Friday, July 26, 2013

ওরাও বাঁচতে চায়ঃ- ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী ২৫.০৭.২০১৩ / ০৮.০৫

   ওরাও বাঁচতে চায়

  ©ত্রিভুবন জিৎ মুখার্জী

 

*** সব ঘটনা কাল্পনিক

আমাবস্যার রাত চারিদিকে অন্ধকার সামনে একটা কালো রঙের স্করপিও খ্যাঁচ্ করে ব্রেক কষল   গাড়িথেকে চারজন নামলো পরনে জিন্স আর ব্ল্যাক টি শার্ট চোখে কালো চশমা হাতে গ্লোভস্ আর পিস্তল মনে হচ্ছে মুখটা ঢাকা সাদা মাস্কে। মাথায় সাদা ফেল্ট্ ক্যাপ চারজন চার দিকে গেলো টি এম কাউন্টারের ভেতর আমি একা বসে। রাতের ডিউটি একটু চোখ টা ধরে এসেছিল ঘুমের আমেজে সামনের দৃশ্য দেখে ঘুমের বারোটা বেজে গেল কিছু একটা অঘটন ঘটবে বোলে মনে হচ্ছিল তন্দ্রাচ্ছন্ন  চোখটা খুলতেই,.. “এই শালা ঘুমচ্ছিস কি ওঠ শালা রাত জাগা প্যাঁচা ঘুমচ্ছিস কিরে?” 

কথাটা শুনে মেজাজ টা চটে গেল নিজেকে সামলে নিলাম আমার হাতে একটা লাঠি ছাড়া আর কিছু নেই পরনে শুধু সিকিউরিটি গার্ডের ড্রেস হাতে দুমড়ন একটা গত কালের আনন্দ  বাজার পত্রিকা কাল খবরটা চোখে পড়েছিল,“কলকাতার টি এম লুটেরারা গাড়ি নিয়ে  ডাকাতি করছে, সিসি টিভি ফুটেজে ধরা পড়ছেনা  ওরা দলে বলে আসছে সঙ্গে মারণাস্ত্র

ভয় লাগলো  আবার রাগ হল! তোরা গরীবের পেটে লাথি মেরে চিট ফান্ড এর টাকা লুটলি এখন ব্যাঙ্কের টি এম লুটছিস !! আলু পিঁয়াজের দাম বাড়ালি দুমুঠো যে নুন ভাত খাবো  তাও তোরা শান্তিতে খেতে দিবি না। কি চাস তোরা ? আমরা গরিবরা না খেয়ে মরি আর তোরা  দেশ লুটে মস্তি করবি কথাটা মনে মনে ভাবছিলাম .......

..হটাতএই শালা আমার সামনে দাঁড়া নইলে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব! টুঁ শব্দ করবিনা”  সামনের ছেলেটা বলল  

আমি কেন সামনে দাঁড়াবো ?

ন্যাকা! জানিস না ! দাঁড়া বে জান প্যারী হ্যায় তো !!একটু ইতস্তত বোধ করে পকেট হাতড়ে কি একটা বারকরতে চেষ্টা করছিল (নিশ্চই লাইনে নতুন মানে প্রফেশনাল নয়)   

... ঠিক সেই সময় আমি ওর মাথায় আমার ডাণ্ডা দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিলাম। দিয়ে দৌড়ে ওখান থেকে পালালাম ওই ছেলেটা আচমকা এটা হবে আশা করে ছিলোনা চিৎকার করে তলায় পড়ে গেল। আমি প্রাণ বাঁচাতে ছুটলাম মোবাইলে মেসেজ দিতে মেসেজ বক্স থেকে শেভ করা   মেসেজ টা আমার ব্যাঙ্কের বি এম কে পাঠিয়ে দিলাম সেন্ট হল দেখলাম...ঠিক সেই সময় গুলির শব্দ হল। হটাত আমার বাঁ হাতে  কি একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মতন ঢুকে গেল আমি যন্ত্রণায় পড়ে গেলাম। জ্ঞান ছিলোনা কারণ জ্ঞান ফিরতে দেখি আমি হসপিটালে। কাছে আমার স্ত্রী পুত্র বসে।

ডাক্তার বাবু জিগ্যেস করলেনকেমন লাগছে? যন্ত্রণা হচ্ছে ? আপনার অপারেশন হয়েছে , ভয়  নেই গুলি বার করে দিয়েছি। আপনার ছেলেই আপনাকে রক্ত দিয়েছে। ব্লাড গ্রুপ এক;   পসিটিভ ওষুধ ইনজেকশন সব ব্যাঙ্কের ম্যানেজার দিয়েছেন। ভয়ের কিছু নেই। আপনি সুস্থ বোধ করলে পুলিস আসবে আপনার স্টেটমেন্ট নিতে আপনি যা যা ঘটেছে মনে করে বলতে পারবেন  তো?”

-মাথা নাড়িয়ে বললাম , হ্যাঁ স্যার পারবো।

পুলিস অফিসার এলেন সেই সময় কি ব্যাপার কেমন আছেন?

ভালো

-কে কে ছিল কেমন দেখতে একটু আন্দাজ করতে পারবেন।

- হ্যাঁ স্যার আমি একা কাউন্টারের ভেতর ছিলাম এমনিতেই জায়গাটা ফাঁকা তাতে রাতে কেউ  আসে পাসে থাকে না তখন পুলিসের মোবাইল পেট্রলিং কাউকে কাছে দেখি নি স্যার।

-আমি সে কথা আপনাকে জিগ্যেস করি নি ; কে ছিল কে না ছিল ! যা জিগ্যেস করছি তার উত্তর  দিন। একটু গম্ভীর ভাবে বললেন।

 - আমি একা কাউন্টারের ভেতর ছিলাম একটা কালো রঙের স্করপিও ....

-স্করপিও বলে কি করে জানলেন ? তখন অন্ধকার ছিল বলছেন !

-হ্যাঁ স্যার্ , কিন্তু টী এম এর আলো ছিল সেই আলোতে গাড়িটা দেখে বুঝতে পারি তা ছাড়া -আমি গাড়ি চিনি সার আমি আগে গাড়ি চালাতাম।

- আচ্ছা ! নাম্বার দেখেছিলেন?

-না স্যার ওটা দেখতে পারিনি কারণ গাড়িটা সাইড করা ছিল একটু দুরে।

-হুঁ আর কিছু ?

-ওই গাড়িথেকে চারটে লোক কালো পোশাকে বেরুলো। 

-কালো বলে কি করে জানলেন?

-আমি রাত কানা নই স্যার। একটু আলো পড়েছিল ওতেই দেখেছি ওরা কি পরেছিল।

-হুঁ তা বটে  

 কথা বলতে একটু কষ্ট হচ্ছে স্যার

ডক্টর বললেন,“পেসেন্ট কে একটু রেস্ট দিন

ঠিক আছে পরে আসবো। ঠিক ঠিক বলবেন

মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম।

বৌ কাছেই ছিল বলল আমরা না খেয়ে থাকবো তাও আচ্ছা তোমাকে চাকরি আর করতে হবে না।

-সংসার কি করে চলবে ?

-সে আমি বুঝবো এখন

এখানে বলে রাখি ,আমার বৌযমুনাএকটি বাচ্চা মেয়েকে সারা দিন রাখে। ঘরের রান্না বান্না যাবতীয় কাজ ওই করে মেয়েটির বাবা মা দুজনেই সকাল থেকে অফিসে যায়। যমুনা মেয়েটিকে ছোট থেকে বড় করেছে। ওরা মাস গেলে ৫০০০ টাকা মাইনে দেয় আমি ৬০০০ টাকা পাই রাত দিন এক করে খাটতে হয়। এই কটা সামান্য টাকায় আমাদের অনেক কষ্টে  চলে যায়। তবে এই দুর্দিনে আর সংসার টানতে পারছিনা দেশে মা বোন আছে তাদের টাকা পাঠাতে হয়। তারা না হলে না খেয়ে  মরবে। মা, বি পি এল এর চাল পায়। বোন ক্ষেত খামারে কাজ করে। বিয়ে করেছিল স্বামী ছেড়ে দিয়েছে

হটাত যমুনা বলে উঠলো কি ভাবছ ? আমি আছি।

-কি করে যে কি করি বুঝে উঠতে পারছিনা আমি কবে হাসপাতাল থেকে যাবো পুলিসের চক্কর আমার খুব বাজে লাগে। জল তেষ্টা পাচ্ছে

যমুনা একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল কিনেছে দেখলাম। সত্যি আমার অনেক খেয়াল রাখে। ছেলেটাও মন মরা হয়ে গিয়েছে

যমুনা বলল তুমি চিন্তা করনা আমার মালকিন বলেছেন উনি ৫০০০ টাকা আগাম দেবেন বলে পুজোতে যে বোনাস পাই সেটা আগে থেকে দেবেন উনি।

-তোকে আমি অনেক দুঃখ দিলাম যমুনা বলতে বলতে চোখে জল এলো  

- মা এই সময় আমি থাকবেনা কে থাকবে শুনি ? তোমার বোন ? স্বামীর ঘর করতে পারলনিকো , তোমাকে কি দেখবে শুনি!

আমি এখানে আছি , খেটে খাচ্ছি কাজ করতে পারে না ? সোহাগ বলি কোথা থেকে আসবে শুনি ? গা জ্বলে যায় আদিখ্যেতা দেখলে ! মরণ !!

-আমি ঘরে ফিরে আমার আগের মালিকের ট্যাক্সি চালাবো দেখিস ঠিক চলে যাবে

রক্ষে কর

ডাক্তার এসে বললেন ওনাকে রেস্ট দিন।

পরের দিন সকাল বেলাতে স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার পুলিস অফিসার এলেন

আজ কেমন আছেন ?

-ভালো

-কথা বলতে কষ্ট হবেনা ?

-না

-আচ্ছা আপনি কালো রঙের স্করপিও বলছিলেন না !

-হ্যাঁ স্যার লোকটাকে কেমন দেখতে বলতে পারবেন

- লোক নয় স্যার একটা কম বয়েসের ছেলে

-কি করে জানলেন ?

- আমাকে থ্রেট করছিল   মেরে ফেলবে বলছিল যদি আমি ওকে টি এম ভাঙ্গা তে  সাহায্য না করি

- আচ্ছা কেমন দেখতে ওকে?

-রোগা লম্বা আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। নন বেঙ্গলি মনে হল সার গলার স্বর চিনতে পারবো সি সি টি ভি ফুটেজে সব কভার করে থাকবে সার

-কি হয়েছে না হয়েছে সেটা আপনার জানার প্রয়োজন নেই যা জিগ্যেস করছি তাই বলুন।

মুখ কেন দেখেন নি?

-মুখে মাস্ক ছিল স্যার  

-হুঁ। নন বেঙ্গলি কেন বললেন ?

-কথা শুনে তাই মনে হল স্যার।

- আপনি গাড়ি চালাতেন না ?

-হ্যাঁ স্যার।

-আপনি কি করলেন আসাতে ?

- এসেই আমাকে বাজে গালা গালি দিয়ে উঠতে বলে আমাকে সামনে দাঁড়াতে বলল আমি মানা করাতে পকেট খোঁজে আমি বুঝলাম মেশিন খুঁজছে সঙ্গে সঙ্গে মাথায় লাঠি মেরে ওখান  থেকে দৌড়ে পালালাম নিজেকে বাঁচাতে

- যদি মরে যেত

-ব্যাঙ্কের টি এম ভাঙ্গবে , আমি ছেড়ে দেব স্যার ! আমি কি করতে আছি তাহলে ?

-কিন্তু যদি মরে যায় ! সেটাও   হতে পারে !! 

একটু ভেবে বললাম, আমার আত্মরক্ষার জন্য এবং ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ টাকা যা  টি এম আছে  তার সুরক্ষার জন্য আমি ওটা করতে বাধ্য হয়েছি স্যার    যদি এই কারণে আমাকে শাস্তি পেতে হয় তবে আমার কিছু বলার নেই

পুলিস অফিসার সমস্ত বয়ান নথিভুক্ত করেন

আমি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে এলাম। ব্যাঙ্ক , আমার সাহসিকতাতে  খুশি হয়ে আমাকে মেন ব্রাঞ্চ এর   সিকিউরিটি গার্ড করে মাইনে বেড়ে  ৯০০০ টাকা হয় বৌ বলল গুলি খাওয়ার পর  মাইনে বাড়ল সবকটা ছেলে ধরা পড়েছে     

আমি বলি, “সততা নিয়ে কাজ করলে ভগবান সহায় হন ”  আমাদের সংসার এখন সচ্ছল

 

*১১৮৮ শব্দের মধ্যে লেখা   





Wednesday, July 24, 2013

নেতজী সুভাষ চনদ্র বসু মৄত্যু রহস্য সুশানত কর।




সুভাষ চন্দ্রঃ মৃত্যু নিয়ে এক ধ্রুপদি শিল্পের স্রষ্টা

( লেখাটি বেরিয়েছিল আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে গোপাল বসু সম্পাদিত তিনসুকিয়ার ছোট কাগজ 'দৃষ্টি'র সুভাষ জন্মদিনে বিশেষ ক্রোড়পত্র হিসেবে। আজো লেখাটি সমান প্রাসঙ্গিক ভেবে এখানে তুলে দিলাম। মূল লেখাটিও ছবিতে রইল। বানান এবং ছাপার ভুল ছাড়া আর কিছুই পালটানো হয় নি)       
      কটা লোকের  জন্মের মধ্যে তার নিজের কি কৃতিত্ব থাকে? কবে, কোথায়, কোন ঘরে জন্ম নেবে সে ঠিক করে? এখানে তার নিজেরও স্বাধীনতা কই? সে তো ঠিক করে জীবনটাকে। নির্মাণ করে তার মৃত্যুটাকে। আর যাঁরা অসাধারণ , যাঁদের মহান বলতে পারলে আমাদের আত্মা তৃপ্তবোধ করে তাঁরা রীতিমত সৃষ্টি করে। সৃষ্টি করে তাঁর মৃত্যুটাকে। যে মৃত্যুর নামে সাধারণের আত্মা আঁৎকে উঠে, অসাধারণেরা তারই নামে গেয়ে উঠেন, “মরণরে তুহুঁ মম শ্যাম সমান।” আর সে শ্যামের জন্যেঃ
“মন্দির বাহির কঠিন কপাট।
চলইতে শঙ্কিল পঙ্কিল বাট।।” তুচ্ছ করে করে এসে যাঁরা অভিসার করেন স্বাধীনতার তাঁরাইতো মূর্ত প্রতীক।
              সুভাষ চন্দ্র বসু এমনই এক মৃত্যু সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর নিজের জন্যে। ভারত মায়ানমার সীমান্ত যুদ্ধে বৃটিশের গোলাবারুদের ঘায়ে তাঁর মৃত্যু হতে পারত। হলো তাইহোকু বিমান বন্দর ছাড়ার মুহূর্তখানিক পরে, দুর্ঘটনায়। তাতেই বা কি? কি সুন্দর সে মৃত্যু! দুশো বছরের পরাধীনতাকে উপড়ে ফেলে দেশ আর দেশের মানুষকে মুক্ত করতে গিয়েইতো? প্রথমে জাতীয় কংগ্রেস ও পরে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বোচ্চ সংগঠক হবার যোগ্যতা অর্জন করতে করতে জীবনটাকে গড়েছিলেন বলেই তো?
             এমন সুন্দর মৃত্যু কবে কোন সাধু সৃষ্টি করেছিল? অথচ আমরা একে স্বীকারই করলাম না। আমরা বিশ্বাস করি সুভাষ বসুর মত এত সুন্দর মানুষটা এতো সুন্দর মৃত্যু বরণ করতেই পারেন না! শৌলমারি না কোথাকার সাধুর ভেক ধরে কাপুরুষের মতো পালিয়ে বেড়াতে পারেন।          
         সুভাষচন্দ্রের দুর্ভাগ্য এই তিনি সফল হলেন না তাঁর লক্ষ্যে। তাই আমাদের কাপুরুষ, ভয় –বিহ্বল, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন পাল্টালো না। সে রইল কুৎসিত আগের মতো। সে আমদের কৌৎসিত্য যে আমরা সুভাষের জীবন ও মৃত্যুর সৌন্দর্য বুঝলাম না। সেনানায়ক সুভাষ নয় সাধু সুভাষের কল্পনা আমাদের বেশি প্রিয়। কেন ফকির বা পাদ্রীও নয় কেন? তাঁকে হিন্দুর একার সম্পদ বলে ভাবি বলে তো? তাঁকে শরীরে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে তিলে তিলে চেতনায় তাঁকে মেরে ফেলার সাধনায় আমাদের ক্লান্তি নেই!
          চে গুয়েভারা ছিলেন আর্জেন্টিনার লোক, কিউবার বিপ্লবে সফল নেতৃত্ব দিয়ে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। পরে বলিভিয়া গেলেন যেখান থেকে মার্কিনী ভাড়াটে শাসকদের তাড়াতে বলিভিয়ার জঙ্গলেই প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় সংঘর্ষেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু নিয়েও কম রহস্যের জলঘোলা হয় নি। অথচ তাঁর অনুগামীরা সে মৃত্যুকে বিশ্বাস করেছে। তাতে লাভ হয়েছে এই যে শুধু বলিভিয়াতে নয়, শুধু কিউবা বা আর্জেন্টিনাতে নয়, সারা লাতিন আমেরিকাতে হাজারো তরুণ সেই তখন থেকে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখছে সাধনা করছে সৃষ্টি করবে মৃত্যু—চে গুয়েভারার মতো। যেমন কোন বাঙালি তরুণ বা তরুণী প্রথম কবিতা লেখে রবীন্দ্রনাথের মতোঃ কিম্বা নজরুলের মতো। এও তেমনি।
        চে’কে নিয়েও ভক্তির বাড়াবাড়ি আছে। চে’র ছবি বা মূর্তি ঘরে রাখা, তাঁর জন্ম মৃত্যুদিন পালনতো তুচ্ছ। চে’র মতো চুল দাড়ি রাখা, পোষাক পরা, পোষাকে চে’র ছবি এঁকে তৃপ্তি হয় না—শরীরে খোদাই করে টাট্টু করা। সুভাষ বসুর লেখা কেউ পড়ে না, পড়ে ‘ শৌলমারির সাধু কি নেতাজী ছিলেন?’ জাতীয় পয়সা রোজগারের ধান্দায় লেখা পাতি বই। চে’র রচনা সবাই হজম করে; মুখে মুখে ফেরে তাঁর কবিতা। এসবে প্রশংসনীয় তেমন কিছু নেই। কিন্তু এ হচ্ছে চে’কে প্রচার করার নমুনা।
      
  চে যে তাঁর ধ্রুপদি শিল্প কর্ম—তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে কি দারুণ ভাবে বেঁচে আছেন সে আঁচ করা যায় যখন দেখি সারা লাতিন আমেরিকাতে মার্কিনী নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়ন বিরোধিতাটা ফুটবলের মতো, লোকের জাতীয় ধর্ম হয়ে গেছে। আর পেলে-মারাদোনার মতো সে ধর্মের দেবতা চে গুয়েভারা। স্বাধীনতার যে কোন সংগ্রাম, যে কোন মিছিলে  ছবির চেহারাতেও চে থাকেন সবার আগে, সবার সামনে। সারা বিশ্ব কান পেতে শোনে চে’র হৃদস্পন্দন।
         এবার কল্পনা করুন সুভাষ থাকেন কই? এ হীনতা আমাদের। সুভাষ বসুর নয়। স্বাধীন ভারতের কোন সংগ্রামের ময়দানে, লড়াইর ময়দানে—বিশ্বায়ন বিরোধী লড়াই নয় বাদই দিলাম—সুভাষ বসুর নাম নিতে কখনো কাউকে দেখব? অনশনে বসলে গান্দির ছবি মালা দিয়ে সাজিয়ে রাখার সংস্কৃতি অসমেও আছে। মৃত্যুর শিল্পীদের সম্মান জানাবার এর চেয়ে বেশি যোগ্যতা আমরা অর্জন করিনি। আমরা তেইশ জানুয়ারি করি। ওখানে একটু গানবাজনা করি আর খেলাধুলা করি। ক্যারাম খেলি। সুভাষ বসু ক্যারাম খেলার প্রতীক!!?
         সুভাষ বসু কি ছিলেন তা যার গরজ আছে তিনি নিজের অধ্যয়ন অনুশীলনে আবিষ্কার করেন। আর এ নিয়ে লেখাটা খউব জরুরি নয়।
          এখন সময় বোধহয় আত্মসমালোচনা করার । আমাদের চেতনার গভীরে বৃটিশ-মার্কিনীদের সেবাদাসদের বিরুদ্ধে লড়াই করার। মনে রাখতে হবে, শুধু কমিউনিষ্টরা তাঁকে ‘কুইসলিঙ্ক’ বলেছিল বলে, আমরা আসলে নিজেদের অপরাধ আড়ালই করি। বরং ঐ জনযুদ্ধের বছর কয় বাদ দিলে কমিউনিষ্টরা সুভাষ বসুর সহযোগীই ছিল। জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরে সুভাষও বামপন্থী বলেই পরিচিত ছিলেন। চীন দেশের ডাঃ সান ইয়েৎ সেন-এর মতো রুশ বিপ্লবের প্রতি সুভাষচন্দ্রের ছিল অপার শ্রদ্ধা। আমাদের ভুলে গেলে চলবে কেন যাঁরা সুভাষকে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে থাকতে দিলেন না তাঁরা কমিউনিষ্ট ছিলেন না। ভুললে চলবে কেন কংগ্রেস ছেড়ে ফরোয়ার্ড ব্লক গড়লে আমাদের অকমিউনিষ্ট পূর্বসূরীরা দলে দলে অনুগামী হন নি। এবং যখন তিনি মায়ানমার সীমান্তে যুদ্ধ করেছিলেন তখন তাঁর আশামত তাঁর সমর্থনে দেশে গণ-অভ্যুত্থান আমরা গরে তুলিনি। যা হবার হয়েছিল বিমান দুর্ঘটনার পর বন্দি মুক্তির আন্দোলনে। ঐ দুর্ঘটনার পরই হয় আমাদের ঘুম ভেঙ্গেছে কিম্বা ভোল পাল্টেছে। আমরা সুভাষদ্রোহী থেকে ভক্ত হয়েছি। তাও কোন সুভাষের? সেনানায়ক নয় রহস্যবাদী সাধু সুভাষের।
      
      বৃটিশের অর্ধ সমাপ্ত কাজের ভার আমরা নিয়েছি ভক্তের বেশে। আমরা তাঁকে ক্যারাম খেলার প্রতীক করে তুলেছি। করে তুলেছি বাঙালিয়ানার প্রতীক। লক্ষ্য করুন চে কিন্তু সারা লাতিন আমেরিকার সম্পদ। আমরা ২৩ জানুয়ারি বলে তাঁর নামে আরো এক তিথি বের করেছি, বুদ্ধ পূর্ণিমা বা কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর মতো। অবতারদের যেমন তাঁদের জন্মের উপরও একটা কর্তৃত্ব থাকে, সুভাষ বসুরও ছিল বলে আমরা কল্পনা করে নিয়েছি। অবতারেরাও পরলোকে গেলে মরদেহ ধরে রাখিনি আমরা। সুভাষ বসুকে পরলোকে যেতে দিতে তৈরিই নই। মনে করি তিনি কোথাও  কারারুদ্ধ আছেন আর পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিন লাদেনকে ধরার চাইতেও ঐকমত্য আছে সুভাষ বসুকে কারাগারে রাখার পক্ষে। তাই কোথায় কি ভাবে আছেন তা নিয়ে কেউ টূঁ শব্দটি করে না। লাদেন সাদ্দামের চেয়েও ওদের ভয় বেশি সুভাষকে?!
              আমরা মনে করি সুভাষ কোথাও লুকিয়ে আছেন সাধুর বেশে। সময় হলে বেরিয়ে আসবেন। তা লুকিয়ে তো বিন লাদেনো আছেন। এ সত্বেও তাঁকে নিয়ে ইঙ্গ-মার্কিনদের কী ভয়। তা সুভাষ বসুর কোনো গোপন সক্রিয়তাও দেখিনা, না দেখি তাঁকে নিয়ে কারো কোনো ভয়!
            সুভাষ কারাগারে আছেন অথচ জেল ভাঙার পরিকল্পনা করছেন না? আজকের হাইটেক যুগের কোনো সুযোগ নিতে পারছেন না? জেলের ভেতরে একটাও বিশ্বস্ত লোক তৈরি করতে পারছেন না, যে বাইরে খবর পাঠাবে? বাইরে তাঁর একজনও অনুচর নেই, যে নিশ্চিত খবর দিতে পয়ারে সুভাষ আছেন কোথায়? অথচ আজকের মানুষ সন্ধান করছে পৃথিবীতুল্য দ্বিতীয় গ্রহটি আছে মহাবিশ্বের কোন ছায়াপথে, কতদূরে?
            সুভাষ সাধু হয়ে আছেন! যতদূর জানি স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনায় দারুণ ভাবে প্রভাবিত ছিলেন তিনি। সুভাষের এ দীর্ঘ আত্মগোপন বিবেকানন্দের দর্শনের কোন ব্যাখ্যায় সমর্থন মিলবে? অথবা বিবেকানন্দের দর্শনে সেই দুর্ঘটনার পর আস্থা হারালেন তিনি? কার দর্শন, কোন দর্শন সমর্থন করবে এ দীর্ঘ আত্মগোপন?
         
সুভাষ এখন শুধু একটি রাস্তার নাম এবং হিন্দু বাঙালি এবং অসমিয়ার কাজিয়ার নাম
 সমর্থন করে শুধু ভীরুতার দর্শন আমাদের যে ভিরুতা ভয় পায় এমন কি রাজনীতির ‘র’ উচ্চারণে। ভালোবাসে শুধু গাইতে আর খেলতে? সে সুভাষের মতো বীর পূজাতে আত্মগ্লানি মুক্ত হবার প্রয়াস করে আর দীর্ঘজীবি কাপুরুষ কিম্বা সাধু বানিয়ে সুভাষকেও নামিয়ে আনে নিজের সারিতে। এভাবে সে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে সুভাষের শিল্পকে ধ্বংস করে। মারে সুভাষকে।
            
 চিতাভস্মকে পেছনে ফেলে নেতাজি কন্যা
            বাইরে ২৩ জানুয়ারি জন্মদিন বটে- কিন্তু এদিনেই তাঁকে আটকে মেরে ফেলবার দিনও বটে। কোনোদিন যদি কেউ তাঁর সত্যিকারের মৃত্যুদিন পালনে সাহসী হয় বোধকরি সেদিনই সে মৃত্যুর ঔজ্জ্বল্য আমাদের পথা দেখাবে। নতুবা আমাদের মনও শত্রুর কাছে বন্ধক রেখে দিতে, কিম্বা সাধু হয়ে পালিয়ে বেড়াতে আমাদেরই বা বাধা কিসে? তাইতো করছেন আমাদের কল্পনার icon. সুতরাং সুভাষ হবেন না চে গুয়েভারা। মার্কিনিরা বা বৃটিশেরাও তাঁকে ভয় পাবে না—তারা করে করে খাবে। প্রেত নৃত্য নাচবে আমাদের বুকের উপর। সেই নৃত্যেই আমরা হব আহ্লাদে আটখানা। জর্জ বুশ আর টনি ব্লেয়ারদের আমরা আজকাল এতো ভালোবাসি সে এমনি এমনি? অথচ চে’র দেহ আর্জেন্টিনায় আমেরিকানরা কী মারই না আজ খাচ্ছে। চাভেজ-এর ভেনেজুয়েলা, লুলার ব্রাজিল মার্কিনীদের ঘাড় ধরে বাইরের দরজা দেখাচ্ছে। এইতো চে। আমাদের সুভাষ ঠিক এভাবেই আমার বেঁচে উঠবেন তো? চাভেজ কিম্বা লুলার চেহারা নিয়ে এই দেশে এই ভারতে আমাদেরই কেউ মাথা তুলে দাঁড়াবে তো? কেউ দাঁড়ালেই আমরা তাঁর সাথী হব তো? 

Tuesday, July 16, 2013

প্রভু জগন্নাথ মহাপ্রভুর ১৬ কলা ঃ-






প্রভু জগন্নাথ মহাপ্রভুর ১৬ কলা ঃ-

১ম কলাঃ- নিবৃতি , সংসারের মধ্যে থেকে সাংসারিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার কলা।
২য় কলাঃ- প্রতিষ্ঠা, সৎ মার্গ তে থেকে যশ অর্জন করার কলা।
৩য় কলাঃ- বিদ্যা , নিস্বার্থ ভাবে জনহিতকর বিস্তার তথা বিদ্যা দান করার কলা।
৪র্থ কলাঃ- শান্তি , মন ও মস্তিষ্ক র মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করে স্থির চিত্ত্যে থাকা।স্থিতপ্রঙ্গ।
৫ম কলাঃ-ইন্দিকা, নিজের অন্ত্ঃ শক্তিকে সংগ্রহ করার কলা।
৬ষ্ঠ কলাঃ- দীপিকা, শক্তির সৎ এবং উপযুক্ত প্রয়োগের কলা।
৭ম কলাঃ- রেচিকা, নিজের দুষ্ট প্রকৃতিকে চিনে,তাকে সিকার করা এবং তাকে পরিত্যাগের কলা। (এটা আজকের যুগে বিরল)
৮ম কলাঃ- মোচিকা, মায়া ও মোহর থেকে মুক্ত রাখা নিজেকে ।
৯ম কলাঃ- পরা , নতুন দিশা র লক্ষে নিজেকে পরিচালিত করা এবং লক্ষ্য স্থাপন করা।
১০ম কলাঃ- অমৃত , অমৃত তুল্য কথার প্রয়োগ এবং তাকে অমৃতর মত বিস্তার করার কলা।
১১দশ কলাঃ- সুক্ষ , সৎ সুক্ষতার বিচার করার কলা । সুক্ষ বিচার শক্তি অর্জনের কলা ।
১২ দশ কলাঃ- জ্ঞান অমৃত, জ্ঞান অর্জন করে তাকে অমৃতের মত বণ্টন করা ।
১৩ দশ কলাঃ- অপার আনন্দ বিস্তার করা ।
১৪ দশ কলাঃ- নিজের কর্ম দ্বারা সমাজের কল্যাণ করা ।
১৫দশ কলাঃ- ব্যাপিনী , সত্যকে সর্বব্যাপী করার কলা।
১৬দশ কলাঃ- ব্যোম রুপা , আকাশের মত নিজের বিরাট ব্যক্তিতে সকলকে আকৃষ্ট করা বা সম্মোহিত করা।

Monday, July 8, 2013

কৈলাসে কলহ [ সব চরিত্র কাল্পনিক ] - অরুণ চট্টোপাধ্যায়


মা মহামায়া নিজের ত্রিনয়নটা সামলে সুমলে রাখে । সরবক্ষন লক করা থাকে । কারণ যদি কোনও কারণে রাগের মাত্রাটা বেড়ে যায় তো ত্রিনয়ন লিক করে আগুন ঠিকরোতে পারে । সেজন্য শুধু লককরাই নয়, একটা ভালভ-এর ব্যবস্থা করেছে । শরীরের হরমোনাল সিস্টেমের ফিড ব্যাক কনট্রোলের মত ব্যবস্থা ।  শরীরের রাগ একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছলে তবেই ত্রিনয়নের ভালভ খুলবে । আবার রাগ মাত্রার নীচে নামলেই সে ডিসচার্জ বন্ধ করে দেবে ।

আসলে সবকিছুর মত এখন ভগবানও ডিজিটাল হয়ে গেছেন কিনা । টাকা আনার মত ছোটখাট বিষয় এই ডলারের যুগে অচল । তাই আনালগ (পড়ুন অ্যানালগ) সিস্টেম বাতিল হয়েছে ।  তা, যা বলছিলাম । বাবা সাতসকালে ধ্যানে বসেছেন ।হাতের তেলোয় একটা চ্যাপ্টা মোবাইল। যেটা নিয়ে এখন মর্তবাসী সর্বদা ধ্যানে মগ্ন সেটা এখন স্বর্গে দেবতাদের হাতে হাতে । কি করবে - ডিজিটাল স্বর্গ যে ।
ধুতুরার সরবতের গ্লাসটা এনে রাখার সময়ই চোখে পড়ল মহামায়ার ।  একি - এখন ধ্যানে বসার সময় নয় ? মেডিটেশনের কত উপকার তা কি মহেশ্বর জানে না ? আর ঠিক তখনই রাগটা তার মাথায় চড়ে বসল ।  কিন্তু এখানে তার ত্রিনয়ন লিক করার সম্ভাবনা নেই। মহাদেবের ত্রিনয়নের জোর একটু বেশি (স্বর্গটাও বোধহয় পিতৃতান্ত্রিক )। এখানেও সেই ফিড ব্যাক কনট্রোল । তাছাড়া একটা অ্যাটমিক পাওয়ার কি আর একটাকে ঘাঁটায় নাকি ? আরে রাম কহো । বড়জোর পায়ে পা লাগিয়ে গায়ে একটু তাপ দেওয়ার চেষ্টা এই যা । আর ওই পরমপুরুষের সাজেশন মেনে একটু আধটু ফোঁস ফাস করা । সেটা তো করতেই হবে নাকি ? নাহলে টেকা যাবে দুনিয়ায় ?
যা বলছিলুম। বাবার হাতে মোবাইল । নারদের নতুন আনা মোবাইল । বাবা বিষ্ণুর দেয়া । দেয়ার সময়ই বিষ্ণু নীরব হাসি হেসেছিলেন । নারদ এর গভীরে লুকিয়ে থাকা অর্থটা অনুধাবন করে মনে মনে হেসেছিল । লাগ ভেলকি লাগ । কৈলাসে এবার কলহ লাগল বলে । নারদ নিজের মনে শুধুবলল, নারদ ! নারদ !!
মোবাইলে বাটন নয় টাচ স্ক্রিন । আহা পরশের কি পুলক আর চমক ! একটু কষ্ট নেই, নেই এতটুকু ঝামেলা । একটা আঙ্গুলের মধুর পরশ মুহূর্তে খুলে দিতে পারে চরম এক সুখের জগত ।
মহাদেব বসে প্র্যাকটিস করছেন । একটা সুন্দরীর বুকের ওপরে আঙ্গুলের মৃদু পরশে খুলে গেল একটা নাচের সীন । হাতের সরবত হাতেই রইল । মহামায়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখে যাচ্ছেন ।আর ভোলানাথ তো ধ্যান করছেন – মোবাইল হাতে ডিজিটাল ধ্যান । মহামায়ার মনে হল এটা একটা বলিউডই সিনেমা । তারপর মনে হল টলিউডিও হতেপারে । আবার হলী হুডিও হতে পারে । আজকাল হুডখোলা আর কার না ?
এতক্ষন তবু রাগ আর দুঃখ চেপে সব সইছিল । কিন্তু আর তো সয় না । ত্রিনয়ন এলারম বাজাতে শুরুকরেছে ।  আরে একি ! বাবা কিনা সাত সকালে ফেসবুক খুলে বসেছে ? নিজের প্রোফাইল । মহামায়ার সামনে । ফ্রেন্ড লিস্ট খুলতেই দেখা গেল । আরে একি ! উর্বশী, রম্ভা এরকম কত সুন্দরী সেই লিস্টে ।  কিন্তু সব ডিজিটাল – তাই ঘাগরা কাচুলি-ওড়নার বদলে সব বিকিনি পরে ফেলেছে । হায় হায় এবার কি হবে ? স্বর্গটাকেও কিনা বুক করে ফেলল ফেসবুক ? হরি হে মাধব – বাথটবে কি গা ধোব ?
কোটী কোটী ফেসবুক-সুন্দরীর লিস্ট কুটিকুটি করে ফেলতে ইচ্ছে হল মহামায়ার । কিন্তু এ যে সব ডিজিটাল – মানে মায়া । মহামায়ার থেকেও বড় মায়া । রাগে মোবাইলটা ভেঙ্গে ফেললেও কি আর সুন্দরীরা যাবে ? এই সুন্দরীদের ধ্যান করবে রোজ মহাদেব  ? হায় হায় বিষ্ণুদেব তোমার মনে মনে এই ছিল ?
- কি, কি করছ তুমি ? রাগে কাঁপতে কাঁপতে মহামায়ার প্রশ্ন, এই তোমার ধ্যান ? এসব কি হচ্ছে ? আবার ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছ ?
মহাদেব মুখ তুললেন । গলার স্বর ভারি শান্ত । না হয়ে উপায় কি ? ভাঙ্গের সরবতটা যে এখনও বউ হাতছাড়া করে নি । একটু না তেলালে যে ও ফিরিয়ে নিয়ে যাবে । বললে, প্রিয়ে, তুমি হলে জগতের সেরা সুন্দরীদের সেরা । তুমি হলে মিস হেভেন । তুমি যখন রেগে যাও তখন মনে হয় একশটা সুন্দর লাল গোলাপ গন্ধ বিকিরণ করতে করতে এগিয়ে আসছে ।
মহামায়া একটু নরম হয়ে পড়ছে নাকি ? তার ত্রিনয়নের চার্জ কি কমে যাচ্ছে ? দনুজ দলনী দুর্গা কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন ? ভাবছেন ত্রিনয়নের চার্জ আরটা আনতে যাবেন কিনা।
- হেপ্রিয়ে । মহাদেব আবার শুরু করেছেন, তুমিই আমার ধ্যান । আমি কি করে অন্য সুন্দরীদের–
-- চুপ কর। এসব ডায়ালগ গল্প উপন্যাসে অন্তত কয়েক কোটী বার লেখা হয়েছে । ভেবেছ  এই সব বস্তাপচা ডায়ালগে ভুলব আমি ? আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না । ফেসবুকের একাউন্ট তুমি এক্ষুনি ডি -একটিভেট করবে কি না বল ?
- আহা এটাতো বিষ্ণুর দেয়া । দেখ না বিষ্ণুই আমার প্রথম ফ্রেন্ড ।
- সে কি বিষ্ণু তোমার ফার্স্ট ফ্রেন্ড ? আমি নই ?
মহাদেব বললেন, ডার্লিং তোমাকেই তো আমি করতুম কিন্তু তুমি যে ফেসবুক পছন্দ করই না । তাই –
মহামায়া কাঁদতে কাঁদতে বললেন, কে বললে ? আমাকে ফ্রেন্ড করবে না তাই বল ।
মহামায়ার হাত একটু বোধ হয় ঢিলে হয়ে আসছিল । শিব উঠে সরবতটা সে হাত থেকে নিয়েই ঘোঁট ঘোঁট করেখেয়ে ফেললেন সবটা ।  তারপর হেসে বললেন, ফ্রেন্ড যে করব তোমারও একটা একাউন্ট থাকা চাই তো ?
- খুলে দাওনা বাপু ।
কলহটা হয়ত মিটেই যাচ্ছিল কিন্তু নারদ অলক্ষ থেকে একটু হাসল । নিঃশব্দে বলল, নারায়ন নারায়ন !
মহামায়ার চোখ পড়ে গেল মহাদেবের জটার দিকে । আরে এটা এমন ফুলে উঠেছে কেন ? কি   লুকিয়ে রেখেছে এখানে ভোলানাথ ? কিছু বলা যায় না কোনও সুন্দরীকে হয়ত –
- ওখানে  কি? তোমার জটার মধ্যে । কি একটা উঁকি পাড়ছে মনে হচ্ছে ?
মুহূর্তে যেন শিব দুর্গার যৌথ তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল । মহাদেব কিছুতেই জটায় হাত দিতে দেবে নাআর জটায় হাত না দিয়ে দুর্গাও ছাড়বে না ।
- আরে আরে করছ কি ? অনর্থ হয়ে যাবে যে । জগত ভেসে যাবে যে ।
- যায় যাক। বলে টেনে জটা খুললেন মহামায়া । পাকের পর পাক খুলতে লাগল জটার । আর স্রোতের পর স্রোত বয়ে যেতে লাগল গঙ্গার । ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ভগীরথের শাঁখের আওয়াজ ।
না জটার ঘোরপ্যাঁচ আর আটকে রাখতে পারল না গঙ্গাকে । বেরিয়ে এসে মহামায়াকে প্রনাম করে বলল,মা কি বলে যে তোমায় কৃতজ্ঞতা জানাব বুঝতে পারছি না । ওঃ আমার কি গা চুলকচ্ছিল যেকি বলব মা । জটাটা একটু সাবান সোডা দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে পার না মা ?
আবার প্রনাম করল ভগীরথও । বলল, মা সগর রাজার ষাট হাজার ছেলেকে বাচাতে হবে মা । মা গঙ্গাকে চাই । আপনি মুক্ত করে দিয়ে কি ভাল যে করলেন ।
মহামায়া যে কি করবেন তা বুঝতে পারছেন না । সত্যি তো ঝগড়ার ফল তবে মাঝে মাঝে ভালও হতে পারে ? শিব এবার ধ্যানে বসলেন । সত্যিকার ধ্যানে ।
সবজান্তা বিষ্ণু ওদিকে হাসছেন । নারদ বলতে যাচ্ছিল, নারদ নারদ !  মুখে আসার আগেই পালটেনিয়ে বলল,  নারায়ন নারায়ন !

[ প্রথম ভাগ ]
কেসবুক (কৈলাস সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইট ) KSBOOK(KAILASH SOCIALI NETWORKING SITE)
- অরুণ চট্টোপাধ্যায়
মর্তে প্রতি বছর একবার করে আসতে আসতে মর্তের একেবারে প্রেমে পড়ে গেছেন মা মহামায়া । অনেক দিন ধরে লক্ষ করে দেখেছেন মর্তবাসীরা আজকাল খুব কম ঘুমোচ্ছে কিম্বা অনেক বেলায় উঠছে ।
কৌতূহল হল । কিন্তু কি করা যায় । মর্তবাসীরা কখন ঘুমোবে বা কখন জাগবে এ তো তাদের মৌলিক অধিকার । তিনি তো তাদের এই fundamental right ছিনিয়ে নিতে পারেন না ।
কিন্তু প্রশ্ন হল তার ধ্যান ছেড়ে দিয়ে মানুষ এখন কার ধ্যান করছে ? কৈলাসে ফিরে বাবা মহাদেবকে প্রশ্নটা করতেই তিনি একবার নিজের সিদ্ধির গেলাসটার দিকে তাকিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে drug addiction.
বলেই আবার ধ্যান মগ্ন হলেন ।
মহামায়ার মনে তো কৌতূহলটা জারিই র‍য়ে গেল । তাই এবার আর কাউকে জিজ্ঞেস করা নয় । রাতের আঁধারে বেরোলেন সারপ্রাইস ভিজিটে । ভাবলেন প্রথম যে জানলায় আলো জ্বলবে তাকেই তিনি টারগেট করবেন ।
কিন্তু হায় । না না সব ঘরে হয় আলো নেভানো, নয় নাইট ল্যাম্প জ্বলছে । ভাবলেন তাহলে তাঁর অনুমান মিথ্যে । ফিরে গিয়ে ছেলে গনেশকে বললেন । গণেশ নিজে সিদ্ধি খান না । সিদ্ধি দ্যান অন্যকে । শুঁড় নেড়ে বললেন, না মা । তুমি জান না । ওরা সব জেগে আছে । ঘরে ঢুকে দেখ । তাহলেই বুঝতে পারবে ।
সেই মত পরের দিন চুপি চুপি আবার গেলেন । প্রথমেই পড়ে গেল একজন তরুণের ঘর । বিছানায় বসে নিজের lap এর top -এ laptop নিয়ে কি যেন নিয়ে মেতে আছে । মা স্বয়ং নিজের চেহারায় আবির্ভূত হলেন । হুঁশ নেই ছেলেটার । সে তখন এক তরুণীর ছবিতে আত্মস্থ । তারপর দেখলেন সে কি লিখল । একটু পরে আর একটা লেখা আবার নিজে থেকেই হয়ে গেল । আবার তরুণ উত্তর লিখল।
মা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে জানলেন এরা প্রেম করছে । এবং আরও জানলেন এরা কেউ কাউকে জানে না, চেনে না । এমন কি এরা যে সত্যি সত্যি এরা তাও এরা জানে না । এই না জানাটাই এদের মস্ত এক আনন্দ আর সাহস দিয়েছে । এরা ডেস্পারেট । পরস্পরের প্রতি এরা যে যা পারছে করে যাচ্ছে । যোগবলে মহামায়া জানলেন, এই খুপরিটার নাম হল মেসেজ বক্স । এর মধ্যে যে যাই কর মহামায়া তো দূরে থাক শিবের বাবাও টের পাবে না। আর শিবের বউ হয়ে তিনিই বা কি করে টের পান ?
মহামায়ার কৌতূহল হল । এরা কি করছে দেখি তো । যোগবলকে লাগালেন কাজে । চট করে ওপাশের মেয়েটা হয়ে গিয়ে বললেন, কি হচ্ছে বাচ্চু । অনেক রাত হয়েছে এবার শুতে যাও ।
এপাশ থেকে ছেলেটা লিখল, আর একটু ডার্লিং । সবে তো তোমার লিপের দিকে এগিয়েছি । লিপস্টিকটা তো ঘসে তুলি নি এখনও । এর পর আরও কত কি –
ছ্যা ছ্যা । তারপর ভাবলেন, এরা সব অল্প বয়েসই ছেলে মেয়ে তো হতেই পারে । টিন –এজার । টিন দিয়ে তো এদের ঘিরে রাখা যাবে না । গেলেন এক বিবাহিতর ঘরে । ওরে বাবা এ তো আরও সাংঘাতিক । ওই টিন – এজাররা তো জানে অল্প । কিন্তু এরা বেশি জানে আর তাই –
নির্ঘুম লোক বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে গেল । দেশ থেকে চললেন দেশে । দেখলেন সারা পৃথিবী কেউ এখন আর ঘুমিয়ে নেই । তখন শুরু হল তাঁর তত্ত তল্লাশ । জানলেন এরা সব মেতে আছে যাতে তার নাম নাকি ফেসবুক । এটা এখন খুব সহজ –লভ্য । কম্পিউটার ল্যাপটপ এসবেরও কিছু দরকার নেই । মুঠোফোন নামে একটা যন্ত্রে আঙুলের মৃদু স্পর্শেই মুঠোয় চলে আসবে সারা দুনিয়া । কর লো দুনিয়া মুঠঠি মে / ভর লো লাইফ ছুট্টি সে ।
[ চলবে ]