Saturday, July 28, 2012

অভ্যর্থনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাঃ-
অভ্যর্থনা
----------
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
----------------- 

প্রথম দৃশ্য
গ্রামের পথ

চতুর্ভুজবাবু এম| এ| পাস করিয়া গ্রামে আসিয়াছেন; মনে করিয়াছেন গ্রামে হুলস্থূল পড়িবে।
সঙ্গে একটা মোটাসোটা কাবুলি বিড়াল আছে

নীলরতনের প্রবেশ

নীলরতন।
এই যে চতুবাবু, কবে আসা হল?

চতুর্ভুজ।
কালেজে এম| এ| এক্‌জামিন দিয়েই--

নীলরতন।
বা বা, এ বেড়ালটি তো বড়ো সরেস।

চতুর্ভুজ।
এবারকার এক্‌জামিনেশন ভারি--

নীলরতন।
মশায়, বেড়ালটি কোথায় পেলেন?

চতুর্ভুজ।
কিনেছি। এবারে যে সবজেক্ট নিয়েছিলুম--

নীলরতন।
কত দাম লেগেছে মশায়?

চতুর্ভুজ।
মনে নেই। নীলরতনবাবু, আমাদের গ্রামের থেকে কেউ কি পাস হয়েছে?

নীলরতন।
বিস্তর। কিন্তু এমন বেড়াল এ মুল্লুকে নেই।

চতুর্ভুজ।
(স্বগত) আ মোলো, এ যে কেবল বেড়ালের কথাই বলে-- আমি যে পাস করে এলুম সে কথা যে আর তোলে না।

জমিদারবাবুর প্রবেশ

জমিদার।
এই-যে চতুর্ভুজ, এতকাল কলকাতায় বসে কী করলে বাপু?

চতুর্ভুজ।
আজ্ঞে এম| এ| দিয়ে আসছি।

জমিদার।
কী বললে? মেয়ে দিয়ে এসেছ? কাকে দিয়ে এসেছ?

চতুর্ভুজ।
তা নয়-- বি| এ| দিয়ে--

জমিদার।
মেয়ের বিয়ে দিয়েছ? তা, আমরা কিছুই জানতে পারলেম না?

চতুর্ভুজ।
বিয়ে নয়-- বি|এ|--

জমিদার।
তবেই হল। তোমরা শহরে বল বি|এ| , আমরা পাড়াগাঁয়ে বলি বিয়ে। সে কথা যাক, এ বেড়ালটি তোফা দেখতে।

চতুর্ভুজ।
আপনার ভ্রম হয়েছে; আমার--

জমিদার।
ভ্রম কিসের-- এমন বেড়াল তুমি এ জেলার মধ্যে খুঁজে বের করো দেখি!

চতুর্ভুজ।
আজ্ঞে না, বেড়ালের কথা হচ্ছে না--

জমিদার।
বেড়ালের কথাই তো হচ্ছে-- আমি বলছি এমন বেড়াল মেলে না।

চতুর্ভুজ।
(স্বগত) আ খেলে যা!

জমিদার।
বিকেলের দিকে বেড়ালটি সঙ্গে করে আমাদের ও দিকে একবার যেয়ো। ছেলেরা দেখে ভারি খুশি হবে।

চতুর্ভুজ।
তা হবে বৈকি। ছেলেরা অনেক দিন আমাকে দেখে নি।

জমিদার।
হাঁ-- তা তো বটেই-- কিন্তু আমি বলছি, তুমি যদি যেতে না পার তো বেড়ালটি বেণীর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়ো-- ছেলেদের দেখাব।

[ প্রস্থান ]

সাতুখুড়োর প্রবেশ

সাতুখুড়ো।
এই-যে, অনেক দিনের পর দেখা।

চতুর্ভুজ।
তা আর হবে না! কতগুলো এক্‌জামিন--

সাতুখুড়ো।
এই বেড়ালটি--

চতুর্ভুজ।
(সরোষে) আমি বাড়ি চললেম। [ প্রস্থানোদ্যম

সাতুখুড়ো।
আরে, শুনে যাও-না-- এ বেড়ালটি--

চতুর্ভুজ।
না মশায়, বাড়িতে কাজ আছে।

সাতুখুড়ো।
আরে, একটা কথার উত্তরই দাও-না -- এ বেড়ালটি--

[ কোনো উত্তর না দিয়া হন্‌হন্‌ বেগে চতুর্ভুজের প্রস্থান ]

সাতুখুড়ো।
আ মোলো! ছেলেপুলেগুলো লেখাপড়া শিখে ধনুর্ধর হয়ে ওঠেন। গুণ তো যথেষ্ট-- অহংকার চার পোয়া!

[ প্রস্থান ]

দ্বিতীয় দৃশ্য
চতুর্ভুজের বাটীর অন্তঃপুর

দাসী।
মাঠাকরুন, দাদাবাবু একেবারে আগুন হয়ে এসেছেন।

মা।
কেন রে?

দাসী।
কী জানি বাপু!

চতুর্ভুজের প্রবেশ

ছোটো ছেলে।
দাদাবাবু, এ বেড়ালটি আমাকে--

চতুর্ভুজ।
(তাহাকে এক চপেটাঘাত) দিন রাত্রি কেবল বেড়াল বেড়াল বেড়াল!

মা।
বাছা সাধে রাগ করে! এত দিন পরে বাড়ি এল, ছেলেগুলি বিরক্ত করে খেলে। যা, তোরা সব যা! (চতুর্ভুজের প্রতি) আমাকে দাও বাছা-- দুধভাত রেখে দিয়েছি, আমি তোমার বেড়ালকে খাইয়ে আনছি।

চতুর্ভুজ।
(সরোষে) এই নাও মা, তোমরা বেড়ালকেই খাওয়াও আমি খাব না, আমি চললেম।

মা।
(সকাতরে) ও কী কথা! তোমার খাবার তো তৈরি আছে বাপ, এখন নেয়ে এলেই হয়।

চতুর্ভুজ।
আমি চললেম-- তোমাদের দেশে বেড়ালেরই আদর, এখানে গুণবানের আদর নেই।

বিড়ালের প্রতি লাথি-বর্ষণ

মাসিমা।
আহা, ওকে মেরো না-- ও তো কোনো দোষ করে নি।

চতুর্ভুজ।
বেড়ালের প্রতিই যত তোমাদের মায়ামমতা-- আর মানুষের প্রতি একটু দয়া নেই।

[ প্রস্থান ]

ছোটো মেয়ে।
(নেপথ্যের দিকে নির্দেশ করিয়া) হরিখুড়ো দেখে যাও, ওর লেজ কত মোটা।

হরি।
কার?

মেয়ে।
ঐ-যে ওর!

হরি।
চতুর্ভুজের?

মেয়ে।
না, ঐ বেড়ালের।

তৃতীয় দৃশ্য
পথ। ব্যাগ হস্তে চতুর্ভুজ। সঙ্গে বিড়াল নাই

সাধুচরণ।
মশায়, আপনার সে বেড়ালটি গেল কোথায়?

চতুর্ভুজ।
সে মরেছে!

সাধুচরণ।
আহা, কেমন করে মোলো?

চতুর্ভুজ।
(বিরক্ত হইয়া) জানি নে মশায়!

পরানবাবুর প্রবেশ

পরান।
মশায়, আপনার বেড়াল কী হল?

চতুর্ভুজ।
সে মরেছে।

পরান।
বটে! মোলো কী করে?

চতুর্ভুজ।
এই তোমরা যেমন করে মরবে। গলায় দড়ি দিয়ে।

পরান।
ও বাবা, এ যে একেবারে আগুন।

চতুর্ভুজের পশ্চাতে ছেলের পাল লাগিল

হাততালি দিয়া 'কাবুলি বিড়াল' 'কাবুলি বিড়াল' বলিয়া খেপাইতে লাগিল

রুদ্রাক্ষ ...... প্রথম ভাগ ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জ্জী

রুদ্রাক্ষ ১ম পর্ব । 

  ত্রিভুবনজিৎ  মুখার্জ্জী

ছোট্ট গ্রাম, নাম তার হরিনারায়ানপুর । চাষ আবাদ করে চলে গ্রামবাসীরা । অর্থনৈতিক সচ্ছলতা  নেই বললেই হয় । কৃষি প্রধান গ্রাম । সকলেই  মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠিন পরিশ্রম করে সংসার চালায় । যে বছর ভাল বৃষ্টি হয় ফসল ভাল , নাহলে কপালে হাত  । ফি বছর বন্যা তে গ্রাম প্লাবিত হয় আর ফসল হানি হয় । গ্রামে কুঁড়ে ঘরই বেশি । যারা গ্রাম ছেড়ে সহরে চলে গিয়েছে তারা প্রায় গ্রামের মুখ দেখেননা বললেই চলে ।দুর্গা পুজোর সময় আসে , কদিন থেকে চলেযায় ।  এমনি এক গ্রামের বাসিন্দা কুঞ্জ বিহারি প্রধান । তার এক মাত্র ছেলের নাম রুদ্রাক্ষ প্রধান ।ডাক নাম রুদ্র ।  শিব রাত্রির দিন  রুদ্রাক্ষ র জন্ম তাই নাম ‘রুদ্রাক্ষ’  । ছেলেটা ধীর স্থির মিষ্ট স্বভাবের ।  
কুঞ্জ আর তার স্ত্রী , লক্ষ্মী দুঃখে কষ্টে দিন কাটাত । রুদ্রাক্ষ গ্রামের স্কুল এ ক্লাস থ্রি তে পড়ত । ভালই পড়াশুনো করত । মাস্টার মশাই রুদ্রাক্ষ কে  খুব স্নেহ করতেন । মা বাবার চোখের মণি যেমন গুনে তেমন কাজে । পড়াশুনো থেকে আরম্ভ করে ক্ষেত খামারের কাজ সব ই করত রুদ্রাক্ষ বাবার সঙ্গে  । 
                                                            
                                
একদিন গ্রামেতে লোকের ভিড । অনেক গাডি তার সঙ্গে কিছু নেতা ,  গ্রামের মোড়ল নিশিকান্ত চৌধুরী । বাবুদের দেখে গ্রামের ছেলে ছোকরা, বুড় বুড়ি সকলেই একজোট হল। নিশিকান্ত বাবু  বললেন, এই গ্রামের সুদিন এল । আপনাদের  আর দুঃখ কষ্ট থাকবে না ।আপনারা  এবার গাডি ঘোড়া চডে বাবুদের মত থাকবেন  । এখানে বাঁধ হবে । সরকার আপনাদের  জন্য এখানে বাঁধ করলে কৃষির উন্নতি সাধন এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসবে । আপনাদের  ছেলে মেয়ে পড়াশুন করে অনেক বড হবে ।বিস্থাপিত ৭২৬ পরিবারের জন্য সরকার আলাদা বসতি নির্মাণ করবেন । আজ তাই আপনাদের  কাছে আমাদের অঞ্চলের মাননীয় বিধায়ক, শ্রী ভগবান চৌধুরী মহাশয় উপস্থিত থেকে এই প্রকল্পের বিষয় বিস্তারিত সূচনা দেবেন। সভাতে, করতালির বদলে বিরোধিতা আরম্ভ হল। স্কুলের এক শিক্ষক শ্রী পঞ্চানন প্রধান বিরোধিতার সুর আরম্ভ করে বললেন,সরকার আগে বিস্থাপিতদের জন্য নতুন বসতি,রাস্তা,স্কুল,ডাক্তারখানা,পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ করুন  তারপর আমরা এই বিষয়ে সম্মতি জানাবো । নিশিকান্ত চৌধুরী খেপে লাল। গর্জে উঠলেন আপনার মাস্টারিটা বিধায়ক মহাশয় এক্ষুনি ঘুঞ্চিয়ে দেবেন,  আপনার সাহস ত কম নয়! শিক্ষক মহাশয় বিনম্রতার সঙ্গে বললেন আপনারা এই গরীব গ্রামবাসী দের জমি নিয়ে নেবেন আর তার বিনিময়ে যা যা ঘোষণা করছেন তার ... বিধায়ক মাহাশয় হাত থামিয়ে নিশিকান্ত কে বসতে বললেন । তার পর শুরু করলেন আমি এখানে কারুর পেটের দানা ছিনিয়ে নিতে আসিনি বরং কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে এসেছি
                                   
। আপনারা ধৈর্য্য ধরে শুনুন সমস্ত বিষয়টা তারপর আপনাদের কথা শুনব। এই যোজনার জন্য সরকার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন এবং এর সুবাদে সমুদায় ৯৯৫০ হেক্টার জমিতে সেচের সুবিধে হবে । আপনাদের পরিবারের কেউ একজন সরকারি চাকরী পাবে। সাতটি পুনর্বসতি কলোনি তে সকল বিস্থাপিতদের থইথান করা হবে । 

      এর মধ্যে কিছু লোক চেঁচা মিচি শুরু করে দেয় । নিশিকান্ত সরকারী দালাল আমরা এ ভিটে মাটি ছাডবোনা। আমাদের বাপ দাদার ভিটে মাটি ছেডে কোথাউ যাবনা । ছেলেদের চিৎকারের সঙ্গে অন্যরাও সুর মেলাল । বিধায়ক মহাশয় জত বোঝালেও কেউ রাজি হলনা কি চিৎকার থামল না । অগত্যা সরকারি বাবুদের নিয়ে সবাই ফিরে গেলেন

                                                                                                                                   

রুদ্রাক্ষ ২য় ভাগ

 তার পরের  দিন পুলিশ এসে পঞ্চানন বাবুকে ধরে নিয়ে যায়
 প্রথমে পঞ্চানন বাবু ওয়ারেন্ট দেখতে চান কিন্তু পুলিশ কিছু না দেখিয়েই ধরে নিয়ে যায় তাঁকে   সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকে যে জার ঘরে  চলে যায় রুদ্রাক্ষ সব দেখে নির্বাক হয়ে যায় বয়স অল্প হলেও তার মনে প্রতিবাদের বহ্নিশিখা জ্বলতে থাকে সে বোঝে যা হচ্ছে সেটা অন্যায় তাই পেছন থেকে পুলিশ এর জীপ কে লখ্য করে ঢিল ছোঁড়ে বাড়িতে দউড়ে চলে যায়।  বাবাকে বলাতে,  বাবা গুম হয়ে বসে থাকেন, মা কিছু বললে বিরক্ত হন আকাশ পানে চেয়ে কিছু বিড় বিড় করেন।
      এর পরের ঘটনা গ্রামেতে ক্যাম্প বসে তাহসিলদার, আর আই,আমিন চেন নিয়ে মাপ জোপ আরম্ভ করে দেয় পল্লিসভা হয়
                        
তাতে কিছু লোক নিশিকান্ত বাবুর গুণ্ডাদের ভয়ে টুঁ শব্দটি করেনা। হঠাৎ বাবা বাডিথেকে একটা কাটারি নিয়ে নিশিকান্তর দিকে দৌড়ন রাগে গজরাতে গজরাতে বলেন তোর চোদ্দ পুরুষের বাপের জমিদারী যে আমাদের জমি নিতে এসেছিস সবাই রে রে করে বাবাকে আটকান তহসিলদার বোঝান তোমরা ক্ষতি পুরন পাবে অনেক টাকা পাবে এখানে সই কর বাবা কাগজটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলেন রাগে বলেন বাবু আপনারা আমাদের অন্ন র থালা ছিনিয়ে নিয়ে টাকা দেখাচ্ছেন টাকা আমরা চাইনা নিশিকান্ত গর্জে উঠে বলল , এই কুঞ্জ তোর গায়ে মেলা চর্বি হয়েছে না ? দেখাচ্ছি তোকে মজা। গ্রামের উন্নতি চাসনা তো গ্রাম ছেডে চোলেযা
পরের দিন পুলিশ এসে কুঞ্জকেও নিয়ে গেল কোন ওয়ারেন্ট না থাকা সত্তেও । দেশের আইন ব্যাবাস্থা র প্রতি কুঞ্জর  ঘৄনা ধরেগেল । পুলিশের দারোগা বাবু বল্লেন , তোর এত সাহস তুই লোক প্রতিনিধির কথা না শুনে  কাটারী নিয়ে মারতে গিয়েছিলিশ ; সেটা কি অস্বিকার করবি । সাক্ষীপ্রমান তোর বাডির লোক ই দেবে ।ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন কি ? কুঞ্জর নিজের জন্যে চিন্তা  হয়না । তার বউ ছেলের যদি কোন ক্ষতি হয় তারচে তার মৄত্যু ভাল হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো । হাজতে নিশিকান্ত আর ভগবান চৌধুরী , বিধায়ক এসে কুঞ্জ কে বল্লেন ,” দেখ কুঞ্জ আমরা তোমাকে ইচ্ছে  করলেই জেল হাজতে পাঠাতে পারি কিন্তু তাতে কি লাভ তোমার বউ ছেলে না খেয়ে মারা যাবে ।নিশিকান্ত বলে ,  তুই কি তাই চাস ?”  কুঞ্জ হাউ হাউ
                              
করে কেঁদে বলে ,”না বাবু ওরকমটি করবেন না ! আমি আপনারা যা  চাইবেন তাই করব ।“  নিশিকান্তর ক্রুর হাঁসি কুঞ্জ র চোখে এড়ালোনা কথায় আছে হাতি কাদায় পডলে ব্যাং এও লাথি মারে । কুঞ্জ র অবস্থা কিছুটা তাই । দারোগা বাবু বল্লেন , বাবুদের অশে দয়া তা নাহলে তোর নামে ৪ টে দফা লাগিয়ে তোকে জেলে ভরতাম বুঝলি । কালকেই  কোরট্ এ হাজির করা হত ৷ভগবান বুঝলি সাখ্যাৎ ভগবান , যেমন নাম সেইরকম কাজ ।  আমাদের বিধায়ক মহাশয় তোকে ছাডাতে নিজে এসেছেন ।তুই কিনা কাটারি নিয়ে গিয়েছিলিশ মারতে । ধর্ম নেইরে এ জুগে ধর্ম নেই । যার ভাল করবি সেই তোকে বাঁশ দেবে । আঃ কি হচ্ছে ? বিধায়ক বলেন । আমি যে জন্য এসেছি সেটা করুন । এই সময় বাইরে লক্ষীর গলার আওয়াজ এল !লক্ষী গজরাতে গজরাতে ভেতরে ঢুকলো , আ মরন মিনশে! আদিখ্যেতা দেখলে গা জ্বলে যায় !! আমার বর ছাডা কি কেউ ছিলনা এ গেরামে মুখপোডারা হাজতে ভরতে তোদের হাথ কাঁপলোনা ?  কাল  থেকে মানুষটা ভাতে মুখ দেয়নি । শুকিয়ে রোগা কাঠি হয়ে গেছে গা । মরন হয় না তোদের ? আমি যদি কোন পাপ না কোরে থাকি এর যবাব দিও হে ঠাকুর তুমি ভরষা !!
দেখছিস কুঞ্জ তোর বউ এর চোপা?” দারগা বাবু বলে উঠলেন । স্যার এর একটা বিহিৎ করুন । মেয়েমানুষের চোপা ! এই কে তোকে থানাতে আসতে বলেছে? যা এক্ষুনি । নাহলে এক্ষুনি তোকেও লক আপ এ   
                            
ভর্তি করে দেব ।  সাধে কি আর বলে মেয়ে মানুষ ? মুখের কথা দেখ ? যেন খই ফুটছে । উঁহ ! দারোগা বলেন।  গরিবের কি কেউ নেই ? আমি কি সাধে এখানে এয়েছি ?লক্ষী ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আমরা এখানে  কুঞ্জ কে ছাডাতে এসেছি আপনি ঘরে যান । সব ঠিক হয়ে যাবে ।  যাচ্ছি  যাচ্ছি কে আর থানাতে আসে বাবু গরজ না পড়লে।লক্ষী গজরাতে গজরাতে থানা ছেড়ে চলে যায়।
দেখলেন স্যার দেখলেন এদের । এরা লাথির ভাষা বোঝে ভালো কথা বললে মাথায় চড়ে। কুঞ্জ র মনে হচ্ছিল গিয়ে ঠাস্ করে এক থাপ্পড মারে নিশিকান্ত কে । কিন্তু ওর হাত পা বাঁধা ।ছিঃ শেষে কিনা থানাতে? লজ্যা ঘৄনাতে নিজেকে ছোট মনে হয়।কিন্তু মাস্টার মোসাই ? কি অভিসন্ধী এদের কে জানে ? বলা মুশকিল । বাডি গেলে যানতে পারব ? লক্ষী ত্ত বা কেমন? থানায় কখন মেয়েছেলে আসে ? সবাই কি ভাবল?                                                        
কুঞ্জ বাড়ি ফিরল তার পরদিন মাষটার মোসাই ও  ফিরে এলেন । মাষটার মোসাইএর এখানে কেউ থাকেন না ।উনি একাই এই গ্র।মে প্রায় বছর দশেক আছেন ।তিনি নিজে ছাত্রদের শিখিয়েছেন অন্যায়কে সহ্য করা এবং অন্যায় করা দুটই এক অপরাধ । অন্যায়কে প্রতিবাদ কর হিঁসা দিয়ে নয় যুক্তি  দিয়ে । কুঞ্জ যেটা করল সেটা ভূল । সে ভূলের মাসুল তাকে দিতে হল। 

রুদ্রাক্ষ ৩য় ভাগ


  
                                      আপনারা ভাবছেন রুদ্রাক্ষ হারিয়ে গেল ? নাকি কোথাউ নিরুদ্দেশ হয়েগেল ?  সেরকম কিছুই হয় নি । রাস্তায় মাস্টারমশাই রুদ্রাক্ষ কে কাটারি হাতে দেখে থমকে যান  তারপর আন্দাজ করেন কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে । তখন ভো্র হয়ে আসছিল । সূ্র্য্য পূর্ব গগনে উদিয়মান তার রক্তিম আভা রুদ্র(রুদ্রাক্ষ) র মুখমন্ডল কে রক্তিম করে তুলেছে । একটা দিব্য জ্যোতি তার মুখমন্ডল থেকে যেন ঠিক্ রে বেরুচ্ছে । মাস্টারমোসাইকে  রুদ্র  দেখে কাটারি টা হাত থেকে ফেলেদিয়ে ডুক্ রে কেঁদে ওঠে , কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,”ওরা আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে । ওদের আমি ছাড়বোনা।“  মাস্টারমোশাই রুদ্র কে কোলে তুলে নেন তারপর বলেন রুদ্র তুমিনা ভাল ছেলে ! ভাল ছেলেরা কি কাটারি ধরে ? আমিত আছি তোমার ভয় কি ?  তোমার মা তোমায় না দেখে অধীর হবেন । চল আমরা তোমাদের বাডী যাই ।
রুদ্র , মন্ত্র মুগ্ধের মত লক্ষী ছেলেটি র মত মাস্টারমশায়ের সঙ্গে বাডী ফিরে এল । ততক্ষনে পাডার লোকেরা ভীড় জমিয়েছে কুঞ্জ র ঘরে । মাস্টারমোসাই কে দেখে সবাই মনে বল পেল । সকলের এক প্রশ্ন কি করনিয় কারন সকলেই মর্মাহত । মাস্টার বলেন আগে শব শৎকার তার পর যা করনিয় । কিন্তু জনতা বলে আমরা বিধায়ক কে ঘেরাউ করব নিশিকান্ত র বাডি ঘেরাও করব । কুঞ্জ র অকাল মৄত্যুর র জন্য নিশিকান্ত চৌধুরী আর বিধায়ক ভগবান চৌধুরী দায়ি । সরকার এই মৄত্যুর জন্য ক্ষতিপুরন না দেওয়া ওবধি আমরা শব নিশিকান্ত র বাডীর সামনে রেখে ধারনা দেব। পরের দিন কাগজে বড বড করে বেরুলো হরিনারায়নপুর এ চাষী ম্রিত্যু । এন জি ও, পত্রকার , বিরোধী নেতাদের শ্রোত ছুটল । কেন কুঞ্জ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল? কি হবে লক্ষী র সিঁদুরের ? কেউ কি তার সোয়ামি কে ফেরাতে পারবে গা ? এ প্রশ্ন আপনাদের কাছে রাখলাম । এরকম হাজার হাজার রুদ্রাক্ষ র জন্ম হচ্ছে এ দেশে এরকম হাজার হাজার কুঞ্জ দারীদ্রের কশা ঘাতে মৄত্যু কে স্বাগত করতে বাধ্য হচ্ছে । থেকে জাচ্ছে কিছু  নিশিকান্ত,নিতাই,নিধিরাম,পুলিশ দারোগা র মতন স্বারথপর রক্ত পিপাষু মানুষ রুপি নরপশু এ জুগে তাদের ই সংখ্যা বেশি । 
  
                                                      ত্রিভুবনজিৎ  মুখার্জ্জী 

Wednesday, July 11, 2012


                  বিশ্বজিৎ রায় 

Saturday, June 2, 2012

একটি সুন্দর প্রেমের কাহিনী ....।

মেয়েঃ আমি কি অনেক মিষ্টি একটা মেয়ে ?
ছেলেঃ না ।
মেয়েঃ তুমি কি আমার সাথে থাকবে ?
ছেলেঃ না ।
মেয়েঃ আমি যদি তোমাকে ছেড়ে চলে যাই , তাহলে তুমি কাঁদবে না ?
ছেলেঃ না ।
মেয়েটি অনেক কষ্ট পেলো , এবং কাঁদতে শুরু করলো ।
তখন ছেলেটি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, এবং বললঃ
তুমি অনেক মিষ্টি নও, কিন্তু সুন্দর ......
আমি তোমার সাথে থাকতে চাই না , কিন্তু বেঁচে আছি তোমার জন্য ...
যখন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে তখন আমি কাঁদবো না , কিন্তু মরে যাব.....।। ♥:

আদিত্য বর্মণ জনি 

Tuesday, May 29, 2012

হারানো প্রায় স্মৃতির রোমন্থন খডিলাগি একাদশী ১৫ ই জুন ২০১২ (

    হারানো প্রায় স্মৃতির রোমন্থন  

 খডিলাগি একাদশী ১৫ ই জুন ২০১২ ( বাবার ২৬ তম শ্রাধ্য দিবস উপলখ্যে) 
আজ থেকে প্রায় ৪৯ বছর আগের কথা । সাল টা ১৯৬৩-৬৪  ।আমার বাবা তখন দন্ডকারন্য প্রোজেক্টকেন্দ্র জায়গাটার নাম মাল্কান গিরি ; আমার বাবা কেন্দ্র সরকারের অধীনে ডেপুটেসন এ চাকরী সুত্রে পোস্টেড । জোনাল এগ্রিকালচার অফিসার, মাল্কানগিরি জোন ;কেন্দ্র সরকারের বরিষ্ঠ অধিকারি (Sr. Class I Officer)। জায়গাটার নাম ‘মাল্কানগিরি’ কারন সুউচ্চ পাহাড় দিয়ে ঘেরা এক বিশাল ভূমি এই এলাকা যার আসল নাম ‘মাল্যবন্তগিরি’  ।উডিশ্যার কোরাপুট জেলার এক দুর্ভেদ্য  জঙ্গল এলাকা ছিল এই মাল্কানগিরি ।জয়পুর,কোরাপুট থেকে প্রায় ৬০কিলমিটার দুর।তখন চারিদেকে গভীর জঙ্গল বসতি শুন্য  আদিবাসী প্রধান এলাকা।এখানে ডঙ্গরিয়া  কন্ধরা আদীম অধিবাসী এবং এরা ভীষণ সরল প্রকৃতের মানুষ। তখন মাল্কানগিরি  একটা সাব্ ডিভিসেনাল হেড ক্বাটার  ছিল । চারিদিকে শাল,পিআশাল,শাগুআন (সেগুন) এর গভীর জঙ্গল । আমার খুব আনন্দ হত ওখানে গেলে ৷ কারন আমাদের ক্বাটার টা  খুব বড় ছিল । মা ,সুন্দর বাগান করেছিলেন ৷ সামনে নানান ফুল আর ক্বাটার  এর পেছনে নানান তরিতরকারি, শাক সবজি ,  বিশাল একটা আম গাছ ছিল । ওটা  এমনি একটা জায়গা যে  কাছে পিঠে  কোথাউ বাজার ছিলনা , তাই মা  নিজেহাতে রকমারি তরিতরকারি,  শাক, কা৺চালঙ্কা ,পে৺পে, এমনকি প্রায় পঞ্চাশটা মুরগী ও পুষেছিলেন  আমাদের সকলের জন্য যাতে খাওয়া দাওওার কোন অসুবিধে না হয় ।আমরা বাডির মুরগীর ডিম আর গোরুর দুধ খেতাম, বাইরেথেকে এসব  কেনা হতনা  ।  নীলকণ্ঠ আর মিশ্র নামে দুটো কাজের লোকছিল । ওরা বাগান আর দুটো গরুর দেখাশোনা করত। মা বলতেন , পড়াশুনো করতে হলে মগজে বুদ্ধী  চাই , আর তার জন্য চাই উত্তম খাদ্য পানিয় । তাই আমাদের বাড়িতেই সব ব্যাবস্থা ছিল । আমরা গরমের ছুটিতে ‘বেলঘরিয়া’ থেকে সুদুর ‘মাল্কানগিরি’ যেতাম।এক জনাকীর্ণ স্থান থেকে জনশুন্য ঠিক বোলব না জনবিরল স্থান । চারিদিকে জঙ্গল হিংস্র জন্তু আর কিছু আদিবাসী নর নারী । সন্ধ্যা হলেই মাদলের ধ্বনিতে মৄদু গম্ভীর তাল বাদ্য যা মানুষের অস্তিত্ব র প্রতিক স্বারুপ । সে এক দারুন দৃশ্য না দেখলে বোঝা যায়না । নাচের তালে ধাংগডা ধাংগড়ী (ওদের ভাসায়) মাতাল অবস্থায় সারা দিনের পরিশ্রমের কষ্ট ভুলে যেত;  মরদের কঠিন বাহু তে নিজেকে বুঝি হারিয়ে ফেলত ধাংগডীরা । সে দৄ্শ্য অত্যন্ত মনরম এবং হৃদয় স্পর্শী   বাস্তব  ভিজুয়াল যা টাকা দিলে ও কেউ পাবেনা এখন ! এটাই প্রকৄতির এবং ভগবানের সৄস্টির আসল রুপ।  উতলা হয় মন ওখানে আবার যেতে!   
           বাবা সকাল ৮ টা থেকে জীপে টুরে যেতেন ফিরতেন  প্রায় রাত ৮ টার সময় ।  কাজের চাপ বাডলে জঙ্গলের মধ্যেই টেন্ট ফেলে স্টাফেদের সঙ্গে থেকেযেতেন।সে যুগে মোবাইল ছিলনা যে কেউ খবর নেবে ।    তখন মাল্কানগিরি তে ইলেকট্রিসিটি আসেনি তাই সারাদিন অসহ্য গরম হত।  হাত পাখা তখন একমাত্র ভরসা। ভ্যাপসা গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত । সারাদিন গরম আর রাতে মশা । লন্ঠনের আলো তে মা রান্না করতেন । মিশ্র রুটি করে চোলেযেত । মা রকমারি তরকারি তৈরি  করে আমাদের খেতে ডাকতেন। 
                       
    ছোডদি এসে ছিল ওখানে  কারন,  প্রথম সন্তান সম্ভবা । তাই ছোটজামাইবাবু, ছোড়দিকে মাল্কানগীরি তে বাবা-মা র কাছে ছেডে কিছুদিন থেকে  কটকে ফিরে গিয়েছিলেন ।সেদিন ছিল জামাই ষষঠী। বেলঘরিয়া থেকে বড জামাইবাবু (বলাই) আর কটক থেকে ছোট জামাইবাবু (কেষ্ট)  এসেছিলেন ।   বাবা মা’র জামাই খাতিরটা একটু বেশি ছিল সেদিন ।স্পষ্ট মনে আছে দুই জামাই কি খাবে না খাবে ,মা হেঁসেলে ঢুকলে আর বেরুবার নাম নেই। রকমারি ব্যঞ্জনে থালা র চতুঃস্পারশে পঞ্চ ব্যাঞ্জন  মাছের কালিয়া,ছোলার ডাল দিয়ে মাছের মাথার মুডিঘন্ট , পাঁঠার মাংস, পাঁঠার মাঁসর দোপেয়াঁজী,  ,মুর্গীর মাংস,শুক্তো,  আমের চাটনি,মোচার ঘণ্ট, পোস্তর বডা ,পটল ভাজা, বেগুন ভাজা, কুমডোর ফুল ভাজা, আলু পোস্ত , ডিমের ডেভিল ,বাডিতে পাতা মিষ্টি দই, ছানার পায়েশ,রসগল্লা,সান্দেশ।  “বলাই,  কেষ্ট  এটুকু খেয়ে নাও বাবা ” মা বলতেন সব খাবার বেডে । খাওয়া র পর ছোট জামাইবাবু পান খেতেন। জরদা দেওয়া পান আনতে আমাকে বাজারে ছুটতে হত সাইকেল নিয়ে । বিকেলে বাবার ড্রাইভার আসতো জীপ নিয়ে, দুই  জামাই বাবাজিবন কে সান্ধ্য ভ্রমনে নিয়ে জাওয়ার জন্য। ড্রাইভার আগত্যা জীপে, জামাই বাবুকে নিয়ে তমশা নদী র তীর ওভধি নিয়েগিয়েছিল  । বাবার অভিলাশ যদি বাবাজিবন কে  live বাঘের দর্শন করানো যায় দুরথেকে।  সন্ধান পাওয়া ত দুরের কথা ,  বাবাজিবনরা   বাঘের মতন চক্ষু (হয়তো মোষের )  দূর থেকে দেখেই ব্যাশ্;  ড্রাইভারকে গাডি ঘোরানর নির্দেশ দিয়ে হাঁপাচ্ছেন।    আমাদের বাডিতে সর্বদাই হট্টগোল । বাবা বলতেন যারা ভেকু তারা চুপ করে থাকে আর নন ভেকুরা সোরগল করে । কথাটা এখনো আমার কানে বাজে । অত্যন্ত রসিক আর আমুদে মানুষ ছিলেন আমার বাবা। মা ঠিক উল্টো । গুরু গম্ভীর প্রকৃতির বাস্তব এবং দায়িত্য সম্পন্না,কর্মঠ মহিলা । ছেলে মেয়েদের প্রচণ্ড ভাল বাস্তেন দুজনেই । একজন স্নেহ দিয়ে আরেকজন শাসন করে । একটা কথা বলে রাখি তখন আমাদের মাসতুতো ভাই সন্তুদা বেশ কয়েক বছর বাবা মার কাছে ছিল । সন্তুদা খুব দুষ্টু ছিল । তখন আমাদের ছোট কাকা (ক্যাঁদন) পুরী থেকে বাবার কাছে এসেছিলেন মাল্কানগিরি তে । ওনার সামান্য মাথার দোষ ছিল । মানে খুব ছেলে মানুষ ছিলেন । খাওয়া ছাডা কিছুই যানতেন না । একবার মা বাবা কি কারনে বাইরে গিয়েছিলেন তখন ছোট কাকা, সন্তুদা আর আমরা দু ভাই ছিলাম  বাডীতে । সন্তুদা,আমাদের বাডীর দুটো মোরগ বেশ প্রমাণ   সাইজের  জবাই কোরে প্রেসার কুকারে  রান্না কোরলো ।ভালোই হয়েছিলো রান্না কারণ বাডীতে তেল মসলার তো অভাব নেই । তখন বাজে আঢ়াইটে । সকলের ক্ষিদেতে প্রাণ ওষ্ঠাগত । ছোট কাকা কে খেতে  ডাকাতেই আসন পেতে পরিপাটী কোরে বসে পডলেন । কোইরে সন্তু মাংস কোথায় ? গোবিন্দ ভোগ চালের ভাত আর মুর্গীরমাংস।  এলাহি ব্যাপার। কাকা খেয়েই যাচ্ছেন সন্তুদা  দিয়েই যাচ্ছে । প্রায় তিন চতুর্থাংশ শেষ হোয়েগিয়েছে ততোক্ষনে । সন্তুদা এবার খেঁপে গেল। যা করল তা এখানে লেখা যাবেনা । আমাদের খুব ক্ষিদে পেয়েছিল । আমরা যে যার ভাত বেডে খেয়ে নিলাম।  ঘটনার কথা মা এসে শুনে খুব  রাগা রাগি করলেন।  
       দুর্গা পূজো এসে গেল । মা বাবার  ইচ্ছা এবারের পূজোতে মার বাপের বাডী অর্থাৎ আমাদের মামার বাডী ‘খেপূতের’ পূজো দেখতে যাব সবাই । তখন আমাদের দাদু , বিজন বিহারী চক্রবত্তী জীবিত । আমরা মাল্কাণ গিরি থেকে সোজা জীপে জয়পুর ওব্ধি গেলাম।  ওখান থেকে বাসে বিজয়নগরম্ । বিজয়নগরম্ থেকে ম্যড্রাস মেলে খডগপূ্র ।  তারপর লোকাল ধরে কোলাঘাট । কোলাঘাট  থেকে  গুপীগঞ্জ । গুপীগঞ্জ থেকে আডাঈ মাঈল পদব্রজে । তারপর খেপূত্। বিশাল পূজো দ্যাখার মতন । বোধন থেকে বিসর্জন ওভধি প্রত্যেকটা মুহূর্ত ভীডিও কোরে রাখার মতন । এখন ওরকম দুর্গা পূজো সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়না । সবাই এই পূজোর সময় এক হয় গ্রামের বাডীতে । একটা উৎসবের মুহূর্ত চারিদিকে শরৎ এর কাঁসফুল। ক্ষেতে পাট ফসল কাটা হয়ে গিয়েছে। সেই ক্ষেতের ওপর হাঁটার সময় তখনকার গ্রাম বাংলার স্পষ্ট চিত্র । একটা পূজো পূজো আমেজ। মন মাতান পূজোর গান । মানবেন্দ্র, হেমন্ত, লতার পূজোর রেকর্ড বাজছে । গগন মুখরিত । 
           খেপূতে তখন আমাদের একমাত্র মামা,  মলয় মামা , আমার মাসতুত ভাই বোম্ভোলা, সন্তুদা , মঞ্জু(মাসি),ফূদাণ,টুটু(মাসি), মেজ দাদু, মেজ দীদা , দাদু, মা,বাবা, মেশোমোশাই, মাসিমা, আর আমাদের সব আত্মীয় স্বজন । একটা বিরাট গেট টু গেদার । পুজো  যাকে বলে ঠিক সেইরকম হত । বনেদী বাডিতে যেরকম হায় । 
        বানী ; আমাদের প্রথম ভাগ্নী । ওর মাল্কানগীরি তেই জন্ম।সালটা ১৯৬৩  জানুয়ারী  মাসে । সরস্বতী পুজোর দিন বাণীর জন্ম । বাবা সাধ করে নাতনীর নাম ‘সরস্বতী’ কিন্তু সে নাম পছন্দ হলনা তাই নাম দেওয়া হল ‘অঞ্জনা’। বানী  জন্ম থেকেই রোগা ছিল কিন্তু   দেখতে ভীষণ সুন্দর কারন ওর বাবা মা দুজনেই সুন্দর।নাতনী র অনেক আহ্লাদ ছিল প্রথম সন্তান। সারা দিন ক্যাঁ কটরে পড়াশুনো হত কম আর গল্প আড্ডা বেশি। ছুটির দিনে বাবার সাঙ্গ পাঙ্গ দের আগমন এবং চা এর আড্ডা ছিল । রকমারি জলখাবার তৈরি হত। 
     মা রোজ বানি কে নিয়ে বেডাতে বেরুতেন । সবাই বলত “বানী মাল্কানগীরি কা রানী”। সে ছোট বেলা থেকেই মা কে বলত দিদুন, “চটি ছাতা ভোঁ”  মানে পায়ে চটি পরে ছাতা নিয়ে বেডাতে  চল । বানিকে দেখতে কটক থেকে ‘চিত্ত’ বাবু (ছোটজামাই বাবুর দূর সম্পর্কের ভাই) গলায় এক ন্যাসনাল প্যানাসোনিক জাপানী ট্রাঞ্জিস্টার নিয়ে হাজির। উদ্দেশ্য সোনাদার শ্বসুর বাডীতে ফাঁট দেখাতে আশা ।পেটে বিদ্যে অষ্টরম্ভা গুঁতো মারলে ‘ক’ বেরুবেনা সে হেন ভদ্রলোক কে,  মা বাবা আপ্যায়নের ত্রুটি রাখেন নি ।   তা তিনি নেই নেই করে বেশ কদিন জামাই আদর খেয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন স্বগৃহে । বাবার কষ্টার্জিত টাকা কিছু ভূতে এসে শ্রাদ্ধ করেগেছে আর আমরা নির্বাক দর্শক ছিলাম । কিছুদিন বাদে ছোটজামাই বাবু এসে ছোডদিকে নিয়েগেলেন । বাডি ফাঁকা। বছর ফুরয়নি আবার ছোডদি হাজির ছোটজামাই বাবুর সঙ্গে । রিনা আমার দ্বিতীয় ভাগ্নী হবে বলে ।                                                            
   কখনো সখনো আমি বাবার সঙ্গে টুরে যাওয়ার বায়না করতাম যার সুবাদে আমি অনেক সুন্দর সুন্দর যায়গা দেখার সুযোগ পেয়েছি। যেমন;  বালিমেলা, ওরকেল, কালিমেলা, মটু, পড়িআ, কুমটিগুড়া, গোবিন্দপালী, তমাসানদি, এম্ ভি ১৯,২১,৫১ ইত্যাদি ।   হরিনারায়নপুর(এই গ্রামটা বাবার নামে ) নামাঙ্করন হয়। তখন দন্ডকারন্য প্রোজেক্ট এ একজন চিফ এডমিনিস্ট্রেটার (আই সি  এস্ ) অফিসার  থাকতেন । তখন শ্রীসুকুমার রায়, আই সি  এস্ , চিফ এডমিনিস্ট্রেটার , দন্ডকারন্য প্রোজেক্ট ছিলেন।  উনি স্বর্গীয় বিধান রায়,তখনকার  পঃবঃ র মুখ্য মন্ত্রী র খুব কাছের লোক ছিলেন ।  উনি বাবাকে খুব ভালোবাসতেন । আর বোধহয় সেই সুবাদে বাবার কাজের মূল্যস্বরুপ তখন ওই গ্রামের নাম ‘হরিনারায়নপুর’ রাখেন নিজে  শ্রীসুকুমার রায়, আই সি এস্,এটাই ছিল বাবার সবচেয়ে বড় সন্মান ।  এখন এরকম কাজ পাগলা লোক সচর আচর দেখতে পাওয় ষায়না।  আর এত অমায়িক এডমিনিস্ট্রেটার ও দুর্লভ । ওই দুর্ভেদ্য জঙ্গলে , সএল সার্ভে করার জন্য টেন্ট ফেলে থাকতে হত বাবাকে।অবশ্য বাবার নিরাপত্তার জন্য সরকারথেকে দুজন শিকারী (body guard)কে পোষ্টিং করা হয়েছিল । জঙ্গলে  পদে পদে বিপদ কারন রয়েল বেঙ্গল টাইগার গোরু ছাগল খেতে আসতো । গরম কালে  সন্ধ্যাবেলায় ভালুক এর আগমন পাকা আম খাওয়ার জন্য। এখন লোকে যা টাকা খর্চা  করে দেখতে যান আমি, তা ছোটবেলাতেই দেখেছি বিনেপয়সায় । তাই আমার আর ওদিকে আকর্ষন নেই। 
আমি প্রায় সব জঙ্গলি জীব জন্তু দেখেছি কিন্তু মানুষ  আর ওদের মধ্যে প্রভেদ হল; ওরা ক্ষীদে পেলে খায়,মানুষ  খায় খাওয়ার নেশায় । ওরা হিংস্র ঠিক কিন্তু  ভুভুক্ষু নয় এই অমানুষের চেয়ে সেই পশুরা অনেক ভাল। ওরা শ্রীঙ্খলিত,  বিশ্রীঙ্খল নয়। উন্মত্ত কিন্তু উন্মাদ নয়।   এটাই মস্ত বড প্রভেদ জন্তু আর মানুষে । মানুষ ওন্নের মুখের অন্ন ছিনিয়ে খেয়ে নিজেকে বাহবা দেয় । পরে যাদের জন্য রাখে তারাই পশ্চাৎ দেশে পদাঘাত করে । এটাই বিধাতার নিয়ম  
  বাবা সারাজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের মানুষ  করেছেন। প্রত্যেকটা সামাজিক দায়িত্য সুচারু রুপে পালন করেছেন । মা অক্লান্ত্য পরিশ্রম করে নাতনীদের জন্ম থেকে বড করেছেন কিন্তু তার প্রতিদানে কিছুই আশা করেন নি। তারা বড হয়ে কখনো  দাদু দিদার খোঁজ করেনি।  অবশ্য ওদের দোষ নেই । দোষ ওদের মা বাবার।  যারা আমার মা বাবার মৃত্যুর পরেও তাদের শুষে গেছে শেষ স্মৃতি  টুকু তে ভাগ বসিয়ে , মুখের ভাত ছেলেদের মুখ থেকে কেডে নিয়েছে ।অঢেল থেকেও যারা লোভের বশবর্তী হয়ে ভাই দের বাসচ্যুত করে নিজেদের ভাগ বসায়  তারা মানুষ রুপি জন্তু।বোধহয় মাল্কানগিরির জন্তুরা এদের চেয়ে যথেষ্ট ভাল ।      
  তখন পূর্ব পাকিস্থান থেকে কাতারে কাতারে লোক ঘর বাডি ছেড়ে স্ত্রী ,পুত্র, কন্যা,পিতা,মাতা, ভগিনী সহ শ্রেফ্ জান বা৺চিয়ে আসছেন;  আর কেন্দ্র সরকার দন্ডকারন্যে  তাদের আশ্রয় স্থল এর ব্যাবস্থা করছেন ।  সেই গুরু দায়িত্তের ৫০% কাজ বাবার দায়িত্ত ছিল। কারন পূর্ব পাকিস্থান(অধুনা বাংলা দেশের) লোকেরা পরিশ্রমি এবং ভালো কৄষক।তাই চাষোপযোগি উন্নত মানের কৄষীজমি নিরুপন একমাত্র উত্তম মৄত্তিকা সার্ভে দ্বারা নিরুপন করা সম্ভব । সেই গুরুদায়িত্তের কাজ বাবাকে দেওয়া হয়েছিল । বাবার অধীনস্থ দু জন সহকারী মৄত্তিকা সংরক্ষণ অধিকারী ,একজন সহকারি কৃষি যন্ত্রী এবং  বরিষ্ঠ গবেসনা সহকারি ও কনিষ্ঠ গবেসনা সহকারি মিলিয়ে প্রায়  একটা বড টীম ছিল । সকলেই দায়িত্ব সম্পন্ন  এবং  কর্তব্য পরায়ন । এক একটা জায়গায় জল পাওয়া যেতনা  তার ওপর প্রখর রউদ্র তাপ সব মিলিয়ে এক কষ্টসাধ্য পরিবেশ তাও সকলের মুখে হাঁসি সেটাই আশ্চর্য্য। সবাই স্বতঃস্ফূর্ত কর্মে উদ্বুধ্য এবং একটি লক্ষ্য রিফ্যুজিদের যেন কোন অসুবিধে না হয়। সরকার থেকে যে বাসস্থান দেওয়া হবে সেটা যেন বাসোপযোগী হয় । চাষ আবাদ ভাল হয় । আজ সে সব যায়গা হা৺সছে । হা৺সছে হরিনারায়নপুর কিন্তু বাবা নেই বাবার কীর্তি আছে । আছে মার স্মৃতি সেই আম গাছ তাতে ফুল ফল সব আছে। আছে আমার দু চোখ ভরা জল আর স্মৃতির রোমন্থন। আজ বাবা মা কেউ নেই আছে কেবল তাদের স্মৃতি । 
                                                       ****/ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জি /**** 
খডিলাগি একাদশী ১৫ ই জুন ২০১২ 
বাবার ২৬ তম শ্রাধ্য দিবস উপলখ্যে