Sunday, November 18, 2012

সুবর্ন বসু।

সমস্যাটা শুরু হল গত শনিবার থেকে। কোথাও কিছু নেই, ঝকঝকে সকাল। বেলা সাড়ে বারোটা মতো হবে। এলআইসি-র প্রিমিয়াম জমা দিয়ে ফিরছিলাম। বেশি দূর নয়। বাড়ি থেকে মিনিট চার-পাঁচের হাঁটা পথ। একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ খুব কাছে কেউ যেন খিলখিল করে হেসে উঠল। চমকে উঠলাম। মাথা নিচু করে হাঁটছিলাম। চোখ তুলে দেখি আশপাশে কেউ নেই। শুধু ফুটপাথের বাইরের কিনারা ঘেঁষে যে ল্যাম্পপোস্টটা ছিল, তার গায়ে হাসি মিলিয়ে যাওয়ার রেশ স্পষ্ট। এইটুকু পড়েই যদি আমার মস্তিষ্কর সুস্থতা সম্বন্ধে সন্দেহ জাগে, আমি একটুও প্রতিবাদ করব না। পাতা উল্টে (বা স্ক্রল করে) অন্য কিছু পড়তে শুরু করার জন্য আপনি ওয়েলকাম। কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের হাসিটা নিয়ে আমার একটুও সন্দেহ নেই। হ্যাঁ মহামান্য পাঠক। ল্যাম্পপোস্টটাই হেসেছিল এবং তার সেই উচ্চকিত খিলখিল এখন আমার কানে লেগে আছে। সেই ছিল ঘটনার শুরু।

আমি কলেজ স্ট্রিটে একটা মাঝারি গোছের পাঠ্যবই প্রকাশনী সংস্থায় প্রুফ দেখি। দ্বিতীয়বার সেই খিলখিল শুনতে পেয়েছিলাম, আমি যেখানে কাজ করি, সেই ঘরটায়। দেওয়ালে ঝোলানো একটা ক্যালেন্ডার থেকে। ক্যালেন্ডারে একটা সিনারি ছিল। লন্ডনের বিগ বেন। দেওয়ালের পিছনে মালিকের ঘর। তিনি তখন অনুপস্থিত ছিলেন। হাসি শোনার পর আমি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিবশেই উঠে গিয়ে মালিকের ঘরটা দেখে এসেছিলাম। তালা বন্ধ। অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি তখন পুরী গিয়েছিলেন। মোট কথা, দ্বিতীয়বারের সেই খিলখিল হাসি শুনেছিলাম ক্যালেন্ডার থেকেই, কারণ ক্যালেন্ডারের দেওয়ালের পিছনে তখন কেউ ছিল না। এরপর ঘটনার ফ্রিকোয়েন্সি বাড়তে থাকে, পাঠকগণ। টেবিলের চাপা দেওয়া গেলাস, দেওয়াল ঘড়ি, রাস্তার ধারে কেতরে থাকা চালকবিহীন টানা রিকশা, ডাস্টবিন এবং এবং আরও অনেকে ... ‘অনেকে’ না বলে ‘অনেক কিছু’ বলাই কি ঠিক হত। আসলে যারা এরকম স্পষ্ট উচ্চকিত শব্দে খিলখিল করে হাসতে পারে, তাদের জন্য অপ্রাণিবাচক অভিধা ব্যবহার করতে মন সায় দিচ্ছে না। অপছন্দ হলে, মহামান্য পাঠক, অধমকে ক্ষমা করবেন।
 যেদিন এই খিলখলে হাসিটাকে আমি নির্ভুলভাবে আইডেন্টিফাই করতে পারলাম, সেই দিনটা ছিল রবিবার। এক ফোটোগ্রাফি – পাগল বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। নিজের ভাবনাচিন্তার কথাই শেয়ার করছিলাম। আসলে ফোটোগ্রাফিটাকে আমার ঠিক ক্রিয়েটিভিটি বলতে ইচ্ছে করে না। যন্ত্রসর্বস্ব কোনও কাজই কি ক্রিয়েটিভ হতে পারে? ফোটোশপে কি মোনালিসা আঁকা যায়? যিনি লেখেন, যিনি আঁকেন, তাঁদের প্রয়োজনমাফিক একটু কাগজ, কলম, রং তুলি হলেই চলে। সামান্য আয়োজন। তা ব্যবহার করে তাঁরা লক্ষ-কোটি টাকার বা ক্ষেত্রবিশেষে অমূল্য সৃজনশীল কাজ করেন। কিন্তু যে কাজের উৎকর্ষের অন্যতম শর্তই হল দেড়-দু’লাখি ক্যামেরা, তা কি ক্রিয়েটিভ হতে পারে? তা তো একটা যন্ত্রনির্ভর অনুশীলন এবং অভ্যেসের বহিঃপ্রকাশ, আর কিছুই না। এইটুকুই বলছিলাম। কিন্তু বন্ধু তা মানতে রাজি নয়। অনেকক্ষণ গা জোয়ারির শেষে আমাকে বলল, ‘না হয় বইপাড়ায় একটু যোগসাজস আছে, প্রকাশক, সম্পাদকদের ধরে-করে না হয় দু-চারখানা রদ্দি গল্পই ছাপিয়েছ, তা বলে কি তোমায় সব কিছুই জানতে হবে। যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বলতে এসো না’। বইপাড়ায় যোগাযোগটা কাজের সূত্রেই আছে। ‘যোগাযোগ’ আর ‘যোগসাজস’ এক কথা নয়। দু’টোর তফাৎ বন্ধুকে বোঝানোর ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কথা শেষ করেই বন্ধুটি রেগে-মেগে উঠে পাশের ঘরে চলে গেল। তার দারুণ দামি ক্যামেরাটা টেবিলের উপর আকার দিকে তাক করা ছিল। কাকতালীয়ভাবেই ছিল। বন্ধু চলে যেতেই ক্যামেরাটা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। স্পষ্ট দেখলাম লেন্স ক্যাপ না-পরানো ক্যামেরাটার পাতলা মহার্ঘ্য লেন্সের ময়ূরকণ্ঠী রংয়ে হাসির রেশ! জনশূন্য ঘরে এত কাছে আচমকা ওরকমভাবে হাসির আওয়াজ হলে আমি চমকে চেয়ার থেকে পড়েও যেতে পারতাম। নেহাত গত মাসখানেকে ওরকম আচমকা হাসি শোনা আমার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, তাই তেমন কিছু হল না। তবে এবার যেটা হল, সেটা অন্যরকম। আগে হয়নি। বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে পড়ে গেল, হাসিটা অনুষ্কার। মানে, আর একটু খুলে বললে দাঁড়ায়, অনুষ্কা ঠিক ওরকমভাবেই হাসত। হুবহু! অবিকল।

এতদিন ভাবনা হয়নি। এবার হল। শুধু ভাবনা নয়, ভয়ও। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? আশ্চর্য ঘটনা দেখুন পাঠকগণ! এতদিন হাসি শুনছি, পাত্তা দিইনি। কিছু মনে হয়নি। যেই চিনতে পারলাম যে, হাসিটা অনুষ্কার, তখনই কেমন একটা ভয় এসে বাসা বাঁধল বুকে। এতদিন পর অনুষ্কার হাসি কেন শুনতে হবে এভাবে! প্রায় আট বছর আগের সেই দিনটা মনে পড়ে গেল স্পষ্টভাবে...

কলেজের ফার্স্ট ইয়ারেই প্রেমে পড়েছিলাম অনুষ্কার। ওরকম ভাল, সোজাসাপটা, হাসিখুশি মেয়ে আমি কখনও দেখিনি। বছরখানেক চলেছিল প্রেমটা। কিন্তু সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি থেকেই আমার কাছে অনুষ্কা কেমন একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছিল। ভাল লাগতে শুরু করেছিল সোহিনী বলে অন্য আর একটা মেয়েকে। আসলে অনুষ্কা মেয়েটা বড্ড সাদাসিধে, সিম্পল। সোহিনীর মধ্যে একটা মাল্টি-লেয়ার, রহস্য-রহস্য টাইপ ব্যাপার আছে, ওর আউটফিটও বেশ আধুনিক, বেশ ইয়ে-ইয়ে আর কী। আসলে আমাদের কলেজ জীবনে ‘সেক্সি’ শব্দটা আজকের মতো সহজ-উচ্চার্য ছিল না, তো তাই একটু দ্বিধা রয়ে গেছে শব্দটা নিয়ে। এখনও। সে যা-ই হোক, সোজা কথায়, সোহিনীকে দেখার পর থেকে আমার অনুষ্কাকে কেমন যেন ঘরেলু, পানসে আর বহেনজি টাইপ মনে হতে শুরু করল। খুব ধৈর্যের সঙ্গে সোহিনীকে খেলিয়ে ছিপে তুললাম এবং অনুভব করলাম অনুষ্কাকে আর ঝুলিয়ে রেখে লাভ নেই। একদিন অনুষ্কাকে ডেকে বলেছিলাম সব কথা। বলেছিলাম, ওকে নয়, সোহিনীকে ভালবাসি। বলেছিলাম, ব্রেক আপ চাই। আর মনে মনে তৈরি ছিলাম প্রচণ্ড সিনক্রিয়েট, চেঁচামেচি এবং কান্নাকাটির জন্য। কিন্তু বললে বিশ্বাস করবেন না পাঠকগণ, অনুষ্কার মতো মেয়ে, আমার বাধ্য, অনুগত, আমি-অন্ত-প্রাণ সেই প্রেমিকা সেইসব প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়াগুলোর কোনওটাই দেখাল না। আমার চোখের দিকে চেয়ে একটুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর খিলখিল করে হেসে উঠেছিল, তারপর একটাও কথা না বলে ধীরে ধীরে চলে গেছিল আমার সামনে থেকে। সেই অপ্রত্যাশিত খিলখিল হাসিটা আমি কোনওদিন। অনুষ্কাকে যতদূর চিনেছিলাম, ওর গভীর কষ্ট পাওয়ার কথা ছিল। তবে সে-সব পেটি ব্যাপার খেয়াল করার মতো মানসিকতা তখন আমার ছিলনা ।

আজ আমার ফোটোগ্রাফি-পাগল বন্ধুর বাড়িতে ক্যামেরার হাসি শুনে আমার মনে পড়ে গেল অনুষ্কার কথা। শিরশিরে ভয় আর তীব্র একটা অস্বস্তি নিয়ে বন্ধুকে কিছু না বলেই বেরিয়ে এলাম আমি। মেয়েদের খুব সিরিয়াসলি নিইনি কখনও। সোহিনীর সঙ্গে মাসতিনেক ঘোরার পর, সোহিনী ওর বাড়ি থেকে দেখে-দেওয়া এক ঘ্যামা এনআরআই পাত্র আঁকড়ে আমাকে টা-টা করে দিয়েছিল। তখনও কিন্তু অনুষ্কার জন্য মন খারাপ হয়নি। মোটামুটি গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর নানা জায়গায় চেষ্টাচরিত্র করার পর এক বন্ধুর এই পাবলিশিং হাউসটায় কাজ পেয়েছি। সায়েন্স ছিল, তাই সায়েন্সের টিচারদের পাঠানো ম্যাটার কম্পোজ বা এডিট করার কাজটা ঠিকমতো সামলে নিতে পারি। তিনতলা পৈতৃক বাড়ি। আমরা তিনতলায় থাকি। বাড়ির একতলা ও দোতলায় দু’ঘর ভাড়াটে আছে। একরকম চলে যায়। বছরদুয়েক বিয়ে হয়েছে। ঘরোয়া স্ত্রী। আমাকে ভালই রেখেছে। সেদিকে অভিযোগ নেই। তবে পাঠকগণ, আপনাদের কাছে স্বীকার করতে বাধা নেই, এক দূর সম্পর্কের শালীর সঙ্গেও আমার সম্পর্ক আছে। বউ জানে না। প্ল্যান আছে, একটু টাকাপয়সা জমিয়ে নিয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনব। শালীকে নিয়ে সেই ফ্ল্যাটে ওঠার ইচ্ছে আছে। বউ প্রবলেম করলে, আউট অব কোর্ট সেপারেশন ব্যবস্থা করতে হবে। শান্তিপূর্ণ ডিভোর্সের আইনকানুন এবং খোরপোষের নিয়মকানুন নিয়ে একটা চটি বই কিনেছি। অবসর সময়ে পড়ি। দিনকাল খারাপ। কখন কী ঝামেলা হয়, কে জানে। একটু পড়াশোনা করে রাখা ভাল। আমার সাদাসিধে ভালমানুষ স্ত্রী সন্দেহ পর্যন্ত করে না। আমি জানি। শিয়োর।

 কিন্তু সমস্যা বাড়ল সেই রবিবার দিন থেকে, ফোটোগ্রাফার-বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরনোর পর। সেই খিলখিলে হাসি ক্রমশই সহ্যের সীমা ছাড়াচ্ছে। দুপুরে বইয়ের প্রুফ দেখতে দেখতে একটু মিঠে ঝিমুনি আমার অনেকদিনের অভ্যেস। সেটাও মাথায় উঠল। একটু চোখ লেগে এলেও কে যেন হেসে ওঠে। ঠিক কানের পাশে। চমকে ঘুম ভেঙে উঠে পড়ি। কোনও কোন‍ওদিন মাথার যন্ত্রণা শুরু হয় তীব্রভাবে। যখন বাড়ি ফিরি তখন বেশ জ্বর-জ্বর লাগে, চোখ লাল হয়ে থাকে। একদিন স্ত্রীও জিজ্ঞেস করল, ‘কী গো। খুব কাজের চাপ যাচ্ছে বুঝি? শরীর ঠিক আছে তো’? জোর করে একটু হেসে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলাম। গত কয়েকদিন হল রাত্তিরেও শুরু হয়েছে এই কাণ্ড। যতবার ঘুম আসে, হাসির আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। কখনও দূর থেকে, কখনও খুব কাছ থেকে। যেন ঘরের মধ্যেই হেসে উঠল কেউ। বেশ কয়েকদিন সহ্য করলাম। কানে বালিশ চেপে ধরে ঘুমনো শুরু করলাম। প্রথম প্রথম বালিশ সরে যেত, হাসির আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেত। তারপর একরকম অভ্যেস করে নিলাম। কিন্তু সেই অভ্যেসও আর স্থায়ী হল না। হাসিটা কেমন যেন আমার মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ল। আমায় কি পাগল ভাবছেন, পাঠকগণ? বিশ্বাস করুন, এরকমই হল। একদিন আর থাকতে পারলাম না। ঘুমন্ত স্ত্রীকে ঠেলে তুললাম। উদ্ভ্রান্তর মতো বললাম, ‘শুনতে পাচ্ছ? একটা হাসির আওয়াজ? শুনতে পাচ্ছ’?

ঘুমচোখে ভারী অবাক হল আমার স্ত্রী। বলল, ‘হাসি! কই না তো। কে হাসছে? কোথায় হাসছে’?
 অধৈর্য হয়ে দু’হাতে ধরে ওকে ঝাঁপিয়ে বললাম, ‘কালা হয়ে গেলে না কি? আমার কান ফেটে যাচ্ছে... ঘুমোতে পারছি না। আর তুমি বলছ কোথায় হাসি’! নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম, কী বলছি, কেন বলছি তার কিছুই আর মাথায় রইল না, উন্মাদের মতো বলে চললাম, ‘অপদার্থ কোথাকার। দাঁড়াও না। ডিভোর্স দিয়ে দূর দূর করে যেদিন তাড়িয়ে দেব, সেদিন বুঝবে কত ধানে কত চাল। ননসেন্স একটা। আমি ঘুমোতে পারছি না, আর উনি নাক ডাকাচ্ছেন। গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়াতে হয়...’ অনেক দিনের তীব্র মানসিক ক্লান্তি যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উঠে এল আমার মধ্য থেকে। কত কী যে বলে চললাম... নিজেরই খেয়াল রইল না।

তবে সেন্স ছিল। একটু হলেও ছিল। যা মুখে আসে বলে যেতে-যেতে লক্ষ্য করলাম, আমার স্ত্রী বেশ মন দিয়ে আমার বিষোদ্গার শুনছে এবং ক্রমশ ওর মুখের ভাব বদলে যাচ্ছে। ওর চিরকালীন শান্ত, সরল, ঠাণ্ডা, তরঙ্গহীন অভিব্যক্তির জায়গায় স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে একটা চাপা কৌতুক। মজা পাচ্ছে নাকি ও। স্পর্ধাটা একবার বুঝে দেখুন পাঠকগণ। রাগে আমার পা থেকে মাথা অবধি জ্বলে যাচ্ছে, আর ও মজা পাচ্ছে।

গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘হাসছ কেন? আমি শালা জোকার নাকি? মাঝরাত্তিরে ভাঁড়ামি করছি তোমার সঙ্গে’?

‘হাসির কথাই তো বলছিলে...’ আমার স্ত্রীর মুখে তখন হাসি চাপার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সে বলল, ‘কী একটা হাসি শুনতে পাচ্ছ বলছিলে, সে তো একটা হাসির কথাই বটে...’ বলেই আর হাসি চেপে রাখতে না পেরে খিলখিল করে হেসে উঠল ও। আর... সঙ্গে সঙ্গে... 
আমার হাড় হিম হয়ে গেল। মেরুদণ্ডে প্রবহমান স্পষ্ট এক হিমস্রোতে অনুভব করলাম আমি। 
পাঠকগণ! বললে বিশ্বাস করবেন না, একেবারে সেই হাসি। হুবহু। অবিকল। পিছোতে পিছোতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল আমার। দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে মাটিতে বসে পড়লাম আমি। ও হেসেই চলেছে, মাথার ভিতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার... সারা শরীরে জ্বলন্ত আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ওর হাসি... ক্রমশ দ্রুততর হচ্ছে আমার হৃৎস্পন্দন... বিশ্বচরাচরের সমস্ত শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছে ওই হাসির আওয়াজে... শুনতে পাচ্ছেন না? পাঠকগণ, শুনতে পাচ্ছেন না আপনারা? সত্যিই শুনতে পাচ্ছেন না?

সুবর্ন বসু। 
আমার ছোটবেলা কেটেছে বরাহনগরের আলমবাজারে। পুজোর মাস দুয়েক আগে কোনও একটা সপ্তাহান্তে বাবা আমাদের কলকাতায় নিয়ে যেতেন পুজোর বাজার করতে। সে ছিল আমাদের সব চাইতে বড় উত্তেজনার দিন

বিকেলের চায়ের জন্য ঢোকা হত অনাদি কেবিনে। সঙ্গে অবশ্যই অনাদির স্পেশাল মোগলাই পরোটা। এই একটা দিন বাবা বাইরের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমাদের লাগাম ছেড়ে দিতেন। আর তখন কলকাতা এত পরিচ্ছন্ন ছিল যে বাইরের খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ভয় কম ছিল। এখন বাইরে খেতে গেলেই ভাবি ভাল জায়গায় যেতে হবে, এসি থাকতে হবে, ভাজাভুজি মোটেই না— হেলথ রুল মেনে খেতে হবে। খোলা জিনিস খাওয়া চলবে না ইত্যাদি।

এক বার বাবা আমাদের চাইনিজ রেস্তোরাঁ কারকো-য় নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন কলকাতায় চিনে খাবারের চল সবে হচ্ছে। http://www.anandabazar.com/e_kolkata/2012/october/amar_sohor5-2.pngচাংওয়া, জিমিস কিচেন, পিপিং আর কারকো— এই ক’টি রেস্তোরাঁতেই সাবেকি চিনে খাবার মিলত। আর চাইনিজ খাবারে ইন্ডিয়ানত্বের ছোঁয়াও ছিল অল্প, তাই আমাদের বরং অসুবিধেই হত। কেবল গোল্ডেন ফ্রায়েড প্রন ছাড়া আর কোনও পদই ভাল লাগত না। বাবা বলতেন, চাইনিজ খাবারের অভ্যেস করতে— সহজ পাচ্য, তেল মশলাও কম। আর সস্ ভিত্তিক রান্না, তাই মুখ বদলানোর পক্ষে আদর্শ। কিন্তু আমরা তিন জন সে কথা মানতাম না। শুধুই গোল্ডেন ফ্রায়েড প্রনের দিকে হাত বাড়াতাম।

আমাদের স্কুল ছুটি পড়ে যেত পঞ্চমীর দিন। আর খুলত ভাইফোঁটার পর। পুজোর ক’দিন বইপত্র শিকেয় তোলা থাকত।

পুজোর প্রতি দিন সকালে বাবা নিয়ম করে চালাতেন গ্রামাফোন চেঞ্জার। আর একে একে সানাই, শরদ, সেতার, নতুন গানের এলপি রেকর্ড— কলের গান বাজত। বছরের এই সময়টা নিয়ম করে বাবা সেই শব্দ যন্ত্রটির http://www.anandabazar.com/e_kolkata/2012/october/amar_sohor5-3.pngপরিচর্যা করতেন পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই। আজও সেই পুরনো আধুনিক গানগুলো রেডিওতে শুনলে মনটা যেন কেঁদে ওঠে। শিউলির গন্ধ, পুজোর ঢাকের আওয়াজ, শিশির ভেজা শরত্কাল ছুট্টে এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ে। এক বার কেনা হয়েছিল হেমন্ত, মান্না, আরতি, প্রতিমা, শ্যামল, সন্ধ্যা, অনুপ ঘোষালের সাতটা ছোট ৪৫ আরপিএম-এর রেকর্ড, এইচএমভি থেকে বেরিয়েছিল। আর সবচেয়ে মজা হল দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সাতটা ছোট রেকর্ড এক সঙ্গে ওই চেঞ্জারে বসিয়ে সেট করে ঘুমিয়ে পড়লে নিজের থেকেই একটা একটা করে বাজতে থাকবে। খুব মজা হত— নতুন গান যা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজছে তা আবার আমাদের বাড়িতেও বাজছে। অনুপ ঘোষালের ‘বিয়ে করবই না’, আরতি মুখোপাধ্যায়ের ‘বন্য বন্য এ অরণ্য ভাল’, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘আমিও পথের মতো হারিয়ে যাব’, মান্না দের “ক’ ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ”, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘গহন রাতি ঘনায়’— এই গানগুলো আমাকে তখন ছুঁয়ে গিয়েছিল, তাই বোধ http://www.anandabazar.com/e_kolkata/2012/october/amar_sohor5-4.pngহয় আজও মনের কোটরে পড়ে রয়েছে। সে বার এই গানগুলোই কিন্তু বেরিয়েছিল পুজোর গান হিসেবে, সালটা বোধ হয় ১৯৭৩ কি ১৯৭৪ হবে, ঠিক মনে নেই। এখনকার ছোটরা দেখি পুজোর সময়েও কম্পিউটার গেম খেলছে নয়তো টিভি খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্টুন দেখছে। তাদের ঠেলেঠুলে প্যান্ডেলে পাঠাতে হয় আরতি দেখতে আর অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসার জন্য।
সপ্তমীর দিন সকাল থেকেই সব প্যান্ডেলে পড়ে যেত নবপত্রিকার স্নান করানোর ধুম। আলমবাজার গঙ্গার ঘাট খুব কাছে বলে সকাল থেকেই শোনা যেত ঢাকের আওয়াজ। প্রত্যেক বার মা বলতেন নবপত্রিকার পুজো মানে আসলে মা দুর্গার পুজোই। অত বড় মৃন্ময়ী মূর্তি তো আর গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে স্নান করানো যায় না, তাই নব পত্রিকা বা কলাবউকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ভাই কেবল বলত, ওটা তো গণেশের পাশে থাকে তাই গণেশের বৌ। মা দুর্গা কেমন করে গাছ হবে? মা তখন আবার ব্যাখ্যা করে দিতেন যে ন’রকমের উদ্ভিদ, যেমন, বেল, ডালিম, কচু, মান কচু, হরিদ্রা, অশোক, ধান, কদলী, আর জয়ন্তী গাছের চারাকে শ্বেত অপরাজিতা গাছ দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা বানানো হয়। শস্যপূর্ণ বসুন্ধরার প্রতীক রূপে চার দিন ধরে মা পূজিত হন। সপ্তমীর দিন বিশেষ আমিষ পদ রান্না হত— মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ, চিংড়ির মালাইকারি, আরও কত কি! সে দিন বিকেলে আড়িয়াদহে আর দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর দেখতে যেতাম রিকশা ভাড়া করে। বিরাট বিরাট পুজো হয় ওই দু’টি অঞ্চলে। মাঝে মাঝে ‘হল্ট’ দেওয়া হত মামারবাড়িতে আর জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে। জল যোগ এবং বিয়োগ করে ঠাকুর দেখার পর্ব চলত। অষ্টমীর দিন ভোর থেকেই চলত অঞ্জলির প্রস্তুতি। একে একে স্নান সেরে সবচেয়ে ভাল আর দামি জামাটি পরে অঞ্জলি দিতে যেতাম। বিয়ের আগে পর্যন্ত এ ভাবেই কাটত ষষ্ঠী, সপ্তমী আর অষ্টমী।

বিয়ের পর প্রথম বছর কেটেছিল দক্ষিণ কলকাতার পুজো দেখে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজমের বাসে চেপে দেখতে গিয়েছিলাম কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজো। আধুনিক থিমের দুর্গাপুজোর চেয়ে অনেক মন কাড়ে এই পুজোগুলি। সে বার সপ্তমীর দিন ধর্মতলা থেকে বাসে চড়ে দেখেছিলাম বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পুজো, জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির পুজো, শোভা বাজারের রাজবাড়ির পুজো, উত্তর কলকাতার বিখ্যাত লাটুবাবু-ছাতুবাবুদের পুজো। ডাকের সাজের প্রতিমা, চণ্ডীমণ্ডপে সুদৃশ্য চালচিত্রে বিশাল আয়োজন, বাড়ির মহিলাদের সাবেকি গয়না ও বেনারসি শাড়ি পরে মায়ের পুজো গোছানো— সব কিছুতেই ঐতিহ্যের ছাপ।


...আরও সুন্দরী হয়ে ওঠে শারদোত্সবে
ত্রিভুবনজিৎ মুখোপাধ্যায়
(কলকাতা)
আজ থেকে বহু বছর আগের কথা। তখন কলকাতা বলতে টালা থেকে টালিগঞ্জ বোঝাত। আমরা তখন বেলঘরিয়াতে থাকতাম, ভাড়া ঘরে। ১৯৫৯ সালের কথা। তখন স্টিম ইঞ্জিন চলত। নতুন পুজোর জামা বলতে স্কুল ড্রেস— তাই পেয়েই খুশি। ষষ্ঠীর দিন মা কপালে চন্দনের টিপ দিয়ে আশীর্বাদ করতেন, “দীর্ঘজীবী হও।” সপ্তমী থেকে পাড়ার পুজো দেখে আর ভোগ খেয়ে প্রতিমা দর্শন। তার পর পায়ে হেঁটে বেলঘরিয়া, মোহিনী মিল, পুকপাড়া, নিমতার পুজো।
http://www.anandabazar.com/e_kolkata/2012/october/amar_sohor4-1.jpg
পরের দিন অর্থাত্ অষ্টমীর দিন, হাঁটতে হাঁটতে রথতলা-সিঁথি ঘুরে পায়ের ব্যথা নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়তাম। মা হয়তো পুজোর খরচের জন্য ১ আনা দিতেন তাতে রাস্তায় হয় চানাচুর নয় ঝুরিভাজা। সঙ্গে একটা বেলুন। মাইকে শ্যামল মিত্রর গান, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা...’ সেই গানের কলির অর্থ বুঝতাম না, তাও গাইতাম। আবার কখনও মিন্টু দাশগুপ্তের প্যারডি, ‘আমি তো পকেট কাটিনি কেন মোরে দাও শুধু প্যাদানি’। লতা মঙ্গেশকরের ‘না যেও না রজনী এখনও বাকি, বলে রাত জাগা পাখি’ সলিল চৌধুরীর সাড়া জাগানো গান। কি বাচ্চা কি বুড়ো— সকলের মুখে ওই এক গান। গান শুনলেই মন ভরে যেত।

দুর্গা প্রতিমা দর্শন— কুমোরটুলির ঠাকুর, বাগবাজার সর্বজনীনের পুজো, শোভাবাজারের ঠাকুর,আহিরিটোলা, পরে ফিরে দেশবন্ধু পার্ক, শ্যামবাজারের পুজো।

নবমীর পুজোর সময় ঢাকের বাদ্যির তালে ধুনুচি নাচ। কোথাও কোথাও পাঁঠা বলি হত তখনও। নবমীর দিন পাড়ার পুজো বেশি উপভোগ্য ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে হুটোপাটি, নাগরদোলনা চড়া, ফুচকা খাওয়া— খুব হইচই। আর দশমীতে দেবীর বিদায়ের পালা। বিজয়ার প্রণাম সারতে সারতে পুজোও শেষ। অপেক্ষা আবার আরও একটা বছরের।

ছোটবেলার স্কুল ছুটি, কৈশোরের রাতজাগা, যৌবনের সদ্য ভালবাসা... দুর্গাপুজোর সঙ্গে যেন সেই সব দিনগুলি পরতে পরতে জড়িয়ে আছে।
অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও তার স্মৃতি এখনও ঠোঁটের কোণায় এঁকে দেয় হাল্কা হাসি। পুজোর শহর, সেই কলকাতা নিয়ে আপনাদেরই কলমে...
http://www.anandabazar.com/e_kolkata/images/amar-shohor-logo.gif
http://www.anandabazar.com/e_kolkata/2012/october/notice-durga-logo.gif


লেখক পরিচিতি
সরকারি চাকরি থেকে প্রায় দেড় বছর হল অবসর নিয়েছেন। বদলির চাকরির ফলে পুরো ওড়িশাই ছিল পায়ের তলায়। ঘোরাঘুরির বহর এমনই যে তাঁকে ভবঘুরেও বলা যেতে পারে। কালাহান্ডি, কোরাপুট, মালকানগিরি, জাজপুর, পুরী— শেষে বারো বছর ভুবনেশ্বরে কাটানোর পর ওড়িশা-বাস শেষ হয়েছে। এখন স্বামী-স্ত্রীতে কলকাতায় ছেলের কাছেই থাকেন।

ফেলে আসা ছেলেবেলার পুজোর সাক্ষী
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
(খড়্গপুর)
http://www.anandabazar.com/e_kolkata/2012/october/amar_sohor5-5.jpg
আর এক বার আমরা একটা গাড়ি নিয়ে বেলুড় মঠে কুমারী পুজো দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানেও খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো হয়। তবে আজকাল ধর্মের নামে যে হুজুগের স্রোতে আপামর বাঙালি মেতে উঠেছে তা বেলুড় মঠের ভিড় দেখলেও বোঝা যায়।

পুজো এখন ফ্যাশানেবল হয়ে উঠেছে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে আলোর রোশনাইয়ের সঙ্গে অনুরণিত হয় এক দিকে মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্র আর ডিজিট্যাল এলসিডি স্ক্রিনে রংচঙে বিজ্ঞাপন। আর সেই সঙ্গে থরে থরে সাজানো ফাস্টফুডের গরমাগরম হাতছানি। এক একটি বারোয়ারি পুজো এখন ‘স্পনসর্ড’ পুজো— কোনও এক কোম্পানির সম্পত্তি, কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের কিনে নিয়েছে ওই পাঁচটি দিনের জন্য। প্রতিযোগিতার মাপকাঠিতে মা আসেন একটা প্যাকেজে! সেরা প্যান্ডেল, সেরা প্রতিমা, সেরা দর্শক শ্রীমতি, সেরা আরও কত কিছুর ভিড়ে কিন্তু আসল পুজো একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সরে যাচ্ছে পুজোর মূল, অনাদি আবেদন।

লেখক পরিচিতি
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রিতে এমএসসি। কলকাতার বাসিন্দা তবে অধ্যাপক স্বামীর কর্মসূত্রে বর্তমানে খড়্গপুরে বাস। এক ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। সাহিত্যচর্চায় ভীষণই ঝোঁক। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে, দেশ পত্রিকায়। এ ছাড়া আনন্দবাজার পত্রিকায় ভ্রমণকাহিনি প্রকাশিত একাধিকবার। গদ্যচর্চার পাশাপাশি কবিতার সঙ্গে নীরবে ওঠাবসা চলতেই থাকে। সঙ্গীতচর্চা, বেড়ানো এবং রান্না— অবসর যাপনের আরও তিনটি ঠেক।

লেখক পরিচিতি
সরকারি চাকরি থেকে প্রায় দেড় বছর হল অবসর নিয়েছেন। বদলির চাকরির ফলে পুরো ওড়িশাই ছিল পায়ের তলায়। ঘোরাঘুরির বহর এমনই যে তাঁকে ভবঘুরেও বলা যেতে পারে। কালাহান্ডি, কোরাপুট, মালকানগিরি, জাজপুর, পুরী— শেষে বারো বছর ভুবনেশ্বরে কাটানোর পর ওড়িশা-বাস শেষ হয়েছে। এখন স্বামী-স্ত্রীতে কলকাতায় ছেলের কাছেই থাকেন।

Saturday, November 10, 2012

মরিচিকা ৩ / ত্রিভুবনজিৎ

-তাই যেন হয় বাবা। রক্ষে কর । ওতে আলার্জি হলেই বাঁচি। হ্যাঁরে তা ওই শীতে কি করতিস?
- তোমার ওই এক ঘেয়ে প্যানর প্যানর ভাল লাগেনা মা। রুম হিটার লাগাতাম বুঝলে!খালি সন্দেহ আর সন্দেহ। ওই জন্য বাবা রাগ করেন।
- সন্দেহর কি আছেরে ! আচ্ছা আমি, মা হয়ে এটুকু জিজ্ঞাসা করার অধিকার নেই?
- নিশ্চই আছে ,তবে ওখানকার ভাল গুল শোন। ওরা কর্মঠো, অনেক স্বাবলম্বি, ডিসিপ্লিন্ড্, ওদের মধ্যে শততা আছে যেটা আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশের লোকেরা পর নিন্দা পর চর্চা ছাডা কিচ্ছু করেনা। ঠকামি,ভন্ডামি,জোচ্চোরি,রাহাজানি,চুরি,পরের ধন আত্মসাৎ করা,ভাই ভাইএর পিঠে ছুরি মেরে তার সম্পত্তি আত্মসাৎ করা ...। ছিঃ ঘেন্না লাগে এদের কথা ভাবলে।
- “ছেলের বিয়ের সময় গেস্ট্ আসবে বলে মিথ্যে কথা বলে ছোট ভাইএর ঘরের চাবি নিয়ে তার গ্যাস্ সিলিন্ডার চুরি করা,তার ঘরের সব জিনিস পত্র চুরি করা,তার খাট্ বিছানায় শুয়ে তার ই  ঘরের পাখার হাওয়া খেয়ে জীবন ধারন করা । তাকে ঘরে ঢুকতে না দেওয়া । এই ধরনের ছোটোলোক ও দেশে নেই। ভগবান করুন এই লকগুলো র জেনো সুমতি হয়। এরা এতোই ঘৃন্য যে এদের কথা লিখতেও ঘেন্না লাগে” । এরমধ্যে সকলের বিয়ে হয়ে গিয়েছে আমার ছেলের জন্য পাত্রি দেখতে হবে!    
 কথাগুলো বিড বিড করে বলছিলাম। ছেলে  জিজ্ঞাসা করাতে চুপ করে গেলাম।  
পরের দিন আনন্দবাজার পত্রিকা তে পাত্র পাত্রি কলমের জন্য বিঙ্গাপন দিলাম। “ভরদ্বাজ সুদর্শন ২৬+ সফট্ ও্যার ইঞ্জিনিয়ার ইনফোসিস্,বেঙ্গালোর।এক মাত্র সন্তান। সদ্য আমেরিকা ফেরৎ। ৭ লাখ্ বাৎসরিক আয়। কোন দাবি নেই। পাত্রী অবশ্যই ইঞ্জিনিয়ার সুদর্শনা ২৪ অনুর্ধ্য ।সত্তর বিবাহে আগ্রহি জোগাজোগ করুন”।   
রবিবারের পাত্র পাত্রি কলমে বেরুনর সঙ্গে সঙ্গে ফোনের পর ফোন আস্তে লাগলো। প্রায় ১০০ টা ফোন রেসিভ্ করে হাঁপিয়ে উঠলাম। এই এক সমশ্যা । সংসারে এলে সকলকে ওই এক ই কাজ করতে হবে । ছেলের জন্য পাত্রী না হয় মেয়ের জন্য পাত্র ।