয়া মেয়েদের মতন । একটু মড হও । ডক্টরেট করেও ...
না না আমি মড কোনদিন হতে পারবো না আয়ন। আমি আমিতে থাকতে চাই।
তবে তোমার সঙ্গে আমার কেমিস্ট্রি ঠিক মিলবে না ।
আমিত মেলাতে চাইনা । তুমি কল করেছিলে আমি করি নি । আর কেমিস্ট্রি র কথা আসছে কোথা থেকে ? আমরা শুধু বন্ধু তাই নয় কি ?
অয়ন অপমানিত মনে করল নিজেকেছিঃ একটা অর্ডিনারি শিক্ষিকা সে কিনা  এতো ডাঁটের কথা বলে ! আর না । ওকে বাই এজ ইউ লাইক । বলে ফোন কেটে দিল।
শালিনী ওটাই চাইছিল। ও এক দম ওই হোটেলে বসে হ্যা হ্যা করে শস্তা মেয়েদের মত কারুর ঘাডে খাওয়া পছন্দ করে না। নিজের ঘর আর কলেজ ছাডা কোথাউ কারুর সঙ্গে যায়নি । প্রফেসাররা তাই ওকে খুব স্নেহ করতেন ইউনিভার্সিটিতে ।
এদিকে মা , মামাকে দিয়ে এক বিঙ্গাপণ দিয়েছেন । হঠাৎ রবিবারের আনন্দ বাজার পত্রিকায় পাত্র পাত্রী বিঙ্গাপনের পেজটাতে লাল কালি দিয়ে গোল করা দেখে বিস্ময় হয় শালিনীর । পডে দ্যাখে , ওমা এত তার জন্যই ... । আশুক মামা দেখাচ্ছি মজা । আমাকে কি পেয়েছে এরা । একটা কমডিটি না কি ? খুব রাগ হয় মা’র ওপর । 
হঠাৎ ল্যান্ড ফোনে রিং হয় । ও ঘর থেকে মা ছুটে আসেন ফোন ধরতে ।
হ্যালো ! কে বলছেন?
আপনি একটা  বিঙ্গাপণ দিয়েছেন ...।
হ্যাঁ ।
মায়ের কাছ থেকে ফোনটা ছাডিয়ে ... মেয়ের মাথা খারাপ আছে আর কালো বেঁটে চলবে !!
ও দিক থেকে লাইন কেটে যায়।
একি করলি শালু ?
ঠিক করেছি । যার বিয়ে তার মতা মত নিয়েছ ? কি ভাব তোমরা ? আমি গোলাম না বাজারের মাছ ? কি ভাবো তোমরা ??  এরকম করলে আমি সত্যি ঘর ছেড়ে চলে যাব । রাগে থর থর করে কাঁপে শালু ।
মায়ের চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু । মা চায়ের কাপটা শালুর হাতে দিয়ে বলেন আমাকে শান্তিতে মরতে দিবি না তুই ? তোর বাবা আমাকে কি জ্বালা যন্ত্রণায় রেখে গেলেন ।
তুমি শান্ত হও মা ।বাবকে কেন টানছ এর মধ্যে । তোমার গলার কাঁটা আমি.. বাবার ছিলাম না !  আমার বিয়ের কথা একদম ভেবো না । সময় হলে আমি নিজেই তোমাকে বলব । তবে এখন না। শান্ত হও । আমার অনেক কাজ বাকি।
আমি জানি রে সে দিন আসবে না । আমি ত তোর মা আমি জানি তোকে ! তুই  মাহলে বুঝবি ।
আমার ওইরকম মা হওয়ার প্রয়োজন নেই যে মা তার সন্তানকে বুঝতে চায় না !
এই কাটা কাটা কথা আমি সহ্য করব কিন্তু পরের ছেলে সহ্য করবে কেন ?
আমিতো কারুর মাথার দিব্বি দি নি আমার কথা সহ্য করতে । তুমি কেন আমাকে বুঝতে চেষ্টা করনা । আমি আর পাঁচটা মেয়ের মত স্বামী ঘর দোর বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে থাকতে চাই না পৃথিবীতে । পৃথিবীতে আরও অনেক কাজ আছে যা মেয়েরা করতে পারবে। করা উচিৎ বলে আমি মনে করি । এই বিশাল পৃথিবী তার প্রত্যেক কোনে আছে বিভিন্ন মানুষ তারা সুধু বাচ্চা জন্ম না দিয়ে দেশের অনেক উপকারে আস্তে পারে । জন্ম নিয়ন্ত্রণ এই জন্য অসফল হচ্ছে আমাদের দেশে । ছেলে মেয়ে  চাকরি পেলেই মা বাবাদের মাথা ব্যথা ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করা । এতে কি হচ্ছে ? অনেক ভাল ব্রেন নষ্ট হচ্ছে ।
আমি অত পডাশুন করিনি তোর মত । আমি তাই জানিনা মা । আমার ভাবনা চিন্তা তোর সঙ্গে কোন দিন খাপ খায় নি...........    
বেলা বারোটা নাগাদ দিদি জামাই বাবু এলেন । সঙ্গে টুকাই ।
মা রকমারি রান্না করে রেখেছেন। সেকেলে শ্বাশুডিদের মত মাথায় ঘোমটা দিয়ে জামাই বাবু কে বলেন, “এসো বাবা এসো ।
টুকাই শালিনীকে দেখে দউডে আসে । মাসি আমার ক্যাডবেরি তা দাও ।
দাঁড়া আনছি বলে ফ্রিজের দিকে এগুলো ।
শ্রাবন্তি, শালিনীর দিদি আর অর্ক শালিনীর জামাই বাবু । দুজনেই মাকে কিছু জিঙ্গাসা  করতে যাচ্ছিল শালিনীকে দেখে চুপসে গেল । 
শালিনী বুঝেও না বোঝার  ভান করল । জিজু কি খবর তোমার ? অর্ক কে দেখে বলল শালিনী ।
তুমি না থাকলে মন উদাস থাকে সখী ।
তাই তবে দিদিকে ছেড়ে এখানেই থাক ঘর জামাই হয়ে ।
তাও আচ্ছা সখী ।
তবেরে দেখাচ্ছি তোমাকে ।
সকলে হেঁসে ফেলে । সত্যি অর্ক-দা খুব মাই ডিয়ার ।
টুকাই বলে ,“ঘর জামাই কি গো মা” ?
গোয়ালে চাষির ঘরের বলদ । গলায় দড়ি বাঁধা থাকে খেতে দিলে খায় আর জোয়াল কাঁধে গরুর গাড়ী টানে । তাকে বলে ঘর জামাই । বুঝলি ।
যা: কি সব বাজে কথা বলে মা । একদম বাজে । মিথ্যা কথা বলছ তুমি ।
শালিনী , টুকাইকে ক্যাডবেরি দিয়ে বোঝায় পরের ছেলেকে ঘরে খাইয়ে দাইয়ে রাখাকে ঘর জামাই বলে । এখন এটুকু জান পরে বড হলে পুরোটা জানবি ।
অর্ক বলেন, “শালু তোর জন্য তবে তাই দেখি।” 
ভাল হবেনা বলছি  অর্ক-দা ।
তোর অয়নের খবর কি ? আমাকে ফোন নাম্বারটা দে না ! আমি কথা বলে দেখি ।
তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে শালিনী । কি ? সে খবর ও  মা তোমাদের দিয়েছে ।
 মা! মা!
কি হল ? অত চ্যাঁচাচ্ছিস কেন ?
তুমি কেন এই সব বল আমার নামে । কি পাও ?
কি বলেছি?
গট গট করে নিজের ঘরে ঢুকে জায় শালিনী ।
কম্প্যুটার খুলে সিভি ফাইলটা খোলে । মনে মনে ভাবে বার্কের কিম্বা ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্সের  চাকরিটাতে আবার এপ্লাই করব । খুব ভুল হয়েছে ঘরে থাকা । বাইরে গেলে এক্সপোসার হবে  । এই স্কটিশে আমার ভবিষ্যৎ  কি ? ইউ জি সি পেতে অনেক দেরি । সেই থোড় বডি খাড়া ... খাড়া বডি থোড় !! ওর প্রফেসারের সঙ্গে যোগা যোগ করে হায়ার রিসার্চের কথা মনে মনে চিন্তা করে । বাবা ওর নামে যে টাকা রেখে গিয়েছেন সেটা নিয়ে ফরেনের কোন ভাল ইউনিভার্সিটিতে পোষ্ট ডক্টরেট রিসার্চ করলে উন্নতি আছে । বিদেশের ডিগ্রীর দাম আছে । শালিনীর থিসিসটা  এপ্লিকেশন অফ  ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্লায়েড ইলেক্ট্রনিক্সযেটা ন্যানো  ফিজিক্সের বিষয়  । বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে যোগা যোগ করতে চায়। শালিনীর প্রফেসার ওকে দিয়ে এই রিসার্চ ওয়ার্ক করিয়ে ছিলেন । নতুন বিষয়ের নতুন দিগন্ত , তাই  ভুরি ভুরি প্রশংসা পায় শালিনী । আজ বাবা বেঁচে থাকলে কখনো শালিনীকে বিয়ের জন্য উৎব্যাস্ত করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন আরো রিসার্চের জন্য । ওর প্রফেসার বিদেশে অনেক ভালো অফার পেয়েছিলেন কিন্তু উনি ভারতে ফিরে কোলকাতা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতাই  শ্রেয় মনে করেন। সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শালিনী স্কটিশে অধ্যাপিকার চাকরিতে যোগদান করে । কিন্তু ওখানেও মন বসে না কারন ও আরও অনেক রিসার্চ করতে চায় ।  নয় আমেরিকাতে গেলে সম্ভব। আমেরিকা জাওয়ার টাকা নেই। যেটুকু পুঁজি আছে সেটা ফুরলে চলবে কি করে ? তাই কোলকাতা থেকেই রিসার্চ এর চিন্তা করে।   
স্কটিশ থেকে ছুটি নিয়ে নেয় এক মাসের  ।  মনে অনেক স্বপ্ন অনেক আশা উদ্দীপনা আর আবিষ্কারের ব্যগ্রতা ওকে সব পেছনে ফেলে এগিয়ে নিয়েছে। পোষ্ট ডক্টরাল প্রোগ্রাম এর জন্য ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে  সিলেক্টেড হয় । ফেলোশিপের টাকায় অনায়াসে চলবে । আর শালিনীকে কেউ বিরক্ত করবে না বিয়ের জন্য ।
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী / মহা শিবরাত্রি / ২৭.০২.২০১৪
  

Sunday, March 9, 2014

রমলা বৌদি ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী /২৭.০২.২০১৪



রমলা বৌদি 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী /২৭.০২.২০১৪

রমলা বৌদি আমাদের পাসের বাড়িতেই থাকেন। সংসার বলতে শ্বশুর  , শ্বাশুডী এক ননদ , রমলা বৌদির   স্বামী আর এক মেয়ে  ৭ বছরের । বৌদির স্বামী সরকারী চাকরি করেন ।   মাস-গেলে ভালো মাইনে পান । সিক্সথ পে কমিশনের দয়ায় ঘরের আসবাব পত্র ভালই হয়েছে । এরিয়ারের টাকা পেয়ে বৌদির স্বামী রতন দা (আমরা রতন দা বলেই ডাকি)  একটা নতুন স্কুটার কেনেন। 
এই স্কুটার কেনার পর বৌদির হয়েছে যত রাগ রতন দার স্কুটারের ওপর । রতন  দা ফুর্তি করতে স্কুটার নিয়ে শনি রবিবার ছুটির দিনে বেড়াতে জেতে চান কিন্তু বৌদির চিন্তা মেয়ের বিয়ে নিয়ে ।  বলেন একটু একটু করে টাকা রেখে মেয়েটার জন্য কিছু সোনার গয়না গড়িয়ে রাখতে । টিভি থেকে দেখে ওই স্কিমের কথা বলেন রতন দাকে । 
রতন দা ও সবের ধার ধারেন না । বলেন, “কি হবে ? ঘরে চোর ঢোকাবে?”
হ্যাঁ যাদের ঘরে সোনা আছে তাদের ঘরে সব চোর ঢুকছে  না ! আসলে দায়িত্ব জ্ঞান কিছু নেই তোমার ! মেয়েটা যে  বড হচ্ছে খেয়াল আছে ? আমার হয়েছে যত জ্বালা। বৌদির গজ গজানি শুরু হয়। 
রতন দা তাস খেলতে বেরুন হাতে তাসের মুঠো নিয়ে । উনিও গজ গজ করেন,  “ঘরে থাকার উপায় নেই , আমার কোন স্বাধীনতা নেই কি ভাবে ? শালার নিকুচি করেছে । কউপুনি  পরে হিমালয়ে চলে যাব । তখন বুঝবে ঠ্যালা"  ।  এই বলে রতন দা তাস খেলতে বেরুন হাতে তাসের মুঠো নিয়ে । 
চা খেয়ে যাও ............
চুলোয় যাগ তোমার চা ...........!!!!
রতন দার মা বলেন “ও বৌমা ছেলেটা যে না খেয়ে গেল!” সব সময় পুরুষ মানুষকে ওরকম বললে হয় !”
রমলা বৌদি জানেন রতন দা’র রাগ শিবের রাগের মত । পার্বতী কে না দেখলে ভোলে বাবা যেমন  তাণ্ডব  নৃত্য করেন ঠিক সেইরকম  বৌ দিকে না দেখলে তার ভোলে বাবা হা হুতাশ করেন । 
মেয়েটা যে দিন দিন বড হচ্ছে । তার চিন্তায়  বৌদির  ঘুম হয় না । বৌদিকেও বলিহারি জাই ৭ বছরের মেয়ের জন্য চিন্তায় ঘুম নেই ।
রাত ১১ টায় রতন দা আসেন ঘরে । এসেই মাকে বলেন স্বভাব বসত: খেতে দিতে ।
মা ,  রুটি তরকারি ভাজা এক বাটি গরম দুধ এগিয়ে দেন । রতন দা খেয়ে সটান ঘরে ঢোকেন । তখন বৌদির মধ্য রাত্রি । হবে নাই বা কেন সেই ভোর থেকে উঠে সংসারের সমস্ত কাজ করেন  বৌদি।  ঝি রাখেন না । ঝিয়ের কাজ অপছন্দ বলে ।
রতন দা সেই সকাল ৯ টায় ভাত মাছের ঝোল ভাজা চাটনি পোস্ত সব একেবারে রুটিন বাঁধার মতন খেয়ে যান । একটু এদিক ওদিক হলে রক্ষে নেই বৌদির । গঞ্জনা শুনতে  হয় “কি রেঁধেছ ? এগুল মানুষে খায় ?”
বৌদির চিরকালের অভ্যাস । ভালো না লাগলে রাঁধুনি রাখ । আমায় ক্ষান্ত দাও । মরণ আমার ! ঘরের গৃহিণীরা যত কাজ ই করুগ না কেন তাদের কাজের কোন দাম নেই । এটাই ছাপোষা বাঙ্গালীর ঘরে নিত্যকার ঘটনা । 
বাডিতে ত ঝি ঢোকাবে না , কি করে সব পারবে শুনি ?
হ্যাঁ বাডিতে নারায়ণ আছেন , আমি অনা-ছিষ্টি করি আরকি ?  পাপ আমার হবে তোমার কি? 
ওঃ কি সেকেলেরা বাবা । মুখে পান ঠুসে রতন দা বেরন বাডি থেকে ।
সেই “বিকাশ ভবনে” পৌঁছে  কাজে লেগে যান ।কাজ বলতে পার্টি আর নতুন সরকার কে নিয়ে কিছু আলোচনা সমালোচনা এই আর কি ! হাজির হওয়াটাই বিরাট কাজ । 
রমলা বৌদি টিভি তে দেখে জানেন হাজার টাকা করে মাসে মাসে সোনার দোকানে জমা দিলে বার মাসে যা হয় তাতে এক মাসের টাকা দোকানে বেশি দেয় অর্থাৎ ১৩ হাজার টাকা দেয় ।  গায়েই নাকি লাগে না । সেই কথাটাই রতন দা কে বোঝাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ঘরে এলেই ওই এক কথা । 
 রতন দা বলেন,"গিন্নী তুমি ও ফন্দিবাজি বুঝবে না ! ওরা তোমার আমার টাকায় ব্যবসা করবে আর দেওয়ার সময় কাঁচা কলা দেবে । তুমি জখন কিনতে জাবে সেই সময়ে সোনার দাম যা থাকবে সেটা দেবে ওরা ।  বকারা ওই ফাঁদে পা দেয় । আমার টাকা সস্তা নয়"।  
তোমার স্কুটারে তেল ফেলার সময় টাকা টা সস্তা নয় । মেয়টা কি আমি বাডি থেকে নিয়ে এসে ছিলাম । আমি কি আমার জন্য বলছি? কেন তুমি বোঝ না ? 
কি বিচ্ছিরি সেন্টিমেন্টের বৌ রে বাবা । বন্দ কর তোমার লেকচার । অনেক শুনেছি এবার কুরুক্ষেত্র হবে বলে রাখলাম আমার স্কুটার নিয়ে কথা বললে ।
আমি নিজের টাকায় কিনেছি তোমার বাবা কি দিয়েছেন ওটা ?
খবরদার আমার বাবা কে নিয়ে টানবেনা বলছি ।  কেন আমার বাবা কি দোষ করেছেন যে ওনাকে টানছ ! ভাল হবে না বলছি । বলে ফুঁপিয়ে কাঁদেন । এতো বড সংসারের সমস্ত কাজ করব তার ওপর গঞ্জনা । আমার আর ভাল লাগেনা। আমি গলায় দড়ী দেব বলে রাখলাম ।
উঁ গলায় দড়ি দেবে ? বলি অত বড লাশ দড়ি সামলাবে কি করে ? ছিঁড়ে যাবে না !
মেয়েকে ছেড়ে গেলে ঘরে ভূত হয়ে ঘুরবে না !! আমায় তখ ওঝা ডাকতে হবে । 
মা ও ঘর থেকে চিৎকার করেন ওরে তোরা থামবি । পাড়া পোডশি চলে আসবে তোদের ঝগড়া শুনে ।
রাতে কি হল কি জানি সত্যি রমলা বৌদি নাকি গলায় দড়ি দিয়েছিলেন । রতন দা শুয়ে পডেছিলেন । সেই সময় সিলিং ফ্যানে কাপডের গিঁট দিয়ে ঝুলে পডেন । রতন দার কথা কিন্তু ঠিক ফলে । দড়াম করে একটা  শব্দ হয় ঘরে । রতন দা হুড-মুড করে উঠে যা দেখেন গলায় ফাঁস নিয়ে সিলিং ফ্যান শুদ্ধি রমলাদি তলায় গডা গডি খাচ্ছেন আর কাঁদছেন ।
রতন দা থর থর করে কাঁপছেন । ও ঘর থেকে রতন দার মা এসে গলার ফাঁস খোলেন ।
আর রতন দা তাস খেলেন না । মেয়ের গয়না গড়িয়েছেন তবে মাসে মাসে নয় নিজের টাকা জমিয়ে । স্কুটার বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন "রতন একটি সুবোধ বালক” ।
রমলাদি হাঁসি মুখে সংসার করছেন আর ঝগড়া নেই।  


Monday, March 3, 2014

যূথিকা রায় : তাঁর গান ও সেই সময় ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



যূথিকা রায় : তাঁর গান ও সেই সময় 

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে কলকাতার মানুষ যখন দক্ষিণ কলকাতার রামকৃষ্ণ সেবাপ্রতিষ্ঠান হাসপাতাল চত্বরে হামলে পড়েছে অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের শারীরিক অবস্থা জানার জন্য, তখনই ঐ হাসপাতালের কোন একটি ওয়ার্ডে সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘ঢুলি’ ছায়াছবির এক নেপথ্য সঙ্গীত শিল্পী, ৯৩ বছরের এক বৃদ্ধা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে শায়িত ছিলেন সকলের আগ্রহের অন্তরালে । 

সুচিত্রা সেনের মৃত্যুর তিন সপ্তাহ পরে তিনি মারা গেলেন ৬ই ফেব্রুয়ারি রাত্রি এগারোটায় । চলে গেলেন আধুনিক ‘মীরা বাঈ’ যূথিকা রায় । না, ‘ছায়াছবির নেপথ্য গায়িকা’ এটা কোন পরিচয়ই নয় যূথিকা রায়ের । বাঙালি যখন সবে গান শুনতে শুরু করেছে রেডিও বা কলের গানে, যূথিকা রায় সেই সময়ের সঙ্গীত শিল্পী । বলা সঙ্গত যে, বাংলা গানের যথার্থ আধুনিক হয়ে ওঠা বা বাংলা গানে পরিশীলিত সাঙ্গীতিক রুচি তথা আধুনিকতার নির্মাণ যাঁদের হাতে হয়েছিল তাদেরই একজন ছিলেন যূথিকা রায় । 

১৯৫০/৫২এ আট কি দশ বছর বয়সে তখনও গান শোনার কান তৈরী হয়নি । একটা চারচৌকো কাঠের বাক্স যাকে রেডিও বলা হ’ত, তাতে যখন মীরার ভজন ভেসে আসতো ‘মায়নে চাকর রাখো জী’ কিংবা ‘মেরে তো গিরিধারি গোপাল’ তখন কে মীরা বাঈ এসব জানার কথা নয় আমার । এবং বলতে লজ্জা নেই এইসব গান যিনি গাইতেন তাঁকেই ‘মীরাবাঈ’ বলে জানতাম । অনেক পরে চিতোর বেড়াতে গিয়ে গাইড যখন একটা ছোট ঘরের ভগ্নাবশেষ দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল ঐ ঘরে বসেই নাকি মীরা তাঁর গিরিধারী নাগরের ভজনা করতেন, তখন যূথিকা রায়ের কথা আর তাঁর কন্ঠস্বর সামনে ভেসে আসতো । একেই বোধহয় ‘লিজেন্ড’ হয়ে যাওয়া বলে ! কিন্তু মীরার ভজন দিয়ে শুরু হয়নি তাঁর সাঙ্গীতিক জীবন, শুরু হয়েছিল আধুনিক বাংলা গান দিয়ে । 

যূথিকা রায়ের জন্ম ১৯২০র ১৬ই এপ্রিল হাওড়া জেলার আমতায় । ঐ একই বছরে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা গানের দুই প্রবাদপ্রতীম সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর মান্না দে । মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার হাত ধরে কলকাতায় এসেছিলেন বেতারে গান গাইতে । কলকাতা বেতারের তখন নিতান্ত শৈশব কাল । মাত্র একবছর আগে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, পঙ্কজ কুমার মল্লিক প্রমুখের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলকাতা রেডিওর পত্তন হয়েছে ১৯২৭এর ১৬ই অগস্ট । ঐ বছরেই বৃটিশ ভারতে প্রথম রেডিও সম্প্রচার শুরু হয় বোম্বাই বেতার কেন্দ্র থেকে ২৩শে জুলাই । তখনও প্রায় কারো ঘরেই রেডিও সেট পৌঁছায়নি । কানে হেডফোন লাগিয়ে বেতারের সম্প্রচারিত কথা শোনা যেতো । কিছু সম্ভ্রান্ত ঘরে রেডিও সেট ঢুকলো আরো কিছুদিন পরে । তখন বিনোদন মূলক বাংলা গান বলতে গ্রামফোন রেকর্ডে লালচাঁদ বড়াল, কৃষ্ণ ভামিনী, ইন্দুবালা, হরিমতী, কমলা ঝরিয়ার প্রেম ও ছলনামূলক ও দেহতত্বের গান, কৃষ্ণ চন্দ্র দের কীর্তনাঙ্গের গান, আর ক্বচ্চিত ‘রবিবাবুর গান’ লেবেলে দু একটি রবীন্দ্রনাথের লেখা গান । তখনও বাংলা গানের পরিশীলিত গায়ন-রুচি তৈরী হয় নি । বাংলা রেকর্ডের গানের বয়সই তখন মাত্র ছাব্বিশ বছর । ১৯০২ সালে কলের গানের প্রথম রেকর্ড চালু হওয়ার পর পরিশীলিত গায়ন-রুচি তৈরী হতে লেগে গিয়েছিল আরো কুড়ি পঁচিশটা বছর । 

মাত্র ১৪ বছর বয়সে যূথিকা রায় প্রথম গ্রামফোন রেকর্ডে গান গাইলেন ১৯৩৪এ কাজী নজরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে । নজরুল তখন কাব্যভুবন থেকে চলে এসে গ্রামোফোন কোম্পানির মাস মাইনের সঙ্গীত পরিচালক । গ্রামোফোন কোম্পানির সর্বময় কর্তা । বস্তুত বাংলা গানের স্বর্নযুগের সূচনা হয়েছিল নজরুলের হাতেই । কুকুর-মার্কা এইচ এম ভি’র লেবেলে যুথিকা দুটি গান রেকর্ড করলেন প্রণব রায়ের কথা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে, ‘আমি ভোরের যূথিকা’ এবং ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’ । যূথিকা রায়ের সেই প্রথম রেকর্ডের গান প্রসঙ্গে বাংলা গানের জীবন্ত তথ্যকোষ প্রয়াত বিমান মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ উদ্ধৃত করি, 

“যূথিকা রায়ের নামে বাজারে রেকর্ড বেরুল - আমি ভোরের যূথিকা আর ওই বিখ্যাত সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে - যে গানটাকে এখনকার গবেষক বিশেষজ্ঞরাও অনেকে, আধুনিক বাংলা গান সরণীটির প্রথম মাইলফলক বলে চিহ্নিত করেছেন। কারুর কাছে এটা হয়ত প্রশ্নাতীত নাও হতে পারে, তবু এ গান যে ইতিহাসের উপাদান হয়ে গেছে - তাতে কিন্তু কোনরকম দ্বিমত নেই। সেই বোধহয় রেকর্ডের বাংলা গানে, প্রথম অর্কেস্ট্রা তৈরি হল।... তা, রেকর্ডখানা বাজারে বেরুল। আর মাত্র তিন মাসের মধ্যে যূথিকাদির এই রেকর্ডখানা ষাট হাজার কপি বিক্রী হয়ে গিয়ে বাজারে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিল। রাতারাতি যূথিকাদি হয়ে গেলো আর্টিস্ট, স্টার।’’ (‘বিমানে বিমানে আলোকের গানে” : শীতাংশুশেখর ঘোষ, পৃ ১৫৪-৫৫)। 

তিরিশের দশক বাংলা গানের সুবর্নযুগের সূচনাকাল । ১৯৩২এ শচীন দেববর্মণ প্রথম বেতার ও গ্রামফোনের গানে প্রবেশ করলেন, ১৯৩২এই বাংলা চলচ্চিত্র নির্বাক যুগ পেরিয়ে সবাক হ’ল, ১৯৩৭এ ‘মুক্তি’ ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালক পঙ্কজ কুমার মল্লিক ছায়াছবিতে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ ঘটালেন । শচীন দেববর্মণ ও সুরসাগর হিমাংশু দত্তের যুগলবন্দির সুরবৈচিত্রে বাংলা গান যথার্থ অর্থেই আধুনিক হয়ে উঠলো। বাংলা গানের কথায় কাব্যের লাবণ্য এল এই সময়ের গানে । এই পর্বেই যূথিকা রায় আধুনিক বাংলা গানের সুবর্ন যুগের নির্মাণে অবিসংবাদী ভূমিকা রেখে গেলেন তাঁর স্বকীয় গায়নশৈলী ও কন্ঠ মাধুর্যের গুনে । ১৪বছর বয়সে প্রথম রেকর্ডের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর গ্রামফোন কোম্পানি একের পর এক কমল দাশগুপ্তর সুরে আধুনিক বাংলা গানের রেকর্ড করাতে লাগলেন । সুরকার কমল দাশগুপ্তর প্রতিষ্ঠার পেছনে যূথিকা রায়েরও অবদান বড় কম ছিলনা । কারণ যূথিকা রায়ের প্রায় সব গানের সুরকার ছিলেন তিনি । যূথিকা রায়ের সংগীতজীবনের প্রায় সবটাই জুড়ে ছিলেন কমল দাশগুপ্ত । নজরুল ইসলাম তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন আর পরবর্তীতে শুধুই কমল দাশগুপ্ত । প্রথম রেকর্ড করেছিলেন নজরুল ইসলামের লেখা ও সুরে কিন্তু যে কোন কারণে সেই রেকর্ড প্রকাশিত হয়নি । হয়তো স্বয়ং নজরুলেরই তা পছন্দ হয়নি । তিনিই তখন কমল দাশগুপ্ত কে সুর করতে বলেন । ১৯৩৯এ নজরুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন । তারপর তো বাক-শক্তিই হারালেন । 

যূথিকা রায় নজরুলের অনেকগুলি গান রেকর্ডে গেয়েছিলেন । তাঁর গাওয়া নজরুলের গানের মধ্যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় গান ছিল ‘ওরে নীল যমুনার জল’ এবং ‘তোমার কালো রূপে যাক না ডুবে সকল কালো মম, হে কৃষ্ণ প্রিয়তম’ । দুটি গানেরই সুর করেছিলেন কমল দাশগুপ্ত । 

এই সময় থেকে যূথিকা আধুনিক বাংলা গান থেকে ভক্তিমূলক – প্রধানতঃ ভজন গানে চলে এলেন । যুথিকা স্মৃতিচারণ করেছেন “এরপর প্রথমে কমল দাশগুপ্ত আমাকে একটা মীরার ভজন শেখালেন, সেই মীরার ভজন যখন দাঁড়িয়ে গেল, পপুলার হলো, ফার্স্ট যখন ‘মীরা কে প্রভু সাঁচী দাসী বানাও’ - এই গানটা বেরিয়ে পপুলার হলো, তখন ওই গ্রামোফোন কোম্পানির থেকে বলা হলো, যতগুলো মীরার ভজন আছে সব যূথিকাকে দিয়ে গাওয়ানো হবে । 

চল্লিশের দশক –বাংলা গানের ভুবন যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে । হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, সত্য চৌধুরী, সুধীরলাল চক্রবর্তী, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, বেচু দত্ত প্রমুখ অনেক শিল্পী, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, মোহিনী চৌধুরী, অজয় ভট্টাচার্যর মত গানের কথাকার, দুর্গা সেন, অনুপম ঘটক, নচিকেতা ঘোষ, সলিল চৌধুরীর মত সুরকার সেই সময়ের ফসল । 

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পনেরো বছর বয়সে প্রথম বেতারে গান গাইলেন ১৯৩৫এ, ১৯৩৭ এ তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বেরিয়ে গেল ‘কথা কয়োনাকো, শুধু শোন’ ও ‘জানিতে যদিগো তুমি’ । বাংলা গানের ভুবনে অনেক শিল্পীর আবির্ভাব সত্বেও আধুনিক বাংলা গানের বাইরে যে অন্য ধারার গান সেখানে গায়নশৈলীর স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে রইলেন যূথিকা রায় । 

তাঁর সঙ্গীত জীবনের প্রথম পর্বের গানগুলিতে রোমান্টিকতার সঙ্গে পাওয়া যায় একটা বিষাদ বিষন্নতার ছবি, আর ভজন গানে তাঁর গায়কীতে বিভোর, তন্ময় আত্মনিবেদন । একের পর এক মীরার ভজন গাইতে গাইতে ‘আধুনিক মীরা বাঈ’এর পরিচিতি পেয়ে গেলেন যূথিকা রায় । প্রায় তাঁর সমকালেই পন্ডিত ডিভি পালুশকর কিংবা অনেক পরে অনুপ জলোটা এবং আরো অনেক শিল্পী ভারতজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন কিন্তু মীরার ভজন গানে যূথিকা রায়ের যে শ্রদ্ধার আসন তাকে স্পর্শ করতে পারেননি কেউ । এই ‘আধুনিক মীরা’ হয়ে ওঠা তাকে বিরল সম্মান এনে দিয়েছিল । সেসব কথা যুথিকা নিজেই লিখে গেছেন তার স্মৃতিচারণ মূলক বই “আজও মনে পড়ে”তে এবং নানান সাক্ষাৎকারে । 

১৯৪৭এর পনেরোই অগষ্ট । সেদিন রেডিওতে যুথিকার গানের সিটিং ছিল । ঘটনাক্রমে সেদিন লালকেল্লায় স্বাধীন ভারতে প্রথম জাতীয় পতাকা তুলবেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু । যুথিকার পনেরো মিনিটের রেডিও সিটিং শেষ হয়েছে, ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত । তখনই টেলিফোনে সংবাদ এলো, প্রধান মন্ত্রী নেহেরু চাইছেন জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পুরো সময়টা রেডিওতে যেন যুথিকা রায় গান গাইতে থাকেন । নেহেরু তখন তিনমূর্তি ভবন থেকে লালকেল্লার পথে রওনা দিয়েছেন । যূথিকা আবার বসলেন গান গাইতে । গান্ধীজীর প্রিয় রামধুন ভজন ও দেশভক্তিমূলক সহ সাত/আটটি গান গেয়েছিলেন জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় । যূথিকার এমনই প্রবল জনপ্রিয়তা ছিল । নেহেরু নিশ্চয়ই জানতেন গান্ধীজী তাঁর দৈনিক প্রার্থনার আগে যূথিকার ভজন শুনতেন । 

১৯৪৬এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় গান্ধীজী কলকাতায় এসেছিলেন সত্যাগ্রহে । মঞ্চে ডেকে নিয়েছিলেন যূথিকাকে, তাঁর ভাষণের আগে গান গেয়েছিলেন যূথিকা রায় । 

তখন ছায়াছবিতে গান গাওয়া যে কোন শিল্পীর খুব কাঙ্খিত ছিল, শিল্পীর জনপ্রিয়তার একটা মাপকাঠি ছিল ছায়াছবিতে গান করা । কিন্তু ছায়াছবিতে গান করা যূথিকাকে টানেনি একদম । তিনি যে তন্ময়তায় ভজন গাইতেন তেমন পরিবেশ তখনকার সিনেমায় থাকতো না বলেই মনে করতেন যূথিকা । এ ব্যাপারে তাঁর মায়ের রক্ষণশীলতাও তাঁর সিনেমায় গান না করার একটা কারণ ছিল । তবু দুটি ছায়াছবিতে তিনি নেপথ্য সঙ্গীতে ছিলেন । তখনকার প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক দেবকী কুমার বসুর হিন্দি ছবি ‘রত্নদীপ’ ছবিতে, মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫১তে এবং পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতপ্রধান ছবি ‘ঢুলি’, ১৯৫৪ তে । তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে আর কোন বাংলা বা হিন্দি ছায়াছবিতে তিনি গান করেননি । 

বস্তুত পঞ্চাশ দশকের শেষ থেকেই তিনি অনুষ্ঠানে গান করা ছাড়া রেকর্ডের গান করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন । তাঁর প্রায় সব গানের সুরকার কমল দাশগুপ্তের সৃষ্টিশীলতাও কমে যায় । অসুস্থতার কারণে রেকর্ডে সুর করা বন্ধ করে দিলেন । যূথিকাও গানের নতুন গান রেকর্ড করা বন্ধ করে দিলেন । এই সময় শ্যামল গুপ্তর লেখা কয়েকটি গানে নিজে সুরও দিয়েছিলেন যূথিকা । আর অন্যকোন সুরকারের সুরে যূথিকাতো গানই করেনইনি । কমল দাশগুপ্ত রেকর্ডের গানে সুর করা বন্ধ করে দেওয়ার পর গ্রামফোন কোম্পানী তাঁর ইচ্ছামত যে কোন ট্রেনারের সঙ্গে গান করার অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু যূথিকা অন্য কোন ট্রেনারের প্রশিক্ষণে গান করায় সম্মত হননি যদিও তখনও তাঁর কন্ঠে গান ছিল আর তাঁর গানের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা ছিল । তখন তিনি রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদের গানে চলে এলেন । এইসময় বাংলা ও হিন্দি ছাড়া উর্দু ও তামিল ভাষাতেও ভক্তিমূলক গান করেছিলেন তিনি । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান করেননি । অবশ্য যূথিকা রায়ের সঙ্গীত জীবনের শীর্ষ সময়ে রবীন্দ্রনাথের গান বাঙ্গালির কাছে এখনকার মত সর্বগ্রাসী ছিলই না বরং বলা ভালো ১৯৬১তে তাঁর শতবার্ষিকীর আগে বাঙ্গালির রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার কানই তৈরী হয়নি । অথচ মজার কথা সাত বছর বয়সে বেতারে যূথিকার প্রথম গানটিই ছিল রবীন্দ্র নাথের ‘আর রেখোনা আঁধারে, আমায় দেখতে দাও’ । 

জন্ম হাওড়া জেলার আমতা, পরিবারের আদিবাড়ি খুলনা জেলার সেনেটি গ্রাম । শৈশবশিক্ষা, গানকে ভালোবাসার শুরু সেখানেই, তারপর ১৯৩০ থেকে কলকাতায় পাকাপাকি বাস । আর গানেরতো কোন দেশ কাল হয় না । বয়সও হয়না । বিস্ময় লাগে, এই সেদিন, ২০১৩র পূজোর ঠিক আগে, ৯৩বছর বয়সে মুম্বাইতে গানের অনুষ্ঠান করলেন । সেটাই তাঁর শেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান । রেকর্ডে গান করা ছেড়ে দেবার অনেকদিন পরে বিশেষ অনুরোধে একটি সাঁইবাবার ভজন রেকর্ড করেন ১৯৭৬এ এবং এটি তাঁর শেষ রেকর্ডের গান । 

সময়ের স্রোত হয়তো আমাদের অনেক কিছুই ভুলিয়ে দেয়, তার মধ্যে অস্বাভাবিকতাও নেই কিছুমাত্র, তবু শিল্পীর সৃষ্টি বেঁচে থাকে । যতদিন গানশোনা মানুষ ‘মীরার ভজন’ শুনতে চাইবেন, তাঁকে বোধকরি ‘আধুনিক মীরা’ যূথিকা রায়ের গানের কাছে যেতে হবে ।

Saturday, March 1, 2014

অজিতেশের সন্ধানে... উজ্জ্বল চক্রবর্তী

অজিতেশের সন্ধানে...
সুদূর শিল্পাঞ্চল থেকে কলকাতায় আসার পর অল্প দিনের মধ্যেই বাংলা থিয়েটারে তাঁর নাম জুড়ে গিয়েছিল শম্ভু মিত্র এবং উৎপল দত্তের সঙ্গে। একের পর এক মঞ্চসফল প্রযোজনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র, যাত্রা, রেডিও— অভিনয় শিল্পের প্রতিটি মাধ্যমেই নিজের প্রতিভার ছাপ রেখেছেন। নাট্যকার হিসেবেও তিনি খ্যাত। বাংলা নাট্যমঞ্চে তিনি, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও মিথ। লেখা ও সাক্ষাৎকার: উজ্জ্বল চক্রবর্তী
বিশ্বের খ্যাতনামা নাট্যকারদের নাটক এই বঙ্গে বসে দেখছেন বাঙালি দর্শক। দেখে হাসছেন, কাঁদছেন, রেগে যাচ্ছেন, কখনও বা ভয়ে শিউরে উঠছেন। বিষয় বৈচিত্রে বা ভাবনাগত নতুনত্বে চমকে উঠছেন। বিভিন্ন চরিত্রকে ঘরের মানুষ বলে মেনে নিচ্ছেন। তর্ক জুড়ছেন নিজেদের মধ্যে। অর্ধশতাব্দীরও আগে বঙ্গ থিয়েটারকে বিশ্ব থিয়েটারের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন যিনি তাঁর নাম অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজস্ব কৌশলে আমৃত্যু তিনি সেই কাজটাই করে গিয়েছেন। ছ’ফুটের উপর লম্বা। বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। আশ্চর্য চাহনি। প্রাণখোলা হাসি। দাপিয়ে অভিনয় করছেন মঞ্চে, গান গাইছেন, নাচছেন। প্রযোজনা নিয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন কলকাতা থেকে সারা বাংলা। বাংলার বাইরে। নেপথ্যে চলছে নাটক লেখা, নাটক নির্মাণ, নির্দেশনা, সংগঠন সামলানো, স্কুলে পড়ানো। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগে এমন শিল্পমুখী প্রতিভা বাঙালি দেখেছে কি না সন্দেহ। শুধু কি বাংলা থিয়েটার! রেডিও নাটক, সিনেমা, যাত্রা, কবিতা লেখা, সবেতেই নিমজ্জিত ছিলেন বাংলা মঞ্চের এই ‘শের আফগান’।
জন্ম, ছেলেবেলা ও পড়াশোনা
অধুনা পুরুলিয়া তখন মানভূম। ১৯৩৩-এর ৩০ সেপ্টেম্বর সেখানকার রোপো গ্রামে মামাবাড়িতে জন্মালেন অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। বেশ কয়েক বছর পরে কলকাতায় পা রেখে যে নাম পরিবর্তিত হবে অজিতেশে। নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত মজা করে বললেন, “সে সময় বাংলা রঙ্গমঞ্চে বেশ কয়েক জন অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ করছেন। আমার মনে হয়, অজিত বুঝতে পেরেছিল, ওর খুব নাম হবে। ভবিষ্যতে যাতে দর্শক বাকি অজিতদের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলে তাই ও অজিতেশ হয়েছিল।”

‘তিন পয়সার পালা’য় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেয়া চক্রবর্তী।
ভুবনমোহন ও লক্ষ্মীরানির বড় ছেলে অজিত। বাবা কোলিয়ারিতে কাজ করেন। আসানসোল শিল্পাঞ্চলের রামনগরে। একটু বড় হতেই অজিত দেখলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সেটা ১৯৪২, তখন তার বয়স বছর নয়েক। জাপানি বোমার ভয়ে ভুবনমোহন তাঁকে পুরুলিয়ার ঝালদায় এক আত্মীয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে অজিত তিনটি বিষয়ের প্রেমে পড়ে গেলেন— ফুটবল, রাজনীতি এবং থিয়েটার। প্রথমটির ঘোর অল্প দিনের মধ্যেই কেটে যায়। দ্বিতীয়টিতে প্রভাবিত করে গাঁধীজির লেখা। কিন্তু পরের দিকে কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকেছিলেন। বেশ কিছু কাল সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলেন। তবে থিয়েটারের মগ্নতা আমৃত্যু কাটাতে পারেননি অজিত। ঝালদা থেকে বছরখানেকের মধ্যেই ফিরে এলেন রামনগর। কুলটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর ভুবনমোহন বদলি হয়ে গেলেন ঝরিয়ার কাছে চাসনালায়। সেখানেই নাট্যগুরুর দেখা পেলেন অজিত। নাম প্রবোধবিকাশ চৌধুরী। তাঁর সঙ্গেই পাথরডি রেলওয়ে ইনস্টিটিউটে ‘টিপু সুলতান’-এ জীবনের প্রথম অভিনয় করেন অজিত। হস্টেলে থেকে চলতে থাকে পড়াশোনা এবং নাটক। স্কুল শেষে অজিত ভর্তি হলেন আসানসোলের বিবি কলেজে। সেখান থেকে আইএ পাশ করে কলকাতা এলেন ১৯৫৩ সালে। ভর্তি হলেন মণীন্দ্র কলেজে।
গণনাট্য সঙ্ঘ থেকে নান্দীকার
ইংরেজির স্নাতক অজিত শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দিলেন। পাশাপাশি তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। বাগুইআটির হিন্দু বিদ্যাপীঠের ইংরেজির শিক্ষক, পার্টি কর্মী, তথা গণনাট্য সঙ্ঘ পাতিপুকুর শাখার শিল্পী অজিতকে তখন সবাই এক ডাকে চেনে। দমদম আঞ্চলিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর দায়িত্ব পড়ে গণনাট্য সঙ্ঘের চারটি শাখাকে মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযোজনা তৈরি করার। মঞ্চস্থ হল ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। তার পর ধারাবাহিক ভাবে সঙ্ঘের কাজ করেছেন তিনি, মূলত থিয়েটারকে আঁকড়ে। প্রথম দিকে তারই শাখা হিসেবে কাজ করত ‘নান্দীকার’। কিন্তু সঙ্ঘের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব আর বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে। তাই গণনাট্য সঙ্ঘ থেকে সরে এসে ১৯৬০-এর ২৯ জুন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে, দীপেন্দ্র সেনগুপ্ত এবং অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহায়তায় স্বতন্ত্র সত্তায় আত্মপ্রকাশ করল ‘নান্দীকার’। এর পর প্রায় ১৭ বছর এই সংগঠনের সঙ্গে থিয়েটারকে নিয়ে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছিলেন অজিতেশ।

‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’তে মঞ্জু ভট্টাচার্য এবং অজিতেশ

‘পাপপুণ্য’তে অভিনেত্রী সন্ধ্যা দে-র সঙ্গে
এই দলের প্রথম নাটক ইবসেনের ‘ঘোস্টস’। বাংলায় ‘বিদেহী’। একটি মাত্র অভিনয়ের পর বন্ধ হয়ে যায় এই নাটকের শো। ’৬০-’৬১-তে পর পর কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করে নান্দীকার। মৌলিক এবং বিদেশি নাটক নির্ভর ‘দাও ফিরে সে অরণ্য’, ‘সেতুবন্ধন’, ‘চার অধ্যায়’, ‘প্রস্তাব’ করার পর ১৯৬১ সালের ১২ নভেম্বর অভিনীত হল ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র’। এই নাটক বাংলা থিয়েটারে নান্দীকার-এর নাম দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মূল নাটক লুইজি পিরানদেল্লো-র ‘সিক্স ক্যারেক্টার্স ইন সার্চ অফ অ্যান অথর’। বঙ্গীয়করণ করেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। এর পর অজিতেশের নির্দেশনায় একের পর এক মঞ্চসফল প্রযোজনা করেছে নান্দীকার। ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’, ‘যখন একা’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘তিন পয়সার পালা’, ‘শের আফগান’, ‘ভাল মানুষ’— তালিকায় নাম বাড়তেই থাকে। নির্দেশনার পাশাপাশি নাটকের গান তৈরি করা, সে গানের সুর দেওয়া, বিদেশি নাটকের আত্তীকরণ, মৌলিক নাটক লেখা— সবই চলতে থাকে অজিতেশের। নান্দীকার তখন বাংলা নাট্যমঞ্চের হীরকখনি।
নান্দীকার থেকে নান্দীমুখ
১৯৭৭-এ ‘সাংগঠনিক কারণ’-এ নিজেরই তৈরি করা দল নান্দীকার ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন অজিতেশ। ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি গঠন করলেন নতুন সংস্থা, ‘নান্দীমুখ’। প্রথম দিকে নান্দীকারে করা তাঁর পুরনো নাটকগুলিই মঞ্চস্থ করত নান্দীমুখ। ‘নানা রঙের দিন’, ‘শের আফগান’, ‘তামাকু সেবনের অপকারিতা’, ‘প্রস্তাব’ ইত্যাদি নাটক দিয়েই পথ চলতে থাকে অজিতেশের নতুন দল।

‘পাপপুণ্য’
এর পর লিও তলস্তয়ের ‘পাওয়ার অফ ডার্কনেস’ অবলম্বনে নান্দীমুখ মঞ্চস্থ করে ‘পাপপুণ্য’। নান্দীকারে এ নাটকের একটি পাঠ-অভিনয় হয়েছিল। তার পরই দল ছাড়েন অজিতেশ। তাই ‘পাপপুণ্য’ মঞ্চে উপস্থাপিত হয় ১৯৭৮ সালে, তলস্তয়ের জন্মের সার্ধশতবর্ষে। এ নাটকে নিতাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করলেন অজিতেশ এবং আদুরির চরিত্রে সন্ধ্যা দে। এর পর হ্যারল্ড পিন্টারের ‘দ্য বার্থ ডে পার্টি’ অবলম্বনে অজিতেশ মঞ্চস্থ করলেন ‘৩৩তম জন্মদিন’। বাংলা নাটকের ইতিহাসে এই দু’টি নাটক জায়গা করে নিয়েছে তার যোগ্যতার কারণেই। কিন্তু সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার পাওয়া অজিতেশের অকালমৃত্যু এই দলকে স্তিমিত করে দেয়।
নাট্যকার অজিতেশ
বিদেশে বসে লেখা, সে দেশের পটভূমিতে লেখা বিভিন্ন নাটক অজিতেশের ছোঁয়ায় হয়ে উঠত ঘরের নাটক। এই বাংলার নাটক। ভিন্ন দেশ-কাল-পরিবেশ-পরিস্থিতি-পাত্রপাত্রী যেন হয়ে উঠত একান্ত ভাবেই এ দেশের। বা বলা ভাল, এই বঙ্গের। ব্রেখট, ইবসেন, চেখভ, পিরানদেল্লো, ওয়েস্কার, পিন্টার— বিশ্ব নাট্যমানচিত্রের এই সব স্থপতির সঙ্গে বাঙালির পরিচয় অজিতেশের হাত ধরে। এঁদের নাটকের অনুবাদ নয়, বঙ্গীয়করণ করে তিনি উপস্থাপন করতেন মঞ্চে।

‘তিন পয়সার পালা’য় অজিতেশ, রুদ্রপ্রসাদ এবং কেয়া
“তার আগে তোরা ক’জন জামা-ফামা গায়ে দে মাইরি। তোর তো জন্ম ইস্তক দেখে আসছি, এই এক লাল শালু গায়ে দিচ্ছিস। তোর গায়ের গন্ধে কাবলি কাঁদবে শালা। সিপাহী বিদ্দোহের পর এটা আর কাচিসনি নাকি বে! দ্যাখ দি-নি কোমরে গামছা বেঁধে ডাঁরিয়ে আচে। তুই বরযাত্তীর না শ্মশান যাত্তীররে? ডাঁইরে ডাঁইরে হাসচে, যেন বাপ মরেচে!”
ব্রেট্রোল্ট ব্রেখট-এর ‘দ্য থ্রি পেনি অপেরা’ যখন মঞ্চে উপস্থাপন করলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন এই ভাবেই তার সংলাপ রচনা করেছিলেন। যার ফলে দর্শকদের কোনও ভাবেই মনে হয়নি তাঁরা কোনও বিদেশি নাটকের মঞ্চায়ন দেখছেন। বরং মনে হয়েছে, এই ‘তিন পয়সার পালা’য় বাংলারই কোনও এক চরিত্র মহীন তাঁদের সামনে কথা বলছে। বাঙালিয়ানার মোড়কে বিদেশি নাটক এ ভাবেই দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করতেন অজিতেশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে কি বিদেশি নাটককে এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয় বাংলা মঞ্চে? নাট্যকার এবং নির্দেশক ব্রাত্য বসু বললেন, “বিদেশি নাটকের স্থানীকরণের বিষয়টা ওই সময়ের দাবি ছিল। দরকারও ছিল। সে দাবিটা অজিতেশবাবু চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন এবং সফল হয়েছিলেন। কিন্তু এই বিশ্বায়ন পরবর্তী যুগে আমাদের থিয়েটারকে আর বিদেশি নাটকের মুখাপেক্ষী হতে হয় না। আমরা আমাদের থিয়েটারের টেক্সট নিজেরাই তৈরি করি। দেশীয় জল-হাওয়া থেকেই উঠে আসে আমাদের চরিত্র ও সংলাপ।” তিনি জানান, সময় পাল্টে গেলেও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নাটকগুলি কিন্তু বাংলা থিয়েটারের সম্পদ। এবং যত দিন বাঙালি থিয়েটার নিয়ে ভাববে তত দিন অজিতেশ থাকবেন।
অভিনেতা ও নির্দেশক অজিতেশ
অভিনয় শিল্পের সব ক’টি মাধ্যমেই কাজ করেছেন অজিতেশ। মঞ্চ নাটকে তো তিনি অবিসংবাদিত অভিনেতা ছিলেনই, বাংলা চলচ্চিত্র এবং যাত্রাশিল্পও সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর অভিনয়ে। থিয়েটারে তাঁর অভিনয় যাঁরা দেখেছেন তাঁদের স্মৃতিতে এখনও যথেষ্ট উজ্জ্বল অজিতেশ। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, সংলাপ, হাসি, গান, বাচনভঙ্গি— সবই মনে আছে তাঁদের।
‘মুদ্রারাক্ষস’
‘আন্তিগোনে’
কোনও চরিত্র করার সময় এমন ভাবে সেই চরিত্রের ভেতর ঢুকে পড়তেন, যাতে দর্শকদের কখনওই মনে হত না মঞ্চে উঠে সংলাপ বলছেন কোনও অভিনেতা। বরং সেই চরিত্র নিজেই যেন সমাজ থেকে উঠে এসে দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে তার আপনকথা। যখন যে ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, তা সে রাজা হোক বা বাবা, ম্যানেজার হোক বা লালমোহন কিংবা নিতাই, অজিতেশ যেন আদ্যোপান্ত সেই চরিত্রই। কথা বলা থেকে হাঁটাচলার ভঙ্গি, ভাষা বা শব্দের ব্যবহার, সবেতেই মাটি থেকে উঠে আসার ব্যাপারটা প্রকাশ পেত তাঁর অভিনয়ে।

ষাটের দশক থেকে তিনি সিনেমাতেও অভিনয় করা শুরু করেন। সব মিলিয়ে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। এর মধ্যে কয়েকটি হিন্দি ছবিও আছে। তপন সিংহ, নবেন্দু চট্টোপাধ্যায়, দীনেন গুপ্ত, অরুন্ধতী দেবী, মৃণাল সেন, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, তরুণ মজুমদার ছাড়াও আরও অনেক পরিচালকের নির্দেশনায় তিনি সিনেমায় অভিনয় করেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘গণদেবতা’র চলচ্চিত্রায়ণ করেন তরুণ মজুমদার। সেই ছবিতে অজিতেশের অভিনয় অবিস্মরণীয়। বৃহৎ বাঙালির কাছে অজিতেশ যে সিনেমার অভিনেতা ছিলেন এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। অন্তত এই প্রজন্মের কাছে তো বটেই।

যাত্রার ক্ষেত্রেও একই রকম সফল অজিতেশ। এবং জনপ্রিয়। গ্রামবাংলার মানুষ যাত্রাশিল্পী অজিতেশের অভিনয়ে বুঁদ হয়ে ছিল। থিয়েটারের বৃত্তের বাইরে একটা বড় সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছতেই অজিতেশের যাত্রায় যোগ দেওয়া। তিনি বলেছিলেন, “যাত্রা অনেক বেশি লোককে দেখানো যায়। জিনিসটা অনেক ছড়ানো। অনেক কথাও বলা যায়।” কিন্তু বছর তিনেক অভিনয় করার পর তিনি যাত্রা ছেড়ে দেন।

অভিনয় শিল্পের আরও একটা মাধ্যম রেডিওতে প্রচুর কাজ করেছেন অজিতেশ। তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এখনও সতেজ বাচিকশিল্পী এবং আকাশবাণী ও দূরদর্শনের প্রাক্তন কর্তা জগন্নাথ বসুর মনে। তাঁর প্রযোজনায় বহু নাটকে অভিনয় করেছেন অজিতেশ। “প্রথাগত অভিনয়ের বাইরে চরিত্র নিয়ে ভেবে সংলাপ উচ্চারণ করতেন অজিতেশবাবু। আঞ্চলিক ভাষার অভিনয়ে ওঁর কাছাকাছি কেউ ছিলেন না। ‘গিরিশ ঘোষ’ প্রযোজনায় তাঁর ‘ঠাকুর’ বলে কান্নায় ফেটে পড়ার অভিনয় আমার সারা জীবন মনে থাকবে। অভিনয়ের এমন ব্যাপ্তি আমাকে আজও অবাক করে।” জানালেন জগন্নাথবাবু।

অজিতেশের নির্দেশনায় কাজ করা শিল্পীরা আজও তাঁর গুণমুগ্ধ। যে পদ্ধতিতে শিল্পীদের দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিতেন, তা আজও তাঁদের কাছে বিস্ময়! অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কখনও শিখিয়ে দিতেন না। কিন্তু সময় দিয়ে নির্মাণ করতেন এক একটি নাট্য মুহূর্ত। মায়া ঘোষ থেকে সন্ধ্যা দে কিংবা বিভাস চক্রবর্তী থেকে পবিত্র সরকার— সকলে এক বাক্যে জানালেন এ কথা।

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত নির্দেশিত ‘ফুটবল’ নাটকের প্রথম অভিনয়ে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়
অন্য অজিতেশ
“অজিতেশের যেটা মজা, আপনার সঙ্গে কথা যখন বলবেন, তখন আপনিই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লোক তাঁর কাছে। এবং অসাধারণ হাস্যরসিক ছিলেন।” বলছিলেন পবিত্র সরকার। কথিত আছে, সকালবেলা কোনও তরুণ হয়তো অজিতেশের কাছে দেখা করতে এলেন। তাঁর সঙ্গে সারাদিনের গল্প শেষে ওই তরুণের বোধ হবে তার জীবনে আসলে একটাই কাজ, সেটা হল থিয়েটার করা। এমন মায়াময় কথা বলতেন। একই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করলেন নাট্যনির্দেশক আশিস চট্টোপাধ্যায়, “আমাদের দলের একটা অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে তাঁকে নেমন্তন্ন করতে গিয়েছি বেলেঘাটার বাড়িতে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও অপরিচিত এই নাট্যকর্মীকে অনেকটা সময় দিয়ে শুধু থিয়েটারের গল্পই করে গেলেন।” সে কারণেই বোধহয় ব্রাত্যকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, যদি কোনও ভাবে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয়, নাট্যকার হিসেবে, অভিনেতা হিসেবে এবং সংগঠক হিসেবে তিনটি প্রশ্ন করতে হলে কী কী করবেন? একটুও না ভেবে তিনি উত্তর দেন, “কোনও প্রশ্ন নয়। শুধুই গল্প করব। থিয়েটার নিয়ে গল্প।”

খেতে খুব ভালবাসতেন। এমনও শোনা যায়, মহলাকক্ষে আনা শিঙাড়ার অর্ধেকের বেশি তিনিই খেয়ে ফেলতেন। জগন্নাথ বসু তো বলেই ফেললেন, “অমন খাদ্যরসিক মানুষ আমি আর দেখিনি। এক বার রেকর্ডিং শেষে আমি আর অজিতেশবাবু গিয়েছি আকাশবাণীর ক্যান্টিনে। তখন ওখানে সিমাইয়ের পায়েস পাওয়া যেত। তিনি ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কয় বাটি পায়েস আছে?’ উত্তর এল, ‘১৯ বাটি।’ তিনি বললেন, ‘দিয়ে দিন।’ টেবিলে ১৯ বাটি পায়েস এল। আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রায় সব ক’টি বাটিই শেষ করে ফেললেন তিনি। আমি বোধহয় ২ বাটি খেয়েছিলাম তত ক্ষণে!”
শেষের সে দিন
১৯৮৩-র ১৩ অক্টোবর মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাংলা অভিনয় জগতের প্রবাদপ্রতিম এই শিল্পী। সেটা ছিল সপ্তমীর রাত। ওই সন্ধেতেই দক্ষিণ কলকাতার ‘সুজাতা সদন’-এ ‘সেই অরণ্যে’ নামের একটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। নাটক শেষে বাড়ি ফিরে একটু রাত করেই খেয়েছিলেন খাবার। তার পর হঠাৎ বুকে ব্যথা। ডাক্তার ডেকে আনার আগেই সব শেষ। সে বছরের অষ্টমীর দিন নিমতলা শ্মশানে পুড়ে শেষ হয়ে যায় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নটের দেহ।