Friday, November 22, 2013

=অপরাধীর পেছনে= (অপরাধমূলক ডিটেকটিভ কাহিনী) -বিভূতি চক্রবর্তী

=অপরাধীর পেছনে=
(
অপরাধমূলক ডিটেকটিভ কাহিনী)
-
বিভূতি চক্রবর্তী
(
১)

শুধুমাত্র তৎপরতা,'পুলিশ-কুকুরের'কেরামতি নয়,নয় কোন আধুনিক
বিশেষজ্ঞের অমূল্য সহায়তা,শুধুমাত্র তদন্তকার্যে তৎপরতার সাহায্যেও
কি করে যে চমৎকারভাবে অপরাধীদের পাকড়ানো সম্ভব,এ হলো সে রকম রোমাঞ্চকর অভিযানের একটি কাহিনী।
রাত তখন দুইটা।শান্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে রয়েছে ধূসর দিগন্তের সবুজ
আঁচলে। চরাচর নিস্তব্দ,নিঃঝুম।আমার দুচোখে ঘুম নেই। বারান্দায় সেন্ট্রি
থানা পাহারা দিচ্ছে। বাইরে শোনা যাচ্ছে বাজারের দিকে 'নাইট পেট্রল পার্টির কলরব। মাঝে মাঝে দু'একটা রাতজাগা পাখীর বিচিত্র চিৎকার।
শুধু আমার চোখেই ঘুম নেই। কেস ডায়েরীর পাতর পর পাতা লিখে চলছি
আমি-তিনটা মোকদ্দমা শেষ করতে হবে আজ রাত্রির মধ্যেই। ঊর্দ্ধ্বতন অফিসারের চাপ আর ভালো লাগে না-কাজ আর কাজ,শুরু নেই,শেষ নেই- তবুও করে যেতে হবে। অধস্তন কর্মচারীদের সেন্টিমেন্ট বলে কোন
পদার্থ আছে,এ তাঁদের কাছে একেবারেই অবিশ্বাস্য। অনেক কাজের চাপে
ব্যতিব্যস্ত মন এক এক সময় ভাবে,তাঁদের ধারণা অধস্থন অফিসারদের
জন্ম বুঝি শুধু অবিরাম কাজ করে যাওয়া আর অনবরত বকুনি খাওয়ার জন্যে।
আর 'পাবলিক'ও মনে করে,পুলিশের কাজ শুধু মানুষ পিটানো। ওঁদের
কেউ যদি দেখতেন এসে আজকের পুলিশের জীবনের করুনতম দিক,প্রতিকূল
পরিবেশের কি বন্ধুর পথ বেয়ে চলতে হয় পুলিশকে তার কর্মজীবনে,তবে
হয়তো ওঁরা আপনা থেকেই এগিয়ে আসতেন পুলিশের সাহায্যকল্পে। কেন যে
বুঝেন না ওঁরা যে ওঁদের সাহায্যের জন্যই পুলিশকে ওঁদের সাহায্য করা প্রয়োজন। আজকের সমস্যা আগেকার মতো কোন একজন বিশেষ ব্যক্তিকে নিয়ে নয়,
নয় কোন বিশেষ অপরাধী গোষ্ঠীকে নিয়ে-আজকের সমস্যা সমাজের
অনেক স্তরেই বিস্তৃত। এই সমাজিক সমস্যাজড়িত জটিলতা দূর করা একা
সাধ্যাতীত,তার জন্য জনসাধারনের সার্বিক সহানুভূতি ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

.....
চ ল বে











Top of Form

=অপরাধীর পিছনে=
(
অপরাধমূলক ডিটেকটিভ কাহিনী)

-
বিভূতি চক্রবর্তী
----------

(
পূর্ব প্রকাশিতের পর)
-
২-

......"
বড়বাবু,বড়বাবু-"
নিশুতি রাত্রির বুক চিরে এ কার আর্ত চিত্কার-হাতের লেখা থেমে গেল। আমার সেন্ট্রি
সতর্ক হয়ে দাঁড়ালো। তারপর হঠাৎ বললো-"স্যার,আপনি? কি হয়েছে?"বাইরে একটা চেনা গলা শুনলাম-"বড়বাবু কই?"আমি আমার রুম থেকে বেরিয়ে এলুম। তারপর ডাঃ রায়কে দেখে চমকে উঠলুম-"এ কি ডাক্তারবাবু,আপনি?এত রাত্রে?"
ডাঃ রায় কান্নায় ভেংগে পরলেন-বললেন,"বড়বাবু,আমার সর্বনাশ হয়েছে,একটু আগে চোরে আমার সব কিছু নিয়ে পালিয়ে গেছে।" আমি ডাঃ রায়কে সান্ত্বনা দিয়ে
বললাম,"চলুন,তাড়াতাড়ি আপনার বাড়ী যাই,ঘটনাস্থলটা দেখি কি হয়েছে?তারপর আমরা দেখবো কি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।"
অপরাধ বিজ্ঞানে ঘটনাস্থলের গুরুত্ব অপরিসীম। অপরাধী কর্তৃক কোন সূত্র পড়ে থাকতে পারে ঘটনাস্থলে যা দিয়ে সহজেই তাদের পাকরাও করা সম্ভব।তাই কালবিলম্ব
না করে এস আই চৌধুরীকে সংগে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ডাক্তারবাবুর বাড়ীর দিকে।
সংগে পাঁচজন সিপাহী।
ডাক্তারবাবুর বাড়ীতে এসে দেখলাম তাঁর স্ত্রী কান্না থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
বুঝলাম,সদ্য অপহৃত অলংকার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর শোকে তিনি মুহ্যমান। আমি এখানে অনাবশ্যক দেরী না করে ডাক্তারবাবুকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করে
নিলাম-"আচ্ছা ডাক্তারবাবু,আপনার এই বাক্সটা কোথায় থাকতো?"
ডাক্তারবাবু ঘরের কোণে একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বললেন,"এই বেঞ্চটার উপর"।
"
কাপড়-চোপড়?"
"
কিছু ঐ আলনায়,বাকীগুলি বাক্সে।"
"
টাকা?"
"
এই বাক্সেই।"
এবার ডাক্তারবাবুর স্ত্রীকে কিছু প্রশ্ন করলাম-
"
মাপ করবেন,আমি আপনার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি,তবু কয়েকটা প্রশ্নের জবাব না পেলে আমার অসুবিধা হবে"
ভদ্রমহিলা কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন,
"
বলুন"।
"
আপনি কখন টের পেয়েছেন?"
"
হঠাৎ একটা শব্দ শুনে।"
"
তারপর?"
"
শব্দটা শুনেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। অন্ধকারের মধ্যেই আমি অস্পষ্ট দেখলাম, একজন লোক ঘরের ভিতর আলনা থেকে কি যেন নিয়ে দরজায় দাঁড়ানো আর
একটি লোকের কাছে দিচ্ছে।
আমি চিৎকার করে আমার স্বামীকে ডাকতেই খোলা দরজা দিয়ে লোক দুটি পালিয়ে
যায় । আমার স্বামী জেগে উঠে আলো জ্বালান।থানায় তখন ২টার ঘন্ঠা বাজে।খোলা
দরজা দিয়ে আমদের ট্রাংকটি বারান্দায় খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।

-----
চ ল বে
Top of Form

=অপরাধীর পিছনে=
(
অপরাধমূলক ডিটেকটিভ গল্প)
-
বিভূতি চক্র বর্তী 

-৩-
......একটা মোটা মুলিবাঁশ ও বাক্সের নিকট পড়ে রয়েছে,আলনায় অনেক কাপড় ই নেই। বাক্সে আমার গহনা ছিল,ডাক্তারবাবুর ৮০০ টাকা ছিল আর কিছু গরম কাপড় ছিল-সব নিয়ে গেছে।"
ছিল-সব নিয়ে গেছে।" করুন শোনালো ডাক্তারবাবুর স্ত্রীর কন্ঠস্বর। আমি ডাক্তারবাবুকে
জিজ্ঞেস করলাম,"ডাক্তারবাবু, চোরাই জিনিসের আনুমানিক মূল্য কত হবে?"
“
অন্তত হাজার ত্রিশেক টাকা তো হবেই"।
ঐ সব কথা শোনার ফাঁকে ফাঁকে আমি ঘটনাস্থলটি দেখে যাচ্ছিলাম। কয়েকটা বস্তার টুকরা
-
যাতে ধূলার দাগ,একটা আনুমানিক ৪ ফুট শক্ত মুলি বাঁশের গুড়ি আর খোলা বাক্সটি ছাড়া
ঘটনাস্থলে উল্লেখযোগ্য আর কিছুই চোখে পড়লো না। ঘরের ভিতরে একবার তাকিয়ে দেখলাম,দরজার উপরে স্কাইলাইটের ঢাকনাটা বাইরের দিক থেকে খোলা-আর কাঁচের
ধূলার আস্তরনের উপর আলগা আলগা দাগ। সন্দেহ হলো,ঐ রাস্তা দিয়েই চোর এসেছে-
নিজের আংগুলের ছাপ না রাখার জন্যে হয়তো বাঁশের মাথায় বস্তার টুকরা বেঁধে
স্কাইলাইটের ঢাকনা ভিতরের দিকে ঠেলে দিয়েছে,তারপর ঐ রাস্তা দিয়ে একজন ভিতরে ঢুকে দরজা
খুলে দিয়েছে। চোরের সংখ্যা আনুমানিক ৩।৪ জন হবে। আর কোন জিনিষই সেখানে পেলাম না। অপরাধীদেরও কোন পাত্তা মিললো না। ডাক্তারবাবুকে বললাম,"ঘটনাস্থলটা যাতে ডিসটার্ব
না করা হয় দেখবেন,আমি ঘুরে আসছি।বাকী রাতটা আপনারা একটু ঘুমিয়ে নিন।"

* * * *

রাত ৩টা। এ এস আই চৌধুরীকে ও সিপাহীদের সংগে নিয়ে চললাম, উদয়পুরের
একটা ট্যাক্সি নিলাম সংগে। হঠাৎ পথে এক যায়গায় এসে দেখলাম কয়েক জোড়া স্পষ্ট
পায়ের ছাপ, জুতার ছাপটা সম্পর্কে নোট রাখলাম,তারপর এগিয়ে চললাম।

এইভাবে আমরা মহারাণী পর্য্যন্ত চলে এলাম। পায়ের ছাপ অনেক আগেই
অদৃশ্য হয়েছিল,তবু মহারাণী চলে এলাম এইজন্য যে অপরাধীরা উদয়পুরের দিকে গেলে
মহারাণী খেয়া পার হবেই। আমি সিপাহীদের ঐ খেয়াঘাটে থেকে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের
জন্য অপেক্ষা করতে বললাম,তাদের যথারীতি উপদেশ দিয়ে দিলাম। রাত শেষ হয়ে এসেছে-পূব আকাশে তখন শুরু হয়েছে রংএর খেলা। কে যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে এই অরণ্য পর্বতে।
মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম অদৃশ্য মহাশিল্পীর আঁকা এই সব অতুলনীয় চিত্রসম্ভার- ভোরের আকাশ, ভোরের বাতাস,সবুজ উপত্যকা- সব মিলিয়ে এ যেন এক
রূপকথার রাজ্য। .........

.........
। চ ল বে
Top of Form


=অপরাধীর পিছনে=
(
অপরাধমূলক ডিটেকটিভ গল্প)
-
বিভূতি চক্রবর্তী
(
৪)
...... এস,আই চৌধুরীর ডাকে সম্বিত ফিরে এলো-"স্যার,ঐ যে মহারাণী
ফরেষ্টের শ্রমিকেরা কাজ করছে বাগানে।" ঘড়িতে দেখলাম বিকাল ৪টা বাজে। ট্যাক্সি
ড্রাইভারকে নদীর ধারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে বলে এগিয়ে গেলাম মহারাণী
ফরেষ্ট অফিসের দিকে। ফরেষ্টার তখনও ঘুমুচ্ছিলেন-ওকে না তুলে হেড গার্ডের কাছে জানতে চাইলাম কয়েক ঘন্টার মধ্যে কোন লোক এদিক দিয়ে গেছে কিনা।

হেড গার্ড আমাদের চিনতো। তাড়াতাড়ি কাছে এসে জানালো যে গত ২।৩ ঘণ্টার মধ্যে
কোন অপরিচিত লোকই এ রাস্তা দিয়ে যায় নি। আমি তাকে অনুরোধ করলাম সে
যেন একটু নজর রাখে,আর কোন সন্দেহভাজন লোক দেখলে মহারাণী
খেয়াঘাটে আমার পুলিশ পার্টির কাছে খবর দেয়।
হঠাৎ রাস্তার উপর পায়ের ছাপ দেখলাম, ছাপ গুলি অমরপুরের দিকে গেছে।
পায়ে পায়ে আমি ও চৌধুরী ঐ সব পায়ের ছাপ অনুসরন করতে করতে মাতরংগীপাড়া
পর্যন্ত এগিয়ে এলাম। কিন্তু পায়ের ছাপ আর দেখতে পাওয়া গেল না। এই স্থানটি
থেকে অনেক দূর পর্যন্ত অনেক কিছু দেখা যায়।
সকাল হয়ে গেছে। এলাকার লোকজন চলাফিরা করতে শুরু
করেছে। আমি আমার বিশ্বস্ত কয়েকজন লোকের কাছ থেকে খবর নিয়ে জানলাম
কাল রাত্রে কোন লোকই এ গ্রামে আসে নি। নিরাশ হয়ে ভাবছিলাম- কি করা যায়।
হঠাৎ রাস্তায় আমার ট্যাক্সির চাকার দাগের উপর টাটকা ৩।৪ জোড়া পায়ের ছাপ
দেখলাম। ঐগুলি উদয়পুরের দিকে গেছে। এর মধ্যে ৩ জোড়া দাগ জুতার। এই
জুতার দাগ আমি অমরপুরে ও পথে আরো দেখেছি। মাতরংগীতে গাড়ীটা ছেড়ে
পায়ের ছাপ ধরে ধরে আমি ও চৌধুরী এগিয়ে চললাম। ড্রাইভারকে বললাম-
মহারাণী থেকে পার্টিটা নিয়ে কিছুক্ষন পরে আমার সংগে দেখা করতে।...............
..........................................
। চ ল বে

-------------------------------------------------------------------
=অপরাধীর পিছনে= 
         (অপরাধমূলক ডিটেকটিভ গল্প)
            -বিভূতি চক্রবর্তী
             (৪)
                 ...... এস,আই চৌধুরীর ডাকে সম্বিত ফিরে এলো-"স্যার,ঐ যে মহারাণী
    ফরেষ্টের শ্রমিকেরা কাজ করছে বাগানে।" ঘড়িতে দেখলাম বিকাল ৪টা বাজে। ট্যাক্সি 
    ড্রাইভারকে নদীর ধারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে বলে এগিয়ে গেলাম মহারাণী 
    ফরেষ্ট অফিসের দিকে। ফরেষ্টার তখনও ঘুমুচ্ছিলেন-ওকে না তুলে হেড গার্ডের               কাছে জানতে চাইলাম কয়েক ঘন্টার মধ্যে কোন লোক এদিক দিয়ে গেছে কিনা।
    
    হেড গার্ড আমাদের চিনতো। তাড়াতাড়ি কাছে এসে জানালো যে গত ২।৩ ঘণ্টার মধ্যে
    কোন অপরিচিত লোকই এ রাস্তা দিয়ে যায় নি। আমি তাকে অনুরোধ করলাম সে
    যেন একটু নজর রাখে,আর কোন সন্দেহভাজন লোক দেখলে মহারাণী  
    খেয়াঘাটে আমার পুলিশ পার্টির কাছে খবর দেয়। 
          হঠাৎ রাস্তার উপর পায়ের ছাপ দেখলাম, ছাপ গুলি অমরপুরের দিকে গেছে।
    পায়ে পায়ে আমি ও চৌধুরী ঐ সব পায়ের ছাপ অনুসরন  করতে করতে মাতরংগীপাড়া 
    পর্যন্ত এগিয়ে এলাম। কিন্তু পায়ের ছাপ আর দেখতে পাওয়া গেল না। এই স্থানটি
    থেকে অনেক দূর পর্যন্ত অনেক কিছু দেখা যায়।
                        সকাল হয়ে গেছে। এলাকার লোকজন চলাফিরা করতে শুরু
    করেছে। আমি আমার বিশ্বস্ত কয়েকজন লোকের কাছ থেকে খবর নিয়ে জানলাম
    কাল রাত্রে কোন লোকই এ গ্রামে আসে নি। নিরাশ হয়ে ভাবছিলাম- কি করা যায়।
    হঠাৎ রাস্তায় আমার ট্যাক্সির চাকার দাগের উপর টাটকা ৩।৪ জোড়া পায়ের ছাপ
    দেখলাম। ঐগুলি উদয়পুরের দিকে গেছে। এর মধ্যে ৩ জোড়া দাগ জুতার। এই
     জুতার দাগ আমি অমরপুরে ও পথে আরো দেখেছি। মাতরংগীতে গাড়ীটা ছেড়ে
     পায়ের ছাপ ধরে ধরে আমি ও চৌধুরী এগিয়ে চললাম। ড্রাইভারকে বললাম- 
     মহারাণী থেকে পার্টিটা নিয়ে কিছুক্ষন পরে আমার সংগে দেখা করতে।...............
           ..........................................। চ  ল  বে

  -------------------------------------------------------------------

Top of Form


=অপরাধীর পিছনে=
(
অপরাধমূলক ডিটেকটিভ কাহিনী)
-
বিভূতি চক্রবর্তী 
পূর্ব প্রকাশিতের পর
--------------------
(
৫)

কিছুদূর গিয়ে ঐ পায়ের ছাপ আর দেখতে পাওয়া গেল না। বিমূড় হয়ে ভাবছিলাম-কি করবো। এমন সময় উদয়পুরগামী একটা গাড়ী পেয়ে তাতে
উঠে মাইল তিনেক এগিয়ে গেলাম। ঐ পায়ের ছাপ তবুও দেখতে পেলাম
না। আমার দৃঢ় সন্দেহ হলো লোকগুলি নিশ্চয়ই পিছনে রয়ে গেছে। গাড়ী
থেকে নেমে চৌধুরী ও আমি আবার পিছনের দিকে চলতে শুরু করলাম।
কি এক নেশার পাগলামি আমায় পেয়ে বসেছে-অপরাধীদের বের করতেই
হবে। চৌধুরী নিরাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে,মুখে চোখে তার স্পষ্ট 
হতাশার চিহ্ন। এক যায়গায় এসে আমার পাশে একটা ঝোঁপের সামনে দাঁড়ালাম। হঠাৎ ফিস ফিস করে কাদের কথাবার্তার আওয়াজ কানে এলো।
আমরা সতর্ক হয়ে ঝোঁপের ভিতর লুকিয়ে রইলাম। মিনিট খানেকের মধ্যেই
দেখলাম,পাশের বাঁক থেকে চারজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এদিকেই আসছে।
অবাক হয়ে গেলাম,এইমাত্র এই রাস্তা দিয়ে আমরা এসেছি। কই,পথে তো
কোন লোক দেখতে পাই নি। আশ্চর্য্য,কোথায় ছিল এরা?কোথা থেকে হঠাৎ
উড়ে এলো আমাদের সামনে? চারজন লোক আস্তে আস্তে আমাদের প্রায়
সামনে চলে এলো। লোকগুলি যথেষ্ঠ শক্তিশালী বলে মনে হলো,আর চমৎকার
পোষাক পরিচ্ছদ-নিখুঁত ভদ্রলোক।
চৌধুরীর পরনে সাদা পোষাক,আমার গায়ে পোষাকের উপর কালো একটা
ওভারকোট,আর মাথায় টুপি। লোকগুলির দৃষ্টিগোচর হওয়ার আগে আমার টুপিটা
ছুঁড়ে জঙ্গলে ফেলে দিলাম,যাতে আমাকে পুলিশের লোক বলে এরা আমায়
চিনতে না পারে। ওরা আমাদের সামনে আসতেই তাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার
আগ্রহ প্রকাশ করলাম-তাদের নামধাম ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলাম।ওরা আমাকে
জানালো-ওদের বাড়ী উদয়পুর,কাল রাত্রে অমরপুরের মহুয়া ফরেষ্ট অফিসের
রমেশের বাড়ীতে ছিল। আজ আবার উদয়পুর ফিরে যাচ্ছে। তারা তাদের নাম
যথাক্রমে মধু,পরেশ,হরেন্দ্র ও সুধীর বলে জানালো। ওদের কথাবার্তা বলার
ঢংটা কেমন যেন সন্দেহজনক-ওদের পোষাকের পারিপাট্যের সংগে ভাষার মোটেই মিল নেই। আমি স্থির বিশ্বাস করলাম,ওরাই আমার ইপ্সিত অপরাধীর দল। 

........
চ ল বে

************************

*
প্রত্যেক অপরাধের ঘটনার পিছনে অপরাধীরা কোন না কোন সূত্র রেখে যায়, যার সাহায্যে তদন্তকারী অফিসার অপরাধ- কাহিনীর সমস্যার সমাধান করেন। আলোচ্য ঘটনাটিতে সূত্র ছিল " পায়ের ছাপ", যার সাহায্যে পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়েছিল। 

Wednesday, November 13, 2013

শিশু-দিবস ত্রিভুবনজিৎ

শিশু-দিবস


ত্রিভুবনজিৎ  


আজ শিশু-দিবস । চাচা নেহেরুর জন্মদিন পালন করছে সব কচি কাঁচা শিশুরা । সকলের মনে  উৎফুল্ল উদ্দীপনা । সব্বাই হাঁসি আর হট্টগোলে এই দিবসটিকে পালন করে । হয় বক্তৃতা , ফ্যান্সি ড্রেস , কিছু গান আর পকেট ভর্তি চকলেট মিঠাই । স্কুলে মাষ্টার মোশাই , দিদিমণিরা ব্যাস্ত ছেলে মেয়েদের শৃঙ্খলিত ভাবে এই দিবসটিকে পালন করতে । এমনি এক দিনে চোখে পডে কিছু শিশুর কথা জারা খেটে খায় নিজেদের জীবিকা অর্জনের জন্য । তার সমাজের অবহেলিত শিশু । তাদের মা বাবা জন্ম দিয়ে খালাস । কেউ চায়ের কেটলি হাথে প্লাটফর্মে চা বিক্রি করছে , কেউ ইটভাটায় ইট বইছে চোখের জল পুঁছে , কেউ হোটেলে চায়ের কাপ ডিস থালা বাসুন ধুচ্ছে , কেউ আবার মোটর মেকানিকের গাল মন্দ শুনে সারা গা কালি মেখে তার হাথে স্প্যানার , স্ক্রু ড্রাইভার দিচ্ছে ,কেউ জুত পালিশ করছে ট্রেনের কামরায় , কেউ বাডীর চাকরের কাজ করছে মুখ বুজে গাল মন্দ শুনে ...ইত্যাদি,ইত্যাদি । এই ভারতে আছে এরকম অনেক কথা যেখানে শিশু নির্যাতনের ভুরি ভুরি কাহিনী । এ নিয়ে অনেক ফিল্ম নির্দেশক সিনেমা করেছেন । ‘স্লাম ডগের’ কথাই ভাবুন  , অস্কার পেয়েগেল ভারতবর্যের বস্তিবাসীর কাহিনীকে সেলুলয়েডে ধরে।    আমরা কিছু বুদ্ধিজীবী  এই নিয়ে হৈ চৈ করি আবার ভুলে জাই । 
আজ মনে করছি সেই স্কুলের দিনের কথা । স্কুল জাওয়ার পথে দেখতাম এক বালক সে মটর মেকানিকের কাছে গাল মন্দ খেয়ে কাজ করছে । তার বাবা মা তাকে স্কুলে পাঠাতে পারেনা কিন্তু জন্ম দিতে পেরেছিল। এই দায়িত্বহীন বাবা ভেবে দেখেনি যে সন্তানটিকে সে পৃথিবীতে আনল তাকে দুমুঠো খেতে দিতে পারবে কিনা স্কুলে পাঠানো দূরে থাক। এরা ভাবে জন্ম দেওয়া তাদের কাজ ভরন পোষণ করা সরকারের কাজ। তবুও কিছু রাজ্য সরকার এইসব ছেলেদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছেন । কিছু বেসরকারি সংস্থা , এন।জি।ও তা ছাডা অনাথ আশ্রম এবং খ্রিশ্চান মিশনারি খুব ভালো কাজ করেন এ নিদর্শন ও আছে। গিরিজন্দের জন্য ট্রাইবাল স্কুল আছে , মুসলিমদের জন্য মাদ্রাসা , মেয়েদের জন্য কন্যা-শ্রম কিন্তু সাধারণ বর্গের ছেলেদের জন্য ব্যতিক্রম । 
স্কুলে জাওয়ার ইচ্ছে রাখে অথচ সে সংসারের দায়িত্ব শিশু অবস্থা থেকে নিতে বাধ্য হয়েছে । আজ এই সব ছেলে মেয়েদের জন্য কেন্দ্র সরকার-থেকে স্বতন্ত্র যোজনা করা উচিৎ । চাইল্ড লেবার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করে তাদের শিক্ষা ব্যাবস্থার উন্নতি করার বিশেষ প্রয়োজন।

Tuesday, November 12, 2013

"সার্কিট হাউস" / ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী / কালীপূজো ২.১১.২০১৩ / রাত ৯.০২ ।



সার্কিট হাউস
ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী / কালীপূজো ২.১১.২০১৩ / রাত ৯.০২ ।


আজথেকে বহু বছর আগের কথা । তা প্রায় ৪০ বছর তো হবেই। আমার বয়েস ৯ - ১০ হবে। তখন আমরা কোরাপুট জেলার ‘মাছকুন্ড’ বলে উডিশ্যার এক জায়গা তে কিছুদিন ছিলাম। উডিশ্যার ‘জয়পুর’ থেকে প্রায় ৪০ কি মি দক্ষিণে । টানা পাহাড়ের ওপর ঘাট রাস্তা। তখন দিনে একটা বাস চলত । বাবার সঙ্গে আমরা জিপে যেতাম মাছকুন্ড । খুব ভয় করতো জখন কিনা জিপটা পাহাড়ের গা ঘেঁসে চলত ।

আন্ধ্র প্রদেশের গোদাভরি নদীর এক শাখা নদী মাছকুন্ড নদী । এই নদী হঠাৎ দিগ পরিবর্তন করে জল প্রপাতে পরিণত হয় নাম “ডুডুমা জলপ্রপাত” ।                                                                                                                             
 চারিদিকে পাহাড় ঘেরা এক মনরম জায়গা । শান্ত পরিবেশ । জলপ্রপাতের গুরু গম্ভীর গর্জনে কম্পিত পরিবেশ ।

এখানে ১৯৫৫ সালে তৈরি হয় জলাপুট ড্যাম । ‘জলা’ মানে জল ‘পুট’ মানে ঘর অর্থাৎ জলের ভাণ্ডার । এইখানে তৈরি হয় মাছকুন্ড হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট , আন্ধ্র এবং উডিশ্যার মিলিত উদ্যমে । ৩৪.২৭৩ টি এম সি জলকে জলপ্রপাত থেকে ১৫ কিমি টানেল দিয়ে ১২০ মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ১৯৫৫ সালে। এখন অবশ্য এই প্রজেক্ট পুরন হয়ে গিয়েছে যার নব-কলেবরের প্রয়োজন । সেটা থাক । 

। ১৯৫৮ র কথা ভাবুন তখন ওই জায়গা কিরকম ছিল ? গভীর জঙ্গলে ভরা নির্জন পরিবেশ । সভ্যতার কোন চিহ্ন বর্ণ ছিলোনা । কিছু আদিম অধিবাসী এবং কিছু সরকারি বাবু । কেউ তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকতেন কেউ একা। কিছু তেলেগু , উড়িয়া এবং আমরা একমাত্র বাঙ্গালী পরিবার । অবশ্য আমরা ছুটি কাটাতে যেতাম ওখানে কারন আমার পিতৃদেব ওখানকার একজন অফিসার ছিলেন । আমাদের পড়াশুনোর জন্য তিনি একাকীত্ব বেছে নেন ।

প্রসঙ্গে আসি। সেই ১৯৫৫ সালের আগে ওই জলাপুটে আসেন কিছু জার্মান ইঞ্জিনিয়ার । তাদের জন্য সার্কিট হাউস তৈরি হয়েছিল যাতে কোন অসুবিধে না হয় ।

আজ সেই সার্কিট হাউসের কথা বলি । জার্মান সাহেবরা ঘর দোর ছেডে এই বিদেশ ভুঁইতে এসে আমাদের দেশের ঘরে ঘরে আলো জ্বালাতে আসেন , কিন্তু তার ই মধ্যে ঘটে কিছু অঘটন ।

ওই নির্জন বনানীতে এক সুন্দরি তেলেগু মহিলা ছিলেন নাম , জি.পূর্ণিমা । তিনি কোন এক কর্মচারীর কন্যা । যেমন দেখতে ঠিক সেরকম গান গাইতেন মহিলা । আর জার্মান সাহেবের নাম আলেকজান্ডার পল । সুধু পল সাহেব বলেই ওনাকে ডাকতেন সবাই। বয়েসটা অল্প । পল সাহেব যেমন সুন্দর দেখতে ছিলেন সেইরকম অমায়িক ব্যাবহার ছিল ওনার। সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে ভালোবাসতেন। খুব ভালো টেনিস খেলতেন এবং পিয়ানো বাজাতেন। প্রসঙ্গত পল সাহেব ওই পূর্ণিমাদের বাডী যেতেন গান শুনতে । অভিভূত হয়ে গান শুনতেন পল সাহেব আর সেই গান পিয়ানোতে বাজাতেন সার্কিট হাউসে । সেই সঙ্গীতের মূর্ছনায় দু জনের মধ্যে কোথায় কখন প্রেম সৃষ্টি হয় কেউ বুঝে উঠতে পারেনি কখন। 

এটাই মুল সুত্র । এর পর চলে চুপি চুপি দেখা আর প্রেমের আদান প্রদান । বোধ হয় ওই একটাই চিত্ত বিনোদনের উপায় । তখন ওখানে না ছিল বায়স্কোপ না ছিল এখনকার মতন টিভি , ভিডিও, ক্রিকেট ফুট বল খেলা ইত্যাদি। তাই দুই হৃদয়ের মিলন ঘটে অজান্তে । ক্রমে পূর্ণিমা অন্তঃসত্ত্বা হন । এর মধ্যে পল সাহেব পূর্ণিমাকে প্রায় স্ত্রীর দরজা দেওয়ার জন্য প্রস্তাব রাখেন তার বাবার কাছে । কিন্তু সমাজের ভয়ে তার বাবা গর রাজি হন ফিরিঙ্গীর হাথে কন্যা সম্প্রদান করতে । রক্ষণশীল সমাজে তা গ্রহণিয় নয় । বিশেষ করে সে যুগে । পল সাহেব ব্যথিত হন । এর মধ্যে কিছু দিন কেটে জায় । ওদের দেখা সাক্ষাৎ বন্দ ।
সে দিন ছিল পৌষ পূর্ণিমা । পূর্ণিমা চুপি চুপি সার্কিট হাউসে জায় কিন্তু দেখে পল সাহেব নেই ।তাকে না জানিয়ে পল সাহেব চলে জান । সে কান্নায় ভেঙ্গে পডে । ওখানেই আত্মহত্যা করে গলায় দডি দিয়ে। 

সকালে সবাই দেখে চকিত হন। এ হেন জায়গায় এরকমটি কেউ আশা করে নি। পুলিশ আসে । বডি পোষ্ট মর্টম হয় ।
পল সাহেব এই ঘটনার বেশ কিছুদিন আগে ফিরে জান ভিজয়নাগরম হয়ে মান্দ্রাজ । ওখানথেকে দেশে পাডি দেন।
সেই সার্কিট হাউসে এর পর আর কোন সাহেব থাকেননি কারন পূর্ণিমা , ঠিক পূর্ণিমার দিন রাতে বেরুত খোলা চুলে । ওই নির্জন পরিবেশে কার বাবা সার্কিট হাউসে থাকবে ? আজও পূর্ণিমার অতৃপ্ত আত্মা পল সাহেবের অপেক্ষায় । মৃদু সঙ্গীতের ঝংকার শোনা জায় আর শোনা জায় পূর্ণিমার হাঁসি কান্নার শব্দ । পল সাহেব কি জানেন পূর্ণিমার কি হল ?আজ ও ওই সার্কিট হাউসে কেউ একলা থাকেনা । আর পূর্ণিমার দিন বন্দ থাকে সার্কিট হাউসের দরজা।

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী / কালীপুজো ২.১১.২০১৩ / রাত ৯.০২ ।