Friday, November 9, 2012

মরিচিকা ২য় পর্ব। ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

   হ্যাল   কে ? মিন্টু বলছো বাবা ? একটু ব্যাঙ্কে বাবার খোঁজ নেবে বাবা । উনি না খেয়ে বাডিথেকে বেরিয়েছেন  এখনো ফেরেন নি ! ৪ টে বেজে গেল কোথায় গেলেন কিছু হদিস পাচ্ছিনা।(মিন্টু , আদিত্য বাবুর ছোট জামাই,  পি এন বে তে স্কেল১ অফিসারসদ্য কেরানি থেকে অফিসার ) 
-      মিন্টু   হ্যাঁ মা ! (আজকাল জামাই বাবা জীবন রা নিজের মায়ের চেয়ে শাশুডী মার বেশি ভক্ত) এখুনি দেখছি । স্কুটার নিয়ে মিন্টু বেরিয়ে যায় ।   
মিন্টু ফোন করে ম্যানেজার কে জিজ্ঞেস করাতে উনি বলেন ,  সকলে পেনসন নিয়ে বাডি ফিরে গিয়েছেন। আদিত্য বাবু ত কখন চলেগিয়েছেন । বাডি ফেরেন নি ? মিন্টু র কেমন সন্দেহ হয় । ও সঙ্গে সঙ্গে থানাতে যায় ওখান থেকে যানতে পারে যে, এক ভদ্রলোক এর  মাথায় আঘাৎ লেগেছে ।ওনাকে সম্ভবতঃ একটা অটো রিক্সা পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছে।  উনি  হস্পিটাল এ এমারজেন্সি ওয়ার্ডেতে আছেন ।
মিন্টু এক বন্ধু কে সঙ্গে নিয়ে হস্পিটালে গিয়ে যা  দ্যাখে আকাশ থেকে পডে । ইনি তো শ্বশুর মশাই !  সম্পুর্ন সঙ্গাহীন অবস্থায় বাবা একটা বেঞ্চে শোয়ান । কেউ কোথাউ নেই। একটা গেঞ্জেল পুলিস কনষ্টেবল্ রোগি পাহারা দিচ্ছে বাকি সবাই খেতে গিয়েছেন
মিন্টু  , ডাক্তার বাবু কে অধৈর্জ্য  হয়ে জিঙ্গাসা করলো ,” পেসেন্ট আমার বাবা, মানে শ্বশুর মশাই । ওনার অবস্থা কেমন ? ওনাকে এক্ষুনি ট্রিটমেন্ট  করতে হবে । কি ইঞ্জেকশান ওসুধ আনতে হবে তাডাতডি বলুন । ওঁর মাথায় আঘাৎ লেগেছে দেখছি । এখানে কি ন্যুরো সার্জেন আছেন? আমি নার্সিং হোমে নিয়ে যাব। ওনার ছেলে নেই আমি ওনার সব দেখা শুন কোরব। মাকে খবর দি। খুবি ঘাবডে যায় আদিত্য ।এক সঙ্গে এতগুল প্রশ্ন বানে ডাক্তার বিরক্ত প্রকাশ করেন। 
-      কোথায় ছিলেন এতক্ষন? এটা সরকারি ডাক্তারখানা । এক্সিডেন্ট এর কেস্ ।আপনি জানেন না প্যারাফারনালিয়া আছে!  আমরা রেফার করছি ।  আমাদের ন্যুরো সার্জেন নেই এখানে। এস সি বি তে নিয়ে যান নয়তো ডাক্তার বসু ভাল ন্যুরো সার্জেন ওনাকে  দেখান । মাথায় চোট্ টা জো্রে লেগেছে । একটা অটো ড্রাইভার হস্পিটালে নিয়ে আসে । পুলিস ওকে আটকে রেখেছে ।  
-      আমি ; সি ডি এম্ ও কে দ্যখা করতে চাই। আমি ওনাকে এখান থেকে সিফট্ করাতে চাই ।  আমার কথা বলার সময় নেই প্লিজ কিছু করুন । মিন্টু এরমধ্যে অর্চনা  দেবিকে ফোন করেন । সব ঘটনা  জানিয়ে দেন। মা খুব শক্ত মনের মানুষ উনি সহজে বিচলিত হন না। কিছুক্ষনের মধ্যে মা চলে আসেন ডাক্তার খানা তে । বড জামাই সুব্রত আর বড মেয়ে বিনা । সকলে এসে পডাতে মিন্টু হাঁফ  ছাডে হস্পিটালের কাজ সেরে ওরা আ্যাপোলো হস্পিটালে আদিত্য বাবুকে শিফট্ করান ওখানে সঙ্গে সঙ্গে আই সি ইউ তে  ভর্ত্তি করার পর ডাক্তার বসু ন্যুরো সার্জেন আসেন । রোগীর চকিৎসা র কোন ত্রুটি হয়না । আমেরিকা তে রেক্স  কে খবর দেওয়া হয় । ও তিন দিনের মধ্যে এসে পৌঁছে যায় । সকলে উদ্গ্রিব কি হবে । রোগী কোমা তে থাকে প্রায় তিন দিন । পরে জ্ঞান আসে ।
এর মধ্যে রেক্স  এসে পডে স্বস্ত্রীক । রেক্স এর আমেরিকান বউ জিনি কিছু কিছু পরামর্স দেয় ডাক্তার কে । কিন্তু বহু চেস্টার পরও আদিত্য বাবুর কোমর থেকে পা ওব্ধি প্যারালিসিস্ হয়ে যায়। প্রায় চার মাস হস্পিটালে রেখে আদিত্য বাবু কে ঘরে আনা হয়। ভেন্টিলেটার  এ থাকার সময় ডাক্তার বলেন বন্দ করলে শেষ আপনার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করুন সে কি বলে ? রেক্স রাজি হয়  না। বলে যতো টাকা লাগে দোব বাবার চিকিৎসা ভাল করে যেন হয় । তাই হল 
এর মধ্যে অর্চনা দেবি বাপের বাডির ভাইদের কাছ থেকে কেস্ করে তাদের  জমি বিক্রি বাবদ ১০ লাখ টাকা পান  তাতে স্বামির চিকিৎসা এবং ঘরের খরচ সব চলে । ব্যাঙ্কের নগন্য মাত্র পেন্ সন এর টাকা দিয়ে আগের ধার দেনা শোধ করেন। রেক্স   ভাল ছেলে তাই মাকে ডলার পাঠাতো। মা সেই টাকা দিয়ে ঘরটা বাডিয়ে তোলেন । তিন তালা ঘর বানান । ভাডা বসান । ভালই ভাডা পেতে লাগেন।ঘরে ঢুকলে আগে ভাডাটে পরে গৃহস্বামি । এর পর পুর্ব কির্তীর ফল ভোগ করেন কারন দুই জামাই ঘরের ভাগ চায় । অগত্যা তাদের চাহিদা পুরনের জন্য ছেলের পাঠান টাকা  দিয়ে দুট ফ্ল্যাট্ কিনে দুই জামাইকে দান করেন।
প্রায় ৫ বছর বেড্ রিডিন থাকার পর আদিত্য বাবুর স্বর্গ বাস হয়  আদিত্য বাবুর বড বউদি ছোট বেলা থেকে ওনাকে মানুস করেন। উনি এসে কান্নায় ভেঙ্গে পডেন। এক ভাই নাটাবাবু আর সকল  ভাইপো এবং অর্চনা দেবির ভাইরা এসে দাঁড়ান (জদিও তাদের সর্বস্য নিয়ে যান ওই বোন) দুই মেয়ে জামাই উপস্থিৎ থেকে কাজ উদ্ধার হয়। পারলৌকিক কাজ আটকায়না কখন ।


                                    
এর পর অর্চনা দেবি ঘর বিক্রি করে চলেজান ছোট মেয়ে জামাই এর কাছে । ছেলে আমার মস্ত বডলোক আর ভাইদের বলেন উনি প্রতিষ্ঠিত । তাই কোন ভাই আমল দেন না। এর পর ছেলের বাচ্চা সাম্লানোর জন্য আমেরিকা একাই যান । ফিরে তাঁর দিদিকে আমেরিকার গল্প শোনান । মাস মাস চলে আমেরিকা আর আমেরিকা র গল্প । দিদি আর থাকতে পারলেন না । তিনিও ভয়যার এর গ্রুপ এর সঙ্গে লন্ডন, গ্রীস, আয়ারল্যন্ড, ভেনিস, ইত্যাদি ঘুরে এলেন টা ১,৫০০০০কা খরচ করে । মানতে হয় ভাই এদের প্রতিযোগিতা আর টাকা অপব্যায়ের সমস্ত রাস্তা খুঞ্জে বার করা।এরা লোকের কাছে বিদেশে ্যাওয়ার গল্প ফাঁদার জন্য সব করতে পারে। 
দিদি এসেই সকল কে টেলিফনে জানায় আমেরিকার কথা । হাঁসব কি কাঁদবো জানিনা । হুঁ হাঁ তে উত্তর সেরে গিন্নী কে বললাম, গিন্নী কি বল, ইউরোপ আমেরকা যাবে নাকি ? 
- রক্ষে কর কাজ নেই ! বলি আদেকলা র হল ঘটি জল খেয়ে খেয়ে গেল প্রান্ টি । 
- আচ্ছা সব বউ রা কি তাদের ননদ কে টিটকিরি দেয় ?
- জানিনা বাপু । জা সত্যি তাই বললাম।এখন তোমার দিদি খারাপ লাগবেই । বেলা হল অফিস যাবেনা?
- না গেলে খাব কি ? আমার ছেলে ত এখনো পডা শেষ করেনি !আরেক বছর পর বি টেক্ শেষ  হবে তার পর এম বি এ যদি করে তো আর ডু বছর । আমার কি ডলার আছে বসে খাব?
- মুখ্যে আগুন ডলারের । দরকার নেই ওরকম ফিরিঙ্গী বউ এর ডলার ! লজ্যা ঘেন্না নেই গো ? 
  পয়সা টা কি এতই বড ? 
- পয়সা ক্যা না করতা ? গিন্নী ওটাই সব বাকি সব ফক্কা। 
ছেলে পাস করলো ভাল ভাবে । এম বি এর কোচিং নিতে শুরু করলো । এরমধ্যে ইনফসিস্ এর লিখিত পরীক্ষা তে ভাল করাতে মাইশুরে জএন্ করল ট্রেনিং এ । ছ মাস পর বেঙ্গালুরু তে ইনফো সিটি তে কাজে জয়েন করলো । ঢুকেই যা মাইনে পেল ভালই । আমার কোন প্রতিক্রিয়াই হল না। ওর মা যথা রিতি টেলিফোনে খবর নিত । মাস গেলে টেলিফোন এর বিল বাডতে লাগলো। নতুন চাকরি র প্রথম মাইনেতে ছেলে একটা মোবাইল কিনে দিল। তখন মোবাইলের অনেক দাম ছিল ।  ভালই লাগলো তবে আমার এই অপচয় ঠিক পছন্দ নয়। ৭৫০০ টাকা একটা মোবাইল্ এর দাম। নাইবা রাখলাম মবাইল   !   --ছেলে বলে, তোমার ল্যান্ড ফোন এর বিল্ টা তো বাঁচলো । 
-তোমার ওই হাড ভাঙ্গা পরিশ্রমের টাকায় আমার সখ্ এর কোন ইচ্ছে  নেই। টাকা জমাও এম বি এ র জন্য । 
- ঠিক আছে। 
- কিছুদিন পরেই ছেলে প্রজেক্ট এর কাজে কম্পানি থেকে আমেরিকা গেল । এক বছরের জন্য । 
রাত্তির ১২ টার ফ্লাইট্ । নেতাজী সুভাশ এয়ারপোরট্ থেকে দিল্লী, তারপর দিল্লী থেকে ফ্রাঁকফুট্ হয়ে নিউ ইয়রক্। আমি আর গিন্নী শুধু ভাবি কবে ফিরবে ! ব্রহ্মনের ছেলে ওখানে কি বলতে কি খাবে কে জানে? গিন্নীর পুজ বেডে গেল । উপোস তাপাস । আজ সংক্রান্তী কাল আমাবশ্যা লেগেই রইল । আমার ভয় আমেরিকান বউ না ঘরে তোলে ? যা জুগ পডল ?
- মনের কথা মনে রেখে আছি । হঠাৎ দিদির ফোন , হ্যাঁরে তোর ছেলে আমেরিকা গেল খবর দিস নি?
 - দেওয়ার মত খবর হলে নিশ্চই  দিতাম।
- ও! তা কোন্ টা তোদের দেওয়ার মত খবর শুনি!! 
- আগে মানুষ হোগ তার পর নিশ্চই দোব।
- হ্যাঁরে আমাদের পাডার সম্পাকে মনে আছে ?
- কে সম্পা ? না মনে নেই । কেন ?
- ওর সঙ্গে আমাদের ছেলে কে খুব মানাবে।
- এবার বুঝলি তো, কেন তোদের বলিনা কিছু !
- ২২ বছরের ছেলে কে তোরা বিয়ে দিয়ে গলায় একটা অপগন্ড মেয়ে ঝোলাবি? 
- এখন তো বলছি না ?
- প্রয়োজন নেই । আগে এম বি এ  করুগ । 
- ওর এম বি এর খরচ ওরাই দেবে।
-  দিদি প্রসঙ্গ বদলা । আমার এ সব মেটেরিয়ালিস্টিক্ কথা  শুনতে একদম ভাল লাগে না।
- আমি অফিস্ যাচ্ছি । ছাডলাম । 
- ছেলেকে ফোন করব যে তার উপায় নেই । সব হাঁ করে কথা শুনবে। আমাদের মনের অবস্থা কেউ বোঝে না। 
এক বছর ছ মাস পর ছেলে ফিরল। রাত্তির ২ টোর সময় ফ্লাইট্ এল। ওর মা'র চোখে জল। খুব ভাল চেহারা হয়ে গিয়েছে । একেই ফর্সা তাই ওখানকার হাওয়া বাতাসে খুব হ্যান্ডসাম লাগছিল । আসলে ছা পোসা বাঙ্গালির ঘরে একটু কেউ উন্নতি করলে ঢোল বাজানোর লোকের অভাব থাকেনা। এটাই বাঙ্গালির সবচেয়ে বাজে গুন। কস্মেটিক্স ইলেক্ট্রনিক্স এর জিনিস বোঝাই। সবাই এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ্ করে ঘরে ফিরলাম । ছেলের জন্য পাঁচ লিটার মিনারেল ওয়াটার কিনে রেখেছিলাম কারন ওখান থেকে এলেই আগে পেটের গন্ডগোল দ্যাখাদেয়
- বাডিতে মা রকমারি রান্না করেছিল। অনেক দিন পর ছেলেকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা । 
-না ছেলে আমার খুব ভাল। ওখানে নিজে হাতে রেঁধে খেত। মাইক্রো ওভেন এর রান্না।  
-ছেলে বল্ল বাবা অখানে সব পাওয়া জায়, শুধু মানুষ পাওয়া জায় না। সব মেসিনের মত।
-তা যে দেশের যা নিতি? তুমি আমি কে? ওদের দেখার জন্য সব হুড হুড করে যাচ্ছে।
- বাবা ম্রিগাঙ্ক আর ম্রিনালিনির সঙ্গে নিউ ইয়র্কে দেখা করলাম । ওরা পার্টি দিল।
- হ্যঁারে পার্টি তে মদ গিলিস্নিতো?
- হ্যাঁ।
-মানে?
-মানে আবার কি ? সকলে খেল আমিও খেলাম! মুচকি হেন্সে বলল।
-আহ্! কি হচ্ছে ? সুরু হল তো? আমি চোটে গেলাম ! আরম্ভ হল এক ঘেয়ে কথা।
-তুমি কেন চিন্তা কর বলত ? আমার ওতে আলার্জি ।  
ক্রমশঃ- 



                                    

Sunday, November 4, 2012

ওকে করে তুলুন গৃহকর্মনিপুণ

ওকে করে তুলুন গৃহকর্মনিপুণ
ই যে নিয়ম করে সকালবেলায় ঘুম থেকে ওঠা, আর রাতে গুটি গুটি পায়ে বিছানার দিকে রওনা দেওয়া এর মাঝে সারা দিনে বাড়ির যে সব কর্তব্যকর্মগুলো স্বামী-স্ত্রীকে পালন করতে হয়, তার একটা লিস্ট বানিয়েছেন কেউ কখনও? না করলে অবশ্যই করবেন। এবং তাজ্জব হবেন। মেয়েদের কাজের ফর্দ ফুরোতেই চাইবে না। আর পুরুষটির বেলায় ঢ্যাঁড়া। দাঁতে পেনসিল চেপে তারা ভেবেই পাবে না, তাদের আসলে কী কী ঘরের কাজ করতে হয়! ভাবছেন, এ সব তো পুরোপুরি নারীবাদী চিন্তাধারা? না, এমন নয় মোটেই। আসলে, ছোট থেকেই আমরা এক ধরনের ভাবনায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। সংসার, বাড়িঘর মেয়েরাই সবচেয়ে ভাল সামলাতে পারে। তারা বড়ই গোছানো, পরিপাটি, ঠান্ডা মাথা। সংসার নামক জটিল আবর্তের ঘাঁতঘোঁতগুলো একা হাতে ভালই ম্যানেজ করে নেয়। পুরুষদের অমন সূক্ষ্মতাবোধ নেই। তারা বরাবরই আত্মভোলা গোছের। বাইরের কাজেই তাদের মানায়। এর বাইরে যারা সারা ক্ষণ বউয়ের সঙ্গে হাতে হাতে ঝুটঝামেলা সামাল দেয়, মুখে তাদের একগাল প্রশংসা উপহার দিয়েছি। তবে, মুখ চাপা দিয়ে ফিক করে হেসে ‘মেয়েলি’ বলতেও ছাড়িনি। ফলে হয়েছে কী? ঘরের বরটিকে এন্তার আশকারা দিয়ে মেয়েরা নিজের ওপর যাবতীয় খুঁটিনাটি দায়দায়িত্ব চাপিয়ে মনমেজাজ করছে তিতকুটে, দিবারাত্রি খিটখিট, তুচ্ছ কারণে বাচ্চাদের ধরে দমাদ্দম পেটানো সবই চলছে। গোল্লায় পাঠাচ্ছে এমন চমৎকার দাম্পত্য-জীবনটিকে।
মেয়েরা চাকরি করলে দায়িত্ব যে আরও বাড়ে, জানা কথা। কিন্তু হোমমেকারদেরই বা কী এমন আরাম মেলে? বড় বড় কাজের কথা ছেড়েই দিলাম। খুচরো কাজের মধ্যে সকালবেলায় অ্যালার্ম ক্লক-এর কাজ করা, কর্তার অফিস বেরোনোর আগে হারানো মোজা-রুমাল খুঁজে দেওয়া, অফিসের চাপ পড়লে ভোকাল টনিক দেওয়া, বাচ্চাদের হাজার উটকো বায়নাক্কা সামলানো, শ্বশুর-শাশুড়ির মেজাজ বিগড়োলে ঠান্ডা মাথায় তাদের সামলে সংসারের শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখা, আপদবিপদে মহামায়ার মতো পরিবারকে রক্ষা করা আরও মনে করাতে হবে?
কিন্তু মেয়েরা যে দু’হাতে হাজার হাতের দায়িত্ব নেয়, সেই অতি পরিচিত কথাটাই ফের মনে করিয়ে লাভ কী বলুন? বরং কী করে পুরুষ সদস্যটিকেও বাড়ির কাজে ঢোকানো যায়, তা নিয়ে মনের মধ্যে নাড়াঘাঁটা করলে সমাধান মিলতে পারে। কথাটা এক বাক্যে শেষ। কাজটা কিন্তু বেজায় পরিশ্রমের। সংসার যে দু’জনেরই আর তাই কাজটাও যে খানিক মিলেজুলেই করা প্রয়োজন এই হাজার বার শোনা কথাটা তাদের সামনে বলতে যান, এমন ভেবলে যাওয়া মুখে তাকিয়ে থাকবে, যেন আপনি তাকে ফতুয়া পরে এভারেস্টে চড়তে বলছেন।
তা এ হেন অলস মানুষদের দিয়ে ঘরকন্নার কাজ করাবেন কী করে? একটা সহজ সমাধান তো হাতের কাছেই মজুত। সরাসরি স্বামীকে বলুন। মুখে সাহায্যের জন্য বলবেন না, এ দিকে মন কষাকষি হলেই সেই নিয়ে খোঁচা দেবেন, এটা কিন্তু কোনও কাজের কথা নয়। প্রয়োজন হলে ঠান্ডা মাথায় তাকে বুঝিয়ে বলুন, আপনি কেন এই কাজ একা করতে পারছেন না। তবে সময়টা এখানে খুব জরুরি। কর্তা বাড়ি ফিরে সবেমাত্র ল্যাপটপটা নিয়ে বসেছেন বা তক্ষুণি একটা তুমুল ঝগড়া শেষ হয়েছে, ঠিক সেই সময়ই তেতো খাওয়া মুখে কাজের ফিরিস্তি ধরালে আরও একটা কুরুক্ষেত্র বাধতে দেরি হবে না। তাই, একটু সময় হাতে রেখে হালকা মেজাজ আছে কিনা দেখে তবেই এগোন। আর হ্যাঁ, সোজা কথা কোনও জবাব নেই। তাই এর আগে আপনি কবে কী বলেছিলেন, আর সেই কাজটা কেন মোটেই সিরিয়াসলি নেওয়া হয়নি এমন সব হিসেবপত্তর নিয়ে বসলে কিন্তু শেষমেশ কিছুই হাসিল হবে না। বরং উল্টোটা করে দেখতে পারেন। এন্তার বরের কাজের প্রশংসা করুন। আপনি যে কত সাহায্য তার কাছ থেকে পান, সেটা বলে দেখুন, কার্যোদ্ধার হবেই। মানছি, সারা দিন কাজের পরেও আপনি আপনার প্রাপ্য প্রশংসাটুকুও হয়তো পান না। কিন্তু দায়টা তো এখন আপনারই। তাই ইনসেনটিভ হিসেবে খানিক প্রশংসা খরচ করতে পারলে ক্ষতি তো কিছু নেই! আসলে বেশির ভাগই পুরুষই খুব গুছিয়ে ঘরকন্না করতে পারে না। তবু যেটুকু পাওয়া যায়, তাতে একটু ‘বাহ্! দারুণ! চমৎকার!’ গোছের শব্দ প্রয়োগ করলে তারাও খুশি হবে, আর কিছুটা হলেও আপনার কাজের সামাল দেওয়া যাবে।
ছবি: সুমন চৌধুরী
কাজ এক বার মিটে গেলেই আর পায় কে! এ বার আপনি খুটুর খুটুর করে তার ভুলগুলো বের করতে বসলেন। এই চুলচেরা বিশ্লেষণ না-ই বা করলেন! আসলে বাড়ির কাজ তো এক বারে মেটার নয়। এ তো রোজকার দায়িত্ব। এক দিনে তার কতটুকুই বা সুরাহা হবে? আপনাকে তো ভবিষ্যৎটাও ভাবতে হবে। বর যে যে কাজ করবে, সব একেবারে আপনার মনের মতো হবে বাড়াবাড়ি চিন্তা। ভুল হতেই পারে। সাদা, রঙিন সব জামাকাপড় এক সঙ্গে ওয়াশিং মেশিনে কাচতে গিয়ে এর রং ওর ঘাড়ে লাগতেই পারে। সেটা নিয়ে বাড়ি মাথায় না করে ঠান্ডা মাথায় দেখিয়ে দিন কোন কোন জিনিস এক সঙ্গে কাচা যেতে পারে। আর হ্যাঁ, প্রত্যেকটা জিনিস আপনি যে ভাবে করেন, ঠিক সেই ভাবে তাঁকেও করতে হবে, না করলেই প্রলয়, এমন হলে কাজের উৎসাহটাই হারিয়ে যাবে। আপনি খাওয়ার আগে পেপার ন্যাপকিন দিয়ে দু’বার প্লেট মোছেন। আপনার বর প্রতি বার তা না-ও করতে পারেন। এটুকু মেনে নিন।
আর একটা কথা জানেন তো যে, বাড়ির কাজকে ঠিক আধাআধি ভাগ করা চলে না? ‘আমি সারা দিন এই এই কাজ করে যাচ্ছি, তাই তোমাকেও এই কাজগুলো করতে হবে’ এটা বলতে গেলে ভুল করবেন। ফ্ল্যাটের ইনস্টলমেন্টটা কি ঠিক আধাআধি ভাগ করতে পারেন? বা বেড়াতে যাওয়ার সময় ট্যাক্সির বিলগুলো? এখানেও তা-ই। একটু বেশি কাজ না হয় আপনাকেই করতে হল। বরং সরাসরি কাজ অর্ধেক করার চেয়ে টোনটা এমন রাখতে পারেন, যাতে মনে হয় আপনার উপায় নেই, তাই এটা ওঁকে করতে হচ্ছে। যেমন তরকারিটা গ্যাসে বসানো আছে বলেই আপনি ওঁকে জল ভরতে বলছেন।
আপনি কাজ ভাগ করেছেন। স্বামীর ওপর দায়িত্ব পড়েছে ছেলেমেয়েকে ইংরেজি শেখানো। তিনি কোনও দিন সেটা না করে রান্না করতে চাইলেন। আবার উল্টোটাও হতে পারে। আপনার রান্না করতে ভাল লাগছে না বলে আপনি পড়াতে বসতে চাইছেন। আলোচনা করে কাজটা উল্টে নিন। আপনার বা আপনার স্বামীর পছন্দ না হলেও সে কাজ করতেই হবে এমন কোনও লিখিত চুক্তি হয়েছে কি? বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ালেই কাজে চূড়ান্ত বিরক্তি আসে। তাতে মন বসে না। আর আপনাদের দু’জনেরই কোনও একটা কাজ ভাল না লাগলে? বিকল্প খুঁজে ফেলুন। খাবারটা বাইরে থেকে আনিয়ে নিন বা ছেলেমেয়েকে এক দিন পড়া থেকে রেহাই দিয়ে সবাই মিলে দারুণ একটা মুভি দেখে ফেলুন।
এই যে এত কিছু নিয়ে আলোচনা, এর কোনও দরকারই হবে না আপনার স্বামী মানুষটি চটপটে হলে। কিন্তু তিনি যদি স্বভাবকুঁড়ে গোছের লোক হন, তা হলে ধৈর্য ধরতেই হবে। যিনি এক গ্লাস জল গড়িয়ে কোনও দিন খাননি, তিনি হঠাৎ করেই বাচ্চাদের টিফিন বানানো থেকে শুরু করে ঘর পরিষ্কার পর্যন্ত সব একাহাতে সামলে নেবে, এমনটা সিনেমায় হতে পারে, বাস্তবে নয়। তাই অল্প অল্প করে সইয়ে সইয়ে কাজ করতে দিন। সাততাড়াতাড়ি স্বভাব বদল করতে যাবেন না।
অনেক সময় হুট করে অনেকটা কাজ ঘাড়ে এসে পড়লে এত হিসেবনিকেশ করে দু’জনে ঠান্ডা মাথায় কাজ ভাগ করে করা যায় না, ঠিকই। কিন্তু তাই বলে, সবটা নিজের ওপর নিয়ে, তার পর সময় মতো শেষ করতে না পেরে টেনশন, অশান্তি দুই-ই ক্রমাগত বাড়িয়ে চলার কোনও মানে নেই। তার চেয়ে সপ্তাহের গোড়ায় দু’জন বসে সারা সপ্তাহে কী কী কাজ করতে হবে, তার মোটামুটি একটা প্ল্যান বানিয়ে সেই মতো কাজ ভাগ করে নিন। লিস্টটা বরং বরকেই বানাতে দিন। তাতে আপনার কাজের একটা আন্দাজ অন্তত তিনি পাবেন।

Monday, September 17, 2012

সংস্কৃত অতনু বর্মণ


সংস্কৃত

অতনু বর্মণ


ফরফর করে কেউ ইংরাজি বললে আমবাঙালি যেমন তার দিকে সমীহ করে তাকায়, একদা সংস্কৃত ভাষাটির ছিল সেই দাপট। অং বং চং বলা পণ্ডিতের কদর ছিল সর্বত্র। অধুনা ভাষাটি সংস্মৃত হলে কী হয়, অন্নপ্রাশন থেকে পিণ্ডদান পর্যন্ত এই ভাষার উপস্থিতি এখনও অটুট। ঠাকুরমশাই যা বলেন, অর্থ না বুঝেই তা আওড়ে যাওয়া বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে। ফি-বছর মহালয়ায় বাঙালি রেডিওতে ব্যাটারি লাগায়, কেউ কেউ রেডিওটাই কিনে আনে বাড়িতে। তারপর সারা বছর সেটায় পিঁপড়ে ডিম পাড়ে, মাকড়সা জাল বোনে এবং মহালয়ার আগের দিন তাকে চেক-আপে নিয়ে যাওয়া হয়। দোকানদার বলে, ‘এ আর চলবে না, একটা নতুন নিয়ে নিন, কতই বা দাম’! পুজোয় নতুন জামা, নতুন জুতোর মতোই বহু বাড়িতে নতুন রেডিও কেনা হয় ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ শুনবে বলে।
অর্থ না বুঝলে কী হয়, অর্থ বানিয়ে নিতে বাঙালির ধারেকাছে আসবে না কেউ। সেই কবে শিব্রাম চকরবরতি মশাই ‘কাকস্য পরিবেদনা’-র স্বকৃত অর্থ করেছিলেন- ‘কাকে বেদানা খাচ্ছে’, সেই রীতি আজও বহমান। দেশগাঁয়ে বড়-বাইরেকে বলা হয় বাহ্যে যাওয়া। আমাদের শ্যামাদাস বহুদিন জানত যে, ‘বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া’ মানে বাহ্য করার পূর্বে অনুষ্ঠিত লঘু ক্রিয়াগুলির কথা বলা হচ্ছে। জানি না ‘এহ বাহ্য’ বলতে সে কী বুঝতো!
ছোটবেলায় ঠাকুমার কাছে শোনা একটা গল্প মনে পড়ে গেল। গাঁয়ের মাতব্বর পালমশাইয়ের ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা, যদিও তার তিনকুলে কেউ সরস্বতীর স্পর্শলাভ করেনি। এহেন পালমশাই গেছেন বদ্যিবাড়ি। কবিরাজ পালমশাইয়ের নাড়ি ধরেই চোখ বন্ধ করে বলে গেলেন-‘ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ম মহাদ্যুতিম, ধ্বন্তারিং সর্বপাপঘ্ন প্রণতস্মি দিবাকরম’। কবিরাজ যে সূর্যপ্রণামের মন্ত্র জপলেন, সে বোঝা তো পালের সাধ্য নয়। পাল ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘কী বলছেন কোবরেজমশাই, কিছুই তো বুঝতে লারলম, টুকচি বুঝাইন দ্যান’। কবিরাজ তখন বুঝিয়ে বললেন, ‘ওঁ জবাকুসুম মানে তোর চোখ জবাফুলের মতো লাল হয়েছে। সঙ্কাশং মানে সঙ্গে কাশিও আছে শুধু নয়, কাশ্যপেয়ম মহাদ্যুতিম অর্থাৎ খুব ঘন ঘন কাশি হচ্ছে। ধ্বন্তারিং সর্বপাপঘ্ন অর্থাৎ আমি সব রোগের ধন্বন্তরি। প্রণতস্মি দিবাকরম মানে প্রণামীটা আগে দে বাবা’!
আমাদের অল্পবিস্তর সকলেরই ধারণা যে, সংস্কৃত মানেই অনুস্বারের বাড়বাড়ন্ত। অং বং চং সহ হিং টিং ছট প্রভৃতি নানান কিসিমের বাকবিন্যাসে আমরা এক একজন সংস্কৃত পণ্ডিত। রঙচঙ মেখে হংকং ঘুরে আসা থেকে ক্রিংক্রিং সাইকেল, ঢং-ঢং ঘন্টা, এমনকি কাবলিওলার হিং অথবা সিনেমায় কিং কং- সবই আমার সংস্কৃত মনে হয়।
এই সূত্রে আবার ঠাকুমার ঝুলি এবং আবার একটি গপ্পো। পদ্মলোচন পিতৃমাতৃহীন। খুড়ো আর খুড়িমার নয়নের মণি। নিরক্ষর খুড়ো আদরের পদ্মলোচনকে ভর্তি করেছিলেন পণ্ডিতের টোলে। এদিকে পদ্মলোচনের মোটেও বিদ্যায় রুচি নেই। তার ধারণা, ‘বিদ্যাস্থানে ভয়ে বচ’। কোনওক্রমে বছর ঘুরতেই টোলফেরত ভাইপো বাড়ি ফিরছে শুনেই খুড়ো সেঁধিয়েছেন খাটের তলায়। পণ্ডিত ভাইপোর সঙ্গে নিরক্ষর খুড়ো কথা বলবে কী করে! এদিকে গুণধর ভাইপো ঘরে ঢুকেই বলল, ‘খুড়িং খুড়িং, খুড়োং কোথাং’? সরলা খুড়িমা গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসলেন, ‘অনুস্বার লাগালে যদি সংস্কৃত হয়/তবে কেন খুড়ো তোমার খাটের তলায় রয়’।
এগুলো গল্পই। যদিও গল্প হলেও মেসেজটি পরিষ্কার। সংস্কৃত ভাষাটির অনুসারী দুই প্রকার। প্রথম পক্ষ হল তারা, যারা সংস্কৃত বোঝে না। আর দ্বিতীয় পক্ষ হল তারা, যারা একটু বেশি বোঝে। যারা বোঝে না, তাদের নিয়ে গন্ডগোল কম। তারা অনুস্বার লাগিয়ে মজা করে আর যারা বেশি বোঝে তাদেরকে নিয়েই মুশকিল। এরা সবকিছুকে সংস্কৃতের গর্ভজাত করে প্রমাণ করতে না পারলে শান্ত হয় না। একইরকম এক বেশি বোঝা সংস্কৃত পণ্ডিতের দাবি যে, দার্জিলিং শব্দটির উৎস নাকি ‘দুর্জয় লিঙ্গ’ শব্দ থেকে। কে যে কোথা থেকে এসেছে- দেবা ন জানন্তি। বৈদিক ভাষাকে সংস্কার করার ফলে যা দাঁড়াল, তারই নাম ছিল সংস্কৃত। কালে কালে যাকে আমরা বহিষ্কার করেছি এবং ভাষাটি এখন বহিষ্কৃত। ভাষাটির পোশাকি নাম দেবভাষা। দেবদেবীর ভাষা নিয়ে মানুষের কী বা কাজ! অন্তঃসারশূন্য বাঙালি তাই সংস্কৃতকে বরণ করেছে একটিমাত্র বর্ণে- ‘অনুস্বার’। বর্ণকে কোমল করে যদি বরণ হয়, তাহলে কি মর্ণ থেকে আগত- চন্দরা কহিল- ‘মরণ’।

Sunday, September 2, 2012

গঙ্গা-ভ্রমন ও ইলিশ-উৎসব / দেবাশিষ কাঞ্জিলাল ।

গঙ্গা-ভ্রমন ও ইলিশ-উৎসব
--------------------------------          
২/৯/২০১২  দেবাশিষ কাঞ্জিলাল ।
---------------
আজ সকালে আমাকে আর ঈশানচন্দ্রকে নিয়ে আমার পালিকা নৌ-ভ্রমনে গেছিলেন।
সঙ্গে ছিল আমার বড় মেয়ে-জামাই, দেবশ্রী ও রাজীব। আর ছিল কাজল,যে আমার দুই মেয়ে দেবশ্রী ও রাজশ্রীকে শিশুকাল থেকে পালন করেছে এবং এখন আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। আর ছিল মৌসুমী নামে এক বালিকা,যে এখন ঈশান-পালিকা !
শুধু ছোট মেয়ে-জামাই, রাজশ্রী-প্রনব ছিল না বলে আমাদের বৃত্ত অসম্পূর্ণ থাকার এক দুঃখ খুব কষ্ট দিয়েছে আমাদের !

সেই গঙ্গা ভ্রমন শেষ করে একটু আগে ফিরলুম। 
ফেয়ারলি প্লেসের ঘাট থেকে ছাড়ল লঞ্চ বেলা দশটা নাগাদ। প্রায় আশিজন আমরা একসঙ্গে। যে সংস্থাটি আমাদের নিয়ে এই ভ্রমনের আয়োজন করেছে, Travel Plus Howrah, তার ব্যবস্থাপকেরা প্রথমে শুরু করলেন আমাদের পারস্পরিক পরিচিতি জানাতে। 
এই অনুষ্ঠানের অন্যতম অজুহাত ছিল ইলিশ। তাই তাঁরা এর নাম দিয়েছিলেন 'ইলিশ-উৎসব' ! 
লঞ্চের পিছনে রান্নার আয়োজন, আর সামনে দু'পাশে আমরা বসে শুনছি গান,মাইক্রোফোনে। সে গান ছড়িয়ে যাচ্ছিল লঞ্চের বাইরেও, হয়তোপৌঁছে যাচ্ছিলো গঙ্গার দু পাড়ে ! 

লঞ্চ চলেছে, চলছে গান, quiz,নানা প্রতিযোগিতা। আমি সেই quiz এ প্রেমেন্দ্র মিত্রর ঘনাদার প্রথম গল্পের নাম 'মশা' বলে দিয়ে, ফাঁকতালে একটি প্রাইজ পেয়ে গেলুম ! আসলে দীপায়ন নামে প্রশ্নকারী যখন প্রশ্নটি করেছিলো, সেই সময়ে আমার পায়ে একটি মশা কামড়াচ্ছিলো, তাই খুব আস্তে বলেছিলুম , 'কি মশা' ! 
ব্যস, সেই মূহূর্তেই দীপায়ন,'সঠিক উত্তর' বলে আমার হাতে প্রাইজের পেনটি তুলে দিলে, আর সব লোক মহা হাততালি দিতে লাগলে, আর আমার কিছু বলাই হল না !
পরে আমি যখন দীপায়নকে আলাদা করে ব্যাপারটি বোঝাতে গেলুম যে ওই প্রাইজ আসলে আমাকে কামড়ানো সেই মশাটিরই পাওয়া উচিত, সে শুধু হাসতে লাগল, আর আমার ফোন নম্বর, ইমেল আইডি এইসব নিলে। মনে হল সে বোধহয় আমাকে একটু 'cultivate' করতে চায় ! 

কিন্তু ঈশানচন্দ্রের বোধহয় এইসব খুব একটা পছন্দ নয়,তাই সে 'নীচে জলে...নীচে জলে' বলে ,তাকে নিয়ে জলে নামতে আমাকে প্ররোচিত করেই চলল ! তখন সেই হাঙ্গামায় বাধ্য হয়ে, নীচের বদলে তাকে নিয়ে ওপরে হুইল-হাউসে উঠলুম লোহার সিঁড়ি বেয়ে। এইখানে কাঁচের ঘরে যে ভদ্রলোক হুইল চালাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণের মধ্যেই সখ্য পাতিয়ে সে একটু হুইলও ঘুরিয়ে নিলে মহাখুসী হয়ে ! 

এ দিকে দু'সপ্তাহ আগে ঈশানচন্দ্র পুরীতে তার আড়াই বছরের দীর্ঘ জীবনে প্রথম একসঙ্গে এত জল দেখে এসেছে ,আর সাগর চিনেছে। স্বাভাবিক ভাবেই সে আজ নদীকে সমুদ্র বলতে শুরু করেছিল। যখন তাকে বললুম,এ হল গঙ্গা, তখন প্রথমে তার একটু আপত্তির ভাব ছিল। পরে অবিশ্যি সে আপত্তি আর খুব একটি ছিল না তার।
আজ সে নৌকো চিনল, মাঝি, মাঝধরার জাল, আরো অনেক কিছু জানলে। 

আর তার হাতের একটি খেলনা টিয়াপাখি, যেটি তার মা বেলুড় মঠে নেমে এনে দিয়েছিল সবে, সেটিকে, যেমন করে সে তার মা-বাবার বই দশতলার থেকে নীচে ফেলে দেয়, সেই ভাবেই গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে খুব আমোদ পেয়েছে !আর তার এই কীর্তিতে যেই তার মা রেগে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি, সে তার সুরেলা গলায় আমায় বকতে শুরু করেছে,' দাদা, তুমি পাখি জলে ফেলে দিইইইলেএএএ ক্যায়ায়ানোওওওও ~~ ? 

লঞ্চ চলেছে গঙ্গার বুকের মাঝখান দিয়ে। ডানদিকে পড়ল নানা সব ঘাট। নিমতলা ঘাট দেখে আমার জীবনের একমাত্র ঠাকুরের স্মৃতি মনে এল। এটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ ষ্টেশন। বাঁদিকে উত্তরপাড়া, ভদ্রেশ্বর, নানা ঘাট, কত দুরে সব গাছপালা ছবি যেন, ল্যান্ডস্কেপ।
এবার এসে পৌছলুম বেলুড় মঠের ঘাটে। নোঙ্গর পড়লো জলে।

আরেকটি ঘটনা চোখে পড়ল আজ এই নৌ-ভ্রমনের সুবাদে। লঞ্চ যখন চলেছে মাঝখান দিয়ে দু' পাড়কে বড়ো সুন্দর দেখিয়েছে ছবির মতই। শুধু যখনি কোন পাড়ের কাছে গেছে, সেই পাড়কে দেখিয়েছে বড় কুশ্রী, আর উল্টোদিক বড়োই মনোময় সবুজ ! অথচ কত বড় এক মিথ্যে এটি ! আমাদের জীবন-নদীতেও যখন বয়ে যাই আমরা, তখনো এই ঘটনাই ঘটে বোধহয় !

এবার ইলিশ-উৎসব শুরু। ইলিশের মাথা দিয়ে কচুর শাক, তেলের সঙ্গে ইলিশ-ভাজা, শর্ষে-ইলিশ,দই-ইলিশ,ইত্যাদি ইত্যাদি,ইলিশের পরাকাষ্ঠা ! আমার সেই সব রূপোলী-সুন্দরীদের জন্য এত মন খারাপ হল, আমি তাদের স্মৃতিতে শর্ষে-ইলিশ খেলুমই না, মনের দু;খে ! সবাই তাই শুনে আমাকে খুব বাহা বাহা করতে লাগল। আমি ভাবছিলুম, এই সুযোগে যদি সবাইকে দিয়ে ইলিশ-সুন্দরীদের আত্মার প্রতি দু' মিনিটের নীরবতা পালন করানো যায়, তা'হলে দু'শো মজা হবে ! কিন্তু আমার পালিকা ,যিনি আমায় নিয়ে সর্বদাই সন্দিহান থাকেন যে আমি কখন কি করে বসি, তিনি বোধহয় কিছু আঁচ করে ,তাড়াতাড়ি খেয়ে ওঠার আদেশ জারী করলেন। আমার এই সৎ উদ্যোগ একেবারেই মাঠে মারা গেল ! আর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আমার মেয়ে , কানে কানে চুপিচুপি এসে বলে গেল ,'তোমার শর্ষেতে Allergy বলে তুমি শর্ষে-ইলিশ খেলে না, আর তাই নিয়ে সবাইকে এমন নাচালে' ! সেই 'ঘরের শত্রু বিভীষন' বলে ইংরিজিতে একটা কথা আছে না, তার মানে এখন আবার বুঝতে পারলুম নতুন করে।

এদিকে ঈশানচন্দ্র আবার হুইল-হাউসে যাবার বায়না শুরু করেছে। আবার তাকে নিয়ে চললুম ওপরে। সেখানে চালক-ভদ্রলোক ছিলেন না, নীচে খেতে নেমেছেন বোধহয়। তবে তাঁর দুটি ছোটো ছেলে-মেয়ে মহানন্দে হুইলটি ঘোরাচ্ছিল ! আমি দেখে আঁৎকে উঠে তাদের এই প্রয়াস থেকে বিরত করতে চাইলুম, যাতে তাঁরা কিছু অঘটন না ঘটায়। তাতে তাঁরা নির্বিকার ভাবে জানিয়ে দিলে যে আমার জলযান সম্পর্কে নাকি আদৌ বিন্দুমাত্র ধারনা নেই, তাঁরা এই কর্ম প্রায়ই করে থাকে, এবং তাতে আজ পর্যন্ত কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয় নি ! তাদের কথার প্রত্যয় দেখে আমার আত্মবিশ্বাস আজ টলে গেল। কেন জানি না, মনে হতে লাগল, সত্যিই আমি বোধহয় বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনীয়ারিং বিষয়গুলি সত্যিই কিছু জানি না ! এই ব্যপারে অবিশ্যি আমার নিজেরই বরাবর একটি সন্দেহ ছিল, আজ এই শিশুরা আমার সেই সন্দেহ যে সঠিক তা প্রমান করে আমাকে একেবারে চিন্তামুক্ত করে খুব খুসি করে দিলে ! 

এই শিশুদুটি তার পরে মহা উৎসাহে আমাকে নৌ-বিজ্ঞান সম্পর্কে এমন চিত্তাকর্ষক বহুকিছু শেখালে ,যা সারা জীবনে কোন ইঞ্জিনীয়ারিং বইতে পাওয়া যাবে না। তাঁরা এও জানালে, এগুলি তাঁরা জন্মগত সূত্রেই জেনেছে ! তাদের সঙ্গে আমার আর ঈশানচন্দ্রের এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল, তাঁরা আর আমাদের ছাড়তে চাইলে না, তারাও আমাদের সঙ্গে নীচে নামলে !

এরপর সূর্যদেব তাঁর সাত-ঘোড়ার রথে শুরু করলেন দিগন্তের দিকে যাত্রা। আমাদেরও শুরু হল ফেরা। ঊঠল নোঙ্গর, বন্দরের কাল হল শেষ !

ফেরার পথে ঈশানচন্দ্র তেমন কিছু আর করে নি। শুধু ,আমরা যখন কোল্ড-ড্রিঙ্কস খাচ্ছিলুম, তখন 'আমাল গোলা বেথা,আমায় কোল-ডিঙ্কস দাও ' বলে সামান্য হামলা করে ঠিক আমার কাছ থেকে তা' আদায় করে খেয়ে, আমাকে একটু বকুনি খাইয়েছে !

এরপরে এসে নামলুম আবার ফেয়ারলির ঘাটে, তারপরে বাড়িতে ফেরৎ । ঈশানচন্দ্র চলে গেল তার বাড়ীতে, কাল আবার তার স্কুল আছে তো, তাই ! 

আমি এখন সেই মেঘ-পিওন, যার ব্যাগে মন-খারাপ থাকে দিস্তা দিস্তা, বিকেলে ঈশানচন্দ্র চলে যাবার পরে যার মন খারাপ হয়ে কুয়াশা হয়েছিল, তা' এখন ব্যাকুল হয়ে তিস্তার মত বইছে তার মনে !

Tuesday, August 28, 2012

গণমানুষের কবি, সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মহাপ্রয়ান দিবস উপলক্ষে


কাজী নজরুল ইসলাম :-
গণমানুষের কবি, সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন হাজার রকম বৈচিত্র্যে ভরা। তার জীবনের নানা অংশ জুড়ে আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর গণমানুষের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাক্সক্ষা। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ তখন ইংরেজদের কুশাসনের দাবানলে পুড়ছিল। আর তাই কবি কাজী নজরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় বৈরীপক্ষ ছিল ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী। সঙ্গত কারনেই ব্রিটিশদের সইতে পারতেন না নজরুল। অন্যায়ের বিপক্ষে- সত্যের পক্ষে ও শোষিত মানুষের জন্য কথা বলতে গিয়ে নজরুল ব্রিটিশ শাসকের রোষানলে পড়ে জেল পর্যন্ত খেটেছেন। শুধু তাই নয় নজরুলের লেখার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে ব্রিটিশ সরকার। কাজী নজরুলের লেখা যুগবাণী, বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, প্রলয় শিখা ও চন্দ্রবিন্দুসহ মোট ৫টি গ্রন্থ ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। বলা বাহুল্য বাংলা সাহিত্যে সমকালীন অন্য কোনো কবি বা সাহিত্যিকের এত গ্রন্থ একত্রে কখনও বাজেয়াপ্ত হয়নি। তাই নজরুলের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ রাজরোষের মাত্রা এখান থেকেই অনুমান করা যায়। নজরুলের প্রতিবাদ আর তাঁর লেখনীর অন্যতম দিক হলো নজরুলই ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেন। নানা সৃষ্টিতে বৈচিত্র্যমণ্ডিত নজরুলের কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় পত্রিকা সম্পাদনাও। ১৯২২ সালে নজরুল 'ধূমকেতু' নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। পত্রিকাটি সপ্তাহে দু'বার প্রকাশ পেত। ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ধূমকেতু'র দ্বাদশ সংখ্যায় 'আনন্দময়ীর আগমন' নামক একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতাটি ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ফলে এই কবিতায় নজরুলের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রাজদ্রোহের মামলা হয়। একই বছরের ৮ নভেম্বর রাজদ্রোহের অপরাধে নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত নজরুলের বিচার হয়েছিল কলকাতার আলীপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে। পরবর্তীতে এই মামলার রায়ে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। রায় ঘোষণার পরের দিন তাকে আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আগে থেকেই নজরুলের কাব্য চেতনা আর সৃষ্টিশীল দ্রোহের সঙ্গে পরিচিত ছিল সাধারন মানুষ। এবার কারাবরণ করে নজরুল সমগ্র দেশবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তার 'বসন্ত' নাটকটি কবির নামে উৎসর্গ করেন। দিনটি ছিল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি। এদিকে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল নজরুলকে আলীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে হুগলী জেলে স্থানান্তর করা হয়। আলীপুরে নজরুল ছিলেন বিশেষ শ্রেণীর কয়েদি। কিন্তু হুগলিতে স্থানান্তরের পর নজরুলকে বিশেষ শ্রেণীর কয়েদির মর্যাদার পরিবর্তে সাধারণ শ্রেণীর কয়েদির অবস্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। হুগলী জেল সুপার মিস্টার আর্সটন ছিলেন নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের জন্য কুখ্যাত। বিশেষ করে রাজবন্দীদের সঙ্গে জেলের ভেতর অমানবিক নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার করতেন তিনি। এ সময় নজরুল তার বিখ্যাত 'শিকল পরার গান' জেলে বসেই রচনা করেন। জেলখানার ভেতর অকথ্য নির্যাতন আর বৈষম্যের শিকার হয়ে নজরুল এখানেও বিদ্রোহী হয়ে ওঠলেন। শুরু করলেন আন্দোলন। আন্দোলনের সূত্র জেলখানায় পায়ে ডান্ডা বেড়ি, ভাতের বদলে মাড় ভাত ও রাজবন্দীদের নির্যাতনের প্রতিবাদ। এসব বন্ধের দাবিতে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল হুগলী জেলে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। দিনের পর দিন তিনি অনশন চালিয়ে যেতে থাকেন।
সে সময়কার কবির জেল জীবন সম্পর্কে খুব পরিষ্কার ধারনা পাওয়া না গেলেও নজরুলের জেল জীবনের করুণ মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরে কলকাতার আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকা। সেখানে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত একাধিক বিশ্লেষণী লেখায় নজরুলের সেই সময়কার অনশনসঙ্গীদের ভাষ্যে ফুটে ওঠে নজরুলের জেল জীবন। হুগলি জেলে কবি নজরুলের সঙ্গে মৌলভী সিরাজউদ্দীন এবং বাবু গোপাল চন্দ্র সেনও অনশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই সূত্র মতে অনশনের কয়েকদিনের মধ্যেই নজরুল প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হন। সেই সঙ্গে অযত্ন অনাহারে শরীরের ওজন প্রায় ১৩ কেজি কমে যায়। এভাবে নজরুল একটানা অনশন করে যান ৩৯ দিন। আশে-পাশের শুভাকাক্সক্ষী ও সাধারন মানুষ নজরুলের পরিণতির কথা চিন্তা করে আঁতকে ওঠলেও নজরুল তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অবিচল। সেই সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং নজরুলকে চিঠি লিখে অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে এ বিষয়ে তাকে টেলিগ্রাম পাঠান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- 'Live up hunger strike. Our Literature claims you' কিন্তু টেলিগ্রামটি নজরুলের হাতে পৌঁছায়নি। জেল কর্তৃপক্ষ 'Address is not found' লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠান। জেল কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ঠিকানা জানলেও ইচ্ছে করেই টেলিগ্রামটি নজরুলের কাছে না পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে ফেরত পাঠান। রবীন্দ্রনাথ এ ঘটনায় দারুণ মর্মাহত হন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও নজরুলের অনশনে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি শিবপুর থেকে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে হুগলী জেলে গিয়ে নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা ও অনীহার কারণে তিনি দেখা করতে পারেননি। ফলে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বেশি হতাশ হতে হয়েছিল তাকে। চুরুলিয়া থেকে নজরুলের মা জাহেদা খাতুনও নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হন। এসব সংবাদ খুব দ্রুতই চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সমগ্র দেশবাসী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অতঃপর শেষ পর্যন্ত অনশনের ৩৯ দিন পর কুমিল্লার মাতৃসম বিরজা সুন্দরী দেবীর অনুরোধে তারই হাতে লেবুর রস পান করে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন। তিনি ছিলেন কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো কবি, ব্রিটিশদের কাছে তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বার বার কারাভোগ করেছেন, নির্যাতিত হলেও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, পিছিয়ে আসেননি কখনই। লড়াই চালিয়ে গেছেন সারা জীবন। এরপর উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। জাতীয় কবির সম্মাণ দিয়ে নজরুলকে ঢাকায় আনা হলো। একসময় সমস্ত ভক্তদের কাঁদিয়ে কবি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা এক মহান পুরুষ। ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো চিরপ্রেমিক। দ্রোহ ও প্রেমের চিরবিদ্রোহী। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালির জাগরণের কবি। বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন রাখালরাজা। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ কবির জন্মদিন। ১১২তম জন্মবার্ষিকী।
এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর বাকি হাতে রণ-তুর্য নিয়ে প্রেম ও দ্রোহের সম্মিলন ঘটাতে ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ নিখিল ভারতের অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ) বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি নজরুল। বাবা কাজী ফকির আহমদ, মা জায়েদা খাতুন তার ডাক নাম রেখেছিলেন দুখুমিয়া। চুরুলিয়ার বালক দুখুর শৈশবের কিছু সময় কাটে বাংলাদেশে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলে লেখাপড়া করেন। কিছুদিন কাটান চট্টগ্রামে। বিয়ে করেন কুমিল্লায়। প্রথমে দৌলতপুরের নার্গিস। সে বিয়ে টেকেনি। পরে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের প্রমিলা সেনকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকরুদ্ধ অসুস্থ কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সার্বজনীন মুক্তি ও মানবতার কবি নজরুল বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা। বাংলা সাহিত্যাকাশে ধূমকেতু রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। চিরপ্রেমিক চিরবিদ্রোহী কবি তার নাতিদীর্ঘ সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে নিজকালের মাটি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে গেছেন বাংলাকাব্যকে। পরাধীন শৃক্সখলিত জাতির স্বাধীনতার স্পৃহাকে জাগ্রত করতে বিদ্রোহের গান শুনিয়েছেন এ ভূখণ্ডের আপামর জনসাধারণকে। 'কারার-ই লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট, রক্ত জমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদি। ওরে ও তরুণ ঈশান বাজা তোর প্রলয় বিষাণ, ধ্বংস নিষাণ, উড়ুক তারার প্রাচীর ভেদী'। বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের অহংবোধকে উত্তরসূরির মননে নাড়া দিতে নিজের লেখনী শক্তি দিয়ে বাজিয়েছেন আজন্ম প্রেমের মোহন বাঁশি_ 'তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ'?। কখনো গানে, কখনো বা কবিতায় বুনেছেন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার বীজ_ 'মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মসলমান' কবিতায়। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, মানবপ্রেমের পক্ষে আজীবন ছিলেন চিরজাগরুক তিনি। মানবকল্যাণ ও শান্তির চিরন্তন জয়গান গেয়েছেন আজীবন। মাত্র ২২ বছরের সাহিত্য জীবনে অসংখ্য কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক রচনার পাশাপাশি বেশ সম্পাদিত করেছেন বেশ কিছু পত্রিকা। ব্রিটিশ শাসনবিরোধী লেখার জন্য কয়েকবার কারারুদ্ধও হয়েছেন সাংবাদিক-কবি নজরুল ইসলাম। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তার কয়েকটি বইও নিষিদ্ধ করে। অজ্ঞাত রোগে বাকরুদ্ধ ও লেখনি শক্তি হারিয়ে অকালে সাহিত্যাকাশ থেকে ঝরে পড়ার আগে সৈনিক-কবি এভাবেই তার শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেছিলেন কাব্যলক্ষ্মীকে_'অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে/প্রদীপ শিখা সম/, কাঁপিছে প্রাণ মম/তোমার সুন্দর ভঙ্গিতে। ... /
আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে, এবং জাতির ক্রান্তিকালে সমস্যা সংকটের সময় সব বাধা অতিক্রমের প্রেরণা হয়ে আছেন কবি নজরুল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল তার লেখা কবিতা আর গান। এ বছর কবির অমরসৃষ্টি 'বিদ্রোহী' কবিতাটি রচনার ৯০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ঔপনিবেশিকতার নাগপাশ থেকে দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে নিপীড়িত-নির্যাতিত-বঞ্চিতদের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে কবির কলমের কালিতে অক্ষর আর শব্দের সম্মিলন ঘটেছিল যেন বিদ্রোহের আগুন। রচনা করেছিলেন কালজয়ী বিদ্রোহী_'বল বীর... / বল উন্নত মম শির।/ শির নেহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির!/বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাঁড়ি/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ ভূলোক, দূ্যলোক, গোলক ভেদিয়া,/ খোদার আসন আরস ছেদিয়া /উঠিয়াছে চির-বিস্ময়, আমি বিশ্ব বিধাত্রির!/মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে/ রাজ রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!/বল বীর/আমি চির-উন্নত শির!'।
আজ জন্মদিনে কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে জাতি। রাষ্ট্রীয় আচার অনুষ্ঠানে পালন করা হচ্ছে ১১২তম জন্মবার্ষিকী। সকালে ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে কবির মাজার। আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান মালার। সকালে জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে নজরুল মেলার উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে কবির অমর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল একাডেমী, বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমীসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিবসটি পালন করছে। গণমাধ্যমও দিনটি উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ ও অনুষ্ঠান প্রচার করছে।
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা এক মহান পুরুষ। ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো চিরপ্রেমিক। দ্রোহ ও প্রেমের চিরবিদ্রোহী। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালির জাগরণের কবি। বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন রাখালরাজা। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ কবির জন্মদিন। ১১২তম জন্মবার্ষিকী।
এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর বাকি হাতে রণ-তুর্য নিয়ে প্রেম ও দ্রোহের সম্মিলন ঘটাতে ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ নিখিল ভারতের অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ) বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি নজরুল। বাবা কাজী ফকির আহমদ, মা জায়েদা খাতুন তার ডাক নাম রেখেছিলেন দুখুমিয়া। চুরুলিয়ার বালক দুখুর শৈশবের কিছু সময় কাটে বাংলাদেশে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলে লেখাপড়া করেন। কিছুদিন কাটান চট্টগ্রামে। বিয়ে করেন কুমিল্লায়। প্রথমে দৌলতপুরের নার্গিস। সে বিয়ে টেকেনি। পরে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের প্রমিলা সেনকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকরুদ্ধ অসুস্থ কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সার্বজনীন মুক্তি ও মানবতার কবি নজরুল বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা। বাংলা সাহিত্যাকাশে ধূমকেতু রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। চিরপ্রেমিক চিরবিদ্রোহী কবি তার নাতিদীর্ঘ সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে নিজকালের মাটি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে গেছেন বাংলাকাব্যকে। পরাধীন শৃক্সখলিত জাতির স্বাধীনতার স্পৃহাকে জাগ্রত করতে বিদ্রোহের গান শুনিয়েছেন এ ভূখণ্ডের আপামর জনসাধারণকে। 'কারার-ই লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট, রক্ত জমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদি। ওরে ও তরুণ ঈশান বাজা তোর প্রলয় বিষাণ, ধ্বংস নিষাণ, উড়ুক তারার প্রাচীর ভেদী'। বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের অহংবোধকে উত্তরসূরির মননে নাড়া দিতে নিজের লেখনী শক্তি দিয়ে বাজিয়েছেন আজন্ম প্রেমের মোহন বাঁশি_ 'তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ'?। কখনো গানে, কখনো বা কবিতায় বুনেছেন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার বীজ_ 'মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মসলমান' কবিতায়। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, মানবপ্রেমের পক্ষে আজীবন ছিলেন চিরজাগরুক তিনি। মানবকল্যাণ ও শান্তির চিরন্তন জয়গান গেয়েছেন আজীবন। মাত্র ২২ বছরের সাহিত্য জীবনে অসংখ্য কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক রচনার পাশাপাশি বেশ সম্পাদিত করেছেন বেশ কিছু পত্রিকা। ব্রিটিশ শাসনবিরোধী লেখার জন্য কয়েকবার কারারুদ্ধও হয়েছেন সাংবাদিক-কবি নজরুল ইসলাম। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তার কয়েকটি বইও নিষিদ্ধ করে। অজ্ঞাত রোগে বাকরুদ্ধ ও লেখনি শক্তি হারিয়ে অকালে সাহিত্যাকাশ থেকে ঝরে পড়ার আগে সৈনিক-কবি এভাবেই তার শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেছিলেন কাব্যলক্ষ্মীকে_'অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে/প্রদীপ শিখা সম/, কাঁপিছে প্রাণ মম/তোমার সুন্দর ভঙ্গিতে। ... /
আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে, এবং জাতির ক্রান্তিকালে সমস্যা সংকটের সময় সব বাধা অতিক্রমের প্রেরণা হয়ে আছেন কবি নজরুল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল তার লেখা কবিতা আর গান। এ বছর কবির অমরসৃষ্টি 'বিদ্রোহী' কবিতাটি রচনার ৯০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ঔপনিবেশিকতার নাগপাশ থেকে দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে নিপীড়িত-নির্যাতিত-বঞ্চিতদের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে কবির কলমের কালিতে অক্ষর আর শব্দের সম্মিলন ঘটেছিল যেন বিদ্রোহের আগুন। রচনা করেছিলেন কালজয়ী বিদ্রোহী_'বল বীর... / বল উন্নত মম শির।/ শির নেহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির!/বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাঁড়ি/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ ভূলোক, দূ্যলোক, গোলক ভেদিয়া,/ খোদার আসন আরস ছেদিয়া /উঠিয়াছে চির-বিস্ময়, আমি বিশ্ব বিধাত্রির!/মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে/ রাজ রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!/বল বীর/আমি চির-উন্নত শির!'।

উত্সবের শহর কলকাতা আরও সুন্দরী হয়ে ওঠে শারোদোত্সবে...।
১৯৫৭-৫৮ সাল। 

আজ থেকে বহু বছর আগের কথা . তখন কলকাতা বলতে টালা থেকে টালিগঞ্জ বোঝাত . আমরা তখন বেলঘরিয়া তে থাকতাম 
ভাড়া ঘরে. ১৯৫৭-৫৮ সালের কথা.তখন স্টিম ইঞ্জিন চলত. পুজোর জামা বলতে স্কুল ড্রেস. তাই পেয়েই খুশি .ষষ্ঠী র দিন 
মা কপালে চন্দনের টিপ দিয়ে আশির্বাদ করতেন দীর্ঘজীবি হও. সপ্তমী থেকে পাড়ার পুজো দেখে আর ভোগ খেয়ে প্রতিমা দর্শন. 
তারপর পায়ে হেঁটে বেলঘরিয়া, মোহিনী মিল,পুকপাড়া,নিমতা র পুজো. 
পরে র দিন অর্থাৎ অষ্টমীর দিন হাঁট তে হাঁট তে রথ তলা সিঁথি
ঘুরে পায়ের ব্যথা নিয়ে কখন অঘোরে ঘুমিয়ে পড়তাম.মা হয়ত পুজো র খরচের জন্য ১ আনা দিতেন তাতে রাস্তায় হয় চানাচুর নয় ঝুডিভাজা কিনে খেয়ে মহা আনন্দে ঘরে ফিরতাম। কত অল্পে আমরা সন্তুস্টো ছিলাম? এত আলোর রোস্নাই ছিল না কিম্বা প্যান্ডেলের জাঁক জমক ছিল না। সাবেকি পুজো । বিরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র র মহিশমর্দিনি র রেকর্ড বাজতো।সবাই বিভোর হয়ে শুনতো। আমার 
সঙ্গে একটা বেলুন. মাইকে এ শ্যামল মিত্রর গান ,"আমার স্বপ্নে দেখা রাজ কন্যা.." সেই গানের কলি র অর্থ বুঝতামনা তাও গাইতাম.
আবার কখনো মিন্টু দাস গুপ্তর প্যারডি,"আমি তো পকেট কাটিনি কেন মোরে দাও শুধু প্যাঁদানি". লতা মঙ্গেশকর এর," না যেও না এখনো রজনী বাকি বলে রাত জাগা পাখি " সলিল চৌধুরী র সাড়া জাগানো গান. কি বাচ্চা  কি বুডো সকলের মুখে ওই এক গান.সুপার হিট. 
গান  শুনলেই মন ভরে যেত . দূর্গা প্রতিমা দর্শন . কুমোরটুলির ঠাকুর ,,বাগবাজার সার্বজনীন পূজা,শোভা বাজার এর ঠাকুর,আহিডিতলা ,
পরে ফিরে দেশবন্ধু পার্ক ,শ্যাম বাজার এর পুজো। 
নবমির পুজো র সময় ঢ়াকের বাদ্যির তালে ধুনুচির নাচ । ছাগ বলি প্রথা তখন হোত কথাউ কথাউ। নবমির দিন পাডার পুজো বেশি উপভোগ্য ছিল।বন্ধু দের সঙ্গে হোই হুল্লোড । নাগর দোলনায় চডা । ফুচকা খাওয়া । খুব হৈ চৈ । 
দশমি যেন দেবির বিদায়ের সঙ্গে পুজো শেষ ।মহিলাদের পুজো প্যান্ডেলে সিঁদুর খেলা। তারপর প্রতিমা বিসর্জন ।   বিজয়ার প্রনাম সারতে সারতে ব্যাস্ ফুরলো পুজো         (২৯০ শব্দ)

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জ্জী, ৭৭ রামকান্ত বোস স্ট্রিট  
বাগবাজার , কলকাতা ৭০০ ০০৩